যেমন হবে বিশ্বকাপ দলঃ ফ্রান্স

৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের মিডফিল্ডার রবার্ট পিরেস ছিলেন বৃশ্চিক রাশির জাতক। আর বৃশ্চিকরা নাকি ভালো ফুটবলার হয় না। এটা যে জ্যোতিষীর কথা, তিনি আবার একজন ফুটবল কোচও; রেমন্ড ডমেনেখ। ২০০৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় তাই ফ্রান্স দল থেকে বাদই দিয়ে দিলেন পিরেসকে। খারাপ ফর্ম, ইনজুরি, শৃঙ্খলা ভঙ্গ_এমন কত শত কারণে দল থেকে বাদ পড়েন ফুটবলাররা! কিন্তু রাশি মিলছে না বলে দল থেকে বাদ দেওয়া! শুধু ডমেনেখের দ্বারাই হয়তো সম্ভব। পেশাদার ফুটবল কোচ ছাড়াও তিনি আবার শখের নাট্যকার ও জ্যোতিষী কিনা!

তার পরও ডমেনেখ ফ্রান্সের কোচ হিসেবে আছেন বহাল তবিয়তে। কারণ, এই পাগলামির পরও তাঁর অধীনে ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে ‘লা ব্লুজ’। শত বাধা পেরিয়ে এবারের বিশ্বকাপেও মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। নাহ! এই জায়গায় এসে একটু ভুল হলো। আসলে বলতে হবে শত বাধা পেরিয়ে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপে নিয়ে গেছে ‘থিয়েরি অঁরির হাত।’ বাছাইপর্বটা খুব একটা ভালো যায়নি। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে প্লে অফে সেদিন যদি অঁরির হাত থেকে পাওয়া পাসে গোল দিতে না পারতেন গালাস, তাহলে কিছুতেই দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সকে বিশ্বকাপে নিয়ে যেতে পারতেন না ডমেনেখ। ইচ্ছে করে নাকি অনিচ্ছায় হাতে বল লাগিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড, সেই বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। যেটা শেষ হয়েছে তা হচ্ছে, আয়ারল্যান্ডের বিশ্বকাপের স্বপ্ন।

এত উত্থান-পতন আছে বলেই ফ্রান্সের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ডমেনেখ একই সঙ্গে নন্দিত ও নিন্দিত। রাশিটাশিতে বিশ্বাস করেন বলেই দল নির্বাচন আর তাঁর খেলানোর কৌশল নিয়ে বিতর্ক আছে খোদ ফ্রান্সে। ঠিক একই কারণে ডমেনেখের বিশ্বকাপ দল নিয়েও আগেভাগে কিছু বলে দেওয়া কতটা ঠিক হবে, এমন প্রশ্নও করতে পারেন অনেকে। কিন্তু সব বলা না গেলেও কিছু তো বলাই যায়। ডমেনেখের দলেও এমন ফুটবলার আছেন, যাদের ঠিক নিজের জ্যোতিষবিদ্যা দিয়ে বিচার করবেন না ফ্রেঞ্চ কোচ।

থিয়েরি অঁরি তাঁদের একজন। ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এই গোলদাতা বিশ্বকাপেও থাকবেন ডমেনেখের প্রধান ভরসা হয়ে। প্যাট্রিক ভিয়েরার অনুপস্থিতিতে কিছুদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্বও উঠেছে তাঁর কাঁধে। বিশ্বকাপেও তিনি ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেবেন_এই সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। হাত দিয়ে বল পাস দেওয়ায় সমালোচনা হয়েছে পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু ফ্রান্স সমর্থকরা জানেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি করতে হলে তাদের সবচেয়ে বেশি দরকার হবে অঁরিকেই।

ডমেনেখের পছন্দের ফরমেশন ৪-২-৩-১-এ অঁরির সঙ্গী হিসেবে সবচেয়ে নিয়মিত ফ্রাংক রিবেরি আর ইওয়ান গরচেফ। এই তিনজনের সামনে নিকোলাস অ্যানেলকা। বাছাইপর্বে বেশির ভাগ ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছেন রিয়াল মাদ্রিদের করিম বেনজেমা। বিশ্বকাপের দলেও তাঁর ভূমিকাটা একই থাকবে বলে ধারণা করা যায়। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্লে অফ ম্যাচে প্রথম একাদশেই ছিলেন আন্দ্রে পিয়েরে জিগন্যাক। বাছাইপর্বে ফ্রান্সের হয়ে ৮ ম্যাচ খেলে ৪ গোল করা এই স্ট্রাইকার ২৩ জনের দলে থাকছেন এটুকু বলে দেওয়া যায় নিশ্চিন্তে। এ ছাড়া অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে জায়গা করে নিতে পারেন চেলসির ফ্লোরেন্ত মালুদা অথবা আর্সেনালের সামির নাসরি।

