অব্যক্ত ভালোবাসা

রাত্রি ১১.৩০ মিনিট। ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক আগ মূহুর্তে মোবাইলের ডিসপ্লেতে আলো জ্বলে উঠলো। অচেনা নাম্বার। কিছুটা ইতস্তত ভাব, ধরবে কি ধরবে না? অবশেষে পরিচিত কেউই হয়তো নাম্বার পরিবর্তন করেছে ভেবে ধরলো। তারপর যা হলো তার জন্যে হয়তো রুদ্র প্রস্তুত ছিলো না।

ফোনটার কলার ছিলো একটি মেয়ে। রুদ্র তার নাম জানেনা। তাকে চিনেও না। তবে মেয়েটির কন্ঠে এমন কিছু একটা আছে যা রুদ্রকে আকৃষ্ট করে ফেলেছে। ঘটনাটি হটাৎ করেই ঘটে যাওয়ায় একে কেন জানিনা স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছে রুদ্রের। এই বাস্তব স্বপ্নে তৈরী শিহরণের আলোড়ণেই বাকি রাত কেটে গেল। কিন্তু তার ঘোর যেন কাটলো না। মন দ্বিধান্বিত যেন এখনো স্বপ্নেই আছে। বাস্তবতা কড়া নাড়লো যখন ফোনের উপর মেয়েটির নাম্বারটি দৃশ্যমান হল।

এতক্ষণ যার কথা হল সে রাফিদুল ইসলাম। ডাকনাম রুদ্র। ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করে। এবার দশম শ্রেণীতে উঠলো। তার বিচরণ কলেজের প্রতিটি প্রান্তে। একাডেমির ফার্ষ্ট বয়, গ্রাউন্ডের হিটম্যান আর মঞ্চের সুপারষ্টার। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা তাহলো দুষ্টের শিরোমণি। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে তার পদধূলি পড়েনা। বড্ড চঞ্চল আর চপল স্বভাবের। আড্ডা দিতে ভালোবাসে। আর যে কাজে মানা তাতেই আগ্রহ তার সবচেয়ে বেশী। এবার আসল কথায় ফিরি।

হটাতই তার মনে হলো আররে ধুর নাম তো জানা হলো না। সে কি করে কোথায় পড়ে তাও তো কিছু জানতে হবে। নইলে বন্ধুরা যে সবাই তাকে টিজ করে মেরে ফেলবে। তাছাড়া কে জানে যার কণ্ঠ এতো সুন্দর মানুষটা না জানি কত সুন্দর। যেই ভাবা সেই করা কিছুটা ইতস্তত করলেও অবশেষে ডায়াল করলো নাম্বারটিতে ০১৭১৯৫১………………।

তারপরই শুনতে পায় অপাশ থেকে সেই সুমধুর কণ্ঠ। নিয়মিত কথা হতে থাকে ছুটির দিনগুলিতে। ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে পরিচয়। অল্প কিছুদিনের মাঝেরি হয়ে যায় ভালো বন্ধুত্ব। রুদ্র এর ফাকে কখন যে তাকে পছন্দ করে ফেলেছে সে নিজেও জানেনা। সে ফোন করে শুধু তার কথা শোনার জন্য, তার হাসির রিনিঝিনি নুপুরের তান শোনার জন্য। তার হাসিই যেন আজ তার পৃথিবী।

যাকে নিয়ে এত কথা তার নাম দিয়া। দিয়ার মত উজ্জ্বল সে মুখের আলো। সে রুদ্রেরই ক্লাসমেট। পড়াশুনা ঢাকার স্বনামধন্য বিদ্যালয় ভিকারুন্নেসায়। সেদিন রাতে বান্ধবীর নাম্বারে ফোন করতে গিয়ে ভুল করায় ফোনা আসে রুদ্রের কাছে আর যত ঘটনার উৎপত্তি। আসলে শেষ ডিজিটে ০৬ এর জায়গায় ৬০ চাপায় এত কিছু।

