আমাদের “সত্য” স্যার

“তারপর কী হল শোন, সেই ক্যাডেটকে খুঁজে পাওয়া গেল টয়লেটের মধ্যে । হাতে হুমায়ূন আহমেদ এর বই। ভাঙা দরজার সামনে যখন প্রিন্সিপাল দাঁড়িয়ে আছে তখনো তার চেতন নেই। এঁকেই বলে বইয়ের পোকা। ভাঁবা যায় টানা তিন দিন একটা ক্যাডেট বই পড়ে টয়লেটে কাঁটিয়ে দিয়েছে।” সত্য স্যারের গল্প শুনে কেউ অবাক হলনা। কারন মোটামুটি সবাই জানে স্যারের কথার অধিকাংশই মিথ্যে। ক্যাডেট কলেজের ভাষায় যার নাম গুল। নাম সত্য হলেও স্যারের কাজ মিথ্যে বলা। সময়ে অসময়ে হাবিজাবি একরাশ গাঁজাখুরী গল্পকে ক্যাডেট দের সামনে উপস্থাপন করা। ক্যাডেটদের অবশ্য একদিক থেকে সুবিধাই হয়। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস এর ত্রিশ মিনিট ই চলে যায় গল্প করে। ;;) স্যারের বিষয় অর্থনীতি। তবে তিনি কখনো তার সাবজেক্টের ধারে কাছেও যাননা। তার মতে অর্থনীতি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বোরিং সাবজেক্ট। টাকা পয়সার হিসেবের মধ্যে গুল মারা যায়না। তবে ইতোমধ্যে তিনি দুটো বই লিখে ফেলেছেন। বই এর অধিকাংশ অধ্যায় ই কাকতালীয় ভাবে অন্য লেখকের বইয়ের সাথে মিলে গিয়েছে। 😛 এই নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। কারন একজন লেখক তার নামে মামলা করেছেন।জনৈক ক্যাডেটের পিতা বরিশাল শহরের বিখ্যাত ল ইয়ার। তিনি বাধ্য হয়ে তাঁর স্মরনাপন্ন হয়েছেন। তবে লাভ হবে বলে মনে হচ্ছেনা। স্যারের এই সব কু কীর্তি আবার একাদশ শ্রেনীর মুস্তাকীম ভালো জানে। এই জন্যে মুস্তাকীম এর প্রতি তার বিশেষ নজর। বাসা থেকে প্রায়ই গোপনে মুস্তাকীমকে খাবার দিয়ে যান। আর মুস্তাকীম সেই খাবার খেয়ে দিব্যি আরামে সবার কাছে স্যারের কুকীর্তি ফাঁস করে দেয়। 😉 গল্প শেষে ক্যাডেট দের মধ্যে কানাকানি দেখা যায়। একজন তো বলেই ফেলল,স্যার টানা তিন দিন একটা ক্যাডেট কী ভাবে টয়লেটে কাটায়? তিন দিনের মধ্যে তো অনেকবার প্যারেড স্টেট কাউন্ট করা হয়েছে।ধরা পড়েনি? স্যার কিছুটা বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হলেন। তিনি ভেবে নিয়েছেন কেউ এই প্রশ্ন করবেনা। কিছুক্ষন ভেবে তিনি বললেন, আরে ওটাতো অ্যথলেটিক্সের টাইম ছিল। বুঁজতা হ্যাঁয়? আচমকা ঘাবড়ে গেলে কিংবা চমকিত হলে তাঁর কথায় চন্দ্রবিন্দুর প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। ক্যাডেট কোন উত্তর দেয়ার আগেই ক্লাসে প্রিন্সিপাল স্যার ঢুকলেন। সত্য স্যার কোন ভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,সাঁলাম স্যাঁর।প্রিন্সিপাল স্যার আর্মি মানুষ। ক্লাসে গল্প একদম পছন্দ করেন না। তিনি রাগী গলায় বললেন, Mr.Shotto,whatz happenning there? সত্য স্যার ঢোক গিলে বললেন, class sir,economics sir. প্রিন্সিপাল স্যার কঠোর গলায় বললেন,OK meet me after the class. সত্য স্যার নার্ভাস কন্ঠে বললেন, ওকে স্যার। সাঁলাম স্যাঁর। প্রিন্সিপাল চলে গেলে তিনি ক্যাডেট দের দিকে হতাশ গলায় তাকিয়ে বললেন, প্রিন্সিপাল স্যার লোক ভালো। অফিসে গেলে চা কিংবা কফি খাওয়ায়। ক্যাডেটদের মধ্যে চাপা হাসির রোল পড়ে গেল। স্যার তার চালাকী হাসি দিয়ে বলল, ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫, লাল হাউস। সাবধান। :gulli2: স্যারের আরেকটা অভ্যাস তিনি কোন ক্যাডেটের নাম ধরে ঢাকেননা। সবার ক্যাডেট নম্বর মুখস্ত। এক্ষেত্রে তিনি একটি ডায়রি ব্যবহার করেন। যেখানে সবার নাম থাকে। সাথে ক্যাডেট নম্বর। আর স্যারের ব্লাক লিস্টে যেসব ক্যাডেট থাকে তাঁদের ক্যাডেট নম্বর বেশি মুখস্ত থাকে। সে হিসেবে নবম শ্রেনীর ১৪১৫ ক্যাডেট নম্বরটা একটু প্রিয়। প্রিয় এই অর্থে এই ক্যাডেট স্যারের সব গাঁজাখুরি গল্পে বাম হাত ঢুকায় । ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ চুপ করে রইল। কোনমতে হাসি কন্ট্রোল করে বলল,ওকে স্যার। এর মধ্যে ক্লাশ শেষের ঘন্টা পড়লো। স্যার তাঁর বিখ্যাত হাঁটা দিয়ে ক্লাস থেকে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বললেন, আগামি ক্লাসে তোমাদের মজার একটা গল্প বলবো। রেডি থেকো।

