ডায়রি

ডায়রি
১৫ডিসেম্বার ২০১২
সবাই বলে –আমি না’কি ঠিক আমার বাবার মত।সেই নাক,সেই চোখ,সেই চেহারা।আমি আবার এত কিছু বুঝি না।জমজ ভাইবোনদের ভেতরই আমি মিল পাই না,আর তো বাপ-ছেলে!কিন্তু বাবার সাথে আমার মিল আছে।স্বভাবের মিল,অভ্যাসের মিল; তাও আবার যে-সে অভ্যাস ন্য।ডায়রি লেখার অভ্যাসের মিল।বাবা প্রচুর ডায়রি লিখতেন যেই অভ্যাস পৈতৃক সূত্রে আমার পাওয়া।বাবা সেগুলো রেখেও গেছেন আমার জন্য,কিন্তু সেগুলো পড়া বারন আমার।বাবা না’কি ফুফুকে বলে গিয়েছিলেন ২০ বছর হবার আগে যেন কোনভাবেই সেইগুলো আমাকে পড়তে দেওয়া না হয়।না আমার বাবা কোথাও ঘুরতে যান নি,আমাদের ছেড়ে পালিয়েও যাননি।উনি আর নেই।ঢাকা ভার্সিটির টিচার ছিলেন, এরপর কিভাবে জানি মারা গেলেন।ফুফু বলেন- বাবা না’কি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন,তাহলে ডায়রি পড়তে দেবার কথা কিভাবে বলে গেলেন?এগুলো কখনও জিজ্ঞেস করিনি ফুফুকে,রাগ করবেন।এসব কথা আগেও লিখেছি তাও আবার লিখছি কেন কে জানে?হয়ত আমার ভেতর সব উল্টো-পাল্টা হয়ে যাচ্ছে। কেননা কালকেই সব ডায়রি গুলো পড়তে পারব আমি।হ্যা কালই আমার জন্মদিন,১৬ই ডিসেম্বার। এই নিয়ে প্রায়ই খোচা-খুচি করে বন্ধুরা।কিন্তু কালই আমি ২০ এ পা রাখব।কেমন জানি লাগছে,সব গুলিয়ে যাচ্ছে।উত্তেজনায় কিছু ঠিকঠাক লিখতেও পারছিনা।বাবা কি সেগুলো আমার জন্য লিখেছেন, না’কি আমাকে কিছু জানাবার জন্য,কিছু বলবার জন্য?সব গোল পাকিয়ে যাচ্ছে; বাবা কেন এতদিন আমাকে পড়তে বারণ করেছিলেন?ইশ!বাবা যদি ‘কুচকুচ হোতা হ্যায়ের’ মত প্রতি জন্মদিনে ১টা করে ডায়রি পড়তে দিতেন,তাহলে খুব মজা হত।বাবা মনে হয় ‘কুচকুচ হোতা হ্যায়’ দেখেন নি।আসলে কি লেখা আছে সেগুলোয়? বাবা কি ভাবতেন যা ২০ এর আগে আমি কিছু বুঝব না?বাবা বেঁচে থাকলে বুঝতেন যে যেই ছেলে একসাথে ৫/৬ টা গার্লফ্রেন্ড সামলাতে পারে সে কতদূর এগিয়ে গেছে!কিন্তু বাবা হয়ত বুঝতে পারেন নি যে তার ছেলের এতকম বয়সে এইরকম উন্নতি হবে!রাত সাড়ে ১১টা বাজে।গত জন্মদিনে উপমার সাথে কথা বলার সময় দোলা আর মিতি ফোন দিয়ে ওয়েটিং এ পেয়েছিল ফোন,তাই কি রাগ আমার উপর।কিন্তু মনে মনে যে কি অবস্থা তা আমিই বুঝেছি।প্রতি জন্মদিনে এই বিনা রক্তপাতে মারামারি টা দেখতে ভালই লাগে।কে কার আগে ফোন দিয়ে আমাকে উইস করবে এই নিয়ে মারামারি।এই কম্পিটিশনটা দেখআর মধ্যে একটা পৈশাচিক আনন্দ আছে।কন্তু এবার সব বাদ।ফোন বন্ধ করে রাখব,নাকি সাইলেন্ট করে রাখব তাই ভাবছি।নাহ!সাইলেন্টি করে রাখি, তাহলে মিসকল গুনে গুনে দেখতে পারব কে কার চেয়ে এগিয়ে।এবার বোধহয় বুশরা মেয়েটাই বেশি কল দেবে,এই ক’দিন আগেই রিলেশন হল কিন্তু পুরাই পাগল একটা,এটাকে বেশিদিন রাখা যাবেনা।