অল্প কিছুদিনের মাঝেই বন্ধুত্বের এমন নিগূঢ় বাধনে ওরা বাধা পড়েছে যে একে অন্যকে সব কথা নিমিষেই বলে ফেলে। সব সমস্যা, আনন্দ দুঃখ ও বেদনাগুলো ভাগাভাগি করে দুজনা। সবকিছু বললেও রুদ্র আজো বলতে পারেনি তার ভালোলাগার কথা, তার ভালোবাসার কথা। চার বর্ণের এই ছোট্ট একটা শব্দই যেন তার অভিধানে নেই। এর পিছনে অবশ্য একটা কারণ আছে রুদ্র চায়না দিয়া কোন কারণেই তার উপর রাগ করুক। তার সাথে কথা বলা বন্ধ করুক তার থেকে দূরে চলে যাক। তাই সে নিরব থাকে যতদিন না দিয়া নিজ থেকে বুঝতে পারবে ততদিন সে কিছুই বলবে না। কারণ সে চায়না দিয়া জীবনে সামান্যতম কষ্টের কারণ সে হোক।

 

কলেজে আসার আগে সাতদিনে এত কিছু ঘটে যাওয়ায় আমূল পরিবর্তন এসেছে রুদ্রের জীবনে। তার চলাফেরা, কথাবার্তা, চিন্তাধারা হাসিকান্না সব কিছুই যেন অচেনা। তার ক্যাডেট কলেজের বন্ধুরাও যেন আজ তাকে চিনতে পারছেনা। এ যেন এক অন্য রুদ্র। কলেজের পর্ব বেশ স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। সবাই আছে যার যার গণ্ডিতে কেবল এক রুদ্র ছাড়া। সে যেন নিজের গণ্ডি  ছাড়া ভলকা ঘুড়ি। যার সুতো কাটা। কোন কিছুই তার ভালো লাগেনা, সারাদিন বসে বসে ভাবে আর ডাইরিতে লিখে কিছু অর্থহীন শব্দ মালা,

“কখনো দেখি দু’চোখ মেলি , কখনোবা থাকো তুমি অন্তরালে

ইথারে ভেসে আশা শব্দ বুনে , এঁকেছি তোমায় এ মনে।

তুমি ভালোবাসা আমার, তুমি বেঁচে থাকা আমার

কল্পনার রাজ্যের সব গল্পে শোনা, তুমিই আমার রূপকথার রাজকন্যা।

কখনো খুনসুটি, কখনোবা কান্নাহাসি, কত রাত জাগা কত গল্প শুনি

তোমার খুশির সীমা বাঁধনহারা, তারই সাথে মন আমার পাগলপারা।

তুমিই তো ভালোবাসা আমার তুমিই তো বেঁচে থাকা আমার

কল্পনার রাজ্যের যত সব গল্পে শোনা, তুমিই তো আমার সে রূপকথার রাজকন্যা।

মনের ক্যানভাসে একা বসে তোমায় আঁকা, স্বপ্নের মত গানে গানে দিনের শেষে রাত আসা

তোমার কণ্ঠ, তোমার হাসি যতসব বাঁধভাঙা, নিশ্চুপ নীরবতায় কত কথা কানে কানে কয়ে যাওয়া।

এই নিয়েই গড়া তুমি ভালোবাসা আমার, এই ভেবেই পাওয়া তোমায় বেঁচে থাকা আমার।

কল্পনার রাজ্যের যত সব গল্পে শোনা, তুমিই তো আমার সে, রূপকথার রাজকন্যা।”

 