আজকের লাঞ্চ টাইমে একটু গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। ম্যানু ছিল মুরগীর মাংস কিন্তু অজ্ঞাত কারনে ডিম দেয়া হয়েছে। ডিম মুরগী থেকে এলেও কেউই মাংস বাদ দিয়ে ডিম খাবেনা। ক্লাস টুয়েলভের মধ্যে চাপা উত্তেজনা। সবার এইচ এস সি পরীক্ষা চলছে। এই মুহূর্তে ভালোমন্দ খেতে মন চায়। এই ভয়াবহ অবস্থায় একদিন তৃপ্তির সাথে মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারাটা বিশাল ব্যাপার। ক্লাস টুয়েলভ কিছুদিন পর কলেজ থেকে চলে যাবে। সবার মধ্যে ড্যাম কেয়ার টাইপ ভাব। সেকেন্ড হাই টেবিলে তখন চলছে স্যারদের বিদায়ী বীট। কোন স্যার একটু বেশি বুঝলেই ক্যাডেটদের প্রিয় যন্ত্রসংগীত অথাত্‍ কাঁটা চামচ আর ফাঁকা গ্লাসের মিশ্রনে তৈরি অপূর্ব শব্দের মুখোমুখি হতে হয়। একটু আগেই প্রিন্সিপাল অফিস থেকে ঝাড়ি খেয়ে আসা সত্য স্যার বিমর্ষ মুখে ডায়নিং এ ঢুকে পড়লেন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে।ক্লাস টুয়েলভ ক্ষেপে যাওয়া মানে দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত। এরকম যুদ্ধের পরিস্থিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি জনগনকে থামানোর চেষ্টা করেন। সে হিসেবে কলেজের রাষ্ট্রপতি প্রিন্সিপাল স্যার আর প্রধানমন্ত্রী অ্যডজুটেন্ট। কিন্তু একটু আগে প্রিন্সিপালের কাছ থেকে ঝাড়ি খেয়ে নিতান্তই গো বেচারা হয়ে পড়লেন সত্য স্যার। আর অ্যডজুটেন্টকে তিনি বিশেষ কারনে ভয় পান। স্যারের অসহায় অবস্থা দেখে ডায়নিং হল প্রিফেক্ট মুমতাহীন উঠে এল। বেচার নম্র ভদ্র টাইপ ছেলে। ঝামেলা টামেলা পছন্দ হয়না।তিনি কর্কশ কন্ঠে যুদ্ধের পরিস্থিতি থামানোর অব্যর্থ চেষ্টা করছেন। এরমধ্যে বিক্ষুদ্ধ জনতা পেছন থেকে মুরগী মুরগী বলে চিত্‍কার চেঁচামেচি করা শুরু করল। ভয়াবহ অবস্থায় সব সময় নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হয়। আজ সত্য স্যারের দিনটাই খারাপ। ডায়নিংহল প্রিফেক্ট একা পরিস্থিতি সামলাতে পারছেনা দেখে অনিচ্ছা সত্তেও কলেজ প্রিফেক্ট মিশকাত উঠে এল। ডিম আর ডাল দিয়ে খুব মজা করেই ভাত মাখিয়ে নিয়েছিল। হঠাত্‍ স্যারের অসহায় চোখে চোখ পড়ায় না উঠে পারলোনা। মিশকাত রাশভারী মানুষ। চিল্লাপাল্লা কম করে। ইদানিং রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রেমে পড়েছে বিধায় প্রায়শই উদাসীন ভাব নিয়ে চলে। টুকটাক কবিতা লেখাও শুরু করেছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা দিয়েছে। মিশকাত সাহেব ডায়নিং হল এর মাঝে এসে বললেন, FOR GOD SAKE,IF U AGAIN UTTER D WORD MURGI,THEN I WILL JUST ENTER ALL D EGGS FROM UR BACKSIDE… 😀 😀
মিশকাত এর কথায় কাজ হলো। ডায়নিং এ পিনপতন নীরবতা। সেকেন্ড ডায়নিং হলে তখনো বির্তকের ঝড় চলছে। এরা হচ্ছে প্রতিবাদী বিরোধী দল। কোন একটা ইস্যু পেলেই হরতাল ডেকে বসে। স্যার একটু চিন্তামুক্ত হলেন। তিনি চাপা গলায় বললেন,যাঁও তোমরা খেতে যাও। আমি দেখছি। মিশকাত খুশী হলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো লাঞ্চ শেষ হতে পাঁচ মিনিট বাকী। পাঁচ মিনিটে তিন প্লেট ভাত খেতে হবে। মিশকাত ফাস্ট হাই টেবিলের দিকে দ্রুত হাঁটা শুরু করলো। ক্যাডেটদের কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। ::salute::

