কিছু দৃশ্যকল্পঃ কেমন বিজয় দিবস চাই?

কেমন বিজয় চেয়েছিলেন আমাদের দেশের জন্য, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা? তাঁরা কী চেয়েছিলেন যে ৪২ বছর পর এই বিজয় দিবস কিছু কিছু লোকের জন্য লোকদেখানো দেশপ্রেমের একটা হাতিয়ার হবে? নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ থেমে যাওয়া শুনতে শুনতে তাঁরা কী এরকম ভেবেছিলেন কখনো, যখন মানুষ ঠান্ডায় জমে যাওয়া কাউকে সাহায্য করার চেয়ে আতশবাজি পুড়িয়ে উল্লাস করাকে দেশপ্রেমের মহৎ উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করবে? কিংবা দেশপ্রেম দেখানোর অসুস্থ প্রতিযগিতায় মাতবে?

তাঁরা নিশ্চয়ই এই সব দৃশ্যের কথা ভাবেননি। দেখতে চাননি এরকম কোন দেশপ্রেমিককে।

 

১#

ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলে আর মায়ের কথোপকথন-

-রনি, ঘুম থেকে ওঠ। সকাল ১০টা বাজে।

-ওহ, come on, mom. আজকে ছুটির দিনেও ঘুমাতে দিবা না!

-আজ তো বিজয় দিবস, চলো স্মৃতিসৌধে যাই। ফুল দিয়ে আসি।

-বিজয় দিবস? ধুর, আমি তো জানি ডিসেম্বরে খালি একটাই festival.

-হ্যাঁ, একটাই তো। তুমি কিসের কথা বলছ?

-U know mom, ক্রিসমাস।

 

২#

দুই ছেলের আলাপ ফেসবুক নিয়ে-

-ডিসেম্বর এসে গেল আর তুই কভার আর প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করলি না?

-মানে? কিসের ছবি দেবো?

-কেন? দেশের ছবি, পতাকার ছবি, মানচিত্রের ছবি দিবি। না হলে ফ্রেন্ডরা বুঝবে ক্যামনে যে তুই দেশকে ভালবাসিস; দেশের কথা ভাবিস?

-নারে ভাই, একদিনের বা একমাসের জন্য আমার এই লোক দেখানো দেশপ্রেম ভাল লাগে না।

-একদিন দেখাবি না তো কবে দেখাবি? তুই একটা ক্ষ্যাতই রয়ে গেলি।

 

৩#

এক বন্ধু আরেকজনকে ফোন দিয়েছে-

-হ্যালো দোস্ত, আজকে রাতে ফ্রি আছিস তো?

-কেন? কী করবি?

-আজকে “স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে” হোটেল সোনার বাংলায় একটা DJ পার্টি আছে। যাবি নাকি? ধুম-ধারাক্কা গানে চরম নাচানাচি হবে।

-“স্বাধীনতা দিবস” নারে ব্যাটা “বিজয় দিবস”।

-আরে একটা কইলেই হয়। আসল কথা হইলো মাস্তি; বুঝলা মামা- মাস্তি।

 

৪#

-জানিস এবার আমাদের পাড়ায় বিজয় দিবস উপলক্ষে ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে?

-হুহ, মাত্র ৩ লাখ! আমাদের তো খালি লাইটিং আর সাউন্ড এর জন্যই আড়াই লাখ লাগছে।

 

৫#

দুপুরে খাওয়ার পর আরাম করতে বিছানায় শুয়েছেন জাফর সাহেব। একটু পরেই কাজের লোকটি এসে জানালো যে পাড়ার কয়েকটি ছেলে এসেছে তাঁর সাথে দেখা করতে। বেশ বিরক্ত হলেও উঠলেন তিনি। কিছুদিন পরেই নির্বাচন, তিনি এমপি পদপ্রার্থী। তাই এখন পাবলিকের জ্বালাতন সহ্য করতেই হবে। ড্রইং রুমে এসে দেখলেন চারটি ছেলে। ওনার দলের ছেলে নয় এরা। বরং ওনার সাথে মনোনয়ন নিয়ে ঝামেলা ছিল যার, এরা তারই দলের। ওরা জানালো যে বিজয় দিবস পালন করা হবে এলাকায়। তাই কিছু চাঁদা চায় ওরা। জিজ্ঞেস করলেন- কত? ওরা জানালো, বেশি না, মাত্র ২ লাখ দিলেই হবে।

অনিচ্ছা স্বত্বেও তিনি দিতে রাজি হলেন। নির্বাচনের আগে আর ওদের ঘাঁটাতে চান না।

বিকেল বেলা। এলাকার রাস্তায় হাঁটতে বেড়িয়েছেন তিনি। এখন লোকজনের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে হবে। যদিও তিনি সারা বছর ঢাকাতেই থাকেন, ইলেকশনের কাজে কয়েকমাস হল নিজের এলাকায়ই থাকছেন। সকাল-বিকাল তাই বের হন সবাইকে দেখাতে যে তিনি এলাকাতেই আছেন।

হঠাৎ কোথা থেকে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে দৌড়ে আসলো। বয়স ৯-১০ হবে। এসেই কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো- “স্যার আমাগো শীতে খুব কষ্ট অয়। একটা কোম্বল কিন্যা দিবেন?”

