বিশ্বকাপের বিশাল ধরা ……

নেটে বিশ্বকাপ নিয়ে হাবিজাবি সার্চ দিতে দিতে একটা সাইটে দেখলাম বিগেস্ট আপসেটস অফ ওয়ার্ল্ড কাপ. পড়েই ভালো লেগে গেলো। তাই সবার সাথে শেয়ার করছি।

১০

আলজেরিয়া ২ বনাম জার্মানি ১ (১৯৮২)

১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ শুরুর সময় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন জার্মানির প্রথম ম্যাচ ছিলো আলজেরিয়ার সাথে। শক্তি এবং ইতিহাস জার্মানির পক্ষে (এই ম্যাচের আগে পর্যন্ত কোনো আফ্রিকার দল কোনো ইউরোপিয়ান দলকে হারাতে পারেনি) থাকায় জার্মানির ম্যানেজার জুপ ডেরওয়েল দাবী করেছিলেন তার দল কোনো ঝামেলা ছাড়াই এই ম্যাচ জিতে যাবে। কিন্তু ম্যাচের ৫৪ মিনিটে মাজদের আলজেরিয়াকে এগিয়ে দিলে তার হিসেব নিকেশ সব উলটে পালটে যায়। ৬৭ মিনিটের মাথায় রুম্মিনেগের গোলে সমতা আসলেও ঠিক তার পরের মিনিটেই বেল্লুমির গোলে আবারো লিড ফিরে পায় আলজেরিয়া।

এই ম্যাচে হেরে গিয়ে জার্মানি প্রায় প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো। গ্রুপের শেষ খেলা ছিলো জার্মানি আর অস্ট্রিয়ার মধ্যে। এবং এই ম্যাচের আগে হিসেব ছিলো যদি জার্মানি হারে বা ড্র করে তাহলে অস্ট্রিয়া আর আলজেরিয়া পরের রাউন্ডে যাবে। যদি জার্মানি ২ গোলের বেশি ব্যাবধানে জেতে তাহলে জার্মানি আর আলজেরিয়া যাবে। কিন্তু যদি ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে জেতে তাহলে জার্মানি আর অস্ট্রিয়া যাবে। জার্মানি এই ম্যাচটা খুবই আক্রমনাত্মকভাবে শুরু করে প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যেই গোল পেয়ে যায়। কিন্তু ম্যাচের বাকিটা সময় দুই দলই অর্থহীনভাবে বলে লাথালাথি করে সময় কাটিয়ে দিলে আলজেরিয়া
বাদ পড়ে যায়। সন্দেহ করা হয় এই ম্যাচটির ফলাফল দুইদলের সন্মতিতেই নির্ধারিত হয়েছিলো।

মাজদের এর সেই গোল

কোস্টারিকা ১ বনাম স্কটল্যান্ড ০ (১৯৯০)

প্রথমবারের মতন মতন বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম ম্যাচ পড়লো ইউরোপিয়ান দলের সাথে হোক না দলটা স্কটল্যান্ড। কজন ভাবতে পেরেছিলো কোস্টারিকা জিতবে? হুয়ান আর্নোল্ডো কায়াসো এই ম্যাচের একমাত্র গোল করে কোস্টারিকার ফুটবল উপকথায় নিজের নাম পাকাপাকিভাবে লিখে নিলেন।

এর পরের ম্যাচে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ব্রাজিলকে তারা একটার বেশী গোল করতে দেয়নি। ব্রাজিলের সাথে হেরে গেলেও গ্রুপের শেষ ম্যাচে সুইডেনকে ২-১ গোলে হারিয়া কোস্টারিকা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যায়।

১৯৯০ সালের কোস্টারিকা দল

বুলগেরিয়া ২ বনাম জার্মানি ১ (১৯৯৪)

মেক্সিকোকে দ্বিতীয় রাউন্ডে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারাটাই ছিলো বুলগেরিয়ার জন্যে বিশাল এক অর্জন। অন্য দিকে জার্মানি হিসেব করছিলো সেমিফাইনালে ইতালীর সাথে খেলাতে তারা ঠিক কি রকম স্ট্র্যাটেজীতে খেলবে। খেলার শুরু দিকে দুইদলেই সমান সমান আক্রমন করে খেললেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে লেচকভ পেনাল্টি বক্সে ফাউল করে বসলে লোথার ম্যাথিউস পেনাল্টি থেকে জার্মানিকে এগিয়ে দেন। হারানোর কিছুই নেই — মনোভাব নিয়ে বুলগেরিয়া জার্মানিকে সাড়াশি আক্রমনের মধ্যে ফেলে দিলে ৭৫ মিনিটের মাথায় রিস্টো স্টয়চকভ সমতা ফেরান। ঠিক তিন মিনিট পরেই সেই লেচকভ অসাধারন ডাইভিং হেডে বুলগেরিয়াকে এগিয়ে দেন। এর পরে প্রানপনে চেষ্টা করেও জার্মানি আর গোল করতে পারেনি।

