নভিসেস প্যারেডের স্মৃতিঃ

(এই লেখাটি সামহোয়ারইনের পাঠকদের জন্যে লিখেছিলাম।এখানেও দিয়ে দিচ্ছি এ কারণে যাতে নভিসেস প্যারেড নিয়ে মজার ঘটনাগুলো নিয়ে পাঠকেরা কমেন্ট করেন।ব্লগটি না পড়লেও চলবে কারণ এখানে এমন কিছু লিখিনি যা আপনাদের অজানা।মূলত সাধারণ পাঠকদের ক্যাডেট কলেজ নিয়া ধারণা দেবার জন্যেই এর জন্ম)

নভিসেস প্যারেড ক্যাডেট কলেজের প্রতিটি ক্যাডেটের জীবনে নিঃসন্দেহে অন্যতম স্মরণীয় একটি দিন।সেনাবাহিনীতে যেমন পাসিং আউট প্যারেড,সেই মাত্রায় না হলেও ক্যাডেট জীবনে ক্লাস সেভেনের একজন ক্যাডেটের কাছে নভিসেস প্যারেডের গুরুত্ব কম নয় কোন অংশেই।আমার আজকের ব্লগ সেই নভিসেস প্যারেডের অম্ল-মধুর স্মৃতি নিয়েই।

ক্যাডেট কলেজে যোগদানের প্রথম সাতদিনে নিয়ম কানুন সম্পর্কে অল্প-বিস্তর ধারণা দেয়া হলেও মূল প্রশিক্ষণ শুরু হয় দ্বিতীয় টার্ম থেকে।একদিকে ডায়নিং হলে আদব কায়দা শেখার মহড়া,পড়াশোনার চাপ আর অন্যদিকে চলে তাকে কলেজের উপযোগী করে তোলার অন্যতম প্রধান প্রশিক্ষন-প্যারেড শিক্ষা।ভোরবেলা পিটির সময় সারা কলেজ যখন দৌড়-ঝাঁপ ও শারীরিক কসরতে ব্যস্ত, কলেজে সদ্য যোগদান করা ১২-১৩ বছর বয়েসি কিশোরেরা তখন বেরেট ক্যাপ,অক্সফোর্ড সু,ভেস্ট,সাদা হাফপ্যান্ট আর আর্মি বেল্ট পড়ে লেফট-রাইট-লেফট,জলদি-চল,টাচ-এন্ড-ব্যাকে মুখরিত করে তোলে চারদিক।আর তাদের প্রশিক্ষণে থাকেন সেনাবাহিনীর নন-কমিশন্ড অফিসাররা।সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকেন ক্যাপ্টেন বা মেজর পদমর্যাদার একজন সেনা অফিসার।কোন কোন ক্ষেত্রে অবশ্য নৌ বা বিমান-বাহিনী অফিসারদেরকেও এডজুট্যান্ট হিসেবে দেখা যায়।প্রায় আড়াই মাস কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে নভিসেস প্যারেডের মাধ্যমে সপ্তম শ্রেণীর নবীন ক্যাডেটদেরকে কলেজের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সাথে একত্রীভূত করে নেয়া হয়।

এবার আসি আমার নভিসেস প্যারেডের কথায়।১৯৯৭ সালে আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে ক্যাডেট কলেজে যোগদান করি।কলেজে যোগদানের আগে বাইরের স্কুলে হালকা পিটি-প্যারেড করলেও একেবারে সামরিক কায়দায় ড্রিল করার অভিজ্ঞতা আমাদের অধিকাংশেরই ছিলনা।তাই পুরো বিষয়টা শুরুতে খুব কৌতুহল নিয়ে লক্ষ্য করতে থাকি সবাই।কিন্তু প্রাথমিক কৌতুহল কেটে যাবার পর আস্তে আস্তে এর কঠোর দিক গুলোর সাথে পরিচিত হতে শুরু করি আমরা।বাবামায়ের আদুরে ছেলেটি,সকালে ওঠা যার দু চোখের বিষ-সেই ছেলেটিকেই দেখা যায় কাক-ডাকা ভোরে আর সবার মত প্যারেড গ্রাউন্ডে হাজির হতে।প্রথমে কিছুক্ষন চলে গা-গরম বা ওয়ার্মিং-আপ।কলেজের নানা জায়গা দৌড়ে টাচ-এন্ড-ব্যাক করা, যারা শেষে এল তাদের আবার দৌড়ে ফেরত যাওয়া-এসবের মাধ্যমে শরীরকে প্যারেডের উপযোগী করে নেয়া হয়।সবার প্রথমে “সাবধান” আর “আরামে দাঁড়া” শেখানো হয় ভেঙ্গে ভেঙ্গে-পা তুলে প্রেস করার আগ মুহুর্তকে বলা হয় সাবধান/আরামে দাঁড়া সংখ্যা-১,আর সজোরে মাটির সাথে পা প্রেস করাকে বলা হয় সংখ্যা-দুই।এই পা প্রেস করা নিয়ে এবং পা তোলা নিয়ে ড্রিল স্টাফদের বিভিন্ন মজার মজার মন্তব্য ছুটে আসে ক্যাডেটদের দিকে, যা কঠোর পরিশ্রমের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে সহায়তা করে।যেমনঃকোন ক্যাডেট যদি ফাঁকি দেবার জন্যে একটু ধীরে পা ফেলে,সাথে সাথে স্টাফের গর্জন শোনা যায়-“ এমন ভাবে পা প্রেস করবা যেন গ্রাউন্ড ফেটে পানি বের হয়, সেই পানিতে পুকুর হয়ে যায় আর সেই পুকুরের মাছ দিয়ে সারা কলেজকে খাওয়ানো যায়……”।কেউ যদি পা যথাযথভাবে উপরে না তোলে তখন শোনা যায়-“এমন ভাবে পা তুলবা যেন পায়ের নিচ দিয়া আর্মাড ডিভিশনের ট্যাঙ্ক যাওয়ার জায়গা থাকে”।সাবধান, আরামে দাঁড়া এগুলো শেখানোর পর ধীরে ধীরে শেখানো হয় জলদি-চল(বা মার্চ পাস্ট,টিভিতে সেনাদলকে দ্রুতলয়ে যে ড্রিলটি আমরা করতে দেখি),ধীরে চল(টিভিতে কোন বিদেশি অতিথি বা উচ্চ পদস্থ কোন ব্যক্তিকে কুচকাওয়াজের সময় দুজন সেনা সদস্য ধীরলয়ের যে ড্রিলের মাধ্যমে কোন বেদীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করে তার দলগত রূপ),স্যালুট,তিন সারিতে ডানে ফেরা,বাঁয়ে ফেরা ইত্যাদি।