নবম শ্রেনীর ক্লাসে ঢুকে সত্য স্যার কিছুটা অবাক হলো। বোর্ডে হাবিজাবি কিছু একটা লেখা। স্যার তার মর্ম উদ্ধার করতে পারলোনা। ইদানিং তাঁর দিনকাল বেশ খারাপ যাচ্ছে। সবসময় একটা দ্বিধায় ভোগেন। সব ক্যাডেটরা মনে হয় তাকে পেছনে পেছনে খুব ক্রিটিসাইজ করে। ঘটনা সত্যি হলেও তিনি নিজেকে কলেজের সবচেয়ে বুদ্ধিমান দাবী করেন। কয়েকদিন আগে জনৈক ক্যাডেটকে পরীক্ষা হল থেকে হাতে নাতে নকল সহ ধরেছেন। আহামরি কিছু না। সপ্তম শ্রেনীর আর্টস এন্ড ক্রাফটস পরীক্ষায় ক্যাডেটটি শক্ত কাগজে গরু কেঁটে এনে পরীক্ষা হলে নকল করছিল। স্যার বেচারাকে ধরার পর তাকে ডায়লগ দিয়েছিল,আঁমার মত বুদ্ধিমান এই কলেজে নাই। বেচারা সপ্তম মানের ক্যাডেট ভয়ে ভয়ে বলল, জ্বীঁ স্যাঁর…
ক্যাডেটের অনুকরনটা অনেকটাই স্যারের মত হওয়া বিধায় তিনি ভাবলেন সপ্তম মানের ক্যাডেটরাও তাঁকে টিজ করে। বেচারা কোথায় আছেন। মেজাজ খারাপ হওয়ার মত পরপর কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথমত কেউ তার কথার উত্তর দিচ্ছেনা। দ্বিতীয়ত ক্লাসের এক তৃতীয়াংশ ক্যাডেট নেই। টয়লেট লিডিং এ গল্প করছে। স্যার ক্ষেপে গেলেন। ফর্মলীডার কে বললেন,এক মিনিটের মধ্যে সবাইকে ডেকে নিয়ে আসো যাও। এরপর তিনি রাগী কন্ঠে বললেন, কেঁ কেঁ লিখেছে এঁটা? কিঁ লিখেছে?
অবস্থা খারাপ দেখে পেছন থেকে রেদোয়ানুল বলল,স্যার এটা প্লাস্টিকের সংকেত। স্যার চাপা গলায় বললেন,কেঁ লিখেছে? ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ বলল স্যার আমি। রেদোয়ানুল সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলল,স্যার এটা প্লাস্টিকের সংকেত। ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ এর কথা শুনে স্যার আরো ক্ষেপে গেলেন। এই ছেলেটা তার পেছনে লেগেছে অনেক আগ থেকেই। সেদিন স্যার ক্লাসে বলতেছে, উনি যখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ছিলেন তখন নাকি দেখেছেন সাংগু গ্যাস ফিল্ডের আলোয় ক্যাডেটরা লাইটস অফের পর লেখাপড়া করে। তার এই গুল মারার পর ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ বলেছিল, জ্বী স্যার কথা সত্য। আমার এক আত্মীয় এর বাসা গ্যাসফিল্ডের কাছে। তাদের বাসায় কোন ইলেকট্রিক বাল্ব নেই। ঐ গ্যাস ফিল্ডের আলোতেই কাজ হয়। ক্লাসের সবাই এক সাথে হেসে ফেললে তিনি বুঝতে পারেন আসলে তিনি ছোট খাট একটা বীট খেয়েছেন। আজ বেচারাকে তিনি বাগে পেয়েছেন। তার রাগ আরো বেড়ে গেল। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল, আমারে প্লাস্টিকের সংকেত চিনাও? আমার ইন্টারে সায়েন্স ছিল। ফর্মলীডারকে নির্দেশ দিলেন বাইরে থেকে লাঠি নিয়ে আসতে। ফর্মলীডার কয়েক বার খালি হাতে ফিরে এলে স্যার নিজেই বাইরে থেকে রঙ্গন গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে এলেন। ক্যাডেটদের মারার নিয়ম নেই। কিন্তু এই প্রথম তিনি পুরো রঙ্গন গাছের ডালটা ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ এর হাতে পিঠে এবং হ্যান্ডস ডাউন করিয়ে হিপে ভাঙলেন। :brick: ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ চুপ করে সহ্য করল। স্যার চলে গেলে ক্লাসের বাকী সবাই এসে জিজ্ঞেস করল,দোস্ত বেশি ব্যথা পাইছোস?
কেউ কেউ পানি নিয়ে এল। ক্যাডেটরা আসলেই একটু বেশি ভালো। 😡 একজনের বিপদে সবাই এগিয়ে আসে। ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ মলিন হাসি দিয়ে বলল, ধূর এই মাইরে ক্যাডেটদের কিছু
হয়না।