এইগুলাই পরে ঝামেলা করে।কিন্তু নাবিলা মেয়েটা জানি কেম্ন।পুরাই অন্যরকম,মনে হয় ও কল নাও দিতে পারে।ওকে টোপ ভাল মত গেলাতে হবে।ধুর কি লিখছি এগুলো?এরা যাবে-আসবে।শুধুই অপেক্ষা রাত ১২ টা বাজার।সবগুলো কি আজকেই পড়ে ফেলব না’কি একটা একটা করে পড়ব আর সেগুলো নিয়ে লিখব?একবার তো ফুফুর আলমারি থেকে একটা চুরি করে ফেলেই ছিলাম।কিন্তু দেখলাম যে ওটা অনেক শেষের দিকের লেখা, তাই আবার বাধ্য ছেলের মত গিয়ে রেখে এসে ছিলাম।প্রথম দিকের গুলা যে ফুফু কই রাখেন?পরে আবার সবগুলোই কোথায় যেন সরিয়ে রেখেছেন।যাক সেসব পুরোন কথায়।বাবা কেন ডায়রি লিখতেন?আমি তো লিখি নিজেকে চেনার জন্য।নিজের ডায়রি নিজে পড়ে নিজেকে আসল রূপে চেনা জায়।কেননা ডায়রিই একমাত্র জায়গা যেখানে কেউ মিথ্যা কথা বলেনা।বেশী কঠিন হয়ে যাচ্ছি?হয়ত বাবার মত হয়ে যাচ্ছি।আজ আর আমার মাথা ঠিক হবেনা।ডায়রি আমার তোর সাথে দেখা হবে বাবার ডায়রি পড়ার পর।
১৬ই ডিসেম্বর ২০১২
শুভ জন্মদিন ‘রক্তিম’।হ্যা নামটা কেমন, তাইনা?অনেকটা বাংলা ছবির নায়কদের মত।কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরে জন্মদিন হলে এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করাও যায়না। আর পারলাম না,বাবার ডায়রি গুলো হাতে নিয়ে বসেছি। পড়ছি আর লিখছি।ফুফু জেগেই ছিলেন।যেতেই বললেন,”এসে গেছিস?তোর জন্যই বসে ছিলাম রে।জানতাম যে তুই আর থাকতে পারবিনা।আমি তোর জায়গায় হলে আমি ও থাকতে পারতাম না।”বলে কপালে চুমু খেয়ে,প্রায় দশ মিনিট ধরে রাখলেন আর কি যেন দোয়া করলেন আমাকে।বললেন,”পুরো রাশেদের মত হয়েছিস দেখতে, এই নে তোর আমানত।আমি খুব কষ্ট করে এতদিন এগুলো আগলে রেখেছি রে।বারবার আল্লাহর কাছে চাইতাম যে এগুলো দেয়া পর্যন্ত যেন আমি বেঁচে থাকি।কারও আমানত সামলানো খুব কষ্টরে।পরে বুঝবি।”চাবিটা নিয়ে আমি চলে এলাম।আলমারি খুলেই থ হয়ে গেলাম।কি সুন্দর করে গোছানো।বাবা মায়ের ছবি,অ্যালাবাম,আমার ছোট বেলার ছবি,বাবার ডায়রি।মনেমনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম, আর ফুফুকেও। আমার বেস্ট বার্থডে গিফট এভার।চটপট ছবি গুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ডায়রি গুলোর দিকে তাকালাম।ইশ কি অবস্থা!প্রথম দিকের ডায়রি গুলোর বেশিরভাগ পাতাই হারিয়ে গেছে,কিছু ছেঁড়া,কিছু পোকায় খাওয়া।১৯৮২ এর ডায়রিটা মোটামোটি ভালই আছে।এটা দিয়েই শুরু করি তাহলে।না’কি পুরোনগুলো পড়ব?বাবার জন্ম যদি ৬২তে হয় তাহলে ৮২তেই তো বাবার ২০হবার কথা।বাবা আমাকে বিশ বছরে পড়তে দিয়েছেন আমিও বাবার বিশ থেকেই শুরু করি।দেখা যাক বাবা আর আমার মধ্যে বিশ বছরে কতটা মিল ছিল?   “২৮ফেব্রুয়ারি,৮২ …… আমার ভার্সিটিতে প্রথম দিন ছিল আজ।কেমন যেন লাগছে।মফস্বল ছেঁড়ে একেবারে ঢাকা ভার্সিটি।তাও যদি এখন সেসব থেকে মুক্তি পাই।”    আরে কিসের থেকে মুক্তির কথা বলতে চাইছেন বাবা?আগের গুলো দিয়েই শুরু করা উচিত ছিল এইজন্য। থাক যা হয়ে গেছে ,তা হয়ে গেছে।কোথাও না কোথাও তো এই নিয়ে লেখা থাকবেই।আবার শুরু করি। ধুর।পুরো ১ ঘণ্টা হয়ে গেল সেই জিনিস টা নিয়ে কিছুই তো পেলাম না।বাবার ভার্সিটির কথা আছে,ক্লাসের কথা আছে, ক্যান্টিনে খাওয়ার কথা আছে,আড্ডার কথা আছে,মেয়েদের নিয়ে ছ্যাচড়ামির কথাও আছে।কিন্তু সেই টপিক টা নিয়ে কিছুই নেই।তাহলে বোধহয় কোন ফালতু বিষয়ই ছিল।আচ্ছা বাবাও এত ছ্যাচড়া ছিলেন। বাহ! বাহ! এখন বুঝলাম যে আমি এইরকম কেন!
আরও দেড় ঘন্টা পার হয়ে গেল।কই কোথাও কিছুই নেই। তবে সেই বিষয়টার কথা বাদ দিলে ডায়রিটা খুবই মজার।কিন্তু মনের মধ্যে খুতখুত করছে।যাই হোক এর মধ্যে বাবার এক বছরের কাহিনি শেষ হয়ে গেছে।সব কিছুই গতানুগতিক,শুধু বাবার পলিটিক্সে ঢোকার ব্যাপার টা যথেষ্ট আনকমন, ইন্টারেস্টিং এবং ডেঞ্জারাস।
“পলিটিক্সে আমি কিভাবে ঢুকলাম সেটা আমি ভাল মত বুঝিনি।প্রথমে হলে একটা ভাল সিটের নাম করে নাম লিখিয়ে নিল এক পার্টির লোকেরা। ধীরে ধীরে মিছিলে,মিটিং,খাওয়াদাওয়া।সবই মজা লাগত।মাঝে মাঝে রাত-বিরাতে ডেকে নিয়ে যাওয়াটাই খারাপের মধ্যে একটা ছিল।সভাও হত,মাঝে মাঝে দু’একটা বক্তৃতাও দিতাম। সবই ঠিক ছিল কিন্তু কিভাবে যে এর ভেতরে ঢুকে গেলাম নিজেই বুঝলাম না।আজকে ঘটল এক ভয়ংকর ঘটনা।আমাকে আর আমার এক ব্যাচমেটকে পার্টি অফিস থেকে ডেকে পাঠানো হল।যাবার পর একটা প্যাকেট ধরিয়ে দয়ে বলল এটা এক নেতার গাড়িতে গোপনে রেখে আসার জন্য।প্যাকেটে কি আছে জানতে চাইলে কুতসিত এক হাসি উপহার দিয়ে বললেন – এতে উপহার আছে,সারপ্রাইজ।ওনার ক’দিন আগেই জন্মদিন গেল কি’না  তাই উফার।আমি আরও কিছু জানতে চাইছিলাম কিন্তু আমার গবেট বন্ধুর অগাধ আস্থা ছিল পার্টির উপর।আর কিছু না বলে এসে পড়লাম। কিন্তু আমার এক খালার অসুখ ছিল বলে ওকে একাই পাঠিয়ে দিলাম।সন্ধায় হলে ফিরে দেখি পুলিশে ভরে গেছে গোটা হল, ছাত্ররা ছুটোছুটি করছে।আমাকে ও আমার চার বন্ধুকে গাড়িতে উঠতে বলে পুলিশ।আমরা তো খুন করিনি তাই ভয় পাবার প্রশ্নই অঠেনা।কিন্তু থানায় গিয়ে তো আমরা পুরাই থ।শুনলাম যে সেই প্যাকেটে ছিল টাইম বোম।এবং নাম জিজ্ঞেস করায় আমার গবেট বন্ধু আমাদের ৫জনের নামই বলে দিয়েছে।আমাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে নিচ্ছে ওরা।অবাক হবার ক্ষমতাও হারিয়েও ফেলেছি।আমি এখন থানায় রাত ১০টা প্রায়।কিছু বুঝতে পারছিনা কি হবে?”
