রতন ও তার নায়িকা

১.

বর্গাকৃতির বিশাল পুকুরটার উত্তরে যে অংশটা বাঁধানো, তার ঠিক পাশেই বড় একটা জলপাই গাছ আছে। পরিণত দুপুরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে গাছের ছায়া লাল মাটিতে এমনভাবে পড়ে যে, তাকে ঝাঁকড়া চুলের শীর্ণ কিশোর বলে ভ্রম হয়। ঠিক সেই ছায়া বরাবর হাঁ করে দাঁড়িয়ে এই গ্রামের এক কিশোর, রতন। শীর্ণ ঠিকই, তবে মাথার চুল ঝাঁকড়া নয়, ছোট করে কাটা। ছোটখাট কৃষ্ণগাত্র, পরনে ময়লা ধূসর হাফপ্যান্ট। হাঁ করা দৃষ্টি হাতে ধরা কোন বস্তুর উপর।

আপাত বৈশিষ্ট্যহীন এই বালক এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছে তা দূর থেকে ঠিক বোঝা গেল না। অবশ্য সেটা নিয়ে জগতের কারো মাথা ঘামানোর কারণ আছে বলেও মনে হয় না। বৈশ্বিক মানদণ্ডে রতনের অবদান-কৃতিত্ব-গুরুত্ব ইত্যাদি শূন্য বললে সেটা নিয়ে সম্ভবত কেউই প্রতিবাদ করবে না। গ্রীষ্মের এই ভরদুপুরের নিস্তরঙ্গ পুকুর, নির্বিকার জলপাই গাছ কিংবা নিরীহ সাদা মেঘের সাথে তাকে ভাবগাম্ভীর্যের আসনে জোরপূর্বক না বসিয়ে, দৃষ্টিসীমার হাজার-লক্ষ জীব ও জড়বস্তুর কাতারে ফেলাই স্বস্তিদায়ক মনে হয়- যাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবার প্রয়োজন সচরাচর পড়ে না।

কাজেই গ্রামে বেড়াতে আসা ঢাকাবাসী তরুণ ইশফাকের ‘কীরে, রতন নাকি?’ হাঁকে যখন রতন ভূত দেখার মত চমকে উঠে সেই রহস্যময় বস্তু পকেটে ঢুকিয়ে দৌড় দিলো, ইশফাককে কিছুটা সাময়িক বিস্ময় গ্রাস করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। গ্রামে ছুটি কাটাতে পারা আশীর্বাদের মত, বিশেষ করে ওর মত ঢাকার ধোঁয়া-ধূলায় ত্যক্তবিরক্ত মানুষের জন্যে তা জৈষ্ঠ্যের খররৌদ্রের পর এক পশলা বৃষ্টি। শান্ত-নিস্তব্ধ সবুজে মাটির চুলার রান্না, সুনীলের উপন্যাস, আর বুক ভরে পরিষ্কার বাতাস নেবার আনন্দ আহরণে ব্যস্ত সে। এর মাঝে ছোটখাট জাগতিক বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার কাজটা মন সযত্নে নিজ থেকেই করে!

কাজেই খোলা বারান্দায় বসে আবার উপন্যাসের ভেতর ডুবে গেল সে। বড় চাচী কিছু পিঠা রেখে গিয়েছেন সামনে, বইয়ের সাথে নির্বিবাদে মিশে গিয়েছে সেগুলো। নিকট এবং সুদূর অতীত-ভবিষ্যৎ সব মিথ্যে, এই সময়টুকুই সত্য।

২.