ক্লাশ টুয়েলভের সাথে সত্য স্যারের বিশেষ মিটিং চলছে। এই সব মিটিং ফিটিং এ সাধারনত প্রিফেক্টরাই অংশ নেয়। নরমাল ক্যাডেটরা অই টাইমটা ঘুমিয়ে কাটায়। আজকের মিটিং এর বিষয় ক্লাশ টুয়েলভের ফেয়ারওয়েল ডিনারে কী ম্যানু থাকবে। সত্য স্যার প্রথমেই জানিয়ে দিলেন মুরগী খাওয়ানো যাবেনা। কারন চারিদিকে SWINE FLUE এর ছড়াছড়ি। কথাটা শুনে সবাই বেশ মর্মাহত হল। তিন হাউস প্রিফেক্ট মইনুল জিন্নাহ আর আহসান মুখ চাওয়াচুয়ি করলো। এর মধ্যে শোভন বলল,স্যার এইটা হবেনা। মানবো না। ফেয়ার ওয়েল ডিনারে মুরগী থাকবেনা এইটা ক্যামন কথা। সত্য স্যার শোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন,বলছিনা একবার। মুরগী খাওয়াতে পারবোনা। শোভনকে ধমক দেয়াটা মোস্তফা মানতে পারলোনা। সেকেন্ড হাই টেবিলে পাশাপাশি বসার কারনে দুজনের সম্পর্ক বেশ ভালো। মোস্তফা বলল, স্যার ক্যাডেটরা বিষ খেয়ে হজম করতে পারে। সেইখানে সোয়াইন ফ্লু টুলু কিছুই না । আপনি মুরগী না খাওয়ালে খবর আছে। আসি স্যাঁর, সাঁলাম স্যাঁর। স্যারের ভঙ্গী নকল করে মোস্তফা চলে গেল। স্যারের শুধু হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা। ক্লাস টুয়েলভ থেকে সেভেন পর্যন্ত তাঁকে বীট দেয়। আজিব কপাল তার। 😕

