প্রবাসের ডায়েরি থেকে…(প্রথম খন্ড) – ১

১। লন্ডন থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে অক্সফোর্ডের রাস্তায় মাত্র ২৩ মাইল গেলেই বাকিংহ্যামসায়ারের ছোট্ট একটি শহর বেকন্সফিল্ড। এখানে যুক্তরাজ্যের একটি ভাষা ভিত্তিক সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “ডিফেন্স স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ” অবস্থিত। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দিকে খুব সম্ভবত ১২ ডিসেম্বর, স্কুলের ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ উইং এর ক্লাস রুমে বসে আছি। মাত্র ৩ সপ্তাহ আগে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমে বাংলাদেশ দুতাবাস থেকে পাঠানো মাইক্রোতে করে আমি আর তৌহিদ (CCR) সরাসরি এখানে চলে এসেছিলাম। আসার সময় মাইক্রোর মধ্য থেকে রাস্তা আর দুপাশের সবুজ প্রকৃতি ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখা হয়নি। ও হ্যাঁ, মাঝে ২ টা উইকএন্ডে বেকন্সফিল্ড শহরটা ঘুরে দেখেছি আর একদিন স্কুল থেকে এইচ এস বি সি ব্যাংকে নিয়ে গিয়েছিল একাউন্ট খোলার জন্য। ছোট্ট ছিমছাম একটা শহর। ব্যস্ততা নেই, নেই হৈ চৈ, চিৎকার। আমার খুব ভাল লেগেছিল শহরটা।

সকাল থেকেই মনটা খুব খারাপ। আজ কোর্সের শেষ দিন। সার্টিফিকেট দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতাও শেষ। ৩ সপ্তাহের ছুটি শুরু আজ থেকে। সবাই একে একে চলে যাচ্ছে অথবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু আমি আর তৌহিদ এখনও জানি না কোথায় যাব। সকাল থেকে ৬-৭ বার ফোন করলাম ব্রিগেডিয়ার জাকারিয়া (তৎকালীন ডিফেন্স অ্যাটাচি) স্যারকে কিন্তু পাচ্ছিলাম না। এর মাঝে আমাদের কোর্স ও আই সি এসে জিজ্ঞাসা করেছে আমরা কোথায় যাচ্ছি। সব কিছু শুনে বললেন, “তোমরা আজ রাত এখানেই থেকে যাও। কাল সকালে দেখ কি করতে পার”। এর কিছুক্ষন পরেই একজন অফিস সহকারী এসে জানালো, একটা ফোন এসেছে বাংলাদেশ দুতাবাস থেকে। আমাদের মনে স্বস্তি ফিরে এলো। জাকারিয়া স্যার জানালেন, “তোমাদের জন্য বাংলাদেশ সেন্টারে ২ টা সিট বুকিং দেওয়া আছে, তোমরা ওখানে যাও। ওখানে রেন্ট খুব কম, মাত্র ১৫ পাউন্ড/দিন। রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে”। ঠিকানা আর কিভাবে যেতে হবে জেনে আমরা সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ওভারকোর্ট গায়ে জড়িয়ে রেলস্টেশনের দিকে রওনা হলাম।