প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে জাফর সাহেব বললেন- “যা, ভাগ। তোদের জন্য তো আমি দানসত্র খুলে বসেছি না? যা, মর গিয়া”।

 

৬#

বিজয় দিবসের দুইদিন আগে। রাজাকারের পা চাটা জামাত-শিবিরের তাণ্ডবে এক বাচ্চা ছেলে রাস্তায় আহত হয়ে পড়ে আছে। কয়েকজন সাংবাদিক নিজের জীবন বাজি রেখে ছবি তুলতে শুরু করলেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে আসলো- আরে ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কী লাভ? ও মারা গেলেই বেশি নিউজ কাভারেজ পাওয়া যাবে। চ্যানেলের বিজ্ঞাপনের দাম আরও বেড়ে যাবে। পরদিন পত্রিকার বিক্রি আরও ১ লক্ষ কপি বেশি হবে।

তখন সবাই চিন্তা করতে লাগলো- আসলেই তো, ওর বেঁচে থেকে কী লাভ?

 

##উপরোক্ত দৃশ্য গুলো পুরোই লেখকের কল্পনা প্রসূত মনের ভুলভাল বকবকানি। বাস্তবে কারো সাথে মিলে গেলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

১,৮১৪ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “কিছু দৃশ্যকল্পঃ কেমন বিজয় দিবস চাই?”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ০১ কোন কিছু হইলেই ইংলিশ মিডিয়ামকে এটাক করার প্রবণতা আমাদের আছে।
    মিডিয়াম টিডিয়াম কিছু না। বাবা-মা, পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাই আসল।
    যদি মা তাকে আগে নিয়ে যেতো তবে নিঃসন্দেহে ঐ কথা শুনতে হতো না।
    আর বিশেষ দিলগুলোতে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে যাওয়ার হ্যাপা অনেক। আমি নিজে এভয়েড করতাম।
    বইমেলায় প্রায় প্রতিদিন গেলেও ২১ তারিখ না যাওয়ার চেষ্টা করতাম।
    ২১ তারিখ রাতেও ফুল দিতে যাই নাই। পরেরদিন দিনে হয়তো গেছি।

    ০২ কেউ করে কেউ করে না। কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কেউ চেঞ্জ করে খুশি কেউ না করে খুশি।

    ০৩ এইসব ডিজে কখনো যাই নাই। ইচ্ছা নাই। তবে যে যাওয়ার সে যাবে।

    ০৪ এইটা আমাদের স্বভাব। অন্যের চাইতে নিজেরটা ভালো বা বাড়িয়ে বলতে হবে।

    ০৫ যে এমপি পদে দাড়াবে তার কাছে বিরোধী দলের ছেলেপেলে চাদার জন্য আসবে না। আর গরীব এর টাকা তুললে বা যাকাত ইত্যাদি দিলেও হঠাৎ করে কেউ এসে চাইবে আর দিয়ে দেয়া হবে ব্যাপারটা এতো সহজ না। ভিক্ষুকদের ও নকল পাওয়া যায়।

    ০৬ সবাই স্কুপ চায় এর বেশি কিছুই বলার নেই।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
    • সামিউল(২০০৪-১০)

      রাজীব ভাই...... আমি ছোটমানুষ, আমার অল্প বয়সের অভিজ্ঞতায় আমি এইটুকু চিন্তা ভাবনা করেছি। অনেক কিছুই হয়তো আবেগ দ্বারা Biased হয়ে লিখে থাকতে পারি। তবে আমার সাজেশন ছিল এই গুলা-

      ০১ আমি ইংলিশ মিডিয়াম পড়ুয়া ছেলেটিকে দোষ দিচ্ছি না। দোষ দিচ্ছি এর সিস্টেম কে। এই সিস্টেমে বাংলাদেশী ছেলেমেয়েদের এই দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই শেখানো হয় না। এই মাধ্যমে পড়ে এমন কিছু বাচ্চার মধ্যে আমি নিজে দেখেছি, তারা দেশের ঐতিহ্য বিষয়ে কোন পাত্তাই দেয় না। আবারো বলছি ওদের দোষ নেই। তবে এবছর থেকে নাকি ইংরেজি মাধ্যমে বাংলা পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা খুশির ব্যাপার।

      ০২ "কেউ করে কেউ করে না। কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কেউ চেঞ্জ করে খুশি কেউ না করে খুশি"
      আপনার কথা সম্পূর্ণ সঠিক। কিন্তু আমি শুধু তাদের কথাই বলেছি যারা নিজেরা তো এই কাজ করেই সাথে অন্যকেও প্রভাবিত করে এগুলো করার জন্য।

      ০৩ ভাই, "যে যাওয়ার সে যাবে"; এটাকে কী আমাদের কালচারের সাথে মানানসই? আমাদের বিজয় দিবস আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিতে পালন করবো আমরা। ডিজে পার্টি মানেই তো কিছু ইংরেজি আর হিন্দি গান নিয়ে লাফালাফি করা।