ইশ! বাবার জন্য খারাপি লাগছে।কিন্তু পরের লেখটা এত পরে কেন?প্রায় আড়াই মাস পরে।
“এতদিন শরীরের ব্যথায় উঠতে পারিনি।আমার উপর দিয়েই বেশি গেল ২ সপ্তাহের রিমান্ডের পুরোটাই।যা ভেবেছিলাম তাই হল।তদন্তে বেরিয়ে গেল আমার পূর্ব পরিচয়। আমার বাবা ৭১’এ রাজাকার ছিলেন তা ফাস হয়ে গেল এবং কাকতালীয় ভাবে সেই নেতাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।পরে পার্টির এক বড় নেতাই ছাড়িয়ে আনলেন আমাদের চারজনকে,কিন্তু জেল হয়ে গেল আমার সেই বন্ধুটির।পার্টির এই বিষয় নিয়ে আর একটা কথাও বলেনি আমার সাথে, ওরা আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলনা তাই আমিও কিছু জিজ্ঞেস করিনি।কিন্তু ক্ষতি পুরোটাই হল আমার। গত বিশ বছর ধরে যেই গঞ্জনা বয়ে আসছি তা আবার শুরু হয়ে গেল।যার থেকে বাঁচার জন্য ঢাকায় এসেছিলাম আমি।কিন্তু ঘুরেফিরে সেই পুরোন কাহিনি।কি হবে আর আমার।যুদ্ধের পর মানুষ কেমন নির্মম হতে পারে তা দেখেছিলাম আমি।দেশ স্বাধীন হবার পর আমার সামনে আমার বাবাকে ডুবিয়ে মারা হয়, মায়ের চোখে ঢেলে দেওয়া হল এসিড,যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে মা মারা গেলেন আধ-ঘন্টার ভেতরই।আমাকেও ছাড়তে চায়নি ওরা।আমার চোখেও এসিড ঢালতে চাইছিল গ্রামের লোকেরা,কিন্তু গ্রামেম ইমাম সাহেব এসে বাঁচালেন আমাকে। বললেন- আমি নিতান্তই বাচ্চা ছেলে, আমাকে মাফ না করলে খোদাও না’কি ওদের মাফ করবেনা।ধর্মের কথা বললে কে না পিছে ফেরে?তাই আমাকে পাঁচ-দশটা চড় থাপ্পড় মেরেই বিদেয় করা হল।এবং সেই ইমাম সাহেবই আমাকে তার কাছে রাখলেন এবং কলেজ পর্যন্ত পড়ালেন।স্কুল কলেজেও উঠতে বসতে অনেক গালি খেতাম। এরপর তিনিই ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন।তার বছর দু’এক পরেই মারা যান তিনি,কিন্তু আমাকে তার কবরে মাটিও দিতে দেয়নি গ্রামের লোকেরা। রাজাকারের মাটি না’কি আল্লাহ কবুল করেন না।কিন্তু বাবার সেই আলিশান বাড়িতে ঠিক চেয়ারম্যান আস্তানা গেড়েছেন। কি আর করা,চলে এলাম।উহঃ প্রচন্ড ব্যথা গায়ে।আর লিখতে পারছিনা ”
ছিঃ হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে আমার।কি ভয়ানক, কি বীভৎস, মানুষ কিভাবে পারে এমন করতে? (next para)
এরপর আর এসব নিয়ে কোন কথা নেই।দিব্যি বাবার দৈনন্দিন জীবনের কথা বলে গেছেন।কিন্তু আগের মত প্রতিনিয়ত নয়, ছাড়াছাড়া ভাবে।এর ভেতরে বাবার ভার্সিটির টিচার হবার কথা,সাংবাদিকতার ক্তহা,মায়ের সাথে দেখা হওয়া,প্রেম বিয়ের কথাও আছে।বাবার ফাটাফাটি কছু রোমান্টিক কথাবার্তা আছে।বাবাও না! বাবা এসব লেখার সময় নিশ্চয় ভাবেননি যে আমাকে এগুলোও পড়তে দেবেন। এই রে পড়তে পড়তে সকাল সকাল হয়ে গেছে।মিসকলে ফোন ভরে গেছে দেখি! ১০৮টা মিসকল!!!মেয়েগুলা আসলেই পাগল হয়।বাকি গুলো কালথেকে পড়ব।এর মধ্যে আরও মিসকল আসতে থাকুক।আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।