সন্ধ্যায় ঝড় শুরু হলো। সেই সাথে বড় বড় ফোঁটায় ঝুমবৃষ্টি।

স্বাস্থ্যবান আমগাছের মোটা মোটা ডাল সশব্দে ভেঙে পড়ছে ঘরের চালের উপর। সেই সাথে টিনের চালে পানির ফোঁটার শব্দ কখনো তানপুরার মোলায়েম সুর, আবার পরমুহূর্তেই ক্রুদ্ধ জান্তব গর্জনের আওয়াজ নিচ্ছে। এই অদ্ভুত অনিশ্চিত সঙ্গীতের স্বর-রাগিনীর তল অনুধাবন মানব মনের অসাধ্য। শহরে ঝড়-বাদলা যে হয় না তা নয়, তবে পল্লী অঞ্চলে এ জিনিসের আবেদন ভিন্ন। সেটা বোঝে বলেই ইশফাক চুপচাপ বারান্দায় এসে বসে রইলো, ঠিক যে জায়গাটায় দুপুরে বসে ছিল। মাটির গন্ধ এখানে নাসিকারন্ধ্র পেরিয়ে মস্তিষ্কে পরশ বুলোয়, বৃষ্টির শব্দ এখানে কর্ণ ভেদ করে অন্তরাত্মায় পৌঁছে বিচিত্র ভাষায় দুর্বোধ্য সব প্রশ্ন করে। সে সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকে না বলেই হয়তো শুনতে এত ভাল লাগে।

জমাট অন্ধকারের মাঝেও ইশফাকের মনে হলো ছোটখাট একটা ছায়ামূর্তি স্থির দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার দক্ষিণ কোণে। গড়নটা চেনা।

‘রতন নাকি রে?’
রতন কোন জবাব দিলো না। রতনকে পুরোপুরি প্রতিবন্ধী বলা যায় কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, তবে সে যে কিছুটা হলেও ওই ঘরানার তাতে সন্দেহ নেই। শারীরিক-মানসিক দু’দিক থেকেই। ইশফাকের প্রশ্ন শুনে সে অদ্ভুতভাবে কুঁকড়ে গেল আর অনাবশ্যক ব্যস্ততায় ঘাড় চুলকানো শুরু করলো।
‘আয় এদিকে আয়। কেমন আছিস?’
‘জ্বে, ভাল।’
‘একেবারে ভিজে গিয়েছিস দেখি! ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো।’
‘পুকুরের ওই পাড়ে আছিলাম। বিষ্টি নামার পর এপি দৌড়ায় আইতে আইতে ভিজ্যা গেছি।’
‘ও। সারাদিন বাইরে ঘুরঘুর করিস ক্যান? লেখাপড়া নাই?’
‘ভাইজান লেখাপড়া করি না। টেকা নাই।’
‘ও…’ ইশফাকের হঠাৎ মনে পড়লো, রতনরা হতদরিদ্র।

‘আচ্ছা, তোর বয়স কত রে?’
‘ভাইজান, উনিশ।’
…উনিশ! অথচ দেখে কোনমতেই তেরো-চৌদ্দর বেশি মনে হয় না। বেচারার অপুষ্টিতে ভুগে এই অবস্থা। ছোট ছোট কুতকুতে চোখে প্রাণ খুঁজে পাওয়া কঠিন- লেখাপড়া আসলেই অনেক দূরের ব্যাপার। হঠাৎ দুপুরের কথা মনে পড়াতে ইশফাক একটু সোজা হয়ে বসলো।
‘এ্যাই, দুপুরে এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছিলি রে?’
রতন সাথে সাথে মাথাটা নীচু করে ফেললো।
‘কিসু না ভাইজান, কিসু না।’
‘আহা, বল না! গোপন কিছু? যা, আমি কাউকে বলবো না। প্রমিজ।’
‘কিসু না ভাইজান।’
‘এই ব্যাটা, বল। বললাম তো কাউকে বলবো না।’

