স্বপ্নচূড়া-১

চায়ে চুমুক দিতেই ভুলটা ধরা পড়ে।সিগারেট আনা হয় নি।বালিশের পাশে যে দু’টা সিগারেট রাখা ছিল,সেগুলো সেখানেই গড়াগড়ি খাচ্ছে অথবা কে জানে এতক্ষণে মনসুর অথবা প্রকাশের ঠোঁটে শোভা পেয়ে রক্তে নিকোটিন ছড়াতে ছড়াতে নিজেকে ভষ্ম করে দিয়েছে কিনা!চায়ের সাথে সিগারেটের অনুপস্থিতি ব্যাপারটাকে অনেকটা তরকারীতে লবণ না দেওয়ার মতই মনে হয় দিলীপের।আর সেটা যদি হয় দুধ চা,চিনি বেশী, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।পুরোপুরি অত্যাচার বলেই মনে হয় তখন।এক কাঠি সিগারেট যে কিনে নিবে সেই যোও নেই।কি আর করা?উদাস মনে চায়ের কাপে চুমুক দেয় দিলীপ।

শাহবাগ মোড়ে টং এর দোকানে চা খেতে খেতে আনিস ভাই এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে দিলীপ।চেহারাতে ‘দয়াল তোমারও লাগিয়া যোগিনী সাজিব’ ভাবটা বেশ দুই এক দিন আগেই এসেছে।এখন শুধু সেটাকে আরেকটু ঘষা মাজার কাজ চলছে।নির্ঘুম লাল চোখগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে স্বপ্নডানায় পাখা মেলেছে মন,লালচে চোখটাতে এখন আর শাহবাগ মোড় নয় অন্য কোন কিছুরই একটা প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাঞ্ছারামপুর গ্রামের পশিম আকাশে রঙের মেলা বসেছে।রুপসুন্দরী এই গ্রামের পশিমের দিকের বিল ঘেষা বাড়িটা নিতাই মাষ্টারের।বাড়ির সামনের সুপারি গাছগুলো বাড়ির সৌন্দর্যকে আরেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে,এবং বাড়ির মানুষজনের রুচির আরেকটা নিদর্শন বহন করে তুলসী তলার ছোট্ট ফুল বাগানটি,ফুলের প্রকার জুঁই,জবা এবং কয়েক জাতের ঘাস ফুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সেগুলো যে প্রতিনিয়ত অতি যতনে বেড়ে উঠে সেটা সহজেই অনুমেয়।সাঁঝ বেলার আগের এই সময়টাতে মাঝে মাঝে প্রকৃতিতে একটা হলুদ আলোর খেলা চলে,যেই আলোতে সবকিছুকে স্বাভাবিক এর থেকে একটু বেশী সুন্দর লাগে।হলদে এই আলোটার নাম ‘কন্যা দেখা আলো’।ঘরের ভিতরে আয়নার সামনে যে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে তাকে দেখার জন্য বা তার রূপের সার্টিফিকেট দেবার জন্য এই কন্যা দেখা আলোর রুপবর্ধণ প্রতিভা কাজে লাগানোর কোন দরকারই পড়ে না।সময় নিয়ে গাড় করে চোখে কাজল লাগানোয় ব্যস্ত অনুপমা।বাসন্তী রঙের তাঁতের শাড়ীতে কাজল দেয়া চোখগুলোকে ফ্রেমে বাঁধানো কোন ছবি বলে মনে হচ্ছে।মহাসাগরের গভীরতা এসে যেন ভর করেছে সেই ভেজা ভেজা চোখ দুটিতে।মনে হয় কান্নার জন্য তৈরী হয়ে আছে,যে কোন সময় অবিরাম বর্ষণ শুরু হবে।মহাসাগরের গভীরতা থেকে নিজের চোখ দুটোকে মুক্ত করে চুলের দিকে চোখ পড়তেই “অন্ধকার বিদিশার নিশা’ উপাধি দিতে ইচ্ছে করে সেগুলোকে।প্রতিদিন বিকেল থেকে শুরু হওয়া সাঁজ-গোজের এই প্রস্তুতি পর্ব চলে সন্ধ্যাপূজার আগ-পর্যন্ত।এই সময়টাতে আপনমনে নিজেকে সাঁজায় সে।এরপর মাটির পাত্রে সযতনে জমিয়ে রাখা ইন্দিরার স্বচ্ছ জলে নিজের মুখটাকে একবার দেখে নেয়া।কাজটা করতে হয় অনেক গোপনে যাতে কেউ দেখে না ফেলে,যেন এটা অনেক লজ্জার কোন কিছু।এক পর্যায়ে জলের উপর আঙ্গুলের স্পর্শ বুলিয়ে দিতেই জলের উপরের চেহারাটা আস্তে আস্তে ভগ্নাংশে রুপ নিতে থাকে।বিকেলের এই খেলাটাতে একটা তৃপ্তি খুঁজে পায় অনুপমা।আকাশের রঙের সাথে মনের রঙটা মিলে আরকটি মনকে রাঙ্গানোর মনোবাসনা ভর করে হৃদয় মন্দিরে।অদ্ভূত এক ভাললাগা আর স্বপ্ন খেলা করে যায় মনে।সময় পার না হতেই ভাবনায় ইতি টানতে হয়,সন্ধ্যা পূজার সময় হয়ে যাচ্ছে।

‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে’ গানটি মৃদু স্বরে গাইতে গাইতে হালকা মাথা দোলাচ্ছে অনুপমা,সাথে দুই হাতে তালি বাজিয়ে গানের তাল রাখার চেষ্টা।স্বর্গের কোন দেবী বুঝি এই সময় নিতাই মাস্টারের তুলসী তলায় স্বয়ং এসে গান ধরেন।অনুপমা কে দেখলে দেবীর মতই লাগে।ছোট বেলায় স্বরস্বতী পূজার আগে নিতাই মাস্টার মজা করে বলতেন, ‘স্বরস্বতী মা তো আমার ঘরেই আছে,আবার নতুন করে প্রতিমা কিনে আনা কেন?”কথা গুলো বলতেন হোসেন মাস্টার এর সাথে।তার বাল্যকালের বন্ধু এবং বর্তমানে একই স্কুলের শিক্ষক দুজনেই।কিছুক্ষণ পরেই হোসেন মাস্টার আসবেন তাদের বাড়িতে সাথে থাকবে শফিক,তার ছোট ছেলে।এবার ক্লাস ফোর এ উঠল।প্রতিদিন অনুপমা দিদির পূজার সন্দেশ না খেলে তার হবেই না।শফিকের বড় বোন নুসরাত অনুপমার বান্ধবী,কিছুদিন আগে বিয়ে হয়ে গেল।শফিককে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তার বোন কয়জন সে চোখ বন্ধ করে ‘দুইজন’ বলে দেয়।এই দুই পরিবারের সম্পর্কটাই এমন।নিতাই মাস্টার মেয়ের পূজার দিকে তাকিয়ে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।ছোট বেলায় মা-বাবা হারানো আলাভোলা মানুষটা মেয়ের মাঝেই সব কিছু খুঁজে পান।

পূজার এক ফাঁকে তুলসী তলায় এসে কপাল ছুঁইয়ে প্রণাম করে হাত জোড় করে শাখা দুটোকে কপালে ছোঁয়ায় তটিনী দেবী।অনুপমা নাম কীর্ত্তণ করতে করতে মায়ের দিকে তাকায়।মেয়ের মায়া ভরা মুখটা দেখে তটিনী দেবীর কান্না চলে আসতে চায়।পর পর তিন টা সন্তান মারা যাওয়ার পর টিকে যায় অনুপমা।তাইতো এই সংসারে অনুপমাকে ‘মাথায় রাখা হয় না যেন উকুন না ছোঁয় মাটিতে রাখে না যেন পিপড়ায় না ছোঁয়।দেখতে দেখতেই মেয়ে বড় হয়ে গেল,কয়েকদিন পরেই অন্যের ঘরে চলে যাবে।এটাই নিয়ম,মেয়েদের অন্যের ঘরকেই আপন করে নিতে হয়।

মার্চ মাসের এই সময়টাতে পরিবেশে একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব বিরাজ করে।হালকা গরমের মধ্যে একটা মৃদু ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়।সেই বাতাসটাই বোধ করি স্বপ্ন ফেরি করে বেড়ায়।আজকের রাতের এই অবাধ্য জোছনাও যোগ দিয়েছে সেই ফেরীওয়ালাদের ভীরে।অনুপমা সেই খোলা জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না ছড়ানো চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুরে আসে অতীতের দিনগুলোতে।যখন দিলীপ ওর বাবার কাছে পড়তে আসত।বয়স খুব বেশী ছিল না তার।কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।রাগে গাটা জ্বলে যেত অনুপমার।কোন দিন কিছু বলে নি ঠিক আছে,কিন্তু মাঝে মাঝেই গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পথ আটকে দাড়াত আর খুব গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করত ‘কেমন আছ?’ উত্তর দেয়া হলেই মাথা নেড়ে চলে যাওয়ার সংকেত দিত।

