যেমন হবে বিশ্বকাপ দলঃ আর্জেন্টিনা

কটা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সেটা আবার জোড়া লাগাতে হবে। অন্ধকারে এবং হাত দুটোকে কাজে না লাগিয়ে! এই কাজটা যতটা কঠিন, কিছুদিন আগ পর্যন্ত ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাটাও ছিল ঠিক ততটাই। ১৬ মাসে যে ভদ্রলোক ১০৩ জন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের জার্সি পরিয়েছেন, তাঁকে নিয়ে আর যাই হোক, কোন ভবিষ্যদ্বাণীতে যাওয়া যায় না। তবে সুখের কথা, বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কমে এসেছে আর্জেন্টিনা দল নিয়ে ম্যারাডোনার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। জার্মানির বিপক্ষে সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচটা খেলার আগে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ স্বয়ং বলে দিয়েছেন, শতকরা ৮০ ভাগ নিশ্চিত করে ফেলেছেন তিনি তাঁর দল। এদের অনেককে ফোন করে তিনি জানিয়েও দিয়েছেন বিশ্বকাপে খেলার সুসংবাদটা। বাকি ২০ ভাগ? সেটা তো অন্য কোচরাও নিশ্চয়ই এখনো হাতে রেখেছেন।

কোচ হিসেবে ম্যারাডোনা তাহলে অন্যদের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই? কিন্তু ১৬ মাসের কীর্তিকলাপ তো আবার কথা বলছে এর বিপক্ষে। নাহ! এই বিতর্ক অন্তহীন হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং চলুন দেখা যাক আর্জেন্টাইন কোচের ফোন পেয়েছেন কারা সেটা আন্দাজ করা যায় কি না।

বিশ্বকাপের জন্য প্রাথমিক দল ঘোষণার এখনো মাস দুয়েক বাকি। অফিসিয়ালি তাই এখনো কারো নাম বলছেন না ম্যারাডোনা। কিন্তু হাভিয়ের মাসচেরানোকে ছাড়া যে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাবেন না, এটা বলেছেন বহু আগেই। ডিফেন্সিভ এই মিডফিল্ডারকে এতই পছন্দ ম্যারাডোনার, গত নভেম্বরে নিজ দলের অধিনায়কের দায়িত্বটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁকে। বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব থাকবে লিভারপুলের এই তারকার কাঁধে_সেটা একরকম নিশ্চিত। মাসচেরানোর মতো আর্জেন্টাইন কোচের পছন্দের তালিকায় আছেন আরো একজন। হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন। মাঝখানে অনেকদিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। কিন্তু ম্যারাডোনার পছন্দ এবং এস্তুদিয়ান্তেসের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স গত বছর মার্চে তাঁকে আবার ফিরিয়ে এনেছে দলে। সেই থেকে মিডফিল্ডে নিজের দায়িত্বটাও বেশ ভালোমতোই সামাল দিচ্ছেন ভেরন। ম্যারাডোনাও তাই তাঁকে বিশ্বকাপ দলে রাখার কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকবার। আর্জেন্টিনার হয়ে মাত্র সাতটি ম্যাচ খেলেছেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। কিন্তু এরই মধ্যে দলে নিজের অবস্থা পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন বেনফিকার এই মিডফিল্ডার। শুধু ম্যারাডোনার দলে থাকা নয়, আগামী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অন্যতম তারকা হয়ে উঠতে পারেন তিনি। হোনাস গুতিরেজ অবশ্য এইদিক দিয়ে সৌভাগ্যবান। আর্জেন্টাইন কোচ নিজে বিশ্বকাপের দল নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে একবার বলেছেন, ‘মাসচেরানো, মেসি, গুতিরেজসহ আরো আটজন।’ কোচের আস্থার প্রতিদানটা বিশ্বকাপে ঠিকই দেবেন ‘স্পাইডারম্যান’, এই বিশ্বাস আছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের। গত দেড় বছরে ম্যারাডোনার দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন পাবলো আইমার, ম্যাক্সি রড্রিগেজ আর এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো। অভিজ্ঞ এই তিন মিডফিল্ডারও থাকতে পারেন আর্জেন্টাইন কোচের বাছাই করা ২৩-এ। যেমন থাকার সম্ভাবনা আছে ফিওরেন্টিনার মারিও বোলাত্তির। হেসাস দাতোলোকেই বা কেন বাদ দেবেন ম্যারাডোনা। রাশিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে মাত্র ২০ সেকেন্ডের মধ্যে আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের প্রথম গোল করা অলিম্পিয়াকসের এই লেফট উইঙ্গার আছেন আর্জেন্টাইন কোচের সুনজরে।

দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মার্টিন দেমিকেলিস আর নিকোলাস ওতামেন্দির ওপর ম্যারাডোনা ভরসা করছেন অনেকদিন ধরেই। এদের সঙ্গে ইন্টার মিলানের হয়ে নিজের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে আবারও ডাক পেয়েছেন ওয়াল্টার স্যামুয়েল। বয়স ত্রিশের কোটা পেরিয়ে গেলেও লেফট ব্যাকের জায়গাটা মোটামোটি পাকা সাবেক অধিনায়ক গ্যব্রিয়েল হাইঞ্জের জন্যে। রাইটব্যাক হিসেবে ম্যারাডোনার পছন্দের তালিকায় সবার উপরে থাকতে পারেন এস্তুদিয়েন্তেসের ক্লেমেন্তে রড্রিগেজ। রোমা থেকে ইন্টার মিলানে ধারে খেলতে আসা নিকোলাস বুরদিসোকেও দেখা যেতে পারে আগামী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ সামলাতে। গত বছর দেড়েক ইনজুরিতে ছিলেন, কিন্তু এখন ফিরে এসে ধীরে ধীরে যেভাবে ফর্মে ফিরছেন, তাতে গ্যাব্রিয়েল মিলিতোও হয়ে উঠতে পারেন রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা।