রতন এবার আস্তে আস্তে মাথা উঁচু করে তাকালো। মুখে লাজুক হাসি।
‘ভাইজান, একজনের ছবি। কাউরে বইলেন না কিন্তু। শরম লাগে।’ বিচিত্রভাবে ঘাড় চুলকে বললো সে।
‘বলিস কি! গার্লফ্রেন্ড নাকি? ছবি সাথে আছে?’
লাজুক হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হয়ে ক্ষুদ্র মাথাটা উপরে-নীচে দু’বার দ্রুত ঝাঁকলো।
‘হা হা হা। আরে এটা তো খুশীর খবর। দেখা ব্যাটা, ছবি দেখা।’

রতন সলজ্জ ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করলো। সেই প্যাকেটের ভেতর আরেকটা প্যাকেট। তার ভেতর একটা ফোর-আর সাইজের ছবি। ইশফাক মোবাইল ফোন বের করে আলো ফেললো ছবির উপর।
এই তুমুল ঝড়-বৃষ্টিতেও রতনের শাড়ি পরিহিতা ভালোবাসার মানুষটির গায়ে পানির কোন স্পর্শ পড়ে নি। গোপনে হাসি চাপল ইশফাক।

‘ওরে বাপ রে বাপ! দারুণ সুন্দরী তো! চেনা চেনা লাগে, কোন নাটক-ফাটকে দেখেছি মনে হচ্ছে। কোথায় পেলি এই ছবি?’

উত্তরে রতনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য থেকে জানা গেল, মাস তিনেক আগে সে বাজারে যায় একজোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেল সেলাই করাতে। সেখানে এক ফটোকপি মেশিনের দোকানে টেবিলের উপর এই ছবি পড়ে থাকতে দেখে সে। সম্ভবত দোকানদারের ব্যক্তিগত কালেকশন, অসাবধানতাবশত ফেলে রেখেছিল। লাবণ্যময় এই মুখশ্রী প্রথম দর্শনেই তার মনে গেঁথে যায় এবং সে গোপনে ছবিটা সরিয়ে নিয়ে আসে। কেউ টের পায়নি, খোঁজও করে নি।

এবার আর হাসি চাপতে পারলো না ইশফাক।
‘হা হা হা! বেশ করেছিস। তোর রুচি তো দেখা যায় ভাল।’
রতন অদ্ভুতভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আনন্দের হাসি হাসলো। হাসলে ভালই লাগে ওকে, অনেকটা স্বাভাবিক মানুষের মত।
‘বিয়ে করবি নাকি? হুঁ? বল বল।’
রতন কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলো। নিষ্প্রাণ চোখে আশা ঝিলিক দিলো, নাকি উপহাস বুঝে ফেলে নিন্দাবাদ জ্ঞাপন করলো তা এই অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা গেল না।
‘এই ব্যাটা, ঢাকা শহরে কিন্তু আমার অনেক লাইনঘাট আছে। নাটক-সিনেমার লাইনে অনেককেই চিনি। তুই বিয়ে করতে রাজী থাকলে বল, আমি ব্যবস্থা করতে পারব।‘
অন্ধকার না থাকলে বোঝা যেত যে এবার হাসি চাপতে ভালই বেগ পেতে হচ্ছে ইশফাকের।

এমন সময় চারদিক আলো করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। তার সেকেন্ড দুয়েক পর প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল কাছেই কোথাও। সেই ক্ষণিকের আলোয় রতনের দৃষ্টিতে যেই অভিব্যক্তি দেখা গেল, তাকে ‘আশা’ বলাই সমীচীন।

‘ভাইজান, আপনে পারবেন?’ দুর্বল কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো রতন।
‘একশবার পারব ব্যাটা, কী বলিস! তুই খালি কবুল বলবি। নে, আমার মোবাইল নাম্বার রাখ। জিরো ওয়ান…’
‘…ভাইজান, মুবাইল নাই।’
‘ও আচ্ছা। সমস্যা নাই, আমি তোর সাথে যোগাযোগ করবো। দে, ছবিটা আমাকে দে। খোঁজ লাগাতে হবে তো।’
বৃষ্টির শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসছে। রতন শক্ত করে ছবিটা চেপে ধরলো। দু’হাত দিয়ে।
‘হা হা হা… আচ্ছা যা, ছবি লাগবে না। আমি ফোনের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে রাখছি। তুই তো কঠিন রোমিও রে! আগে বুঝি নাই। হা হা হা… ‘

