মা

আমার আজকের এই লেখাটি তুহিনের মায়ের দ্রুত সুস্থ্যতা কামনা করে তুহিনকে উৎসর্গ করে লিখা।

আমার ক্যাডেট কলেজের একেবারে শুরুর দিকের ঘটনা। ১৯৯২ সালের জুলাই/আগষ্ট মাস। ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন। আমি, ফখরুল, ফয়সাল এবং মাহফুজ আমরা ৪ জন ছিলাম রুমমেট। আগের শুক্রবারে প্যারেন্টস্‌ ডে হয়ে গিয়েছে। সবার কাছেই কমবেশি খাবারের ষ্টক আছে। ফয়সালের ডেক্সের ভিতরে ছিল ড্রাইকেকের একটা প্যাকেট। আমি আবার ড্রাইকেক খুব পছন্দ করতাম। ফয়সাল আমাদের সবাইকেই খেতে দিয়েছিল, কিন্তু সেদিন আমি একটু বেশি চাওয়াতে অসম্মতি জানিয়েছিল। আমি জোর করাতে ফয়সাল প্যাকেটটা ওর ডেক্সে ঢুকিয়ে তার উপরে বসে থাকল। আমি দুষ্টামি করে ডেক্স খুলতে চাইলে ফয়সাল আমাকে দূরে সরানোর জন্য ধাক্কা দিল। আমি ধাক্কা খেয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে আমার বেডে পড়ে গেলাম। বেডের অপর পাশে রাখা টেবিলের কোনায় আমার মাথার পেছনটা আঘাত লাগল। আমি মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। হাত সরিয়ে এনে দেখি আমার হাত রক্তে ভরে গিয়েছে। ফয়সাল রক্ত দেখে ভয় পেয়ে গেল। সাথে সাথে আমাকে নিয়ে খালি পায়েই হাসপাতালে দৌড় দিল।

হাসপাতালে যাবার পর মেডিক্যাল এসিসট্যান্ট শুরুতে ব্লিডিং বন্ধ করল, তারপর মাথার কিছু চুল সেভ করে ফেলে দিল। কাটা জায়গাতে ২টা সেলাই করে ব্যান্ডেজ করে দিলো। যথারীতি আমাদের দুজনকে ষ্টেটমেন্ট লিখতে হলো। আমি ফয়সালকে টেনশন মুক্ত করলাম। আমি লিখলাম, ফয়সাল আমাকে খুব আস্তে ধাক্কা দিয়েছিল, আমি ইচ্ছা করে পিছনে শুয়ে পড়েছি আমার বেডে, কিন্তু টেবিলটা খেয়াল করিনি। আমার নিজের দোষেই আমার মাথা ফেটেছে। এজন্য ওর কোন দোষ নেই। ফয়সালও একই ঘটনা লিখল। আমাদের এই ষ্টেটমেন্টগুলো যত্ন করে আমাদের পার্সোনাল ফাইলে রাখা হলো।

এর ঠিক পরের দিনের ঘটনা। হঠাৎ লাঞ্চের পর শুনি আমার বাবা কলেজে এসেছে আমাকে দেখতে। আমি তো প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম। ডিউটি মাষ্টার জাহাংগীর স্যার আমার বাবার পরিচিত ছিলেন। বাবার বিশেষ অনুরোধে স্যার তিতাস হাউসের করিডোর (নিচ তলা) দিয়ে অল্প কিছুক্ষনের জন্য বাবার সাথে আমাকে কথা বলার পারমিশন দিলেন। আমি চিন্তা করতে থাকলাম, আমার মাথা ফাটার ঘটনা বাবা জানল কিভাবে? তাহলে কি জাহাংগীর স্যার বাবাকে সব বলে দিয়েছে? ভয়ে ভয়ে নিচে নামলাম। তিতাস হাউসের করিডোরে গিয়ে দাড়ালাম। দেখলাম ১০ গজ দূরে বাবা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল কেমন আছি। আমি ভয়ের সাথে বললাম ভাল। এরপর দেখি বাবা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই আমার সাথে কথা বলছে। একটু অবাক হলাম। একথা ওকথার ফাকে হঠাৎ প্যারেন্টস্‌ডে ছাড়া এভাবে কলেজে চলে আসার কারন জানতে চাইলে বাবা বলল যে, মা নাকি আগেরদিন রাতে আমাকে নিয়ে খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছে, সকাল থেকে প্রচন্ড কাঁদছে, না খেয়ে আছে। মা জোর করে বাবাকে পাঠিয়েছে আমাকে দেখে যাওয়ার জন্য। আমি তখন বুঝলাম বাবা, মা কেউ আমার মাথা ফাটার ঘটনা জানেনা। সাথে সাথে হাসি দিয়ে বললাম “আমি তো ভালই আছি”। এরপর আরো কিছুক্ষন কথা বলার পর বাবা আমাকে যেতে বলল। আমি তো বিপদে পড়লাম। উল্টা ঘুরলেইতো বাবা আমার মাথার ব্যান্ডেজ দেখে ফেলবে। তাই আমি বাবাকে বললাম আগে যাওয়ার জন্য, আমি হাত নেড়ে বিদায় দিব। শুরুতে রাজি না হলেও আমি যখন জিদ ধরলাম তখন বাবাই আগে যেতে বাধ্য হলো। আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আজো আমার বাবা মা জানে না আমার সেই মাথা ফাটার কাহিনী।