এভাবে কঠোর প্রশিক্ষণের মাঝে কিভাবে সময় চলে গিয়েছিল টেরই পাইনি। এগিয়ে আসে আমাদের নভিসেস প্যারেডের দিন।সকাল বেলা আমাদের সে কি ব্যস্ততা!যেহেতু এটি কলেজের একটি হাউস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা(প্রতিটি ব্যাচের ক্যাডেটদের তিনটি হাউসে সমান সংখ্যকভাবে বন্টন করে দেয়া হয়।বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় হাউসগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে),সবার চেষ্টা থাকে দলগত ভাবে ভাল করার।সবাইকে বার বার মনে করিয়ে দেয়া হয়-“খবরদার, তোমার একটি ভুলের জন্যে যেন তোমার হাউস ট্রফি না হারায়”।আর যেহেতু নভিসেস প্যারেড দেখতে অভিভাবকেরাও আসেন,তাঁদের সামনে সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করার তাগিদও থাকে সবার মাঝে।ব্যস্ততা বেড়ে যায় কাঁধের ধাতব ব্যাজগুলো শেষবারের মত মেটাল পলিশ করার কিংবা জুতোর মাথায় “ওয়াটার পলিশ”(জুতোর কালি রোদে গলিয়ে “চিনদি” নামক পাতলা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে জুতো পলিশের একটি বিশেষ উপায়) করে সেটিকে আয়নার মত চকচকে করে নেবার।নতুন এক সেট ইউনিফর্ম,যেটা যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে এতদিন-সেটি পরিধান করে প্যারেড শুরুর ঠিক আগে ড্রেস ইন্সপেকশনের মুখোমুখি হতে হয়।আর তারপর শুরু হয় মূল প্যারেড-এতদিনের পরিশ্রমের ফলাফল প্রাপ্তির পরীক্ষা।অভিভাবকেরা অবাক হয়ে দেখেন তাঁদের অলস,আদুরে ছেলেটির রূপান্তর।প্রতিটি পদক্ষেপে বেরিয়ে আসে আত্মবিশ্বাসের ঝলকানি।শুধু প্যারেড নামক শৃঙ্খলাময় নতুন কিছু শেখা বা শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই নয়,আড়াই মাসের এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫০ টি ভিন্ন পরিবারের কিশোর এক অভিন্ন আত্মায় পরিণত হবার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।আর এ বন্ধুত্ব অটুট থাকে বাকি ৬ বছরের ক্যাডেট অধ্যায় ছাড়িয়ে সারা জীবন।

ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে এসেছি প্রায় ৫ বছর।কিন্তু এখনো যখন টিভিতে কোন কুচকাওয়াজ দেখি-আমার মন একছুটে চলে যায় ১১ বছর আগের ক্লাস সেভেনের সেই চিরসবুজ কলেজ ক্যাম্পাসে,সেই প্যারেড গ্রাউন্ডে।মনে পড়ে যায় ড্রিল স্টাফদের কঠোর মুখ কিংবা বিজয় ছিনিয়ে আনার পর সেই কঠোর মুখেই আনন্দ-অশ্রুর উপস্থিতি।মনে পড়ে ছেলের অবাক করা রূপান্তরে অভিভাবকের উচ্ছ্বাসিত মুখ কিংবা হাউসে ফিরে মুড়ি-চানাচুরের অতি সামান্য আয়োজনের অসামান্য আনন্দ উদযাপন।আজ আর প্যারেড গ্রাউন্ডে যেতে হয়না,জোরে পা প্রেস করার বদলে কলম পেষনই আমার মূল দায়িত্ব।বেরেট ক্যাপ বা আর্মি বেল্টের বদলে ডেভিড রিকার্ডো বা স্যামুয়েসনের অর্থনীতি বই হচ্ছে আমার অনুশীলনের হাতিয়ার,জীবনযুদ্ধে এর দ্বারাই সফল হতে হবে আমাকে।তবুও,জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভব করি কিভাবে ৬ বছরের প্রশিক্ষণ আমাকে সহায়তা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।ক্যাডেট জীবনের যে কোন একটি দিন ফেরত পাওয়ার বিনিময়ে অনেক দুর্লভ বস্তুও অবলীলায় ফিরিয়ে দেবে-আমার মনে হয় এমনটি ভাবা মানুষ আমি একা নই।

৩,১৩৮ বার দেখা হয়েছে

৩৯ টি মন্তব্য : “নভিসেস প্যারেডের স্মৃতিঃ”

  1. আর বইলেন না মাস্রুফ ভাই।আমাদের প্যারেডে এন সি ও ছিলেন আমাদের বাবুল ষ্টাফ।তিনি যে আমাদের কি পরিমান রগড়া দিয়েছেন বলে শেষ করা যাবে না।অবশ্য তার কারনেও আমার শারিরিক ফিটনেস অন্তত বহুগুনে বেড়ে গেছে।
    অপেক্ষা করেন,নভিসেস প্যারেড নিয়ে আমি ১টা ব্লগ লিখছি।

    জবাব দিন
  2. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)
    এভাবে কঠোর প্রশিক্ষণের মাঝে কিভাবে সময় চলে গিয়েছিল টেরই পাইনি।

    টের পাইনি আবার!!!
    বহুত কষ্ট হইছিল... :(( :((


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আমাদের প্যারাডে command ভুল হয়েছিলো, তখন পুরা গ্রুপ দুই ভাগ হয়ে এক দল উলটা ঘুরে অন্য দল ডানে ঘুরে জলদি চল করা শুরু করে। :))


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আমরাও ৩য় 😛 , ১৯৯৬ এ বরিশাল এর শের এ বাংলা হাউস


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  5. সাইফ (৯৪-০০)

    পরীক্ষা।অভিভাবকেরা অবাক হয়ে দেখেন তাঁদের অলস,আদুরে ছেলেটির রূপান্তর।প্রতিটি পদক্ষেপে বেরিয়ে আসে আত্মবিশ্বাসের ঝলকানি।শুধু প্যারেড নামক শৃঙ্খলাময় নতুন কিছু শেখা বা শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই নয়,আড়াই মাসের এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫০ টি ভিন্ন পরিবারের কিশোর এক অভিন্ন আত্মায় পরিণত হবার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।আর এ বন্ধুত্ব অটুট থাকে বাকি ৬ বছরের ক্যাডেট অধ্যায় ছাড়িয়ে সারা জীবন।

    মনে গেথে গেল........................।।
    জবাব দিন
  6. সাইফ (৯৪-০০)

    উদযাপন।আজ আর প্যারেড গ্রাউন্ডে যেতে হয়না,জোরে পা প্রেস করার বদলে কলম পেষনই আমার মূল দায়িত্ব।বেরেট ক্যাপ বা আর্মি বেল্টের বদলে ডেভিড রিকার্ডো বা স্যামুয়েসনের অর্থনীতি বই হচ্ছে আমার অনুশীলনের হাতিয়ার,জীবনযুদ্ধে এর দ্বারাই সফল হতে হবে আমাকে।তবুও,জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভব করি কিভাবে ৬ বছরের প্রশিক্ষণ আমাকে সহায়তা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।ক্যাডেট জীবনের যে কোন একটি দিন ফেরত পাওয়ার বিনিময়ে অনেক দুর্লভ বস্তুও অবলীলায় ফিরিয়ে দেবে-আমার মনে হয় এমনটি ভাবা মানুষ আমি একা নই।
    :boss:

    জবাব দিন
  7. তানভীর (98-04)

    ""ক্যাডেট জীবনের যে কোন একটি দিন ফেরত পাওয়ার বিনিময়ে অনেক দুর্লভ বস্তুও অবলীলায় ফিরিয়ে দেবে-আমার মনে হয় এমনটি ভাবা মানুষ আমি একা নই।"""
    মাসরুফ ভাই এইটার প্রেক্ষিতে কিছু লিখব বলে ভাবছিলাম ...।আজ shrek 4 দেখলাম, দেখার সময় মনে হয়েছিল আহারে shrek এর মত আমিও যদি পিছনে ঐ ছয় বছরের কোন ১ দিনে ফিরতে পরতাম...আর এখন আপনার এই লেখা...কিছু লিখার মত ভাষা পেলাম না...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।