ইশফাক ফ্ল্যাশসহ দু’টো ছবি তুলল। একটা শুধুমাত্র নায়িকার। আরেকটা নায়িকার ছবি হাতে ধরা অবস্থায় রতনের।
‘ভাইজান, পারলে আমার ছবি উনারে দেখায়েন।’
‘কাকে?’
রতন উত্তর না দিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নীচু করলো।
‘হা হা হা! অবশ্যই। কোন চিন্তা করিস না।’
‘দেখায়েন কিন্তু ভাইজান…’
‘শিওর শিওর।’

রাতে খাবার সময় বাড়ির সবার সাথে এই নিয়ে আরেক প্রস্থ হাসি-ঠাট্টা হলো। দেখা গেল রতনের এই নায়িকার গল্প মোটামুটি সবাই জানে। সে সারাক্ষণই এই ছবি পলিথিনে মুড়ে পকেটে নিয়ে ঘোরে, এবং কখনো কারো হাতে দেয় না। একবার বড় রাস্তা ধরে হেঁটে যাবার সময় একদল দুষ্টু ছেলে তার কাছ থেকে এই ছবি কেড়ে নেয়। এর দু’দিন পর রতন যখন জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে, তার মায়ের কাকুতি-মিনতিতে ছেলেগুলো ছবিটা ফেরত দিয়ে দেয়।

‘আইটেম একখান’… মনে মনে বলল ইশফাক। ঢাকায় গিয়ে ফেসবুকে একে নিয়ে পোস্ট দিতে হবে।

৩.

ঢাকায় ফেরার পর রতনের কথা স্বাভাবিকভাবেই ভুলে গেল ইশফাক। এই শহরে বিলাসী চিন্তার সময়-সুযোগ কম। নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে, এবারে পড়ার চাপ শুরু থেকেই অনেক বেশী। তার উপর দু’টো বড় প্রোগ্রাম এ্যারেঞ্জ করতে হবে সামনের মাসে। এতকিছুর মাঝে পল্লীগ্রামের অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের স্মৃতি ধরে রেখে মস্তিষ্ক বাবাজী তার মূল্যবান মেগাবাইট নষ্ট করতে চান না। সময় কোথায়!

গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা শেষ হলো। এ বছরের বর্ষা হলো রাক্ষুসী, সর্বগ্রাসী। সে শুধু পাড় ভেঙে, ঘর ডুবিয়ে ক্ষান্ত হলো না। অনেকগুলো প্রাণ, অনেকগুলো স্বপ্ন ছিনতাই করে তবে সে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বিদায় নিলো।

ইশফাকদের গ্রামেও বন্যা হলো ভালোভাবেই। তবে ওদের বাড়ীটা বেশ উঁচুতে বলে আঁচড় পড়লো না কোন। বন্যা একটু কমবার পর ওরা সপরিবারে গেল গ্রামে ঘুরতে। বাবা বললেন, নিজের চোখে না দেখলে কী করে বুঝবি, এদেশের মানুষ কেমন দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে! সিয়িং ইজ বিলিভিং, মাঝে মাঝে মাটির সাথে মিশে যাবার দরকার আছে, নিজের শেকড়কে ভুলে গেলে চলবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওরা নৌকা করে গ্রাম ঘুরে দেখলো। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ গ্রাম কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, যা হয়েছে তা একেবারে হেলা করবার মত নয়। বাবা চেনাজানা কিছু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে চাল-ডাল-কাপড় এসব বিতরণ করলেন। ব্যবস্থা আগেই করা ছিল।