২। বেকন্সফিল্ড রেলস্টেশন। আমি আর তৌহিদ ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। একটা অজানা অনুভুতি হচ্ছে। দিনটা ছিল শুক্রবার, উইকএন্ড এর শুরু। স্টেশনে যাত্রীও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশিই ছিল। ট্রেন আসল ঠিক সময়েই। উঠে পড়লাম, কিন্তু বসার জায়গা পেলাম না। মাত্র ২৭ মিনিটের পথ। চলে আসলাম লন্ডনের মারিলিবোর্ন স্টেশনে। নোটবুক বের করে দুইজন মিলে মনযোগ দিয়ে দেখছি, এরপর কিভাবে যেতে হবে। আমি তৌহিদকে বললাম, “চল, এতো ঝামেলা না করে প্রথমদিন একটা ট্যাক্সি নিয়েই চলে যায়”। যেই কথা, সেই কাজ। উঠে পড়লাম একটা ট্যাক্সিতে। একটু পরেই বুঝতে পারলাম যে, এটাই আমাদের শেষবারের মত ট্যাক্সিতে চড়া। মারিলিবোর্ন স্টেশন থেকে নটিং হিল গেট খুব বেশি দূরে না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম। ২৪ নম্বর বাসা অর্থাৎ “বাংলাদেশ সেন্টার” খুজে পেতে একটু সময় লাগলো, কারন আমরা ভেবেছিলাম হয়তো বাসার সামনে “বাংলাদেশ সেন্টার” বা এ জাতীয় কিছু লেখা থাকবে। কিন্তু কিছুই লেখা ছিল না। “বাংলাদেশ সেন্টার” এর অফিস রুমে বেশ কিছু সময় ব্যায় করতে হল, কারন এতো পিচ্চি পিচ্চি দুটো ছেলেকে দেখে ম্যানেজার রীতিমত থতমত খেয়ে গেছে। অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর এবং আমাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের কে ৩ জনের একটা রুমে ২ টা সিট দেওয়া হল (৩য় সিটটি ফাঁকা ছিল)। থাকার ব্যবস্থা হল, খাওয়ার চিন্তা শুরু হল। তখন রাত ৯ টার বেশি বাজে। আমরা ২ জন ঠিক করলাম আজ রাতে আশেপাশের কোন রেস্টুরেন্টে খেয়ে আশে পাশের জায়গা গুলোও দেখে আসবো। লন্ডন সম্পর্কে কোন ধরনের আইডিয়াই ছিল না আমাদের। নটিং হিল গেট যে একেবারে সেন্ট্রাল লন্ডনের ভিতরে পড়ে, সেটাও আমরা জানতাম না। যাই হোক, দেখে শুনে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে বসলাম। ওয়েটার মেনু কার্ড দিয়ে গেলো। সব মেনুর উপর দিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তারপর চোখে সরিষার ফুল ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না। কি আর করা। বসে যখন পড়েছি কিছু তো খেতেই হবে। নাগালের মধ্যে কিছু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটা চিকেনকারী আর ২ টা বনরুটি দিয়েই ডিনার শেষ করলাম এবং ১৮ পাউন্ড বিল দিয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, আগামী এক সপ্তাহ অনশন করতে হবে। ওয়েটার একবার জানতে চেয়েছিল ড্রিঙ্কস লাগবে কিনা। তাকে সুন্দর করে একটা ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে নিশ্চুপ লন্ডনের রাস্তায় এলোমেলো হাটাহাটি করলাম কিছুক্ষন। লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে। লন্ডনের নাইট বাস গুলো চলতে শুরু করেছে। কয়েকটা বারের সামনে একটু ভীড় দেখা গেল। রাত সাড়ে ১১ টা বেজে গেছে প্রায়। কিছু খাবারের দোকান, কয়েকটা গ্রোসারি সপ আর বার গুলো ছাড়া সবই বন্ধ হয়ে গেছে। একটা গ্রোসারি সপ থেকে আমরা ৮০ পেন্স দিয়ে একটা বড় পাউরুটির প্যাকেট আর খুব সম্ভবত ১/২ পাউন্ড দিয়ে এক কৌটা জেলি (আগামীকালের সারাদিনের খাবার) কিনে অত্যন্ত খুশি মনে রুমে ফিরলাম। রাতে সুন্দর একটা ঘুম হল।

৩। সকালের দিকে হাটতে হাটতে চলে আসলাম হাইড পার্কে। নটিং হিল গেট থেকে বেশি দূরে নয় পার্কটি। অনেক বড়। এতো বড় একটা পার্ক সেন্ট্রাল লন্ডনের ভিতরে থাকতে পারে আগে কল্পনায় করি নি। দিনের তাপমাত্রা মনে হয় -২ অথবা -৩ ডিগ্রী হবে, কিন্তু সূর্যের আলো ঝিকমিক করছে। এধরনের আবহাওয়া বেশ ভালোই লাগছিল। বেকন্সফিল্ডে এর চেয়ে বেশি ঠান্ডা ছিল। মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। চারিদিকে ঘুরে ফিরে পার্কের মাঝামাঝি জায়গায় এসে গোলাকার কৃত্রিম একটি পুকুরের পাশে বেঞ্চের উপর দুইজন বসে থাকলাম। পুকুরের মাঝে বড় বড় সাদা হাস খেলা করছে। পিছন দিক থেকে একটি নারী কন্ঠ ভেসে আসলো, “এক্সকিউজ মি”। পিছনে তাকিয়ে দেখি একজন জ্বলজ্যান্ত তরুনী খুব উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে আর একটু পেছনে দাড়িয়ে থাকা অপর একটি তরুনীকে দেখিয়ে মেয়েটি আবার বলল, “মাই ফ্রেন্ড ওয়ান্টস টু টক টু ইউ”।
তৌহিদঃ মি?
আগন্তুকঃ ইয়েস। ইউ লুক সো কিউট। আর ইউ নিউ হেয়ার?
তৌহিদঃ সরি আই ক্যান্ট টক নাও।
পাশ থেকে আমি বললাম, “যা না একবার দেখা করে আয়। সবাই তো আর তোর মত কিউট না। সবার ভাগ্যে কি জোটে”?
মেয়েটা চলে গেলো, আর সাথে সাথে আমরা দুইজন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।

চলবে……………

২,৯২১ বার দেখা হয়েছে

৩৩ টি মন্তব্য : “প্রবাসের ডায়েরি থেকে…(প্রথম খন্ড) – ১”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    হাসান ভাই,স্যান্ডহার্স্ট মিলিটারি একাডেমি নিয়ে আমার প্রচন্ড কৌতুহল।এই একডেমি এবং ব্রিটিশ ট্রেনিং নিয়ে যদি এখানে বা আলাদা করে ব্লগ দেন তাহলে মনে হয় সবাই খুব পছন্দ করবে।সময় করে একটু দেখেন না বস...