গোল করছেন লেচকভ

ইতালী ১ বনাম দক্ষিন কোরিয়া ২ (২০০২)

২০০২ এ স্বাগতিক দক্ষিন কোরিয়া নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটা দল ছিলো। গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ড আর পর্তুগালকে হারিয়ে এবং ইউ এস এ এর সাথে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মুখোমুখি হয় তিনবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ইতালীর। ১৮ মিনিটের মাথায় ভিয়েরীর গোলে ইতালী এগিয়ে যাবার পরে থেকে ইতালীয়ান স্ট্রাইকারেরা কে কত মিস করা যায় — প্রতিযোগিতা শুরু করলে এবং কোরিয়ান গোলকিপার লী ইউন জেই বেশ কিছু দুর্দান্ত সেভের কারনে ইতালী প্রথমার্ধের মধ্যেই ৪ বা ৫ গোলে এগিয়ে যেতে পারেনি। ফ্রান্সেসকো টট্টি লাল কার্ড দেখে চলে গেলেও ইতালীয়ান আক্রমনের ধার তেমন একটা কমেনি। থমাসি আরোও একবার কোরিয়ার জালে বল জড়িয়ে দিতে পারলেও রেফারী অফসাইডের কারনে গোল বাতিল করে দেন। পরে রিপ্লেতে দেখা যায় লাইন্সম্যানের ওই সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো। জি সুং পার্কের নেতৃত্বে কোরিয়া কিছু কিছু আক্রমন করতে সক্ষম হয়। ঠিক ৮৮ মিনিটের মাথায় এই রকম একটা টুকরো একটা আক্রমন থেকে সিউল কি হিয়োন সমতা ফেরান। খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে ১১৭ মিনিটে জাং হোনের গোল্ডেন গোলে ইতালী দ্বিতীয় রাউন্ডে থেকেই বিদায় নেয়।

ইতালীর জালে জাং হোয়ানের গোল

দক্ষিন কোরিয়া ০ বনাম স্পেন ০ (পেনাল্টিতে কোরিয়া জয়ী ৫-৩)(২০০২)

ইতালীর সাথে জিতে কোরিয়া মুখোমুখি হয় স্পেনের। ক্যাসিয়াস, হিয়েরো, পুয়োল, মরিয়েন্তেস, রাউলের স্পেনকে নিয়ে সবারই অনেক জল্পনা কল্পনা ছিলো। কিন্তু তাদের তারকা থাকলেও ভাগ্যের সঙ্গ ছিলোনা। দুই দুইটি গোল, একটা ফাউলের জন্যে এবং আরেকটা গোল লাইনের বাইরে চলে যাবার সন্দেহে বাতিল করে দেবার পরে স্পেনের উত্তেজিত ম্যানেজার ম্যাচ অফিসিয়ালদের দিকে যেসব আক্রমনাত্মক এবং কিছুটা অশালীন ইশারা করেছিলেন, সেগুলোর জন্য তাকে তেমন দোষ দেয়া যায়না। পেনাল্টি শুট আউটের সময় এক পর্যায়ে জোকুইন তার কিক মিস করলে এবং এর পরে ক্যাসিয়াস হোং মিউঙ্গের কিকটি সেভ করতে না পারায় স্পেন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।

জোকুইন মিস করলেন

আর্জেন্টিনা ০ বনাম ক্যামেরুন ১ (১৯৯০)

সান সিরোতে ম্যারাডোনার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আর তার সাথে দ্বিতীয়বারের মতন বিশ্বকাপ খেলতে আসা ক্যামেরুন। যারা আর্জেন্টিনার সহজ জয় কল্পনা করছিলো, শারীরিক ফুটবলের প্রদর্শনী দিয়ে ক্যামেরুন তাদের পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলো ব্যাপারটা অতোটা সহজ হবেনা। এই ম্যাচে ক্যামেরুনের দুইজন লাল কার্ড দেখেছিলো। ম্যাচের ৬৬ মিনিটের সময় পম্পিডোর হাত ফসকে বল ওমাম বাইকের নাগালে এলে বাইক বল জালে ঠেলে দিতে দেরী করেননি।
এই ম্যাচে হেরে এবং পরে রোমানিয়ার সাথে ড্র করে আর্জেন্টিনা একটু নড়বড়ে অবস্থাতে চলে গেলেও তারা পরে ফাইনাল পর্যন্ত যেতে সক্ষম হয়।

ওমাম বাইকের গোল

ফ্রান্স ০ বনাম সেনেগাল ১ (২০০২)