সত্য স্যারের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে কাল রাতে। নাইট ডিউটি মাস্টারের রুমে বাইরে থেকে কেউ তালা মেরেছে। স্যার ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে প্রথমে বেশ অবাক হল। রুমের দরজা খুলছেনা। প্রথমে বেশ ভয় পেল। স্যার ভূতে বিশ্বাসী। নিশ্চই এটা ভূতুরে কারবার। কিন্তু কিছুক্ষন পর হাউসবেয়ারা হক ভাই এসে ব্যাপারটা ধরতে পারলেন। তিনি বাইরে থেকে বললেন,স্যার দরজা তো তালা মারা। অচেনা তালা। চাবী তো আমার কাছে নাই। স্যার ভয়ে নার্ভাস হয়ে গেল। কারন একটু পরেই ক্যাডেটরা পিটিতে নামবে। কলেজের সবাই জেনে যাবে তাদের বিশিষ্ট গুলবাজ সত্য স্যার অজ্ঞাত ক্যাডেটদের হাতে তালা বন্দী। মান সম্মানের ব্যপার। স্যার হতাশ কন্ঠে বলল, অই আমারে বাইর কর। হকের বাচ্চা ক্যাডেটরা দেখার আগে তালা ভাঙ। নাহলে তোর মাথায় আমি তালা ভাঙমু।
:boss: :boss: :boss:
তালা ভাঙার শব্দে কিছু ক্যাডেটের ঘুম ভেঙে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সব ক্যাডেট জেনে গেল তাদের প্রিয় সত্য স্যার তালা বন্দী। নিউজ অফ দ্য বরিশাল ক্যাডেট কলেজ তখন স্যারের তালা মারার ঘটনা। এসব খবর বাতাসের আগে ছড়ায়। খবর শুনে প্রিন্সিপাল মর্মাহত হলেন। তিনি বিশেষ শোক প্রকাশ করলেন। কলেজের সি এস এমের দেয়া এক তথ্য বিবরনীতে জানা গেল, অ্যডজুটেন্ট মেজর আলম ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আট চল্লিশ ঘন্টার মধ্যে দোষী ক্যাডেটকে খুঁজে বের করে যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। পুরো বিসিসি জুড়ে নেমে এল এক থমথমে অবস্থা। ক্লাস টুয়েলভ এর মধ্যে তখন চাপা উত্তেজনা। কলেজ অথরিটির ও বিশেষ নজর ক্লাস টুয়েলভ এর দিকে। এসব কাজ টুয়েলভ ছাড়া কেউ করার সাহস পায়না। আর যে করেছে ধরা পড়লে নিশ্চিত কলেজ থেকে বের করে দেয়া হবে। ক্লাস টুয়েলভ তখন নিজেরাও হতভম্ব। কারন তাঁদের কেউই এই কার্যটি সম্পাদন করেনি। কলেজ প্রিফেক্ট মিশকাতের ডাক পড়লো অ্যডজুটেন্ট অফিসে। সাথে তিন হাউস প্রিফেক্ট। অ্যডজুটেন্টের সন্দেহভাজন ক্যাডেটদের তালিকায় ছিল ওবায়েদ ঝুমন আর রাসেলের নাম। তিনি মোটামুটি ধরে নিলেন এই কাজ এরা ছাড়া কেউ করতে পারেনা। এদিকে ঘটনার আকস্মিকতায় মোটামুটি সবাই অবাক। সত্য স্যার অ্যডজুটেন্ট স্যারকে তার নিজের সন্দেহভাজন ক্যাডেটদের নাম দিল। আরো দুটো নাম যুক্ত হল সন্দেহভাজন দের তালিকায়। এরা হল শোভন ও মোস্তফা। আর যাই হোক মুরগী নিয়ে ঘটনার কথা সত্য স্যার এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবেন তা হয়না। সত্য স্যারের সন্দেহের তীর এবার ছুটল সদ্য নবম শ্রেনীতে ওঠা নাদান ক্যাডেট, ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ এর দিকে। কোন এক পড়ন্ত বিকেলে সেই ক্যাডেটকে তিনি লিখতে বললেন দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে একটি স্টেটমেন্ট। নবম শ্রেনীর সেই ক্যাডেটটির বুক তখন দুরুদুরু কাঁপছে কলেজ আউটের ভয়ে।
:frontroll: :frontroll: :frontroll:

