নৌ-অবরোধ এবং পাইপের শহর

আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন যুগিয়েছিলো বিভিন্ন রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা সংগঠন।কোন কোন রাষ্ট্র আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন না করলেও তাদের জনগণ আমাদের পক্ষে ছিলো।এমনই একটি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে।আবার এই দেশেরই সাধারণ মানুষ আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে নানা ভাবে। পন্ডিত রবি শংকর এবং বিটলস এর বিখ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন কর্তৃক আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর কথা আপনারা সবাই হয়তো জেনেছেন জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির কল্যাণে। এঁরা তো বিখ্যাত মানুষ। অত বিখ্যাত নন এমন কিছু বিবেকবান মানুষও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে। এরকম দু’টি প্রচেষ্টা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

নৌ-অবরোধ

রিচার্ড টেলর এবং সমমনা কিছু সংখ্যক মার্কিন নাগরিক কর্তৃক পাকিস্তানের সামরিক সাহায্যবাহী জাহাজ অবরোধের উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের দি প্রগ্রেসিভ-এ। জনাব টেলর এবং তাঁর সঙ্গীরা অহিংস নীতিতে সশস্ত্র সরকারী বাহিনীকে পরাভূত করেছিলেন।পাকিস্তানী আর্মির নির্যাতন এবং সন্ত্রাস সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন সামরিক এবং অর্থনৈতিক সাহায্য চালু রাখে। প্রথমে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি কিন্তু পরবর্তীতে প্রেস এবং কংগ্রেসে গুঞ্জন উঠলে যুক্তি দেখান হয় যে, পাক সরকার এর সুবিধার জন্যই সাহায্য দেয়া হচ্ছে। এপ্রিল মাসে মার্কিন সরকার স্বীকার করে যে, পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন ট্যাংক এবং এফ-৮৬ ফাইটার ব্যবহৃত হচ্ছে।এগুলো বাঙ্গালীদের নিষ্পেষনে ব্যবহৃত হচ্ছিল  তাই “ Send aid to apply leverage” এই যুক্তি টেলরদের কাছে ঠুনকো মনে হতে থাকে।টেলর এবং তার সঙ্গীরা ফ্রেন্ডস অফ ইস্ট বেঙ্গল  এর ডাইরেক্ট একশন কমিটির সক্রিয় সদস্য হন।

৮ই জুলাই এঁরা জানতে পারেন যে, পাকিস্তানী জাহাজ পদ্মা মন্ট্রিলে জেট বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ নেয়ার চেষ্টা করার সময় ধরা পড়ায় কানাডীয় সরকার জাহাজটির লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে এবং জাহাজটি বাল্টিমোর বন্দরের পথে তবে যন্ত্রাংশ গুলো ছাড়া। তখনই পদ্মা অবরোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।১৪ই জুলাই এঁরা No Arms to Pakistan লেখাসহ ক্যানো এবং কাইয়াক এর বহর নিয়ে নেমে পড়েন বাল্টিমোর বন্দরের জলে। উদ্দেশ্য, পুলিশ এবং কোষ্ট গার্ড সাথে নিয়ে আসা ‘পদ্মা’-কে বন্দরে ঢুকতে বাধা দেয়া। ইনট্রেপিড নামের পুলিশ বোট থেকে একজন পুলিশ সার্জেন্ট চিৎকার করে বললেন, “ আপনাদের নিরাপত্তার জন্যই পথ ছাড়ার আদেশ দিচ্ছি, জাহাজের ফেনরেখাগুলো বিশাল- আপনারা এর টানে পড়ে প্রপেলারের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারেন।” “ আপনাদের যা করার করুন, কিন্তু আমরা পদ্মা অবরোধ করবই। আমরা কিছু না করলে ২০ মিলিয়ন পাকিস্তানী মারা পড়তে পারে। ”- টেলর বাহিনীর জবাব।

জাহাজের পথ আটকিয়ে বন্দরের আইন ভঙ্গ করার দায়ে টেলরদের গ্রেফতার করা হয়। জাহাজটির বন্দরে প্রবেশ ঠেকাতে না পারলেও এই প্রচেষ্টা পুরোপুরি বিফল হয়নি।ঘটনাটা টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে ব্যপকভাবে প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে নৌ-অবরোধ কর্মসূচী আরো সফলতা অর্জন করে। আগষ্ট মাসে আরেক পাকিস্তানী জাহাজ আল আহমাদি ফিলাডেলফিয়া হতে কোন মালপত্র না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হয়।এক্ষেত্রে খালাসিরা মাল তুলতে অস্বীকৃতি জানায়। নিউইয়র্ক টাইমস –এর মতে এই বাল্টিমোর একশনের প্রভাবেই পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য কাটছাঁট করা হয়।

পাইপের শহর

১৪ই অক্টোবর ১৯৭১ সাল। ওয়াশিংটন ডিসির লাফাইতি পার্ক।ওয়াশিংটনের নাগরিকদের ভারতে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়ার জন্য তৈরী হয় ক্ষুদ্র শরণার্থী নগর।বাল্টিমোরে নৌ-অবরোধ এর সংগঠক টেলর ছিলেন এই রিফিউজি ক্যাম্পের ক্যাম্প নির্দেশক।টেলরের সহযোগী ছিলেন ডেভিড হার্টসফ এবং বিল ময়ার।‘ফিলাডেলফিয়া ফ্রেন্ডস অফ ইষ্ট বেঙ্গল’- এর আয়োজনে এবং অনেকগুলো বাংলাদেশ গ্রুপের সমর্থনে গড়ে ওঠে এই নগরী।অনেকগুলো ড্রেন-পাইপ দিয়ে শহরটি তৈরী করা হয়। ১৪ই অক্টোবর হতে ১০দিনের জন্য শহরটি চালু রাখা হয়।নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর এবং বোস্টন থেকে অনেক স্বেচ্ছাসেবী ওয়াশিংটনে আসেন এই কার্যক্রমে অংশ নিতে।শরণার্থী পরিস্থিতির এই নাটকীয় উপস্থাপন ওয়াশিংটনের জনতা এবং প্রেসের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সমর্থ হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
১। সূত্রঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র ত্রয়োদশ খণ্ড।

Capture

২।গ্রোবাল নন ভায়োলেন্ট ডাটাবেজে এঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
৩।রিচার্ড কে. টেলরের লেখা Blockade ( অরবিস বুক্স কর্তৃক ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত) বইতে ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

২,৪৮৩ বার দেখা হয়েছে

২৮ টি মন্তব্য : “নৌ-অবরোধ এবং পাইপের শহর”

  1. টিটো মোস্তাফিজ

    পড়বার জন্য ধন্যবাদ ভাই। :teacup:
    ১৯৯৭ সালে বিজয় দিবসে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলাম। ঐ পত্রিকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের দলিল পত্র ঘেঁটে প্রবন্ধটি লিখা। প্রথম সংখ্যাটিই পত্রিকার শেষ সংখ্যা। এ বিষয়ে আমার জানা মতে কোথাও কোন লেখা প্রকাশ না হওয়ায় ক্যাডেট কলেজ ব্লগে পুনঃপ্রকাশ করলাম।


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।