কিছু অসমাপ্তি-২

৩.সেই বাগানবাড়ির অনেক পরের কথা। আমরা যখন আগের বাসায় ছিলাম, বাসা ছিলো দোতলায়।সারাদিন রিক্সার টুং টাং, বুয়াদের হইচই আর মাঝেমধ্যে গাড়ির শব্দে মুখর থাকতো রাস্তাটা। কিন্তু রাতের বেলায় একদম উল্টো। শান্ত, নিশ্চুপ। বারান্দার কাছেই জ্বলতো একটা সোডিয়াম বাতি। অনেক রাত বারান্দায় বসে নৈঃশব্দের মায়া দেখেই সময় কাটিয়ে দিতাম।
কিন্তু প্রতিদিন রাত ৯-১০টার মাঝে আমার নিরবতা ভেঙে দিয়ে যেত একটা কালো মাইক্রোবাস। গাড়িতে বাজতো অনেক অনেক পুরোনো দিনের হিন্দি সিনেমার গান! “তু গঙ্গা কি মৌজ মে যামনা কা ধারা…, পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া হ্যায়,” অথবা “বাহারো ফুল বারসাও”। কখনো কোন ভিন্ন ধাঁচের গান বাজতে শুনিনি, আর কখনো এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন গাড়িটা আমাদের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে যায়নি। ঘড়ি দেখে কান পেতে থাকতাম, যতই ব্যাস্ত থাকিনা কেন।
এভাবে চার বছর কেটেছে, যতবার ছুটিতে যেতাম একই ঘটনা রোজ। আমার ক্লান্তি বোধ হোতনা, বিরক্তও লাগতোনা। এরপর আমাদের বাসা বদল হয়। আমার আর জানা হয়নি এমন কেন হোত!

৪.রাতের সে নিশ্চুপ রাস্তায় এই নিয়মিত অতিথির সাথে আসতো একজন অনিয়মিত অতিথিও, মাঝে মধ্যে, যাকে খুব মনে পড়ে। অনেক রাতে, প্রায় ১২-১টার দিকে মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম আকাশ-বাতাসে হাহাকার জাগানো বাঁশীর সুর! লম্বা একটা সোজা রাস্তা ধরে অনেক দূর থেকে হেঁটে হেঁটে বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে যেত আমাদের বাসার নীচ দিয়ে এক রোগা বাঁশিওয়ালা। যতদূর চোখ যেত আমি তাকিয়ে থাকতাম, তাকে চলে যেতে দেখতাম, আর তারো বেশী কান পেতে থাকতাম যতক্ষন তার বাঁশীর সুর শোনা যায়।
সেই রাতের শূন্যতায় বাঁশিওয়ালার করূন সুরে আমার ভেতরে একটা তীব্র হাহাকার মোচড় দিয়ে উঠতো! সেই বাঁশিওয়ালাও কিভাবে যেন রাতের আঁধারের রহস্যের মাঝেই হারিয়ে গেল!

৮১৮ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “কিছু অসমাপ্তি-২”

  1. শাহরিয়ার (২০০৪-২০১০)

    ১ম নাকি? B-) B-)
    লেখাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে...মানে অনেক ভালো হচ্ছে আগের চেয়ে...লাস্ট ৪-৫টা লেখা পড়লাম,গত বছরের সাথে কোন মিল নাই।গুড!...btw বাঁশিঅলা হাহাকার দিয়ে গেল!


    People sleep peaceably in their beds at night only because rough men stand ready to do violence on their behalf.

    জবাব দিন
  2. সামিয়া (৯৯-০৫)

    চমৎকার একটা লেখা পড়লাম। পাঠকের লেখা ভাল লাগবার একটা পথ হল সে যদি নিজের সাথে মিল খুজে পায়, আবার আরেকটা পথ হল লেখাটা যদি তুমি চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারো। দুটোই পেলাম এই লেখায়, তাই অসাধারণ লাগল।
    আর শাহরিয়ারের সাথে আমিও একমত। লেখা আগের চেয়ে উত্তরোত্তর ভাল হচ্ছে। লিখে যাও দুহাত খুলে। আর এই মেয়ে, তুমি বিভাগে ময়মনসিংহ যোগ করো না কেন? হ্যান্ডস ডাউন। সবগুলো লেখায় ময়মনসিংহ যোগ করে আসো। তারপর আবার দুইদিন ব্যাপী হ্যান্ডস ডাউন।

    জবাব দিন
  3. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    তোমার অসমাপ্তি সিরিজের মধ্যে এটা সবচেয়ে ভাল লাগল। :clap:
    এরকম এক বাশিওয়ালাকে দেখেছিলাম খুলনায়। বাশি বাজিয়ে ভিক্ষা করে। খুব খারাপ লেগেছিল, কিন্তু কি করা......।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।