গল্পের নাম নেই……

সেদিন ক্যাফেতে আমিন ভাই(pcc 24) এর সাথে দেখা; বললেন, “ABCX( Association of BUETian Ex- Cadets) এর ম্যাগাজিন বেরোচ্ছে, কিছু লিখলে আমার কাছে দিও; ছাপা হওয়ার ১০০% গ্যা্রান্টি সহকারে জমা নিচ্ছি”। বললাম, “ইনশা আল্লাহ, দেখি কী করি”।

রাতে বসেছি class test এর জন্য পড়তে। হঠাৎ মনে হল কিছু লেখা দরকার।

বেশ কিছু দিন আগের একটি দৃশ্য মনে পড়লো। টিউশনিতে যাচ্ছিলাম বাসে করে। কলা্বাগানের জ্যামে আটকে আছি, জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম; অসংখ্য প্রাইভেট কার আসে পাশে। সবগুলো যেন কলেজে দেখা রিলে রেস এর এ্যাথলেটদের মত অশান্ত ভঙ্গি্তে দাঁড়িয়ে- এই ছুট লাগাল বুঝি! দেখলাম এক বৃদ্ধকে, পড়নে অনেক পুরনো লুঙ্গি আর হাফ শার্ট, হাতে কিছু কাগজের খেলনা। এক গাড়ি থেকে আর এক গাড়িতে ছুটে যাচ্ছেন বিক্রির আশায়। কিন্তু কোনো গাড়ির সামনেই ১০-১৫ সেকেন্ডের বেশি দাড়াচ্ছেন না। কারন আর কী, কেউই কোনো খেলনা কিনছে না। হায়রে বৃদ্ধ, কেমনে বুঝবে যে এই যান্ত্রিক শহরের বাচ্চা্রাও এখন যান্ত্রিক খেলনা ছাড়া আর কিছু পছন্দ করে না। তাই তাদের বাবা মায়েরাই বা কেন ফালতু কাগজের খেলনা কিনে টাকা নষ্ট করবে?

বৃদ্ধকে দেখতে দেখতে বাস ছেড়ে দিল। শেষ বারের মত তাকে দ্দেখলাম। আমি বলছিনা যে তার হতাশাগ্রস্ত চোখ আমি দেখতে পেয়েছি। কিন্তু আমি বাজি রেখে বলতে পারি যে তার চোখে হতাশা ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। বাস এগিয়ে চললো। আমিও চললাম জীবিকার প্রয়োজনে। ভুলে গেলাম বৃদ্ধে্র কথা।

এভাবেই আমরা প্রতিনিয়ত ভুলে যাই আমদের চলতি পথে ঘটে যাওয়া অনেক তুচ্ছ ঘটনা। তুচ্ছ, হ্যাঁ তা তো বটেই। অথচ ঐ খেলনা বিক্রির উপরেই ঐ বৃদ্ধে্র এবং হয়তোবা তার কোনো পরিবারের সদস্যে্র জীবন নির্ভরশীল।

ভুলে যাই আমরা সবই, নিজের স্বার্থ ছাড়া। কিন্তু ভুলতে পারি নাই আমার হল এর এক ক্যান্টিন বয়ের কথা।

ক্যাডেট কলেজে আমাদের কাপড় ধোয়ার কোনো চিন্তা ছিলনা। কিন্তু বুয়েট এ এসে পড়েছি বিপদে। আমার হলে (শেরে বাংলা) কোন লন্ড্রি নেই তাই পাশের হল সোহরাওয়ার্দীর লন্ড্রিতে কাপড় ধুতে দেই। সেদিন এক ক্যান্টিন বয়কে ডাকলাম তারপর কিছু কাপড় দিয়ে বললাম সোহরাওয়ার্দীর লন্ড্রিতে দিয়ে আসতে আর স্লিপ নিয়ে আসতে। সে একটু পরেই নিয়ে এল। কিছু টাকা দিলাম তাকে। দেখি সে টাকা পাওয়ার পরেও যাচ্ছে না। জিজ্ঞেস করলাম সে কিছু বলবে নাকি। তো সে আমার পিছনের পিসি দেখিয়ে বললো ,”স্যার ওইটা কি আপনের কম্পিউটার?” আমি বললাম,”না,আমার রুমমেটের,কেন?” সে বললো,”স্যার,গান”। বললাম,”কী গান শুনবে?” বললো,”দেখবো”। তো পিসিটা অন করে বললাম আমার পাশে বসতে। জিজ্ঞেস করলাম,“নাম কী?”বললো,”রহিম,আব্দুর রহিম”।

