তাহান……… গ্রেনেডওয়ালা এক বালক।

সন্তোষ শিভান এর মতে বাংলায় ‘তাহান’ এর অর্থ Tolerance অথবা ‘সহ্য’। (যদিও আমি জীবনেও এই বাংলা শব্দ শুনিনি) সন্তোষ শিভান যুদ্ধ বিধ্বস্ত কাশ্মীরের এক বালকের অভিজ্ঞতার একটি মানবিক গল্প বলেছেন ‘তাহান’ সিনেমাতে।
.
কাশ্মীরের এক আকর্ষনীয় পাহাড়ী উপত্যাকায় আট বছরের তাহান, তার বোবা মা, বোন জয়া আর দাদা বাস করে। যখন অনেক ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে দাদা মারা যায় তখন স্থানীয় সূদখোর সামন্তপ্রভু বাড়ির অন্যান্য জিনিসপত্রের সাথে তাহানের প্রিয়বন্ধু পোষা গাধা ‘বীরবল’কেও নিয়ে যায়। বীরবলকে খুঁজতে তাহান পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। নিয়তির নির্মম পরিহাস হলো ওই পাহাড়েই তাহানের বাবা তিন বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলো। বীরবলকে ফিরে পাবার সংগ্রামে তাহান এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। টেররিস্ট কন্সপিরেসীর ফাঁদে পড়ে তাহানকে এক অভাবনীয় ও ভয়ঙ্কর কাজের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। মানুষ আসলেই পাগলের মত ভালোবাসে তাই বোকার মত কিছু কাজ করে ফেলে।(কপিরাইট সানা ভাই) তাহানও তার প্রিয় বন্ধুর জন্য ভালোবাসার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে। আর এভাবেই তাহানের শিহরন জাগানো ‘অপারেশন বীরবল’ এর গল্পটা এগিয়ে যায়।

দ্য গুডঃ

চিত্রনাট্যটা খুব টানটান জমজমাট না হলেও ভালো লেগেছে। তাহানের দাদার গল্পবলা, কাশ্মীরের বাচ্চাদের মিলিট্যান্ট ও ভারতীয় সৈন্য হিসাবে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা কিংবা তাহানের মা এর ‘তাহানের বাবা’র সম্ভাব্য লাশ সনাক্তকরনের মুহূর্তগুলো খুব দারুন লেগেছে। সিনেমার শুরুর দিকে তাহানের সাথে বীরবলের মুহুর্তগুলো ছাড়াও তাহানের দাদা ভিক্টর ব্যানার্জীর দৃশ্যের সংলাপগুলো দারুন। লোকেশন তো ভালো হবেই আর এই জন্যই সিনেমাটা দেখি। বেশী্রভাগ কাশ্মিরী সিনেমা কুলু, মানালী কিংবা সিমলাতে শ্যুটিং হলেও এই সিনেমা আসলেও কাশ্মীরের দারুন কিছু লোকেশনে শ্যুট করা হয়েছে। আর এই কারনেই সিনেমাটোগ্রাফী বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে ভালো লেগেছে।
.
সন্তোষ শিভান এর সিনেমায় ক্যামেরার কাজ ভালো হবে, এটা তো নতুন করে বলার কিছু নাই। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো আসা,রাস্তার পাশের বরফের ধীরে ধীরে গলে যাওয়া, আগুনের ভিতর বরফ গলে পড়া, জমাট বাঁধা লেকের পানিতে আপেলের গড়িয়ে পড়া, কিংবা শ্বেত শুভ্র পাহাড়ী ব্যাকড্রপের ভিতরের সবুজাভ পাথুরে অংশগুলোতে জীবিত করে তুলা সবকিছুই অসাধারন লেগেছে। নিষ্পাপ চেহারার তাহান(পুরব ভান্ডারে), তাহানের মা (সারিকা), তাহানের দাদা (ভিক্টর ব্যানার্জী), জাফর (রাহুল বোস), সুবহান (অনুপম খের), সুবহান এর ভাতিজা(নাম খুঁজে পাচ্ছি না) সবাই এতো দারুন ভাবে সিনেমার সাথে মিশে গেছে যে, কাস্টিং যথার্থ লেগেছে। সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাপার কিন্তু আমার কাছে ক্যামেরার কাজকে মনে হয়নি। আমার কাছে সিনেমার সেরা দিক হলো মূল চরিত্রে তাহান ও তার আশে পাশে সবার দূর্দান্ত অভিনয়। পুরো সিনেমাতে কখনোই মনে হয় নাই যে তাহান অভিনয় করছে। এত সহজ অভিনয় আর বাস্তব অভিব্যাক্তি তাহানকে খুব কাছের মানুষ বানিয়ে দেয়। তাই সিনেমার ক্ল্যাইমেক্সে তাহানের জন্য খুব ভয় লাগতে শুরু করে, বাঁচতে পারবে তো তাহান! তাহান ছাড়া বাকী সবাই খুব ছোট ছোট চরিত্রে কাজ করলেও দারুন করেছে। বিশেষ করে সারিকা ও ভিক্টর ব্যানার্জীর শক্তিশালী অভিনয় হূদয় ছুঁয়ে গেছে। তাহান আর তাহানের গাধাঁ এততাই দারুন করেছে, বলিউডের অনেকেই অভিনয় শিক্ষা নিতে পারে।
.
দ্য ব্যাডঃ
সিনেমার আবহসংগীত কিংবা গান খুবই গড়পরতা মানের। আধুনিক যন্ত্রপাতিতে কিছু ফোক গান ঢুঁকিয়ে দিলে সিনেমাটা আরো মজা লাগতো।সিনেমার ন্যারেশনটা গতিহীনতায় ভুগেছে। (মাত্রই উডি এলেনের সিনেমা দেখেছি তাই বেশী স্লো লাগতে পারে)গল্পে এক ভুতুরে বাড়িতে এক কাশ্মীরি পন্ডিতের কথা বলা হয়েছে। সিনেমার মুল কাহিনীর সাথে তার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাই নাই। কাহিনীতে কিছু ব্যাপার অসম্পূর্ন রেখে দেয়া হয়েছে। যেমন তাহানের বাবার ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়া হলেও ব্যাপারটা শেষ করা হয়নি। তাই সিনেমার শেষে ফিল-গুড ফ্যাক্টরটা পুরোপুরি কাজ করে নাই।