গত দেড় বছরে সাতজন গোলরক্ষককে নিজের দলে ডেকেছেন আর্জেন্টাইন কোচ। তবে সাম্প্রতিককালে তাঁর সবচেয়ে বেশি আস্থাভাজন সার্জিও রোমেরো। নেদারল্যান্ডের ক্লাব আলকামারের এই গোলরক্ষককে তাই আগামী বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন গোলবারের সামনে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে ম্যারাডোনার পছন্দের তালিকায় আছেন আরো দুইজন। কাতানিয়ার মারিনাও আনজুয়ার আর বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বেশির ভাগ সময় আর্জেন্টাইন গোলবার সামলানো হুয়ান পাবলো ক্যারিজো।

বাছাইপর্বে পেরুর বিপক্ষে এক অবিস্মরণীয় গোল করে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে যাওয়ার স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন মার্টিন পালেরমো। ম্যারাডোনাও তাঁকে তুলনা করেছিলেন দেবদূতের সঙ্গে। কিন্তু আপাতত ‘ফুটবল ঈশ্বর’-এর কাছ থেকে পাওয়া এই প্রশংসাবাণী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাঁকে। কারণ তাঁর বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নটা খুব সম্ভব সত্যি করতে পারছেন না আর্জেন্টাইন কোচ। পারবেন কী করে! গনজালো হিগুয়াইন, কার্লোস তেভেজ, ডিয়েগো মিলিতো আর সার্জিও অ্যাগুয়েরো মিলে এক মধুর সমস্যায় ফেলে দিয়েছেন তাঁকে। ফরোয়ার্ড লাইনে কাকে রেখে কাকে খেলাবেন আর্জেন্টাইন কোচ! রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এই মৌসুমে ১৮ গোল করা হিগুয়াইন যদি থাকেন তাহলে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৩১ ম্যাচে ২১ গোল করা তেভেজকেও রাখতে হয়। এইটুকু শুনে যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তাহলে বলি, ২৯ ম্যাচে ১৭ গোল করে সিরি ‘এ’-র এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার মিলিতো আর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে ১৫ বার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছেন সার্জিও অ্যাগুয়েরো।

এদের সবার মতো ম্যারাডোনাকে এত সমস্যায় রাখেননি লিওনেল মেসি। শুধু দলে থাকা নয়, আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশে খেলাও সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত ফিফার এই বর্ষসেরা ফুটবলারের। এত ‘আনপ্রেডিকটেবল’ যে কোচ তাঁর দল সম্পর্কে এতটা নিশ্চিন্তে এ কথাটা বলাটা কি ঠিক হলো?

হবে না কেন? ম্যারাডোনাই তো বলেছেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে মেসি আমার দলে খেলছে।’

———————————————————
সম্ভাব্য একাদশঃ

————গনজালো হিগুয়াইন———-লিওনেল মেসি————

ডি মারিয়া——- গুতিরেজ———- মাসচেরানো————–ভেরন

হেইঞ্জ—–দেমিকেলিস——-ওতামেন্দি/ মিলিতো—–সি. রড্রিগেজ

———————-সার্জিও রোমেরো—————–

গোল ডট কম প্রেডিকসন

গোল ডট কম প্রেডিকসন

২,৫৯৮ বার দেখা হয়েছে

৩১ টি মন্তব্য : “যেমন হবে বিশ্বকাপ দলঃ আর্জেন্টিনা”

  1. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গ্রুপটা কিন্তু সহজ না। গ্রিস চ্যাম্পিয়ন দল। আড় কোরিয়াও অনেক ডেভেলাপ। নাইজেরিয়া ভালো দল। আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা আপাতত বলা যায় ২য় রাউন্ড। কারণ আমি মোটামুটি শিউর ২য় রাউন্ডে ফ্রান্সের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা বিদায় হবে। আর সেই সাথে ব্রাজিলকে হারিয়ে এদেশের মানুষের কাছে ফ্রান্সের যে জনপ্রিয়তা তাতেও ধস নামবে।

    জবাব দিন
  2. হায়দার (৯৮ - ০৪)

    ব্রাজিলের মত এখন মাইরা খেলেনা বলে কি আর্জেন্টিনা খেলতে পারেনা?
    মেসি ভাই মেসিই, তার ধারেকাছে কেউ নাই। সবাই শো পিস ( ক. রোনাল্ডো) টারে একটু আধটু তুলনা করে। তবে ওইটাও ঠিক না। এবার তাই মেসি শো হবে , এমন সম্ভাবনাই বেশী। তাকিয়ে আছি মেসির দিকে...... :dreamy:

    জবাব দিন
  3. আশহাব (২০০২-০৮)

    হায়দার ভাই, আপনে মেসির দিকে তাকায় থাকেন, আমি আপনার দিকে তাকায় আসি 😀 :grr:

    এতেই বুঝা যায় পৃথিবীতে বুদ্ধিমান মানুষের সংখ্যা মাত্র ৭.৫% ।

    কামরুল ভাইয়ের সাথে সহমত :grr:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।