এলাহী বক্স

[একজন সফল মানুষের গল্প]

১৯৭১ সালে বাবার মৃত্যুর পর খুব বিপদে পড়ে যান এলাহী বক্স। বাধ্য হয়ে তারা তিন ভাই সরকারী এতিম খানায় ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে দেশব্যাপী এধরণের সমস্যাগ্রস্তদের কল্যাণে সরকার অনেকগুলো এতিম খানা প্রতিষ্ঠা করে। রাজশাহী জেলাতে এতিমখানাটি ছিলো পুঠিয়াতে। পুঠিয়া রাজবাড়ির একটা দোতলা ভবনে। এতিমখানাটি পরে রাজশাহীর বায়াতে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নাম- সরকারী শিশু সদন, বায়া, রাজশাহী।

সরকারী এতিমখানায় ১৮ বা তদুর্ধ বয়স্কদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজে পুনর্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। হুগলি থেকে আগত রেডিও মেকানিক গোলাম মওলার মডার্ন ইলেকট্রনিক্স তখন রাজশাহীতে নামকরা। রাণীবাজারের এই দোকানেই রেডিও মেরামতের কাজ শিখেন এলাহী বক্স। গোলাম মওলা ছিলেন খুব ভালো মানুষ। এলাহী বক্সকে খুব ভালোবাসতেন তিনি। এলাহী বক্সও ছিলেন খুব মনযোগী শিষ্য। মাত্র তিন মাসেই রেডিও মেরামতি রপ্ত করে ফেলেন তিনি। তার কাজের পয়সা নিতেন না ওস্তাদ ও মালিক গোলাম মওলা। রেডিও মেরামতির সময় বাদে এলাহী বক্স প্যাকেট বানানোর কাজ করতেন আল হেরা কেমিক্যালস- এ। মাত্র ৩৫০ টাকা পেয়েছিলেন এতিমখানা থেকে। কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে কাজ করে বেশ কয়েক বছরেই মোটা অংকের মালিক হয়ে যান তিনি। নিজেই একটা সারাই এর দোকান দেন। কিন্তু টাকার নেশা পেয়ে বসে তাকে।

এরশাদ আমলে ছিল অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা। ফিল্ম, টেপরেকর্ডারের হেড, ক্যাসিও ঘড়ি এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল ভারতে। এজাতীয় জিনিস রপ্তানী করে রেডিওর খুরচা যন্ত্রাংশ আমদানী করা শুরু করেন এলাহী বক্স। যে সব আইটেমে লাভ বেশী আকারে ছোট এসবের বাণিজ্য। মালপত্র নিজেই আনা নেয়া করতেন। দ্রুত বাড়তে থাকে মূলধন। ধরা খেয়ে যান একদিন। মালপত্র টাকা পয়সাসহ ধরা পড়েন। এবার একটু শিক্ষা হয়। একবারে সব টাকা না খাটিয়ে কয়েক ভাগ করে নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এতে করে একবারে সব শেষ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচা গেল। একই সাথে নিজস্ব মেকানিকের কাজও চলতে থাকে। একসময় ঝুঁকি পূর্ণ বাণিজ্য ছেড়ে দিয়ে পুরোদমে উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হন এলাহী বক্স।

ভারত থেকে আমদানী করা জিনিস নিজেই তৈরী করার চেষ্টা করতে থাকেন এলাহী। কিন্তু সমস্যা ছিল। ইলেকট্রনিক্সের ছোটখাটো যন্ত্রাংশের পরিচিতি নম্বর ঘষে দেয়া থাকতো। রেজিস্ট্যান্স, ক্যাপাসিটর, রেকটিফায়ার ইত্যাদি জিনিসের ক্ষমতা ধৈর্য্য ধরে পরীক্ষা করতে করতে সফল হয়ে যান এলাহী। সার্কিট বুঝে নিয়ে কিছু কিছু জিনিস তৈরী শুরু হয়। তার টেলিভিউ ইলেকট্রনিক্স- এর কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাড়ে তিনশত টাকা পরিনত হয় কোটি টাকায়।

পরিশ্রমী এই লোকটি এখন ইনভার্টার তৈরীতে ব্যস্ত।ছোট ছোট কয়েকটি কারখানায় তৈরী হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষমতার ইনভার্টার। লোকে অবশ্য ওগুলোকে আইপিএস বলে। বিদ্যুত সংযোগবিহীন অনেক এলাকাতেই সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছে মানুষ। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ব্যাটারী চার্জ হয়। তার পর ডিসি বাল্ব বা ডিসি ফ্যান চালানো হয়। সাদা কালো টিভিও চলে। কিন্তু এসব মানসম্মত নয়। মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার চালাবেন কিভাবে ? টেলিভিউ এর আইপিএস বা কনভার্টার দিবে সমাধান। চাহিদা এবং সামর্থভেদে বিভিন্ন ক্ষমতা ও দামের পন্য আছে।

দেশব্যাপী স্পিকারের কয়েল এবং ডায়াফ্রাম সরবরাহ করে এলাহী বক্সের টেলিভিউ ইলেকট্রনিক্স। নিজের কারখানা বাদেও অন্যদের দিয়েও কিছু পন্য তৈরী করে নেন। দুইশতাধিক লোক সততা ও নিষ্ঠার সাথে উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এলাহীদের দেখে স্বপ্নবাজ হয়ে ওঠে মন।

১,৬৮৩ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “এলাহী বক্স”

  1. মাহমুদুল (২০০০-০৬)

    এলাহী বক্স রা নিজেরাই সাফল্যের সিড়ি বেয়ে ঊঠে যায়। আর সরকারি সাহায্যপুষ্টরা প্রতিষ্ঠান সহ উধাও হয়ে যায়। ::salute:: ::salute:: ::salute::


    মানুষ* হতে চাই। *শর্ত প্রযোজ্য

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন অনুপ্রেরনাদায়ক লেখা। আমাদের যুবকদেরকে এলাহি বক্সের মত স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য উদ্ভুদ্দ করা জরুরী।

    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ মোস্তাফিজ ভাই :hatsoff:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  3. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    অপ্রতুল বিদ্যুত সরবরাহের দেশে এলাহী বক্সদের দরকার। সৌরবিদ্যুতে ছাড়া আমাদের দেশের গতি নাই। উনাকে :salute:


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
    • মোকাব্বির (৯৮-০৪)

      ঠিক বলসেন। আমারও মনে হয় এই এরিয়াটাতে পিছায় আছিঃ ভালো টেকসই ব্যাটারী ও এলইডি বাল্ব। সোলার প্যানেলের জন্য ব্যাটারী তৈরী হয়তো হচ্ছে কিন্তু সেটা এখনো সেই লেড-এসিড ব্যাটারীর বেইজ মডেল যেটা বাস-ট্রাকে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘস্থায়ী রিসাইকেল, উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারী উদ্ভাবন বা অন্তত টুকলিফাই করার পেছনে যথেষ্ট নজর দেয়া হচ্ছে না। এলইডি নিয়ে বিশেষ জ্ঞান নাই তবে বাঙলাদেশের লাইনে আসতে সময় লাগবে! 🙂


      \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
      অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।