মুহিব বাঁচবেই

কৃতজ্ঞতা: রেজা শাওন, পিসিসি, ২০০১-২০০৭

মুহিবদের ব্যাচের একজন হাসান যখন আমাকে বলল, ভাই মুহিবের জন্য ফান্ড রেইজের কাজ শুরু হয়েছে। সম্ভব হলে একটা লেখা রেডি করেন। বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়াগুলোতে লেখাটা ছাপানো প্রয়োজন। হাতে সময় একেবারেই নেই। হাসানের মেসেজটা পাওয়ার পর আমি আমার বয়স হিসেব শুরু করলাম। পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ এর হিসেবে আমার বয়স চব্বিশ হতে আরও দুই মাস বাকী। জীবনে এখনও আমার কী কী করা বাকী সেই লিস্টটা যখন আমি বের করি, আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। এলোমেলো হয়ে যায়- কারণ এখন পর্যন্ত দিনচুক্তিতে ফী দিন ৮-৯ ঘণ্টা ঘুমানো বাদে জীবনে আমার আর কিছুই করা হয়নি।

মুহিব

মুহিব

মুহিবের সাথে আমার জীবনের হিসাব মিলবেনা। মিলবেনা কারণ; সে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে একটি থেকে এ বছর পড়া শেষ করবে। বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার এন্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মুহিব যখন জীবনের অদ্ভুত এক মোড়ে এসে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করার মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক সে সময়টায় মনে হয়েছে, যে ছেলেটা বয়সে আমার চেয়েও বছর খানেকের ছোট; সে কেন এই বয়সে এই ভীষণ প্রস্তুতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে? মুহিবের তো এখন স্বপ্ন দেখার বয়স। মুহিবের বন্ধু’রা এ বছর পাশ করে ঢাকা শহর চষে ফেলেবে চাকুরীর জন্য, মুহিবের তো এখন তাদের সাথে জুতার সুখতলী ক্ষয়ে ফেলবার বয়স। মুহিবের বয়স এখন আর দশ’টা বাংলাদেশী ছেলের মত পাশের পর উন্নত দেশগুলোর দুতাবাসগুলোতে লাইন ধরে দাঁড়াবার। বিদেশে পড়াশুনা শেষে করবার পর দেশে ফিরে আসা উচিৎ কি উচিৎ না এ বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক জুড়ে দেবার বয়স তার। এই বয়সটা ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ হবার। আবার হয়তো বা আশার বারুদের হঠাৎ আগুনে ধুপ করে জ্বলে ওঠে সবাইকে অবাক দেবার বয়স মুহিবের। এখন কেন সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্যান্সারের সাথে কীভাবে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায়, সেই ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবে? মুহিবের জন্য তো হাসপাতাল একটি দিনের জন্যও নয়। ওর বয়সী কেউ কি কেউ কি এভাবে হাসপাতালে শুয়ে থাকে?

ANO- RECTAL CARCINOMA নামের মরণঘাতী এই কোলন ক্যান্সার কীভাবে এই ছেলেটার শরীরে বাসা বাঁধে, সেটাও আমাকে অবাক করে! কলেজে দীর্ঘদিন এই ছেলেটাকে বাস্কেটবল-ফুটবল- ভলিবল মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে দেখেছি। নিয়মানুবর্তিতা যদি সুস্থ থাকার নিয়ামক হয়, তাহলে এই ছেলের আমাদের চেয়ে আরও বেশ ক’বছর বেশি বাঁচবে সেটা তো আশা করাই যায়। গল্প- উপন্যাসের নিখাদ ভাল ছেলেদের গুণগুলো আমাদের মুহিবের মাঝে ছিল বলে, কিছু ব্যাপারে সৎ হিংসার উদ্রেক হওয়া অন্য সবার জন্য অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।

কলেজে একবার আমার কবিতা লিখবার বাতিক হল। মুহিব আমার টেবিলমেট, ক্লাস ইলেভেন; আমার পাশের চেয়ারে বসে। আমি ক্লাস টুয়েলভ, ওই টেবিলের টেবিল লিডার। বিশ্ব রামছাগল দিবস, আতা গাছে তোতাপাখি দিবস ইত্যাদি নানা স্ব- প্রচলিত দিবসে আমি ক্ষমতাবলে টেবিলের বাকী জুনিয়রদের আমার স্ব-রচিত কবিতাপাঠে বাধ্য করি। কবিতাপাঠের সে জ্বালা জুনিয়র’রা কে কতটুকু ভোগ করেছে জানা নেই। তবে মুহিব দীর্ঘ এক বছর মুখ বুজে আমার অখাদ্য কবিতা গিলে গিয়েছে, বলা যায় গিলতে বাধ্য হয়েছে। টেবিলের অন্যসব জুনিয়রদের মাঝে ও মোস্ট সিনিয়র। না গিলে যাবে কই? লক্ষণীয় ব্যাপার এটাই যে, অসম্ভব বিনয়ী এ ছেলেটা ওই এক বছরে’র দীর্ঘ সময়ে একটা বারের জন্যও বলেনি, ‘ভাই এই আবর্জনাগুলোর অত্যাচার থেকে মুক্তি দেন তো! ঢের হয়েছে।’