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনের সবচেয়ে বড় দাবিদার রিয়াল মাদ্রিদের লাসানা দিয়ারা আর লিওঁর জেরেমি তুলালান। সুযোগ পেতে পারেন বোর্দোর আলউ দিয়ারাও। ইনজুরির কারণে গত বছর জুন থেকে ডমেনেখের দলে নেই প্যাট্রিক ভিয়েরা। এই বছর জানুয়ারিতে ইন্টার মিলান থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে আসা এই ফ্রেঞ্চ মিডফিল্ডারকে বেশ নিয়মিতই সুযোগ দিচ্ছেন রবার্তো মানচিনি। ফ্রান্সের হয়ে ১০৭ ম্যাচ খেলা ভিয়েরার অভিজ্ঞতাকে হয়তো বিশ্বকাপে কাজে লাগাতে চাইবেন ডমেনেখও।

প্যাট্রিস এভরা, এরিক আবিদাল, উইলিয়াম গালাস আর বাকারি সানিয়াকে নিয়ে সাজানো ফ্রান্সের ডিফেন্স কাগজে-কলমে শক্তিশালী অন্য অনেক দলের চেয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তারা সেটা মাঠে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১২ ম্যাচে ১০ গোল হজম করার পরিসংখ্যানও এর পক্ষেই কথা বলবে। তার পরও বিশ্বকাপে হয়তো এদের ওপরই আস্থা রাখবেন ফ্রান্স কোচ। মাত্র ১৩ ম্যাচের অভিজ্ঞতা হলেও এরই মধ্যে জুলিয়েন এসকুদে উঠে এসেছেন ডমেনেখের পছন্দের তালিকায়। স্পেনের বিপক্ষে অভিষেক হওয়া বোর্দোর ডিফেন্ডার মিশেল সিয়ানি নতুন হিসেবে চমকে দিতে পারেন সবাইকে। যেমন চমকে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে আর্সেনালের গায়েল ক্লিশির।
২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে যখন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের যাত্রা শুরু করে ফ্রান্স, তখন তাদের গোলবার সামলানোর দায়িত্ব ছিল স্টিভ মানদান্দার কাঁধে। কিন্তু এর দুই মাস পরই ডমেনেখ দায়িত্বটা বুঝিয়ে দিয়েছেন লিওঁর গোলরক্ষক হুগো লরিসকে। আর সেই থেকে ফ্রান্স কোচের আস্থার প্রতিদানও ভালোভাবেই দিয়ে আসছেন লরিস। মানদান্দাও থাকবেন ডমেনেখের বিশ্বকাপ দলে, তবে তাঁর জন্য রিজার্ভ গোলরক্ষকের জায়গাটাই বরাদ্দ থাকবে বলে মনে হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাই লরিসই যে থাকবেন ফ্রান্স গোলবারে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের জন্য বাধা হয়ে, সেটা একরকম নিশ্চিত।

আসলেই নিশ্চিত, নাকি এর আগে একবার হুগো লরিসের রাশিটা দেখে নিতে হবে? মকর রাশির জাতকদের আবার ফুটবল খেলতে সমস্যা নেই তো ডমেনেখের জ্যোতিষবিদ্যায়!

——————————————–

সম্ভাব্য একাদশঃ

——————-অ্যানেলকা/ বেনজেমা————-

থিয়েরি অঁরি——ইওয়ান গরচেফ—- ফ্রাংক রিবেরি

———-জেরেমি তুলালান– লাসানা দিয়ারা———

প্যাট্রিস এভরা– এসকুদে–এরিক আবিদাল–সানিয়া

——————— হুগো লরিস———————–

গোল ডট কম প্রেডিকসন

১,২৭৫ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “যেমন হবে বিশ্বকাপ দলঃ ফ্রান্স”

  1. এহসান (৮৯-৯৫)

    ফ্রান্স জাতীয় দলের দারুণ অংশ হলো তাদের আক্রমনভাগ। কিন্তু টপ ম্যানেজারগুলো আজকাল দুইজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খেলায়। তারমানে সবাই এখন প্রাগৈতাসিক ইতালীয় ঘরানার ফুটবল খেলে। আর এ কারণেই বেঞ্জেমা আর আনেলকা এক সাথে খেলতে পারছে না। কিন্তু আমার মনে হয় ৪-৪-২ এ ওরা দারুণ খেলতো। কিন্তু ওইযে আগে নিজের ঘর সামলানোর নীতি। তাই তুলালান এর সাথে আরো একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার খেলবে। আলু দিয়ারা থেকে লাসানা দিয়ারা আরেকটু এডভেঞ্চারাস। তাই লাসানা দিয়ারা খেললেই ভালো।