বাড়ি ফিরে ইশফাক চুপচাপ বারান্দায় বসে রইলো কিছুক্ষণ। ‘কত আরামেই না রয়েছি আমরা’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলো সে। যেসব দরিদ্র গ্রামবাসী ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কী হবে এদের? এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পুকুরধারের জলপাই গাছটার দিকে চোখ পড়লো ওর। সাথে সাথে বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়ে গেল রতনের কথা।

‘চাচী, রতনকে আশেপাশে দেখলাম না এই দু’দিন। কোথায় ও?’
‘আর বোলো না বাবা! বেচারাদের বাড়ী ছিল নদীর পাড় ঘেঁষে। ঘরবাড়ি সব গেছে। ওর মা মারা গেল অসুস্থ হয়ে। চিকিৎসা তো অনেক পরের ব্যাপার, কী রোগ হয়েছে বোঝার আগেই দেখি সে নাই। এই বন্যায় মানুষ নিজেকে নিয়েই বাঁচে না, রতনের মায়ের কী হলো তা কে দেখতে যাবে!’
‘হুঁম…’ ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ইশফাক। সেটা চাচীর চোখ এড়ালো না।
‘মা মারার যাওয়ার দুইদিন পর রতন কোথায় যেন চলে গেছে। আমাদের পাশের বাড়ীর কিসমতের সাথে কথা হয়েছে শুনলাম। তোমার কথাও নাকি বলেছে।‘

এবার ইশফাকের বিস্মিত হবার পালা।
‘আমার কথা? কী বলেছে?’
‘তা তো ঠিক বলতে পারবো না বাবা। কিসমতকে জিজ্ঞাসা করে দেখ না। ও বাড়িতেই আছে বোধহয়।’

ইশফাক একবার ভাবলো ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবে। পরমুহূর্তেই আবার কী ভেবে পাশের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
‘কিসমত, আছো নাকি?’
স্যান্ডো গেঞ্জি পরা দীর্ঘাকৃতির তরুণ কিসমত লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে হাসিমুখে বের হয়ে এলো।
‘ইশফাক ভাই, কী সৌভাগ্য! আসেন আসেন। ভিতরে আইসা বসেন।’
‘নারে ভাই, বসবো না। খেতে ডাকছে বাড়িতে। জাস্ট একটা কথা জানতে এলাম। রতন নাকি আমার কথা কী বলেছে তোমাকে?’

কিসমত শব্দ করে হেসে উঠলো।
‘আরে ভাই! আমি তো ভাবছিলাম এই নিয়া আপনেরে হুদাই ডিস্টাপ দিমু না। পাগল-ছাগলের কাজ-কারবার!’
‘আরে না না বলো।’
‘অর মা মইরা যাওনের পরের দিন অয় বাড়ির সামনে আইসা আমারে ডাক দিলো। আমি কইলাম, কীরে মন বেশী খারাপ? হে কোন কথা না কইয়া পকেট থিকা হের ওই নায়িকার ফটো বাইর কইরা আমার হাতে দিলো। কয় যে ইশফাক ভাইজানরে দিয়েন। আর আমার কথা একটু বইলেন।’
‘বলো কী!’
‘কইলাম না ভাই, পাগল-ছাগলের কাম! আমি জিগাইলাম তর ছবি তুই তর কাছে রাখবি না? হে কয়, ভাই টেকা জমায়া স্টুডিও গিয়া ছবির আরেক কপি করাইছি। ইশফাক ভাইজান মুবাইলে ছবি তুলছিলো, হেইডা মনে কয় ভাইয়ে হারায়া ফালাইছে। নইলে তো ভাই এতদিনে আমারে একটা খবর দিতো। ভাইজান আইলে এই ছবিডা দিয়েন। আমি আবার যহন ফেরত আমু, ভাইজানের লগে দেহা করুম।
আমি হা কইরা তাকায়া জিগাইলাম, তা তুই ম্যালা করলি কই?
বলদায় কয়, ভাই সদরে যাই চাকরী খুঁজুম। চাকরীতে ঢুইক্যা বিয়া করুম। আমি অরে যাইতে নিষেধ করলাম নিষেধ শুনলো না। তা পাগল-ছাগলরে বেশী বুঝায়া ঠ্যাকা কী। যা ব্যাডা তর যেইখানে মন চায় যা। আমার কী!’