ক্যামেরুনের ১২ বছর পরে আরেক আফ্রিকান দল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়। শুধু বিশ্বকাপ না ফ্রান্স ছিলো তখন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন এবং কনফেডারেসন্স কাপ চ্যাম্পিয়ন। জিদান এই ম্যাচে খেলতে না পারলেও জোরকায়েফ, হেনরী, পেটিট, উইলটর্ডেরা দারুন ফর্মে থাকায় ম্যাচ শুরুর আগে ফ্রান্স জিতবেনা – এইটা কল্পনা করার মতও কেউ ছিলো বলে মনে হয় না। কিন্তু ম্যাচের ৩০ মিনিটে পাপা বাবা দিউপ গোল দিয়ে সেলেগালকে এগিয়ে দেন। গোটা ম্যাচ ধরে ফ্রান্স মিসের মহড়া চালিয়ে গেলে শেষে মাথা নিচু করেই ফিরতে হয় তাদের।
ফ্রান্স এই গোটা টুর্নামেন্টে কোনো গোল করতে ব্যর্থ হয়ে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়। অন্যদিকে সেনেগাল কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে সক্ষম হয়।

গোলের পরে উল্লসিত পাপা দিউপ

ইতালী ০ বনাম উত্তর কোরিয়া ১ (১৯৬৬)

২০০২ সালের ৩৬ আগে ইতালী একবার দক্ষিন কোরিয়ার প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলো। এবং সেবারও ওই এক গোলের ব্যবধানেই পরাজিত হয়ে বিদায় নেয় তারা। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন পাক দু ইক।
ইতালীকে হারাতে পারলেও ইউসেবিওর পর্তুগালের মুখোমুখি হয়ে এক পর্যায়ে ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষে ৩-৫ গোলে হেরে যায় উত্তর কোরিয়া।

ইতালীর রক্ষনভাগের পরীক্ষা নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া

ইংল্যান্ড ০ বনাম ইউ এস এ ১ (১৯৫০)

১৯৫০ সালে ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতন বিশ্বকাপে অংশ নেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া লীগের বেশ ভালো নামডাক থাকায় ফুটবল শক্তি হিসেবেই তাদের গন্য করা হতো। তাই সবাই ধরে নিয়েছিলো, এই ম্যাচটা তাদের জন্যে কিছুই না। ইংরেজ সাংবাদিকেরা টেলিগ্রাফে এই খবর পাবার পরে ধরেই নিয়েছিলো এটা আসলে প্রিন্টিং এ ভুল এবং ইংল্যান্ড আসলে ১০-১ গোলে জিতেছে। কালে কালে এই ম্যাচটি বেশ বিখ্যাত হয়ে যায় এবং ২০০৫ সালে এই খেলার কাহিনী উপজীব্য করে দ্য মিরাকল ম্যাচ নামে একটা চলচিত্রও বানানো হয়েছে।

ইংল্যান্ড বনাম ইউ এস এ ম্যাচ

হাঙ্গেরী ২ বনাম জার্মানি ৩ (১৯৫৪)

১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরী কোনো সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দল ছিলো। গোটা ছয় বছর ধরে অপরাজিত, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্বকাপের আগের ৩০টা ম্যাচে ১২০টিরও বেশী গোল করেছিলো তারা। অবশ্য কসিকস, টিচি আর পুসকাসের সেরা সময়ে যখন তারা তিনজন এক দলেই খেলছেন, তখন এই রকম ঘটাটাই স্বাভাবিক। তারা ওয়েম্বলীতে প্রথম বিদেশী দল হিসেবে ইংল্যান্ডকে হারায় এবং ৬-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানেই হারায়। এই ম্যাচটি ছিলো ফাইনাল ম্যাচ এবং যেহেতু গ্রুপ পর্বেই হাঙ্গেরী জার্মানিকে ইতিমধ্যেই ৮-৩ গোলে একবার হারিয়ে এসেছে, চ্যাম্পিয়ন কে হচ্ছে সে ব্যাপারে কারো সন্দেহ ছিলো না। কিছু জার্মান কোচ সেপ হারবার্জার গ্রুপ ম্যাচের দলটিকে প্রায় আমুল পরিবর্তন করে আলাদা দল খেলানোর ব্যাপারে মনস্থির করলেন। তারপরেও হাঙ্গেরী পুসকাস আর জীবরের গোলে এগিয়ে গেলে মনে হচ্ছিলো জার্মানি জেতার বদলে আসলে কম ব্যবধানে হারার চেষ্টা করছে। কিন্তু ম্যাক্স মরলক আর হেলমুট রাহনের গোলে প্রথমার্ধের মধ্যেই সমতা ফিরে আসে। একেবারে ৮৪ মিনিটের সমত রাহনের আরেকটা গোলে জার্মানি এগিয়ে যায়। এর পরে পুসকাস জার্মানির জালে বল ঠেলতে পারলেও বিতর্কিত অফসাইডের সিদ্ধান্তে তার এই গোল বাতিল করে দেয়া হয়। এবং জার্মানি তার প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

বিশ্বকাপ জিতে উল্লসিত জার্মানি

১,২৮৪ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “বিশ্বকাপের বিশাল ধরা ……”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    খেলাগুলোর অর্ধেকই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, এর মধ্যে আমার ফেভারিট অবশ্যই ক্যামেরুন হল্যান্ড :grr: :grr: :grr:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।