তার ধ্যান ধারণা জুড়ে কেবল একজনের বসবাস, দিয়া। সে কেমন লম্বা না খাটো। কালো না ফর্সা। তার চোখদুটো কেমন? তার চুলগুলো কেমন? তার পুরো জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে ঐ চপল হাসি।প্রতিটা রাত সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে আদৌ তাকে ভালোবাসবে কি দিয়া?কি জানি? একবার মনে হয় বাসবে আবার মনে হয় নাহ। এইভাবে কখন রাত কেটে ভোর হয় সে নিজেও টের পায়না । আবার শুরু হয় যান্ত্রিক দিনের সূচনা।তবে ব্যতিক্রম কেবল রুদ্র। একহ্ন আর ক্লাসে আড্ডা জমেনা, ডেস্কে ড্রাম পিটিয়ে আর কনসার্ট হয়না। কারণ রুদ্রই যে থাকেনা। জানালার পাশের ডেস্কটাতে বসে বসে আপনমনে আকাশ দেখে, আর কি যে ভাবে কেউ জানেনা। মাঝে মাঝে মন বিদ্রোহ করে উঠে, যা হয় হবে এবার সে বলবেই যে করেই হোক, তাতে যা হয় হবে, ভালোই তো বাসে অন্যায় তো আর কিছু না। ভালো লাগলে ভালোবাসবে নাইলে বাসবে না এতো চিন্তার কি আছে। আবার স্বরূপে ফেরা, খেলার মাঠ, ক্লাসরুমের আড্ডা সবই যেন প্রাণ ফিরে পায়।

এভাবেই পালা বদলের খেলায় শেষ হয়ে কলেজের দ্বিতীয় পর্ব।মনে জাগে স্বপ্ন, আনন্দের হিমেল হওয়া, খুশির রেষ , আবার শোনা যাবে সেই মধুর হাসি, মিষ্টি কণ্ঠস্বর। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সে সুর। ৩ মাস পরে যেন আবার নিজের প্রাণ ফিরে পেলো সে। বনের পাখি খাঁচায় যেমন ছটফট করে নিজ অরণ্যে ফিরে যেতে, তেমনি অবস্থা রুদ্রর। বাসায়ে গিয়েই ফোন করে দিয়ার নাম্বারে, ফোন বাজে কিন্তু রিসিভ হয়না, ঘড়ির কাটায় তাকিয়ে নিজেকেই ধমক দেয় রুদ্র ধুর ! এখন তো ওর স্কুল চলছে। আর ঘণ্টা কয়েকের অপেক্ষাও যেন সহ্য হচ্ছে না রুদ্রর। কথায় আছে অপেক্ষার প্রহর নাকি কাটতেই চায়না। অন্যানবারের মত বাসায় হুলস্থুল নেই, সব কেমন শান্ত হয়ে আছে। রুদ্র আসলেই কম্পিউটারে গান ছেড়ে, এদিকে অদিক করে পুরো বাসা মাতিয়ে রাখতো কিন্তু এবার কেন জানি সব আধমরা, নিষ্প্রাণ শুধুই অপেক্ষা তার, কোন দুষ্টুমি আর ভালো লাগছে না তার, দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে গেছে নিজেও জানেনা ঘুম ভাঙ্গে ফোনের শব্দে, তখন বাজে বিকেল ৪টা। ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই ফোন ধরতে সব ঝিমুনি কেটে গেলো তার। কেননা ওপাশ থেকে ভেসে আসে দিয়ার কণ্ঠ।

দিয়ার কণ্ঠে কেমন জানি অচেনা এক উচ্ছ্বাস ফুটে উঠছে। যা তা মনটকে আনন্দে ভরিয়ে দিলো, বিগত ৩মাসের কষ্ট , ক্লান্তি, শ্রান্তি সব যেন উবে গেলো কর্পূরের মত এক নিমিষেই। কিন্তু বিগত ৩ মাসের কথা যখন দিয়া বলতে থাকে, একটু একটু করে কমতে থাকে রুদ্রর উচ্ছ্বাস। যদিও মন ভেঙে কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো তার কিন্তু মতবুও মুখের ম্লান হাসি ধরে রেখেছিলো সে। প্রার্থনা আর শুভকামনা জানালো দিয়াকে তার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে তবে এই অধ্যায়ে নিজের কোন স্থান নেই তার, দিয়ার পুরোটা জুড়ে আছে কেবল ফারহান। শেষ ৩ মাসেই এতো কিছু হয়ে গেলো, নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিলো তার, দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলো সে। তবে কি তার না বলা ভালোবাসা দিয়া কখনই বুঝবেনা? তার এই অব্যক্ত কথাটা কি তবে না বলাই থেকে যাবে চিরদিন? যদি তাকে হারাতেই হবে তবে কেন সে এলো তার জীবনে? কেন? অজানা ব্যথা অনুভূত হয় তার অন্তরে। একটাই প্রশ্ন অব্যক্ত ভালোবাসাটুকু কি অব্যক্তই রয়ে যাবে, দিয়া কি কখনো তা বুঝবে না???

