রকিমুন্নেসা ম্যাডামের সর্বশেষ সংবাদ

(লেখাটা মন্তব্যে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু অনেক বড় হয়ে যাওয়ায় পোস্ট আকারে দিলাম-আশা করি সবাই নিজগুনে ক্ষমা করে দেবেন)

প্রিয় সেলিনা আপু এবং অন্যান্য ভাইবোনেরা,

আজ প্রায় আধা ঘন্টা ম্যাডামের সাথে কথা হল।সেলিনা আপুর কথা বলতেই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন-“সেলিনা আমার অসম্ভব প্রিয় একজন ক্যাডেট”। আমার সাথে উনার শেষ দেখা ক্লাস টেনে থাকতে,এর পর তিনি বদলি হয়ে চলে যান।অবাক ব্যাপার কি জানেন?আমি আমার নাম বলা মাত্র তিনি আমার পুরো পরিবারের কথা গড়্গড় করে বলে দিলেন-আমরা যে তখন চট্টগ্রামে থাকতাম,বাবা বন বিভাগে চাকরি করতেন-আমার এক চাচাতো বোন মগকক তে পড়তেন…সবকিছু,সবকিছু।সেই সাথে আদনানের কথাও বললেন-ও যে গানটা গেয়ে আইসিসিতে মেডেল পেয়েছিল সেটা যে উনার পছন্দ করা এ কথাটি খুব গর্বের সাথে উল্লেখ করলেন।আমি জিজ্ঞাসা করলাম-ম্যাডাম,কিভাবে মনে রেখেন এতকিছু?উনি হেসে বললেন-কখনো শুনেছ যে মায়েরা তার সন্তানদের কথা ভুলে যায়?

এগুলো আজ থেকে প্রায় ৯ বছর আগের কথা-শত শত ক্যাডেটের ভীড়ে কিভাবে ম্যাডাম আমাকে মনে রেখেছেন এটা ভাবতে গভীর কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা নত হয়ে এসেছিল সাথে সাথেই।

কলেজ এবং ক্যাডেট-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়েও ম্যাডামের সাথে কথা হয়েছে।তিনি খুব দুঃখ করে বললেন ক্যাডেটদের দ্বিগুণেরও বেশি বয়েসি অনেক শিক্ষক ক্যাডেটদের পেছনে লেগে থাকা দেখে তিনি কি পরিমাণ বিরক্ত হন সে কথা।আমাকে তিনি বললেন-“দেখ, কলেজে নাইন টেনে নিজেদেরকে যতই বড় মনে কর না কেন আসলে তো তোমরা তখন ১৫-১৬ বছরের বাচ্চা ছাড়া কিছুই নও। আমি ভাবতেই অবাক হই কিভাবে তোমাদের সাথে অনেক শিক্ষক এরকম করেন যেন ক্যাডেট এবং শিক্ষকরা প্রতিপক্ষ।” তিনি আরো দুঃখ করে বললেন-“জানো,আমার এমন অসুখের পরেও অতিরিক্ত দায়িত্বগুলো থেকে আমাকে এক বিন্দু ছাড় দেয়া হয়নি।”

এ কথা শুনে আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করল কারা সেই অথরিটি যারা একজন ক্যান্সার পেশেন্টের সাথে এরকম ব্যবহার করে।আমার মনে হয় ক্যাডেট কলেজ অথরিটির খোলনলচে বদলে ফেলার সময় এসে পড়েছে,যত তাড়াতাড়ি এটা করা যাবে ততই মঙ্গল।

ম্যাডাম যাতে মাইন্ড না করেন এজন্যে অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে অসুখের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম এবং বলেছিলাম যে আমরা ক্যাডেটরা উনাকে ক্যান্সারের জন্য আর্থিক সাহায্য করতে ইচ্ছুক-এটা শুনে তিনি বললেন যে আমরা যেন বেশি বেশি করে তাঁর জন্যে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি,আর্থিক সাহায্যের আপাতত প্রয়োজন নেই।উনার মত তেজস্বিনী মহিলা যে এ কথা বলবেন সেটা তো জানা কথা- কিন্তু তার পরেও আমি এম জি সি সির এক্স ক্যাডেট আপুদের কাছে অনুরোধ করছি যেন এ ব্যাপারে ম্যাডামের সাথে আবার কথা বলেন।দরকার হলে একটা ফান্ড তুলে বেনামে শুধু ক্যাডেট পরিচয়ে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে,কারণ কেমোথেরাপি যে অনেক ব্যয়বহুল তা আমরা সবাই জানি।