১৭ডিসেম্বর ২০১২
রাত বারটা বিশ।আবার বসলাম ডায়রি নিয়ে।বাবারটাও, আমার টাও।এখন পড়ছি আমার জন্মের সময়ের অংশটা। ইশ! কি দারুনভাবে লিখেছেন বাবা।নতুন কাপড় কেনা,নতুন খেলনা,নতুন বাসায় ওঠা- মনে হচ্ছে যেন আমার সামনে সব কিছু হচ্ছে।বাবা না’কি আমাকে দেখে প্রথমেই বলেছিলেন, “রাজাকারের নাতির জন্ম হল ১৬ডিসেম্বর। বাহ রে নিয়তি,তাও যদি তোর উপর থেকে এই কলংক কাটে।জীবনে খুব সুখি হ বাপ আমার।” এরপর আমার নাম ঠিক হয় রক্তিম।নামটা বাংলা ছবির নায়কদের মত না?কিন্তু বাপ-মা এত কষ্ট করে রেখেছে তাই ফেলে দিতেও পারছিনা।
পড়তে পড়তে এখন সেই জায়গায় এসে পড়েছি যখন আমার বয়স তিন।এখানে একটা সেমিনারের কথা আছে।
“ক’দিন আগেএকটা সেমিনারে গিয়েছিলাম- ’যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার চাই’।আমার বক্তব্য দেবারও কথা ছিল।গোল বাঁধল আমার বক্তৃতার সময়।সবাই বলেছিল যে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার চায় তারা, কেউ ফাসি চায়, আবার কেউ কেউ তাদের বংশ পর্যন্ত নির্মূল করতে চায়।আমি বললাম যে-’ তাদেরকে ভাল হবার একটা সুযোগ ও দেয়া যেতে পারে। এবং আপনারা চাইছেন যে তাদের বংশকে নির্মুল করা হোক, কেন? তাদের ছেলেমেয়ের কি দোষ? আমার বাবাও একজন পাকিস্তানি সমর্থক ছিলেন কিন্তু তাই বলে কি এখন আমার মরে যাওয়া উচিত?’ কথাটা বলার পর বুঝলাম যে কি বলে ফেলেছি।কিন্তু মুখের কথা আর বন্দুকের গুলি ফেরত আনা যায় না ,তা সবাই জানে।ফলাফল হল ভয়ানক।পরদিন খবরের কাগজের হেড লাইনে আমি,’রাশেদ চৌধুরি রাজাকারদের পক্ষে আন্দোলন শুরু করেছেন’ আবার কোনটায় ’রাশেদ চৌধুরি পিতার আদর্শে চলছেন’ আমি আর কি বলব? এরপর কয়েকদিন ভার্সিটিতে আমাকে নিয়ে আলোচনা,বাসায় ঢিল ছোঁড়া,ছাত্রদের পোস্টারে ছেয়ে গেলাম আমি – রাশেদ চৌধুরির উৎখাত চাই, রাশেদ চৌধুরির ধ্বংস চাই ইত্যাদি।আমার একটা ছোটখাট ইলেকশান করার কথা ছিল কিন্তু তখন বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো আর তো ইলেকশান।এত কিছুর মাঝেও শুধু রক্তিম আর ওর মায়ের দিকে তাকিয়েই বেঁচে ছিলাম ”
ইশ!বাবার জন্য খুব খারাপ লাগছে।সেইসব লোকগুলাকে পেলে আর আস্ত রাখতাম না।খালি লাশ পড়ত।এখন মায়ের মৃত্যুর কথা থাকার ক্তহা।তাই এই অংশটা পড়তে ইচ্ছে করছেনা।কিন্তু না পড়েও পারছিনা।কেমন জানি লাগছে