    জবাব দিন
    • মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

      তোমার কথাটা মাথায় আছে। তবে ছুটির অংশটা আগে শেষ করে নিই......।। আর ট্রেনিং এর কাহিনি কি আসলেই ভালো লাগবে?? ঠিক আছে আমি ভালো লাগার মত অংশ টুকু আলাদা করে আনার চেষ্টা করব।

      জবাব দিন
      • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

        ট্রেনিঙ্গের কাহিনী অবশ্যই ভাল লাগবে।বাংলাদেশের আমার অতি পরিচিত কিছু মানুষ -আব্বা-চাচাদের কাছে সেই ছোটবেলা থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর স্যান্ডহার্স্ট মিলিটারি একাডেমির প্রোডাক্ট চৌকস জেনারেলদের রণনৈপুন্য নিয়ে এত্ত এত্ত গল্প শুনেছি- সেই একাডেমিতে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন-আমার জন্য তো এইটা এক্কেবারে "লিসেনিং ফ্রম দা হর্সেস মাউথ" এর মত আকর্ষনীয়।আমি নিশ্চিত ব্লগে অনেকেরই দারুন মজা লাগবে।আমাদের ৫৩ এর হাসিব বলত ওখানে নাকি ক্যাডেটরা প্লাটুন কমান্ডারদের গার্লফ্রেন্ডদের সাথে টাংকি মারে এতটাই ফ্রি-এইটা সত্যি না চাপাবাজি তাও জানা যাবে :grr:

        জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আর লেখা জটিল হইছে মামু...আল্লাহ ই জানে তৌহিদ ভাইয়ের নামে কি চালায়া দিলেন...
    অ ট;আফারা কি নিশিকইন্যা ছিলেন না তো?শুনছি সোহো এলাকায় উনারা এমনে শিকার ধরেন... 🙁

    জবাব দিন
  3. জুবায়ের অর্ণব (৯৮-০৪)

    বাকিংহ্যামশায়ার আমার খুবই প্রিয় একটা কাউন্টি। বেকন্সফিল্ড থাকেন আপনারা, এটা কি চিলটার্ন রেইলে পড়ে? বোর্ন এন্ড, মার্লো এর নাম শুনে থাকবেন হয়তো। বোর্ন এন্ড যেটা স্লাও আর হাই উইকম্বের ঠিক মাঝামাঝি, পড়ে ফার্স্ট গ্রেইট ওয়েস্টার্ন রেইলে, আমি ওখানে একটা পাবে কাজ করতাম। হয়তো দেখেও থাকবেন যেহেতু ৬ বছর আছেন আর পুরো বোর্ন এন্ড গ্রামে পাব আছেই মাত্র দুটি, হার্ট ইন হ্যান্ড নাম। খুবই ভালো সময় কেটেছে ঐ সময়। গ্রাম যে এত এত সুন্দর হতে পারে আগে ধারণা করিনি কখনো।

    জবাব দিন
    • মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

      আমি বেকন্সফিল্ডে মাত্র ৩ সপ্তাহই ছিলাম। এরপর ৩ সপ্তাহ ছুটি কাটিয়ে চলে যাই কেমবার্লি। ওখানে ছিলাম ১ বছর। তারপর বাংলাদেশ। তাই বেকন্সফিল্ড সম্পর্কে আমি বলার মত এর চেয়ে বেশি আর তেমন কিছু জানিনা। অবে শহরটা আমার কাছে খুবই সুন্দর লেগেছিল। ছিমছাম, সাজানো আর পরিপাটি।
      শুনে ভাল লাগলো যে, তুমিও ঐ এলাকায় ছিলে। এখন কোথায় আছো তুমি......??

      জবাব দিন
  4. রায়হান রশিদ (৮৬ - ৯০)

    এত কাছে থেকে তোমরা ঘুরে গেছো শুনে আফসোস হচ্ছে। আগে জানা থাকলে আমাদের এখান থেকেও ঘুরে যেতে পারতে। আমরা থাকি অক্সফোর্ডে। আর বাকিংহ্যামেও প্রতি সপ্তাহেই যাওয়া হয় আমার। যাকগে, তোমাদের বন্ধুদের কেউ ভবিষ্যতে আসলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে বোলো। একটা ইমেইল দিলেই চলবে: rayhan[dot]rashid[at]gmail[dot]com
    বেশ আড্ডা দেয়া যাবে আর অক্সফোর্ডের আশেপাশের সব গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়ানো যাবে।

    জবাব দিন
    • মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

      তৌফিক তোর গল্পটা পড়ে ভাল লাগলো।
      আবার মনে পড়ে গেলো সেই দিনগুলির কথা......।। কোন মেয়ে যদি জিজ্ঞাসা করে,

      "ক্যান আই গেট এ লাইটার প্লিজ"?
      অথবা
      "ডু ইউ হ্যাব সাম চেঞ্জ"?

      তাহলে বুঝতে হবে সে অফার করছে। আমার নিজেরও এই ধরনের একটা অভিজ্ঞতা আছে। পরে কোন এক সময় বলবো।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।