আপনারা শুনে অত্যন্ত খুশি হবেন যে, গুটি কয়েক যে ক’জন মানুষ ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগকে পরাজিত করতে পেরেছেন ম্যাডাম তাঁদের একজন।ডিভোর্স এবং এ ধরণের একটা জীবনঘাতী রোগের সাথে যুগপৎভাবে লড়াই করে জিতে যাওয়া মানুষ আমি আমার জীবনে খুব বেশি দেখিনি-তাই এক অন্যরকম মনোবল পেলাম ম্যাডামকে দেখে।ম্যাডাম শুধু জিতেই যাননি,তাঁর দুই ছেলেমেয়েকে ক্যাডেট কলেজেও পড়াচ্ছেন।আসলে কিছু কিছু মানুষ মনে হয় এরকমই-পরাজয় কাকে বলে এঁরা তা জানেননা-হাল ছেড়ে দেয়াটা এঁদের কল্পনারও বাইরে।

রকিমুন্নেসা ম্যাডামের মত আরো তেজস্বী,নিবেদিতপ্রাণ মানুষ আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে আলোকিত করে তুলুক-অন্তর থেকে এই কামনা করছি।

১,৯৫৮ বার দেখা হয়েছে

৪২ টি মন্তব্য : “রকিমুন্নেসা ম্যাডামের সর্বশেষ সংবাদ”

  1. রকিব (০১-০৭)
    উনি হেসে বললেন-কখনো শুনেছ যে মায়েরা তার সন্তানদের কথা ভুলে যায়?

    আবারো চোখ ভিজিয়ে দিলেন। মাত্র এক সপ্তাহের জন্য উনাকে পেয়েছিলাম, সেভাবে উনার সাথে পরিচয়ের সু্যোগ হয়নি। আল্লাহ উনাকে নিশ্চই সুস্থ্য করবেন। এতগুলো ছেলে মেয়ের দোয়া নিশ্চই কবুল হবে।

    দরকার হলে একটা ফান্ড তুলে বেনামে শুধু ক্যাডেট পরিচয়ে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে

    পূর্ণ সহমত। আমি টরন্টোতে কিছু ক্যাডেট চিনি, হাতে গণার মতই কম হয়তো, কিন্তু তাও সবার কাছে থেকে কিছু করার অনুরোধ জানাবো।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  2. রায়হান রশিদ (৮৬ - ৯০)

    অনেক ধন্যবাদ মাসরুফ ম্যাডামকে ফোন করার জন্য এবং এই গুরুত্বপূর্ণ আপডেটের জন্য। দেশে যারা আছে তারা ম্যাডামের সাথে অন্তত টেলিফোনে হলেও নিয়মিত যোগাযোগটা বজায় রাখতে পারলে ভাল হয়। এতে তিনি অনেক মনোবল পাবেন। জানবেন তাঁর গড়া সন্তানসম ছাত্র-ছাত্রীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং তাঁকে স্মরণ করছে। যদিও যতটুকু বুঝতে পারছি, ম্যাডামের মনোবল বা সাহস কোনটারই কমতি নেই, তবুও অন্যান্য সহযোগীতার পাশাপাশি এই যোগাযোগটার ভূমিকাও খুব কম কিন্তু না।
    ম্যাডামের ছেলে মেয়েরা কেমন আছে? পরিবারের ভেতরকার এই মানসিক চাপ কিন্তু ওদের কলেজ/শিক্ষা জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সম্ভব হলে ওদের কলেজগুলোর পরিচিত সিনিয়রদের সাথে যোগাযোগ করে একটু বলে দিলে ভাল হয় যেন ছেলেমেয়ে দুটোকে ওরাও যেন একটু দেখে শুনে রাখে। সিসিবি-র কেউ কি এই দায়িত্বটা পালন করতে পারবে?