“সেমিনারটা হয়ে গেল প্রায় আট মাস।কিন্তু নিজের অবস্থা আট ইঞ্চি বদলায়নি।কি যে করি।ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।বাসাও বদলে ফেললাম।রক্তিমের মায়ের চাকরিতে সংসার চলছে।এখনযে বাসায় আছি সেটা অনেকটা বস্তি মতন জায়গায়।রক্তিমের নানিও এখন থাকেন আমাদের সাথে।আমি আর বেশি বের হই না।আল্লাহ বাঁচাও আমাদের।ঘড়িতে ১০টা বাজে কিন্তু রক্তিমের মা এখনও এলো না, কি যে করি?খুব অস্থির লাগছে”
“খুবই টেনশন হচ্ছে। ১টা বেজে গেল কিন্তু রক্তিমের মা এখন ও এলো না।আর বসে থাকা যায়না।বেরিয়ে যেতে হবে ওকে খুঁজতে।রক্তিমের নানিকে ডেকে বের হয়ে যেতে হবে।”                     “পুরো একটা দিন চলে গেল কিন্তু রক্তিমের মায়ের এখনও দেখা নেই।কোন আত্মীয়ের বাসায় নেই,কোন বন্ধুর বাসায়ও নেই।পুলিশে খবর দিলাম।ওরাও খুব একটা আমলে নিল বলে মনে হলনা।হাবিলদারেরাও পিছন থেকে টিটকারি দেয় রাজাকার বলে।হয়ত ওর গাজিপুরের মামার বাসায়ই গিয়েছে। বেশ ক’দিন ধরেই বলছিল ওখানে যাবার ক্তহা।যেখানেই থাক নিলীমা,ভাল থাক।”
“আজ প্রায় তিন মাস পর লিখতে বসেছি।ঐ ঘটনার পরদিন ভোরে আযান দেবার পর শুনি অনেক চেঁচামেচি।গিয়ে দেখি মোড়ের সামনে অনেক ভিড়।ভিড় ঢেলে এগিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি নিলীমা।পুতুলের মত দেহটাকে কারা যেন জন্তুর খুবলে খুবলে খেয়েছে।কাপড় প্রায় নেই। আমি কি বলব?কি দেখব?চেহারায় আতংকের ছাপ এখনও রয়েই গেছে।আমার শাশুড়ি ওনার মেয়ের জন্য নামাজে বসেছিলেন, রক্তিম ওর মাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছে।এখন এদের আমি কি বলব? আমার শাশুড়ি খবর পেয়ে দৌড়ে এলেন। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। আমাকে গালিগালাজ করতে করতে ঘরে ঢোকেন।আমাকে কবরে মাটি দিতে দিলেননা রক্তিমের মামারা কেউ ই। রক্তিমকে নিয়ে চলে গেলেন তারা। আমাকে সান্ত্বনা দিতে আমি যাদের হয়ে ইলেকশন করতে চেয়েছিলাম তারা এলেন। বেশ কিছুক্ষন কথাবার্তাবলে চলে গেলেন। বললেন পরিস্থিতি ঠিক হলে আমি যেন আবার পার্টি জয়েন করি। এতেই  কাল হল আমার।পরদিন খবরের কাগজে এল আমি না’কি ইলেকশনে জেতার জন্য আমার স্ত্রীকে বড় নেতাদের কছে বিক্রি করে দিয়েছি। আমি না’কি আমার স্ত্রীকে দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি করাতাম।ছাত্ররা পোস্টার টানিয়ে দিল ‘যে নিজের স্ত্রীকে বেঁচতে পারে তার কাছে দেশ আর এমন কি?’ আমি পুরো এককোনে হয়ে গেলাম।মাঝখানে প্রায় জোর করে রক্তিমকে আমার বোনের কাছে রেখে এলাম।আমার এই বোনের প্রধানত ছেলে মেয়ে নেই এবং দ্বিতীয়ত সে এবং তার জামাই দু’জনেই রক্তিমকে নিজের ছেলের মত ভালবাসে।এর পর আমি নিলীমার জন্য কেস করলাম কোর্টে। ঐ জানোয়ার গুলোর একটাকেও আমি ছাড়ব না।”