ইশফাক চুপ করে শুনলো।
‘ছবিটা আছে?’
‘হে হে হে, আছে ভাই। নিজেও দেখতাম মাঝে মাঝে, চেহারা মাশাল্লাহ ছুইট আছে। খাড়ান দিতেছি আপনেরে।’

৪.

আবার ঢাকা শহর। আবার সেই ধোঁয়া-ধূলা, যানজট, ব্যস্ততা। লেখাপড়া, ক্লাবের প্রোগ্রাম, সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। যান্ত্রিক এই জীবনে কাব্য-উচ্চমার্গ-দর্শনের চর্চা দুষ্কর। করলেও সেটা নিভৃতে, ক্ষণিকের অবসরে, বহুক্ষণ চেপে রাখা নি:শ্বাস একটু ছেড়ে দিয়ে দেহ হালকা করবার প্রয়াসে।

ক্লাস সেরে বাসায় আসতে আসতে রাত হলো সেদিন। বাবার সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিলো ইশফাক।

‘আজকে একটা খারাপ খবর শুনলাম রে ব্যাটা।’
‘কী হয়েছে বাবা?’ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলো ইশফাক।
‘আমার গ্রামের একটা ছেলে ছিল না রতন, একটু অ্যাবনরমাল ধরনের? সদরে গিয়েছিল, চাকরী না কী হাবিজাবি খোঁজার জন্য। সেদিন রাতে বড় রাস্তা ধরে আপন মনে হাঁটছিল। বেখেয়ালে রাস্তার মাঝের দিকে চলে এসেছিল বোধহয়, এক ট্রাক আনকন্ট্রোলড হয়ে ওকে চাপা দিয়ে চলে গেছে। চাপা দিয়েই পগার পার। কেউ ধরতে পারে নি। দেশটা দিন দিন ননসেন্সে ভরে যাচ্ছে। নো ডিসিপ্লিন, নাথিং! এসব অকাল মৃত্যুর দায় কে নেবে? এই যে সমাজের আজ এই দুর্দশা…’

ইশফাক পরের কথাগুলো ঠিক মনোযোগ দিয়ে শুনলো না। চুপ করে ভাত খাওয়া শেষ করে উঠে গেল।

ঘরে এসে ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করল ও।

নীল শাড়ি পড়া বিশ-বাইশ বছরের এক তরুণী। কোমর স্পর্শ করা চুল বাঁধনছাড়া, মৃদু লালচে আভা আছে তাতে। ফর্সা গায়ের রঙ, দু’হাতে নীল চুড়ি, কান পাতলে হয়তো রিনিঝিনি শব্দও শোনা যাবে। কানে বড় বড় দুল। মেয়েটা রাজ্য জয় করা হাসি দিয়ে উপরে একটু কোণার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ভারী মজার কিছু দেখে ফেলেছে। ছবির নীচে ডান কোণায় একটা ফ্যাশন হাউজের নাম লেখা।

এমন সময় ক্লাসমেট আশরাফের ফোন এলো।
‘ইশফাক, দোস্ত! কালকের যে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, কতদূর করেছিস? আমাকে একটু হেল্প করতে পারবি?’

সর্বনাশ! খেয়ালই ছিল না অ্যাসাইনমেন্টের কথা!

তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে ফোন রাখলো ইশফাক। রাত জেগে এই কাটখোট্টা জিনিস শেষ করতে হবে। স্যারটাও এমন কড়া, একবিন্দু ছাড় দেয় না।

ল্যাপটপ অন করে বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করলো ইশফাক।

৪,১৯৭ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।