মুহিব হয়তো বরাবরই এমন। মুখচোরা লাজুক এই ছেলেটার ক্যান্সার বাঁধিয়ে ফেলার খবর পাওয়া গিয়েছে অনেক পরে। সম্ভবত ক্যান্সার থার্ড ষ্টেজ ছাড়িয়ে যাবার পর। কিন্তু, খবর পাওয়া গিয়েছে- এটাই ভাল খবর। মুহিবের ক্যান্সারকে এখন আমরা সবাই মিলে বেঁধে ফেলবো, এর পরের স্টেজে যাবার আগেই।

মুহিব, তোমার জন্য তোমার বন্ধুরা আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে। একদম নো টেনশন! বাংলাদেশের প্রতিটা কোনায় তোমাকে আমাদের মাঝে আবার ফিরে পাবার বার্তাটা নিয়ে তাঁরা পৌঁছে যাবে। কোলন ক্যান্সারকে মরণঘাতী অনেকেই বলে। আমরা বিশ্বাস করি না। তোমার বিশাল চিকিৎসাভার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা হয়েছে, সেটা নিয়েও বিচলিত হবার কোন কারণ নেই। আমরা আছি। তোমার বুয়েটের বন্ধুরা আছে। ক্যাডেট কলেজের লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা হাজার খানেক বড়-ছোট ভাই, আপুরা আছে। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরা তো আছেই। তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না- এদেশে শুদ্ধতম কোন বিশ্বাস খুব অল্প সময়ে মানুষ থেকে মানুষে সঞ্চারিত হয়। তোমার বেলায়ও এমন হবে। দেখে নিও, এমন হবেই। যে বিশ্বাসে আমরা বুক বেঁধেছি, সে বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়বে। তেইশ বছরের একজন দারুণ সম্ভবনাময় ছেলেকে তাঁর বাকী জীবনের স্বপ্নগুলোকে ফিরিয়ে দেবার জন্য যে যুদ্ধটুকু প্রয়োজন, সেটা আমরা চালু রাখবো। টাকার অংকে ৫০ লাখ টাকা কখনোই তোমার স্বপ্নের চেয়ে বড় কিছু নয়। তুমি আমাদের মাঝে নিশ্চিত ফিরে আসবে।

তুমি যখন বিভিন্ন পরীক্ষাগুলোতে ভাল করতে, তোমার বাবা-মার নিশ্চয়ই অনেক গর্ব হতো। এই যেমন, তুমি যখন বুয়েটে টিকে গেলে, সে খবরটা বগুড়ায় তোমার এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো। পথে- ঘাটে তোমার বাবাকে লোকজন ডেকে ডেকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করে। তোমার বাবা কী দারুণ অহংকার করে তোমার খবরটা সবাইকে বলে বেড়ান! এমন একটা খবর আবার তৈরি হবে মুহিব; তুমি যখন সিঙ্গাপুর থেকে ক্যান্সারটাকে একেবারে ফেলে দিয়ে দেশে ফিরবে। আমরা অপেক্ষায় আছি।

(মুহিব এখন ইউনাইটেড হাসপাতালে কোলন ও রেক্টাল সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহিদুল হক এর অধীনে চিকিৎসাধীন। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য যতদ্রুত সম্ভব তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।)

ওর জন্য যেকোন সহযোগিতায়-

bKash Account: 01816111200 (personal)

Trust Bank Ltd.: Nur Mohammad
A/C No: 0029-0310015861

AB Bank Ltd.: Md. Mehedi Hasan
A/C No: 4026-384366-300

BRAC Bank Ltd.: Md. Hasan Mahmud
A/C No: 1532202001766001 (SWIFT Code- BRAKBDDH)

Dutch Bangla Bank Ltd: Sarab Mehnaj Choity
A/C No: 0126105000175031

বিস্তারিত জানতে : ০১৮১৬১১১২০০(নূর), ০১৬৮৭৮৮৩৮৯৪ (মনির), ০১৬৭৮৬১২১১৮ (আবিদ)

মুহিবের ব্যাপারে নিয়মিত আপডেট জানাতে ফেসবুকে একটি গ্রুপ এবং পেজ খোলা হয়েছে। লাইক দিয়ে মুহিবের পাশে থাকুন।

পুনশ্চ: মুহিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভাল আর্কিটেকচার এন্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র এবং পাবনা ক্যাডেট কলেজের ২৫ তম ব্যাচের (২০০২-২০০৮) এক্স-ক্যাডেট।

মুহিব ২

মুহিব ২

৭৭৭ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।