দ্য আগলীঃ
সিনেমাটা মনে হয় একটা রুপক গল্প। যদি তাই হয় তাহলে একটু বেশী রুপক হয়ে গিয়েছে। অনেক কিছুই মাথার উপর দিয়ে গেছে। একেক মানুষ একেকভাবে সিনেমাটা বিশ্লেষন করতে পারে। তাই সিনেমা দেখার পর সন্তোষ শিভান এর সাক্ষাতকার খুঁজে দেখতে হবে যে আসলে উনি কি বলতে চেয়েছেন। কোনো সিনেমা বুঝতে হলে যদি দেখার পর ইন্টারনেট ঘেঁটে পরিচালকের কথা ও পন্ডিতদের সমালোচনা পড়ে সিনেমা বুঝতে হয় তাহলে আমার মতে ওই সিনেমা ভালো হলেও কখনো গ্রেট এর পর্যায়ে যেতে পারে না। পরিচালনা আমার কাছে বেশ সাধারন মনে হয়েছে। কিছু কিছু অতি উৎসাহী সমালোচক সিনেমাতে ইরানী ভাবধারার কথা বলতে গিয়ে সন্তোষ শিভান কে মাজিদ মাজিদী ও আব্বাস কিরোয়াস্তামীর সাথে তুলোনা করে ফেলেছে। শিশু মনঃস্তত্ব নিয়ে ঘটনা আবর্তীত হওয়ার কারনেই এই ভুল মনে হয়। সিনেমার শেষভাগটা বেশ স্লো। কাহিনী বেশ ঝুলে গেছে। অন্যভাবে বলা যায় ক্লাইম্যাক্সের চূঁড়ায় উঠতে পরিচালক বেশ সময় নিয়ে ফেলেছে। সাধারন দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে এই সময়টাতে। আমার মনে হয় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে টার্গেট করে সিনেমা বানানো হলে এইসব সমস্যা তৈরী হয়। আমাদের দেশে তানভীর মোকাম্মেল এর সিনেমাগুলোকে এই রকম মনে হয়। আমি এই ব্যাপারটাকে ‘তানভীর মোকাম্মেল সিন্ড্রম’ নাম দিয়েছি। (ছোট মুখে একটু বড় কথা ফেললাম মনে হয়)

অফটপিকঃ গতবছরের(২০০৮) সিনেমাগুলোতে শিশু অভিনেতারা আমাকে ভীষনভাবে মুগ্ধ করে দিয়েছে। আমিরখানের তারে জামিন পারের ইশান আভাস্তী, ড্যানী বয়েলের স্লামডগের ছোট জামাল, ঋতুপর্ণের ‘খেলা’র পিচ্চিটা(শিশু বুদ্ধ) আর সন্তোষ শিভান এর তাহান। সব পরিচালক শিশুগুলো থেকে দারুন কাজ আদায় করে নিয়েছেন। তাই সবগুলো পরিচালকেই বলতে চাই Kudos!!

