অচিনপুরে যাত্রা…

হুমায়ূন আহমেদ চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর কিছু কাজের জন্য তাঁকে অপছন্দ করলেও তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য প্রাপ্য সম্মানীয় জায়গাটি ছিল অটুট। আমার একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি। অদ্ভুত এক ধরনের শূন্যতা বোধ করছি।

শিল্প-সাহিত্যে ভয়ংকর রকম দুর্বল আর পিছিয়ে থাকা এই আমার সাহিত্য জগতে যা কিছু বিচরণ তার প্রায় পুরোটা জুড়েই হুমায়ূন আহমেদের গল্প আর উপন্যাস – বাকিটা জাফর ইকবাল, সত্যজিৎ রায় আর আর্থার কোনান ডয়েল এর কিছু লেখা। বন্ধুবান্ধবদের মাঝে, রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাস তো সমরেশ এর এই বই বা বুদ্ধদেবের ওই বই – এধরনের আলোচনা হলে আমি কিছুটা ভয়ে থাকতাম। উচ্চমার্গের সাহিত্যরস আস্বাদনের ক্ষেত্রে আমার কোঠা শুন্য। আমার আছে হুমায়ূন আহমেদ – যাকে আমি আমার দৃষ্টিতে একজন দারুন প্রতিভাবান, হৃদয়স্পর্শী ও পাঠকদের অনেক কাছের সাহিত্যিক হিসেবেই বিচার করে এসেছি। কিন্তু অনেকের কাছেই তাঁর সাহিত্যকর্ম “সস্তা” কিংবা “অগভীর”। আমি দরিদ্র মানুষ। আমার সস্তা জিনিসের প্রতিই বেশী আগ্রহ। বিরিয়ানী গোত্রের সাহিত্যকর্ম আমার হয়তো হজম হত না বা হবেও না।

হুমায়ূন আহমেদের বই কখনো গোগ্রাসে গিলতাম আবার কখনো কখনো একটু ধীরে-সুস্থে অল্প অল্প স্বাদ আস্বাদন করে উপভোগ করতাম। আমার কিশোর মনে স্থান করে নেয়া হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বইয়ের মাধ্যমে আমাকে দারুন কিছু সময় কাটাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমার মনে আছে কলেজে থাকাকালীন সময়ে পাগলামি করে তাঁর লেখা সব বইয়ের শিরোনাম দিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলেছিলাম। আমার বোন ছাড়া এটা কেউ জানত না। ভালই হয়েছিল – আপা তাই বলেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সব বই কিনেই পড়েছি। তবে ল্যাপটপে সংগ্রহে রেখেছি ই-বুক হিসেবেও। তাঁর মৃত্যুতে সেই ই-বুক সংগ্রহটি দেখতে গিয়ে আমার আরেকটা কষ্টের স্মৃতি আমাকে এলোমেলো করে দিল। আমি ‘হুমায়ূন আহমেদ’ নামে একটি ফোল্ডারে তাঁর সব বই রেখেছিলাম। তাঁর ভেতরে ‘কমপ্লিটেড’ নামে আরেকটা ফোল্ডার করা ছিল। আমার প্রয়াত বেহেশতবাসী স্ত্রী এক এক করে বই পড়ে শেষ করলে, ‘কমপ্লিটেড’ ফোল্ডারে রেখে দিত। আজ আবিস্কার করলাম, ও এ পর্যন্ত ৬৯টি বই পড়ে শেষ করেছিল। বাকিগুলো পড়ার সময় পায়নি। হুমায়ূন আহমেদ, আপনি আমাকে তো বটেই, আপনার বইগুলো ভীষণ একাকী আমার প্রয়াত স্ত্রীর অবসরের সঙ্গী হয়ে তাঁকে আনন্দ দিয়েছে – আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

হুমায়ূন আহমেদের ইন্তেকালের সাথে মিসির আলি, শুভ্র, হিমুরও জীবনাবসান হল। এটা ভাবতে কেমন যেন লাগছে।

বইয়ের দোকান পেলেই একবার অন্ততঃ ঢু মেরে তাঁর লেখা নতুন কোন বই আছে কিনা – এটা খোঁজ নেয়া ছিল আমার একটা অভ্যাস। অপ্রকাশিতব্য ছেলেমানুষি আনন্দের এই অভ্যাস থেকে আজ মুক্তি পেলাম। একটা কাজ কমল। রেস্ট ইন পিস, স্যার। উই শ্যাল জয়েন ইউ সুন…

৯৫৬ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “অচিনপুরে যাত্রা…”

  1. সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

    ইউসুফ,

    হুমায়ূন আহমেদ, আপনি আমাকে তো বটেই, আপনার বইগুলো ভীষণ একাকী আমার প্রয়াত স্ত্রীর অবসরের সঙ্গী হয়ে তাঁকে আনন্দ দিয়েছে – আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

    বড্ড মন ছুয়ে গেল কথাগুলি।

    ভাল থেকো।

    জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    ইউসুফ ভাই,
    কতদিন পর আপনাকে দেখা গেলো! ভালো আছেন?
    হুমায়ুন আহমেদ এর আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে হঠাৎ একটা শূন্যতাবোধ পেয়ে বসেছে আমাকেও।হুমায়ুনের সংগে আমাদের আত্মীয়তা তো কম সময়ের নয়! উপন্যাস, গল্প, টিভি নাটক, সিনেমা - এসবকিছু দিয়ে আমাদের অনেকটা জুড়ে তিনি ছিলেন।তাঁর সেরা সময়ে যতটা পড়া যায় পড়েছি লেখাগুলো, পরে তেমনটা নয়।

    শেষ পর্যন্ত তিন হুমায়ুনের কেউই আর রইলেন না : আজাদ, ফরিদী আর আহমেদ।

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    অনেকদিন পরে আপনাকে লিখতে দেখে ভাল লাগলো , কিন্তু লেখাটা পড়ে মন খারাপ হলো।

    ভাল থাকবেন স্যার, :salute:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।