    কাকাকে ছেড়ে দেয়ার পাশাপাশি এসিমিলান কেনো গরকায়েফ কে ছেড়ে দিলো সেটা আমার জন্য একটা বিরাট প্রশ্ন। চ্যাম্পিওন্স লিগে দারুন খেলছে এই গরকায়েফ। মধ্যমাঠের গরকায়েফ আর রিবেরী ভালো ফর্মে থাকলেও, অরির দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। তাই সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় মালুদা আসার কথা। কিন্তু অরি হলো বিগগেম প্লেয়ার। অরিকে যতটা পছন্দ করি সেই তুলোনায় ঠিক ততোতাই মালুদাকে অপছন্দ করি। ঘাঊড়া ডমেনেখও আমার মতই অরির উপর বিশ্বাস রাখে। তাই মালুদার চান্স কম।

    ফ্রান্সের ফুল্ব্যাক গুলো দারুণ হলেও তাদের দূর্বলতা তাদের সেন্ট্রাল ডিফেন্স। এই খানে বুড়ো গালাসের প্রয়োজন অনেক। আবিদাল আর সেভিয়ার এস্কুদের একটু বেশীই বুইড়াভাব। আবিদালতো মুলতঃ একজন রাইট ফুল্ব্যাক। তাই এখানেই ফ্রান্স ধরা খাবে মনে হয়। স্প্রিন্টার টরেস, রুনী, হিগুইয়ান, মেসি কিংবা পাতোর তুলোনায় এরা নিতান্তই ক্রস কান্ট্রির দৌড়বিদ। তাই ফ্রান্সের খেলায় লাল কার্ডের সম্ভাবনা প্রচুর।

    এইসব লেখায় দলগুলোর প্রথম পর্বের প্রতিপক্ষ অন্যদলগুলোর নাম এবং ২য় রাউন্ডের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের নাম থাকলে ভালো হয়। তাতে তুলোনা মূলক আলোচনাটা মাথায় রাখা যায়।

    ২.৬ মোটেও বেশি মনে হচ্ছে না। তুলালান সেন্ট্রাল ডিফেন্সকে কি রকম সহায়তা করে তার উপরই ফ্রান্সের সার্থকতা নির্ভর করছে। কিন্তু মুডি ডমেনেখের যেকোনো ভূতুরে সিদ্ধান্তও বিশ্বকাপের চমক হতে পারে।

    জবাব দিন
    • আমিন (১৯৯৬-২০০২)

      ভালো লেগেছে কামরুল ভাইয়ের পোস্ট আর এহসান ভাইয়ের কমেন্ট। ফ্রান্সের বড় শক্তি হলো বিপক্ষ বুঝে নিজেদের খেলা চেঞ্জ করা যার নজির ২০০৬ এ বুঝা গেছে। প্যাট্রিক ভিয়েরা ডমনেখের পছন্দের তালিকায় আছেন এমনকি ফিট থাকলে আর্মব্যান্ড ওর হাতেই থাকবে। বুড়া ভিয়েরার সার্ভিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক ফুটবলে দলগুলোর সাফল্য ডিফেন্সিভ মিডফিলডে বিপক্ষের খেলা নষ্ট করাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর এজন্যই ২.৬ আমার কাছে বেশি মনে হচ্ছে না। আর ওস্তাদ হেনরি (অঁরিকে এই নামে ডাকি) আর ভিয়েরা বিগ ম্যাচে জ্বলে উঠার ক্ষমতা রাখেন , জিদানের আলোয় ঢাকা পড়লেও গত বিশ্বকাপে এদের অবদান ভুলে গেলেও চলবে না। আর ফ্লোয়িং ফুটবল খেলার চেষ্টা করলে ফ্রান্সের সাথে সাফল্য পাবার সম্ভাবনা কম মনে হয়। তবে গ্রীস টাইপ টিমের সাথে (যেটা পড়ার চান্স আছে) পড়লে একটু ঝামেলা হবে। তারপরেও ফ্রান্সের সম্ভাবনা সেমিফাইনাল আমার প্রেডিকশান।
      এই সিরিজটা খুব ভালো লাগছে। বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা সময় কইরা সিসবি গোলটেবিল করতে পারবো বলে আশা করি।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।