কিন্তু এই ঘটনাটি আমাকে প্রায়ই ভাবায়। কি অদ্ভুত এক আত্নিক যোগাযোগ মা আর সন্তানের মাঝে। আমার মা অনেক দূরে থাকলেও ঠিকই সেদিন টের পেয়েছিলেন যে, আমার কোন ক্ষতি হয়েছে। আজকে যখন তুহিন ওর মার জন্য সবার কাছে দোয়া চাইল তখন আমার মা সংক্রান্ত ক্যাডেট কলেজের এই ঘটনাটি হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল। তাই আজকের এই লেখাটি তুহিনের মায়ের দ্রুত সুস্থ্যতা কামনা করে তুহিনকেই উৎসর্গ করলাম। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি আমাদের যাদের মা বেঁচে আছেন, সবাই যেন ভাল থাকেন, সুস্থ্য থাকেন।

২,৫৮২ বার দেখা হয়েছে

২৩ টি মন্তব্য : “মা”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    একবার প্যারেন্টস ডেতে আসার পথে হাইওয়ে থেকে কলেজে ঢুকার সময় টার্ন করতে গিয়ে টেক্সি উল্টে আম্মার মাথা ফেটে গিয়েছিলো। কলেজ হাসপাতালে এনে তারপর সেলাই করা লেগেছিলো। যখন বলা হলো যে প্যারেন্টস ডে আমাকে হাসপাতালে করতে হবে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আম্মা ভালোই চোট পেয়েছিলেন। মাথায় চারটার মত সেলাই দিতে হয়েছিলো। ভাগ্য খুবই ভালো ছিলো সেসময় ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে রাস্তার মাঝখানে উল্টে থাকা টেক্সিটিকে আরো বড় কোনো দূর্ঘটনায় পড়তে হয়নি।
    দোস্ত তোর পোস্ট টা দেখে আজ এতোদিন পর ঘটনাটা মনে পড়লো। তুহিনের আম্মু নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবেন ইনশাল্লাহ, আল্লাহর কাছে সেই দোয়াই করছি।

    মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি আমাদের যাদের মা বেঁচে আছেন, সবাই যেন ভাল থাকেন, সুস্থ্য থাকেন।

    সব মায়েদের জন্য :salute:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
    • ধন্যবাদ ভাইয়া। আম্মুর অবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো। গতকালের বায়োপ্সির রিপোর্টও ভালো এসেছে। আজ যদি সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে বিকেলে বাসায় নিয়ে আসব। আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

      জবাব দিন
  2. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)
    মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি আমাদের যাদের মা বেঁচে আছেন, সবাই যেন ভাল থাকেন, সুস্থ্য থাকেন

    পৃথিবীর সকল মা'কে :salute:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  3. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    লেখাটা চোখ এড়িয়ে গেল কেন আমার বুঝলাম না।

    আমারও আমার মাকে নিয়ে অনেক এরকম ঘটনা আছে। আমি অসুস্থ হলেই মা কেমন কেমন করে যেন টের পেতেন। একে তাকে দিয়ে খবর পাঠাতেন। আহারে।

    সব মায়েরা ভাল থাকুন।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
    • রহমান (৯২-৯৮)
      আহারে

      যাহোক লেখাটা শেষ পর্যন্ত আপনার চোখ যে এড়ায় নাই এইটা দেইখাই আমার খুব খুশি লাগতেছে ফয়েজ ভাই 🙂 । লাবলু ভাই এবং আপনার হস্তস্পর্শ (এক্ষেত্রে পদধুলির প্রতিশব্দ হিসেবে বলছি) পাওয়াতে আমার এই লিখাটা যেন আরো প্রাণ পেল। ধন্যবাদ :hatsoff:

      জবাব দিন
  4. তৌফিক (৯৬-০২)

    আনিসুল হক আর ম্যাক্সিম গোর্কি- দু'জনেরই মা নামে একটা করে উপন্যাস আছে। দু'টোই আমার খুব প্রিয়।

    আমার মাও দাবী করেন আমার কন্ঠ শুনে নাকি তিনি সব বুঝতে পারেন। দাবীটা কিছুটা সত্যিও বটে। ডেটিং করে বাসায় আসলেই মা কিভাবে যেন বুঝে যেতেন বাইরের সময়টা আজ বন্ধুদের সাথে কাটাইনি। 😛

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।