    জবাব দিন
    • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

      আমার মনে হয় এক-দুই বছর আগে বের হওয়া সদ্য এক্স ক্যাডেটরা এটা করলে ভাল হয়-কারণ ওদের পরিচিত ক্যাডেটরা এখনো কলেজে আছে। আর ম্যাডামের ফোন নম্বর ০১১৯৯০৯৭৮৭৫,সেলিনা আপুর পোস্ট থেকে পেয়েছি।ফোন করে খোঁজ নিলে অত্যন্ত খুশি হবেন ম্যাডাম।উনার সরাসরি ছাত্র হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

      জবাব দিন
  3. সাজিদ (১৯৯৩-৯৯)

    ম্যাশ্‌... তোর আপডেট পড়ে খুব ভালো লাগল। ইনশা আল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করব।


    অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক,
    জ্যোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই,
    কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই।

    জবাব দিন
  4. ভাইয়া,
    আমি খেয়াল করলাম গতকাল থেকে এই মহীয়সী ম্যাডামকে নিয়ে লেখা পোস্ট যতবার পড়েছি, ততবার চোখের পাতা ভিজে এসেছে। সেলিনা আপুর পোস্ট কাল বেশ অনেকবার পড়েছি, ব্যতিক্রম নয়...... আমার ধারণা বেশিরভাগ ক্যাডেটদেরই এরকম হবে......

    এ কথা শুনে আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করল কারা সেই অথরিটি যারা একজন ক্যান্সার পেশেন্টের সাথে এরকম ব্যবহার করে।আমার মনে হয় ক্যাডেট কলেজ অথরিটির খোলনলচে বদলে ফেলার সময় এসে পড়েছে,যত তাড়াতাড়ি এটা করা যাবে ততই মঙ্গল।

    আমি পরিপূর্ণ সহমত প্রদর্শন করছি এই কথাগুলোর সাথে। জানিনা, যদি কোনভাবে ম্যাডামের একটু উপকার করতে পারতাম! কোনভাবে......

    আমার জীবনে রকিমুন্নেসা ম্যাডামকে পাইনি ঠিক, কিন্তু ক্যাডেটদের জন্য বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে যারা শিক্ষকতা জীবন অতিক্রম করছেন এরকম কয়েকজনের সান্নিধ্য পেয়েছি... এই শিক্ষকরা আমার জীবনে গড়ে ওঠার জন্য অনেক অনে----ক কিছু। তাদের স্নেহাস্পর্শ না পেলে হয়ত অনেক অনেক কিছু শেখা হত না জীবনে। মানুষ হবার পথে অনেক পেছনে পড়ে থাকতাম......

    দরকার হলে একটা ফান্ড তুলে বেনামে শুধু ক্যাডেট পরিচয়ে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে,কারণ কেমোথেরাপি যে অনেক ব্যয়বহুল তা আমরা সবাই জানি।

    একটা স্টেপ নেয়া যেতে পারে... আমরা সবাই যথাসম্ভব চেষ্টা করব এইটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

    দেখি আমি খুব শীঘ্রই তার সাথে একটু কথা বলব। আল্লাহ তাকে সুস্থ করে তুলুন। অনেক সশ্রদ্ধ সালাম জানাই এই তেজস্বী,নিবেদিতপ্রাণ ম্যাডামকে......
    :salute: :salute: :salute: :salute:

    জবাব দিন
  5. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    জামাই মাস্ফ্যু খুব সুন্দর একটা কাজ করলি :hatsoff: :hatsoff:
    ম্যাডাম সুস্থ আছেন জেনে ব্যাপক স্বস্তিবোধ করছি।
    ম্যাডামকে আবারো :salute:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  6. মেহবুবা (৯৯-০৫)

    আমি ক্লাস ৯-১২ পর্যন্ত ম্যাডামের খুব কাছে থাকা একজন। আমার নামটা একটু ঘুরিয়ে বলতেন...তিনি।
    আমার জন্য উনি এত কিছু করেছেন কলেজের শেষদিন পর্যন্ত.........। আমি মন থেকে দোয়া করি আল্লাহ উনার কষ্টটা কমিয়ে দিন। আরোগ্য হয়ত সম্ভব না.........।তবে সুস্থ যেন থাকেন...এই কামনা করি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।