পাতা ঝরার গান-০২

২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে মিলিটারি একাডেমিতে গেলাম। ছেলে হিসেবে আমার মধ্যে হোম সিকনেস ব্যাপারটা খুব কম। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদে নিজের কলেজের বন্ধু ছাড়াও বাকি নয় কলেজের আরও অনেক পরিচিত মুখ পেয়েছিলাম ওখানে। প্রথমদিনেই মনে করে নিলাম যে আগামী দুটো বছর যা ই হোক আমার একার সাথে তো আর হবে না। যা হবে সবাইকেই ভাগ করে নিতে হবে। কেউ যদি ভেবে বসেন যে ক্যাডেট কলেজে পড়েছি বলে হোম সিকনেস নেই, সেটা মস্ত ভুল। আমি ক্যাডেট কলেজের অনেক ছেলে মেয়েকে চিনি যাদের বাড়ির প্রতি দুর্বলতা প্রকট। একাডেমি তে গিয়ে আর সবকিছুর সাথে একটা ব্যপার খুব দ্রুত বুঝে ফেললাম যে ভোর ৫ টা থেকে সারাদিন জলদি চল ধীরে চল উলটা ঘুর করে, কাদা পানি মাড়িয়ে, ডিগবাজি দিয়ে, দৌড়ে, বাম্পস আপ বাম্পস ডাউন করে, শত শত পুশ আপ রিচ আপ দিয়ে,হামিদ কোম্পানির ড্রেন তাওয়াফ করে রাত দুটা, তিনটা যখনই ঘরে ফিরতাম না কেনো, বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলে শরীরের সব কষ্ট মনে হত পানির সাথে বেয়ে পড়ে যেত নিচে। গোসল করে যখন স্লিপিং সুট টা গায়ে জড়িয়ে রাত সাড়ে তিনটায় নিজের ঘরে বেড সাইড ল্যাম্প টা জ্বেলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরাতাম এটা জেনেও যে আমার ঘুমের জন্য আর একটা ঘণ্টাও হাতে নেই, তখনো কেন যেন নিজেকে কোন এক সাম্রাজ্যের বাদশাহ বলে মনে হত।

সেই থেকে আজ পর্যন্ত সব শারীরিক কষ্টের পর বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার এর নিচে দাড়িয়েছি। কষ্ট সব পানির সাথে বয়ে গেছে। মানসিক কষ্টে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে লাভ হয় না। শুধু শুধু পানির অপচয় হয়।

শাওয়ারের পানির ঢল শারীরিক কষ্ট ঝেড়ে দিতে যতটা না চৌকস, মানসিক কষ্টের বেলায় ঠিক ততটা পারঙ্গম নয় কেন জানি।

………………………………………………………………………………………….

বছর চারেক আগের ঘটনা। আমি তখন ঘাটাইলে। ইউনিটে অফিসার আমরা মাত্র তিনজন। তারমধ্যে একজন আমাদের অফিসার কমান্ডিং। আমি আর ফেরদৌস দুইজন দুইদিকে দৌড়াতাম বিভিন্ন কাজে, তাই সচরাচর স্যারের সাথে কাজের কথা ছাড়া অন্য কোন কথা হোত না খুব বেশি। টিব্রেক টাও যে যার মত করতে হোতো কারণ অধিকাংশ সময়ই দুই- এক জন আমরা বাইরেই থাকতাম। হটাত যদি কোন একদিন আমরা তিনজন একসাথে চা খেতে বসতাম তখন স্যার বেশ সময় নিয়ে গল্প করতেন, কথা বলতেন। কেউ কোন কাজ আনলে বলতেন ” কাজ তো ওরা সারা সপ্তাহই করে, আজ একটু টাইম দাও আমাদের, কথা বলি, পরে আসো তোমরা”। স্যার আমাদের থেকে বেশ বড়। মাঝেমাঝে স্যার ওনার লাইফের অনেক এক্সপেরিয়েন্স আমাদের সাথে শেয়ার করতেন। অনেক উপদেশ দিতেন। স্যার এর কিছু কথা শুনেই ভালো লাগতো, আর কিছু তখন না মেনে নিলেও পরে মনে হত … না ঠিকই বলেছেন। স্যার একদিন আমাদের দুইজন কে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা এই যে ভালোবাসা ভালোবাসা বল, করো তোমরা , তোমাদের যদি বলি একটা ছোট্ট শব্দ দিয়ে ভালোবাসাটা কি, সেটা বুঝিয়ে দিতে, তাহলে তোমরা কে কি বলবে?