গুন্ডা মার্কা চেহারাটা দেখে ভয়ই লাগত তাই আর বাবার কাছে কখনো বিচার দেওয়া হয়ে উঠেনি।এভাবে বেশ কিছুদিন চলার মাঝে কখন যেন একটা মায়া পড়ে গেছিল সেটা বুঝে উঠতে পারে নি।এমনকি নুসরাতের বিয়ের দিন যেদিন সে প্রেমপত্র দিয়েছিল সেদিনও না।সাদামাটা কাগজে সুন্দর হাতে লেখা ছিল ‘ভালবাসি’।আরে! এটা কোন কথা হল?সাথে সাথে সেটা ছিড়ে ফেলে অনুপমা।তার দুইদিন পর যখন দেখে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলতে যেয়ে মাথার পাশে ফেটে রক্ত বের হচ্ছে,সেদিন অনেক কান্না পাচ্ছিল,কান্নার কারন সে বের করতে পারে নি,তবে শফিক কে দিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিল, ‘আপনাকে আর যেন কোনদিন ফুটবলের আশপাশে না দেখি’।যেই ছেলেটা বাপ-মা এর কথা ঠিকমত শুনে নি,সেই ছেলেটিই সেদিনের পর থেকে প্রিয় ফুটবল ছেড়ে দিল।দুরন্ত হলেও ছাত্র ভাল ছিল।এর জন্য নিতাই মাস্টারেরও বিশেষ পছন্দের এই বাপ মরা ছেলেটি।এর কয়েকদিন পরেই গ্রামের সুনাম বাড়িয়ে দিলীপ চান্স পেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।যেন তেন ব্যাপার?আশ পাশের গ্রামের মধ্যে প্রথম কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় পাড়া দিল।গাছের আম চুরি করে খাওয়াতে দিনরাত অভিশাপ দিতে থাকা গৃহস্থের মুখেও সেদিন দিলীপ বন্দনা ঝড়ে ঝড়ে পড়ছিল।এর মাঝেই অনুপমা আর দিলীপের চিঠি চালাচালি অনেক বেড়ে যায়।‘আপনি’ হয়ে যায় ‘তুমি’।আর পোস্টম্যানের ভূমিকায় থাকে শফিক।এই বদখত চেহারার লম্বা চিকনাটাকে কিভাবে যে অনুপমা দিদি এত পছন্দ করে সে্টা ভেবে পায় না শফিক।

চাঁদটা পশ্চিমে হেলে পড়ে।রাতের বয়স বেড়ে মধ্যরাতে উপনীত হয়।অনুপমার স্বপ্নগুলোও পরিণত হতে থাকে।এইতো কিছুদিন পরই দিলীপের ইউনিভার্সিটি শেষ হয়ে যাবে,সেও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ফেলবে।এরপর দিলীপ একটা চাকরী জোগাড় করে নিতেই পারবে।ঢাকাতেই থাকতে হবে তাদের।ছোট্খাটো একটা বাসা নিয়ে নিবে।এক রুমে ওরা ঘুমাবে অন্য রুমে শ্বাশুড়ী।বাবা,মা যখন যাবে তখন একটু সমস্যা হবে।সেটা অবশ্য ঠিক করে নেওয়া যাবে।দিলীপ যদিও অনুপমাকে ছাড়া থাকতে চাইবে না।এটা অনুপমা ভালই বুঝতে পারে।ওদের বাবু ঘুমাবে দুজনের মাঝখানে।বাপ আর ছেলে মিলে তো ওকে জ্বালি্যেই মারবে।দিলীপের কথাটা সে বুঝতে পারে,ওর মেয়ে বাবু পছন্দ।যদিও মুখ ফুটে সে কিছু বলে না কখনো।তাই অনুপমা চায় তাদের এক ছেলে এক মেয়ে হোক।প্রথম জন ছেলে।অনুপমা বুঝতে পারে সে আসলে ছেলে বাবু চায়।ভাবতে ভাবতে লজ্জা লাগে ওর।দিলীপ থাকলে ভাল হত,ওর বুকে মুখ লুকানো যেত।ওর খুব ইচ্ছা লজ্জায় লাল হয়ে দিলীপের বুকে মুখ লুকিয়ে রাখতে।

মধ্যরাতের ঠিক এই সময়টাতে জগন্নাথ হলের পুকুরপাড়ের সিড়িতে দিলীপ কে দেখা যায়।বাঁধভাঙ্গা জোছনায় সেও একটু নিজেকে স্নান করিয়ে নিতে চায়।সারাদিনের কর্মব্যস্ততা আর দুশ্চিন্তাকে ফেলে রেখে পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিফলিত আলোতে অনুপমাকে খুঁজে বেড়ায় সে।এই মেয়েটিকে আগলে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে।যেন একটা বাচ্চা মেয়ে।একমাত্র তার কাছেই যে সবচেয়ে নিরাপদ।আজকে আর কোন স্বপ্ন দেখায় মন দেয় না।দেশের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে।ইতিমধ্যে কয়েক জায়গায় পাকিস্তানীদের প্রতিরোধ করা শুরু হয়ে গেছে।এবার কিছু একটা হবেই।যার জন্য তাদের এতদিনের মিছিল,মিটিং সেই দাবী আদায় করে আনতেই হবে।এর জন্য হয়তো অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হবে,কিন্তু পিছু হটবার উপায় নেই।অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।পরশু গ্রামে যাবে।অবশ্যই সেটা বরাবরের মত ছুটিতে যাওয়া না।

চলবে…

১,১৫২ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “স্বপ্নচূড়া-১”

  1. দিবস (২০০২-২০০৮)

    দিয়ে দিব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।সেমিস্টার শেষের দিকে রিপোর্ট,টার্ম প্রোজেক্ট আর প্রেজেন্টেশন নিয়া বিশাল দৌড়ের উপর আছি 🙁


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।