      ০৪ আমাদের স্বভাবই হয়ত বাড়িয়ে বলা। কিন্তু বিজয় দিবসের মত একটা দিন নিয়ে এরকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা যারা করে, তারা কেমন লোক আমি জানি না।

      ০৫ ভাই, নির্বাচনে কেউ দাঁড়ালে তার কাছ থেকে যত ভাবে টাকা খসানো যায় ততগুলো পথই অবলম্বন করে স্বার্থ অন্বেষীরা। তাকে তো জিততে হবে, তাই না? বিরোধী দলের ছেলেগুলো এই সুযোগ নিবে না কেন?
      আর ভিক্ষুক ছেলে মেয়ে গুলো আসলে একটা মেটাফোর। আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, একজন পার্টি জেতার জন্য এত টাকা খরচ করলেও দুঃস্থদের জন্য কিছু করে না।

      ০৬ এই বিষয়ে আমার আসলেই কিছু বলার নেই। ওই বাচ্চা ছেলেটা যখন মাটিতে পড়ে ছিল, ওই দৃশ্য টিভিতে লাইভ দেখার পর থেকে আমার মাথা আউলায়ে আছে।


      ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

      জবাব দিন
      • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

        ০১ অবশ্যই আনন্দের ব্যাপার।
        তবে এই যে ইংরেজ দের বাঙলা শেখানো এর চাইতে বেশি করে উচিত বাঙলা মিডিয়াম আরো বেশি ইংলিশ বান্ধব করা। মানে ইংরেজির উপর জোর দেয়া।
        ০২ এটাই কি স্বাভাবিক না, এক দিনের যোগী ভাতেরে কয় অন্ন।
        ০৩ আমাদের কালচারে অনেক কিছুই ছিলো না। রবীন্দ্রনাথ ছিলো না। সন্ধ্যা-হৈমন্তীর গানকে এক সময় বলা হতো অশ্লীল।
        যেখানে প্রাণের আবেগ সেটাকে অস্বীকার করা যায় না।
        আমি নিজে এইসব বাজী পোড়ানো, ব্যান্ড এর পিছে টাকা খরচ পছন্দ করি না। আমার পক্ষে সম্ভব হলে আমাদের রিউনিয়নে আতশবাজি না পুড়িয়ে সেই টাকা কলেজের কর্মচারীদের পিছনে ব্যয় করতাম। বড় ব্যান্ড না এনে লোকাল ব্যান্ড আনতাম।
        আহমদ শরীফ কালচারের নামে একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন, আমাদের আনন্দের জন্য ভালো লাগার জন্য কিছু লোক সাপুড়ে নৃত্য, লোক নৃত্য করবে এটা হয় না।

        আহমদ শরীফ নিজে কাজ করেছেন মধ্যযুগীয় সাহিত্য নিয়ে। (ডক ও করেছেন ঐ বিষয়ে। তার ডক্টরেট করার কাইনী ও ইন্টারেষ্টিং) কিন্তু নিজেই বলেছেন মধ্যযুগের সাহিত্য অক্ষমের সাহিত্য।

        একটা সময় দেখবা রিকশা যেহেতু বাঙালি কালচারের অংশ তাই রিকশা বাচাও আন্দোলন হবে।
        ০৪ বাংলাদেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মুসলমান আগে মুসলমান তারপর বাঙালি বা বাংলাদেশি। তো সেই মুসলমানেরা কোন পাড়ার মসজিদ কতো সুন্দর, কতো টাকার টাইল, কতো টাকার কার্পেট, ফ্যান না এসি এইসব নিয়া প্রতিযোগিতা করে আর বিজয় দিবসে সাউন্ড সিস্টেমের খরচ নিয়া করবে না! তা কি হয়...।
        ০৫ যে ছাগল সেই সবাইরে পয়সা দিবে। এবং সে নির্বাচনে জিতবে না।
        ০৬ এই কারণে বিশ্বজিতের হত্যার জন্য ছাত্রলীগের ঐ সন্ত্রাসীগুলার সাথে সাথে মিডিয়া সন্ত্রাসীদের দায়ী করি।


        এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

        জবাব দিন
        • সামিউল(২০০৪-১০)

          একদম খাঁটি কথা কইছেন।

          বাংলাদেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মুসলমান আগে মুসলমান তারপর বাঙালি বা বাংলাদেশি। তো সেই মুসলমানেরা কোন পাড়ার মসজিদ কতো সুন্দর, কতো টাকার টাইল, কতো টাকার কার্পেট, ফ্যান না এসি এইসব নিয়া প্রতিযোগিতা করে আর বিজয় দিবসে সাউন্ড সিস্টেমের খরচ নিয়া করবে না! তা কি হয়...।
          যে ছাগল সেই সবাইরে পয়সা দিবে। এবং সে নির্বাচনে জিতবে না।

          ভাই এরকম ছাগলের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। 😀


          ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

          জবাব দিন
  2. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    দারুন লেখা, সব দিক টাচ করে হইসে, এইটা লেখার ব্যাপ্তি বাড়ায়ে দিসে। প্লাস প্লাস প্লাস 🙂


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।