পরের ঘটনাগুলো ঘটল খুব দ্রুত। ক্যাডেট নম্বর ১৪১৫ এর স্টেটমেন্ট লেখা লাগলোনা। তাকে সাহায্য করল একাদশ শ্রেনীর স্যারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ক্যাডেট মুস্তাকীম। অনেক ভেবে স্যার নিজেও বুঝলেন নবম শ্রেনীর কেউ এ কাজ করার সাহস পাবেনা। অ্যডজুটেন্ট আলম সাহেব তাঁর নিজের সন্দেহভাজন নাম তিনটিও কেঁটে ফেললেন। বাকী রইল দুজন। অবশেষে শোভন ও মোস্তফাকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। নিরপরাধ এই ক্যাডেট দুটিকে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত অ্যডজুটেন্ট অফিসের সামনে একরাশ ক্ষোভ অভিমান আর কৌতূহল নিয়ে।
কেউ জানলোনা কোন দুঃসাহসী ক্যাডেট রাতের আঁধারে তালাবন্দী করলো সত্য স্যারকে। বরিশাল ক্যাডেট কলেজের গল্প এগিয়ে যেতে লাগলো তার নিজস্ব নিয়মে। O:-) O:-) O:-)

………………………………………………………………………………………………………………………………..
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে বরিশাল ক্যাডেট কলেজে ঘটে যাওয়া সত্য কাহিনী অবলম্বনে লেখা। আমি তখন নবম শ্রেনীতে পড়ি। গল্পের প্রতিটি দৃশ্যই সত্যি। চরিত্র গুলো চব্বিশতম ব্যাচ থেকে নেয়া। নবম শ্রেনীর একজন ক্যাডেটের দ্বাদশ শ্রেনীর ক্যাডেটদের মধ্যে কথোপকথন জানা না থাকা বিধায় অনেক জায়গায় লেখকের স্বাধীনতা ব্যবহার করেছি। আশা করছি পূর্ন সমর্থন পাব।

উত্‍সর্গ: চব্বিশ তম ব্যাচ, তত্‍কালীন অ্যডজুটেন্ট নুরুল আলম স্যার এবং আমাদের প্রিয় দত্ত স্যার।

৩,০৫০ বার দেখা হয়েছে

৩৬ টি মন্তব্য : “আমাদের “সত্য” স্যার”

  1. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    হে হে হে আরো কাহিনী মনে পইড়্যা গেল 😉


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    একটানা লিখে যাওয়াতে ঘটনা গুলোর শুরু শেষ বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল, আর একই কারনে একবারে পুরোটা পড়ে শেষ করতে পারলাম না 🙁


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  3. আহমদ (৮৮-৯৪)

    শিক্ষকদের আমি অনেক সম্মানের স্থানে রাখি। তাঁদের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। কিন্তু তারপরেও বলছি, এই লেখার শিক্ষকদের মত যারা, তাদের মানষিক সমস্যা আছে। (সম্পাদিত)


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
  4. সাফায়াত

    দুঃখিত 🙁 শোভন ভাই মোস্তফা ভাই (২৪ তম ব্যাচ), যদিও দুঃসাহসী কাজ করেছিলাম সেই রাতে; কিন্তু সবার সামনে বলার মত সাহস ছিল না। ভাই ক্ষমা করে দিবেন। আমার কলেজে থাকাকালীন সব কুকীর্তির কথা আমার ব্যাচমেটরা জানত। ঐ রাতের ঘটনার সাক্ষী ছিল দুজন- রায়হান ফয়সাল(আমার ব্যাচমেট)। আর স্যারের কথা কি বলব? কয়েকবার চিন্তা করেছি ক্ষমা চাব, কিন্তু কেন যেন আর হয়ে ওঠেনি। তাই এখান থেকে স্যারের কাছে ক্ষমা চাইছি।

    জবাব দিন
  5. ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজেও আমাদের ফজলুল হক হাউসে একবার হাউস টিউটর স্যার নিজেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করেন তার কোয়ার্টারে। :-P:-P

    জবাব দিন
  6. তপু (৯৯-০৫/ককক)

    আমরা তালা মেরে আবার ডানে সালাম বামে সালাম দিয়ে পেরেড করতাম। র সার বেচারা লজ্জাতে লাল হয়ে জেত। অতঃপর একি কাহিনি। হাহাহাহাহাহাহ মজা পেলাম রে ভাই :)) :)) :))

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।