আজ সে ঘটনার ১৫ বছর পর অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও , রুদ্রর ভালোবাসাটুকু অব্যক্তই থেকে গেছে, যদিও তার ভালোবাসার মানুষ তার থেকে হারিয়ে যায়নি বরং তার কাছেই আছে এবং থাকবে আমৃত্যু। সেই ঘটনার প্রায় ৪ বছর পর ফারহান উচ্চ শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া যায় এবং সেখানে যাবার বছরখানেকের মাথায় সেখানকার প্রবাসী এক বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। এই কথা জানার পর দিয়াও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে নিজের পড়াশুনা ও ক্যারিয়ারের দিকে মন দেয়। মেডিকেল কলেজের পড়া শেষ করে এখন সে স্বনামধন্য হাসপাতালে চাকুরী করছে। আর রুদ্র তো আছে আগের মতই তার বন্ধু হয়ে আর পড়া শেষ করে পারিবারিক ব্যবসাতেই যোগ দেয় সে। আর সব সময় দিয়ার সাথেই আছে প্রয়োজনেও আবার অপ্রয়োজনেও। পরে তাদের বাবা-মা তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করলে রুদ্র বা দিয়া কেউই অমত করেনা ।

আজ তাদের সুখের সংসার, এরমাঝেই কয়েকবার রুদ্র দিয়াকে বলেছে, “দিয়া তোমাকে আমি ভালোবাসি। ” তবে এখনো সে তাএক মুখ ফুটে বলেনি, কেবল তার ডাইরির পাতায় গোটা গোটা হরফে লেখা আছে, “ দিয়া তোমাকে আমি ভালবেসেছি সেই প্রথম দিন থেকে যেদিন তোমায় প্রথমবার শুনেছি। তোমায় আজো ভালোবাসি, সারাজীবন ভালোবেসে যাবো । কিন্তু কখনো বলিনি বা বলা হয়ে উঠেনি। ভয়ে, যদি হারাতে হয় তোমাকে কখনো, যদি ভুল বোঝ তাই বলতে পারিনি। অব্যক্তই রয়ে গেছে এসব কথা। আর আজ যখন এই অব্যক্ততাইতোমাকে আমার কাছে এনে দিয়েছে, তাই আর কখনো ব্যক্ত করবো না, থাকনা কিছু কথা অব্যক্তই, যদি কখনো পারো নিজ থেকে বুঝে নিতে বুঝে নিও,

 “বাস্তবতার রঙয়ে ছাওয়া,

কল্পনাকে হারিয়ে পেল পূর্ণতা,

এ তো কেবলই আমার

অব্যক্ত ভালোবাসা।”

৯৩২ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “অব্যক্ত ভালোবাসা”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)

    ছোট ভাই, মাইন্ড করো না। গল্প হিসেবে খুব একটা ভাল লাগেনি। অযথা বিশেষণের ব্যবহার আর রূপক গুলো কেমন জানি একঘেয়ে লেগেছে।
    আর কাহিনী টা খুবই সাধারণ এবং ইম্যাচুউর মনে হয়েছে।

    তবে তোমার আগের কয়েকটি লেখা ভাল লেগেছে।
    চালিয়ে যাও।


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।