“রক্তিমের বয়স এখন পাঁচ।ও ওর ফুফুর কাছে ভালই আছে।তে হবে,আমি প্রায়ই বলি  যে আমি মরে গেলে আমার ডায়রি গুলো যেন ওকে পড়তে দেয়।ওর অনেক কিছু শেখার আছে এই ডায়রি গুলো থেকে।কিন্তু এও বলা আছে যেন বিশের আগে ওকে কোন অবস্থাতেই পড়তে দেওয়া না হয়।ওকে অনেক কিছু বুঝতে হবে,শিখতে হবে যার জন্য বিশই উপযুক্ত।আমি এই কয়েক বছরে পুরো বিধ্ব্যস্ত হয়ে গিয়েছি।নিলীমার কেসটা হেরে গিয়েছি এবং সরকারি পক্ষের উকিল আমাকে আসামি বানিয়ে উলটো কেসে ফাসিয়ে দিয়েছে।আমি না’কি আমার বৌকে দিয়ে দেহ ব্যবসা করাতাম।তাই না’কি শেষমেশ আত্মহত্যা করেছে আমার স্ত্রী।আগামিকাল তার শুনানি।ভাবা যায়? কি ন্যায় চাইব? কার কাছে চাইব?তাই আমি আত্মহত্যা করছি। আমাকে মাফ করে দিস বাবা রক্তিম আমার। কিন্তু তুই দেখ আমি আর কি করব এখন? নিলীমা আমি আসছি।রক্তিমকে যাতে আমার মত গঞ্জনা সইতে না হয়।আমি ওকে মুক্তি দিচ্ছি যা আমার বাবা আমাকে দেন নি।এই ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে মরার আইডিয়াটা কয়েকটা ছবি থেকে পেয়েছি।কিন্তু এগুলো জমাতে অনেক কষ্ট হয়েছে।একসাথে বেশি দেয়না।তাই দু’মাস ধরে এসব জমাচ্ছি। এগুলো আমকে মুক্তি দেবে।আজ আমার মুক্তি, রক্তিমের মুক্তি।বাবা রক্তিম আজ আমার শেষ লেখা।তুই একদিন এগুলো আর বুঝবি কেন আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম।এছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না রে। সোনা আমার , আমাকে ক্ষমা করিস।তোকে এতিম করে রেখে যাচ্ছি,কিন্তু ফকির করে না।আমার আর তোর মায়ের সব কিছু তোর নামে করে যাচ্ছি, পাশাপাশি বেশ কয়েকটা ফিক্স ডিপোজিটও আছে। রাগ করিস না বাবা। আমি জানি মা-বাবা না থাকার কষ্ট কি? কিন্তু মনে রাখিস আমি আর তোর মা সব সময় তোর পাশেই আছি।২০১২ তে অনেক কিছু পালটে যাবে জানি কিন্তু আমাদের জন্য তোর ভালবাসা যেন না কমে।ভাল থাকিস বাবা আমার।আর এটা পড়ে একদম কাঁদবি না কিন্তু। এই ব্যাপারে তুই যদি কাঁদিস তাহলে আমি খুশি হব। কেননা তুই হবার পর সবাই বলত যে তুই আমার মত,তোর সবকিছুই আমার মত।তাই তোর মা খুব মন খারাপ করতো।ওর স্বভাব ছিল একটু কিছু হলেই কাঁদা।আমি আর তোর মা যখন তোকে ওপর থেকে দেখব  তখন যদি তুই কাঁদিস তাহলে তোর মাকে বলতে পারব – ছেলে তোমার মতই হয়েছে নিলীমা।এটা শুনে তোর মা খুশিতেই কেঁদে দেবে দেখিস। যাই বাবা।রাগ করিস না। আর আমাদের কখনও ভুলে যাস না।বিদায়……।।  ইতি,  তোর বাবা রাশেদ চৌধুরি  এবং তোর মা নিলীমা আক্তার চৌধুরি………………………।। “
১ জানুয়ারি ২০১৩
বাবা আমি আসলেই মায়ের মতই হয়েছি ।তুমি খুব খারাপ।আমি একদম তোমার মত না।একদম না।কখনই না। আমি তোমাদের কখনও ভুলে যাব না। কখনও না… কখনও না …কখনও না ।।
…………………………………….অনিন্দ্য ইমতিয়াজ
১,০৪০ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “ডায়রি”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।