২,৪৯১ বার দেখা হয়েছে

২৫ টি মন্তব্য : “তাহান……… গ্রেনেডওয়ালা এক বালক।”

  1. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)

    আপনার রিভিউয়ের পাঙ্খা আমি আগে থেকেই। এতো সুন্দর করে আপনি বিশ্লেষণ করেন যে মনে নতুন কোন প্রশ্নের উদয় হয় না। মনে হয় এর চেয়ে বেশি বা কম হলে হত না।

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    এই ছবি দেখুম না বাতিল, এর চেয়ে কাশ্মীর উপ্রে টুরিষ্টের জন্য কোন ভিডিও ক্লিপ আছে কিনা ওইটা দেখুম।

    জয় হো, জয় হো............। :tuski: :tuski:


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. এখন আর হিন্দী সিনেমা দেখা হয় না খুব একটা।কয়েকজনের রিকমেন্ডেশন পেয়ে লাস্ট দেখেছিলাম 'a Wednesday' আর 'গজিনী' । 'a Wednesday' ভালো লেগেছিলো।
    এটাও যোগাড় করতে পারলে দেখবো।
    আপনারা কেউ বাংলা ছবি নিয়ে লিখেন না ক্যান? বাংলায় তো অনেক ভালো ছবি হচ্ছে এখন, দুই বাংলাতেই। 😀

    জবাব দিন
    • এহসান (৮৯-৯৫)

      প্রথমত দেশী বাংলা সিনেমা আমি এত সহজে এখানে পাই না। দয়া করে কেউ যদি desitorrent এ দেয়, তাহলে দেখি। আহা দেখার ইচ্ছা আছে কিন্তু পাচ্ছি না। 'আমার আছে জল' দেখেছি। আমার দেখা গত দশকের সবচেয়ে বাজে সিনেমা। বইটা আমার এত ভালো লেগেছিলো কিন্তু সিনেমাটা চরম ভুয়া লেগেছে।

      পশ্চিম বাংলার বেশ কিছু সিনেমা দেখেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'শুভ মহরত'। মারাত্মক রকমের ভালো সিনেমা। কিন্তু সিনেমাটা মুছে ফেলেছি। তাই আরেকবার দেখে রিভিও দেয়ার ইচ্ছাটা পুরন হচ্ছে না। এছাড়া অনুরনন, লাস্ট লিয়ার, মোন আমর, দোসর, ও তোমার রিকমেন্ডশনে উৎসব দেখলাম। কোনটাই আহামরি লাগে নাই। ও হ্যা ফেলুদার দুইটা সিনেমা(কৈলাসে কেলেংকারী আর বোম্বাইয়ের বোম্বেটে) দেখেছি। ভালো লেগেছে কিন্তু যতটা না সিনেমার জন্য তারচেয়েও বেশী প্রিয় বইয়ের চিত্রায়ন হিসেবে।

      জবাব দিন
      • আমরা ব্যাচের সবাই কালকে দলবেঁধে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে দেখে আসলাম 'মনপুরা'। মন পুরে নাই, তাই এটা নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে না।
        গানগুলি শোনা থাকলে এ ছবি দেখার আর খুব একটা দরকার নাই।

        অফটপিকঃ 'উৎসব' কিন্তু আমার বেশ ভালো লেগেছিলো । একটা সাধারন গল্প খুব অসাধারন ভাবে বলেছে। সহজ সরল সাবলীল অভিনয়, মেকিং বেশ ভালো (একটু টিপিক্যাল ঋতুপর্নীয় আতলামি আছে)। আর শুরু ও শেষটা দারুন। এরচেয়ে ভালোভাবে এই ছবি শেষ করা যেতো না। 😀
        'শুভ মহরতে'র মতো ক্লাসিক (এটা আমার দেখা সেরা বাংলা থ্রিলার মুভি) না হলেও 'উৎসব' আমি কোনরকম চিন্তা ভাবনা ছাড়াই সবাইকে রিকমেন্ড করবো। 😀

        জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আমি রাহুল বোসের ব্যাপক ফ্যান... :thumbup:
    ওর মতন ভাল অভিনেতা বলিউডে খুব কমই আছে...(ব্যক্তিগ্ত মতামত)... :-B


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।