কিছু অসমাপ্তি

১।অনেক ছোটবেলার বাসাটা খুব মনে পড়ে। আশেপাশে যখন সবাই অট্টালিকা বানানোর প্রতিযোগিতায় মত্ত, আমাদের আর রুলিদের(আমার ছোট্টবেলার বান্ধবী) তখন ছিলো বাগানবাড়ি, ঢাকার একদম মধ্যখানে! বাসার সামনে একচিলতে বাগান,বাবার শখের পেয়ারা গাছ, মায়ের নানান পাতাবাহার, বোনের প্রিয় শিউলী আর আমার আম গাছের দোলনা! খেজুর গাছ ও ছিল একটা, আর কি কি ছিল মনে নেই। এই বাগানের দেয়ালের ধারে বসে আমি দেখতাম অন্য বাচ্চাদের সারাদিনের নানা খেলায় ব্যাস্ততা, আর ভাবতাম ওদের কত্ত মজা! মা বাবা কখনোই ডাকে না, কিচ্ছু বলেনা! এই কিচ্ছু না বলা দলের একটা ছেলের সাথে টুকটাক কথা হোত রোজ, নাম মনে আছে এখনো, তপু। একবার তার হাতে একটা ফুল দেখে খুব চেয়েছিলাম আমি। নাম-না-জানা সেই ফুল তপু আমাকে দেয়নি, তবে কথা দিয়েছিল আবার আনলে দেবে।
পরে জেনেছিলাম ফুলটার নাম সন্ধ্যামালতী। তপুর কাছে এই বিদ্যে ঝাড়া হয়নি আমার। কারন এরপর বার কয়েক দেখা হলেও তপু আর ফুল নিয়ে আসেনি, একদিন আর আসেনি, এরপর আর কোনদিন আসেনি। তাই জীবনের প্রথম ফুল না-নেয়াই রয়ে গেল!

২।বড় হবার সময় বাগান ভেঙে বারান্দা হোল। আমি গৃহবন্দি।বাইরে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলে আর আমি তাদের ধারাবিবরনী দিতাম! বারান্দার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকতাম সারাদিন! আমাদের পাশের বাসার সনির সাথে পড়তো তুহিন। ক্লাস ফোরেই হেব্বি রোমান্স! সনিদের বাসা থেকে এই রাস্তাটা দেখা যেতনা। তাই ও আমার সাথে পুতুল খেলার নামে সারাদিনরাত আমাদের বারাব্দায় পড়ে থাকতো! ওদের দেখে আমি ভেবে পেতাম না হচ্ছে টা কি?
তুহিন ছিলো দারুন মেধাবী, সনি ফেলটুস!তুহিন আমার ভালো বন্ধু, তবুও গোপনে হিংসা করতাম! বাবা ছিলনা তুহিনের। মায়ের কষ্টের দাম ভালোভাবেই দিতো প্রতি পরীক্ষার ফলাফলে। আমিও এত পারতাম না।
সনিদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায় হুট করে ওর বাবা ক্যান্সারে মারা গেলে।ভাড়া বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যায় ওরা, তখন আমরা পড়ি ক্লাস সিক্সে। তুহিন খোঁজখবর নিতো মাঝে মাঝে।
আমি এরপর চলে আসলাম ক্যাডেট কলেজে, আর বেমালুম ভুলে গেলাম ওদের কথা।
এইতো ৩/৪ মাস আগে, কলেজের এক জুনিয়র এসেছে বাসায়, খাতা ফটোকপি করাতে নিচে গেলাম। একটা ছেলে নাম ধরে ডাকছে শুনে তাকালাম এবং বিরক্ত হলাম। বাজে অ্যাটায়ার, খ্যাত বলা চলে! বলে চিনতে পারিসনি? বললাম, না তো।সে মর্মাহত চেহারা বানিয়ে বললো এত মজা করেছি, এতো আড্ডা দিয়েছি সব ভুলে গেলি? সাথে সাথেই মনে পড়লো, আর সাথে অনেক অপরাধবোধ। জিজ্ঞাসা করলাম খব কি। ও আমার খবর সব জানে, গড়গড় করে বলে গেল টিভিতে দেখেছে, রেজাল্ট শুনে সে খুব খুশি ইত্যাদি ইত্যাদি। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ি শুনে সে মহাখুশি! সেও নাকি জিপিএ ৫ পেয়েছে, পরীক্ষা দিয়েছে গতবছরই। কোথায় পড়ে জিজ্ঞাসা করে এবার ধাক্কা খেলাম আমি। সে চখমুখের যন্ত্রনা গোপন করে হাসিমুখে বললো,আমি তো আর পড়িনাই দোস্ত, ভালো একটা চাকরি পেয়ে গেছিলাম। ফিলিপস এ চাকরী করি।
সেই মেধাবী তুহিন আর পড়েনাই? চাকরী করে মানে কি? ফোন নাম্বার দিল, দিলাম, বাসায় এসে সেভ করলাম তুহিন DO NOT RCV লিখে। ও দুয়েকবার ফোন দিয়েছিল, ধরিনাই, কেন ঠিক জানিনা এখনো।ও মোড়ে দাঁড়ানো ছেলেগুলার মতো আচরণ করে এজন্যে, ও পড়েনা, চাকরী করে এজন্যে, নাকি ছোট্টবেলার তুহিনের ছায়া সে প্রায় মুছেই ফেলেছে সেইজন্যে, জানিনা।
কিছু জিনিস হারালে ফিরে পেতে নেই। কারন আমরা বাস্তবকে তার স্বরূপে মেনে নিতে পারিনা।

৮০২ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “কিছু অসমাপ্তি”

  1. রকিব (০১-০৭)

    সময় এবং অবস্থান নিদারুণ পরিবর্তনের চাবি। নিজের কিছু গল্পের সাথে মিল খুঁজে পাই; পুরো লেখাটাই একটা বিষণ্ন ভালো লাগা দিয়ে গেল।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।