একটা হিন্দি গান ছেড়ে দিলাম। রহিম বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। এরপর জিজ্ঞেসা করলাম,বাসা কই? বললো থাকে কামরাঙ্গী চরে। আগে গ্রামে ছিলো। তার বাপ নাকি জুয়া-টুয়া খেলে অনেক ধার দেনা করে সব টাকা-পয়সা,সম্পত্তি হারিয়েছে-এখন রিকশা চালায়। তার মা আর বোন বাপের সাথে বস্তিতে থাকে। সে নাকি বাপকে সাহায্য করার জন্য এখানে কাজ করতে এসেছে।

এই সময়ে আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম সে মোটেই পিসির স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে নেই বরং সে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথাগুলো বললো এবং কথাগুলো বলার সময় তাকে ৮-৯ বছরের রহিমের চেয়ে অনেক বড় দায়িত্বশীল কোন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।

বললাম, “স্কুলে যাও নাই?”বললো,“ওয়ানে গেছিলাম এর পরেই তো চইল্যা আইছি ঢাকায়”। আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। আমি একটু কাজে বাইরে যাচ্ছিলাম বলে উঠতে হলো। তাকে বললাম চলে যেতে। সে আমাকে বলল “আমি তাহলে আসি স্যার।”

একটা বিষয় খেয়াল করলাম,সে এতক্ষণ পুরোটা সময় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলো। কিন্তু এই পুরো বাক্যটা সে সম্পূর্ণ শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করলো। হয়তোবা বড় কাউকে কারো থেকে বিদায় নেয়ার সময় সে এই বাক্যটি শুনেছিল তাই সে এইভাবে বললো। এই ব্যাপারটা আরো নিশ্চিত হলাম এর দুদিন পরে। তাকে বললাম কাপড়্গুলো নিয়ে আসতে। সে নিয়ে এল এবং যাওয়ার সময় আবারো একই ভাবে বলল,”আমি তাহলে আসি স্যার”।

জানিনা কেন এই ঘটনা দুটো বললাম। আসলে আমাদের এই ব্যস্ত সময়ে আমরা সবাই নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত। ছাত্রজীবনে আমরা পড়াশোনা ,টিউশনি আর প্রেম নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি। এইসব তুচ্ছ ঘটনা কারো মনে থাকে না। কিন্তু যখন আমরা একা একা রাস্তায় বসে থাকা অন্ধ ভিখারির পাশ দিয়ে হেটে যাই,সবার বুকের মাঝেই হাহাকার করে ওঠে।

রাস্তার সেই খেলনা বিক্রেতা বৃদ্ধের জীবনের কাহিনী জানি না আমি। হয়তো এর পিছনেও আছে নদীভাঙ্গন কিংবা ধার-দেনা বা রোগ-শোকের কালো হাত।

আর জানলেই বা কী?আমিতো ক্যান্টিনবয় আব্দুর রহিমের গল্প জানি। কিন্তু তার জন্য কীই বা করতে পারি। আসলে সবারই সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু একসাথে অনেকে থাকলে সীমাকেও ভাঙ্গা যায়। মানুষের জন্য আসলে কিছু করার এটাই সময়।

৫৬৪ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “গল্পের নাম নেই……”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।