আমি চিন্তা করে বললাম ” কম্প্রোমাইজ” হতে পারে স্যার।

ফেরদৌস বলল হাসতে হাসতে ” পুরোটাই একজন আরেক জনের জন্য স্যাক্রিফাইজ”।

স্যার বললেন ” না, তাহলে তো ব্যাপারটা হিসাব নিকাশের পর্যায়ে চলে গেলো, ক্যাল্কুলেটিভ ব্যাপার স্যাপার। তাহলে ভালোবাসাটা কোথায়? আমি একটা ওয়ার্ড বলি? তোমরা মিলিয়ে নাও। দেখো মেলে কিনা”

আমরা বললাম ” বলুন স্যার”। বলে একটু শোনার জন্য নড়েচড়ে বসলাম।

স্যার বললেন ” Love is nothing but Acceptance, গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া ভালোবাসা কিছুই না। তুমি যতদিন একজন মানুষের সবকিছু, সে যেমন , সে যা করে, সব গ্রহণ করতে অথবা মেনে নিতে পারবে ততদিন তুমি তাকে ভালোবাসবে। যেদিন থেকে মানতে পারবে না সেদিন থেকে ভালোবাসা কমতে থাকবে। না মানতে পারতে পারতে ভালোবাসা শেষ হয়ে যাবে। স্যাক্রিফাইজ, কম্প্রোমাইজ দিয়ে জীবন চলে, কিন্তু ভালোবাসা চলে না ব্যাটা” ।

বড়রা শুধু কাজের জন্য বকাবকি করেন না। মাঝেমাঝে অনেক ভালো কিছু কথাও বলেন, যেগুলো সারাজীবন মনে থাকে।

……………………………………………………………………………………..

বিকেলে একটা ফোন আসলো ,অপরিচিত নাম্বার। রাস্তাঘাটে থাকলে যেটা হয়, পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করতে করতে মিসড হয়ে গেলো। কল দিলাম, কলটা কেটে দিয়ে আমাকে আবার কল করলেন;

হ্যালো,
–তুমি কি তানভীর হা-মীম বলছ?
জী বলছি,
— আমি পাইলট অফিসার শরীফুলের বোন।
আপু,আসসালামুয়ালাইকুম।
—তুমি তো শরীফ এর কোর্স মেট , শরীফ মারা গেছে জানো?
(কিছুটা চিন্তিত এবং বিচলিত হলাম, শরীফ নামের আমার এয়ার ফোরসের কোনো কোর্স মেট নেই)
জীনা আপু।
—- ও তো মারা গেছে প্রায় ২ বছর হল, প্লেন ক্র্যাস করে।
আপু, ও কোন কোর্সের?
— ৬২ লং কোর্সের
আপু, আমি ৫৯ এর,শরীফ আমাদের ফার্স্ট টার্ম ছিল। আমি ওর ক্র্যাসের এর খবর জানি।(দীর্ঘশ্বাস………)

আজ ওর একাডেমির ডায়রি ঘাটতে ঘাটতে, তোমার কিছু লেখা পেলাম, নিচে তোমার নাম লেখা, সুন্দর করে সিগ্নেচার করে ফোন নাম্বার দেওয়া। তুমি ওকে বলেছিলে;

” ডিয়ার শরিফ, বি এ ড্যাম ফাইটার। ডোন্ট ল্যান্ড ইন এ প্যাডি ফিল্ড এন্ড ডোন্ট বি সো কাওয়ারড টু ইজেক্ট সো কুইক্লি,ফাইট টিল দ্যা লাস্ট…”

(আমার চোখের সামনে ২০০৮ সালে বি এম এ থেকে বাফা তে ফিরে যাবার সময় ফ্লাইট ক্যাডেট শরীফের ডায়রিতে নিজের লেখা গুলো ভেসে উঠলো, সেই সাথে শরীফের সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ)।

জি আপু,আমার মনে আছে।
—- তুমি কি জানো শরীফ ধান ক্ষেতেই ক্রাস করেছিলো, কিন্তু তোমার শেষ কথাটা ও রেখেছে, হি ফট টিল টু দ্যা লাস্ট, ও ইজেক্ট করেনি ।

( চোখ দুটো ভারি হয়ে যাচ্ছিলো, নোনা পানি এসে বাধ ভাঙ্গার পায়তারা করলো, বনানি ১১ নাম্বারে দাড়িয়ে একটা ছেলে হাউমাউ করে কাদছে,ব্যাপারটা শোভনীয় না…… বুক ফেটে গেলো, পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম)

——- তোমার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা হল তাই ফোন করলাম……… ( এরপর আপু আমি কোথায় আছি, ক্যামন আছি ইত্যাদির খবর নিলেন। আমি আমার দক্ষ অভিনয় শিল্পকে কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক স্বাভাবিক ভাব ধরে কথা চালিয়ে গেলাম, মোবাইলে কথা শোনা যায় কিন্তু মুখ দেখা যায় না, মুখ দেখা গেলেও মনের ভাংচুর দেখা যায় না)।

২,৮১৭ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “পাতা ঝরার গান-০২”

  1. লুব্ধক (১৯৮৮-১৯৯৪)

    আ-হা! জীবনের গল্পগুলাই এরকম!
    আমারে একজন শিখাইছিলেন, "বাবা, যত দেখবেন, শিখবেন, জানবেন, বুঝবেন জীবনডা আসলে একটা মিছাকথা!"
    🙁

    স্টিল হ্যাভ টু ফাইট টিল দি লাস্ট!


    কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার ...

    জবাব দিন
  2. তানভীর (২০০১-২০০৭)

    হামীম ভাই, ভালো লাগলো... 🙂 🙂 🙂
    স্টিল হ্যাভ টু ফাইট টিল দ্যা লাস্ট!!!!
    এই মোটো বুকে লালন করে বেঁচে আছি.....থাকবো।।। (সম্পাদিত) (সম্পাদিত)


    তানভীর আহমেদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।