সমুদ্রপারের পাড়ায় পাড়ায় ( লুনসারের লৌহ পাহাড়)

সমুদ্রপারের পাড়ায় পাড়ায়

লুনসারের লৌহ পাহাড়

আমার ব্যক্তিগত মত হল পৃথিবীতে স্বাধীনতা বা স্বাধিকারের জন্যে যুদ্ধই হল শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ।  অন্য সকল যুদ্ধই অনৈতিক এবং মানুষের জন্যে অকল্যাণকর। প্রথম ধরনের যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সনে আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এক অলৌকিক তাড়নায় সমগ্র বাংলার মানুষেরা গ্রথিত হয়েছিল হিরন্ময় কোন এক সুত্রে। গড়ে তুলেছিল বিস্ময়কর প্রতিরোধ। হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। আমি ঐ সময়টাতে ক্লাস ওয়ানে পড়া এক শিশু। তারপরেও বুঝতে পারতাম জন-মানুষের এই অকৃত্তিম যুথবদ্ধতা। পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা এবং ভালোবাসাই এই বিনি সুতোর মালা তৈরি করতে সক্ষম।

সিয়েরালিওনের যুদ্ধটা দ্বিতীয় ধরনের। এখানে দেশের মানুষেরা পরস্পরের শত্রু এবং পরস্পরের সাথে হানাহানিতে লিপ্ত। এই ধরণের যুদ্ধে নৈতিকতার লেশ মাত্র নেই। যুদ্ধংদেহী সকল দলের সদস্যরাই মানবিকতা লঙ্ঘন করতে ব্যস্ত। উপরোল্লিখিত ধরনের পরিস্থিতি শান্তিস্থাপনের উদ্দেশ্যে জাতিসঙ্ঘের অধীনে আগত বহুজাতিক সামরিক/বেসামরিক সদস্যদের ভেতরেও বিচ্যুতি সৃষ্টি করতে পারে! একারনেই সম্ভবত আমাদের আচরণের ওপরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের আতিশয্য।

২০০২ সালের জুন/জুলাই মাস। মধ্য সিয়েরালিওনের লুনসার নামক স্থানে বাংলাদেশ আর্টিলারি ব্যাটালিয়নের সহযোগী সিগন্যাল কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিশেবে কয়েক পক্ষকালের জন্যে আমার আগমন। আটলান্টিক পারের গডরিচ হতে। এই কোম্পানির অধিনায়ক মেজর আসাদ (সিনিয়র) এর হয়ে প্রক্সি দিতে।  স্যার দুই মাসের ছুটিতে বাংলাদেশের খুলনা জেলার সাতক্ষীরা এলাকায় নিজ বাড়ীতে গেছেন।

লুনসারের কোম্পানি অফিসে ঢুকতেই ক্যাপ্টেন শাব্বির মৃদু হেসে আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানাল। কিছুক্ষণ  পর আমার পূর্ব পরিচিত এক সৈনিক আমাকে সালাম দিয়ে অযাচিতভাবে আমাকে নতুন তথ্য প্রদান করলো। এক তলা অফিস বিল্ডিং। এর দেয়ালে চালুনের ছিদ্রের মতন অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র। সেগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাকে বলল, “স্যার, এই দেয়ালগুলোর গায়ে যে ছিদ্রগুলো দেখছেন এগুলো গুলির ছিদ্র! আমদের আগে এখানে নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনীর একটা প্লাটুন ছিল। আর ইউ এফ বা ‘রেভুল্যুশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ এর বিপ্লবীরা একরাতে এই ক্যাম্প আক্রমণ করে। প্লাটুন কমান্ডার এক ক্যাপ্টেন সহ পুরো প্লাটুনের সবাই নিহত হয়। আমি শুনেছি আর ইউ এফ  এর সদস্যরা শুধুমাত্র তাদেরকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। প্লাটুনের সদস্যদের বুক বেয়নেট দিয়ে চিরে ফেলে তাদের কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল! এমন হিংস্র ছিল তারা।”  উল্লেখ্য, প্রাথমিক পর্যায়ে নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনী Economic Community of West African States Monitoring Group (ECOMOG) নামক সংস্থার অধীনে এই এলাকায় নিয়োজিত হয়েছিলো। কিন্তু তারা বিবদমান গোষ্ঠী সমুহের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই অঞ্চলের  দায়িত্বভার গ্রহন করে। শুধুমাত্র তাই নয় প্রথমবারের মতন তারা আর ইউ এফ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হয়।

আমি অবাক। শেষ পর্যন্ত আমি রবিন্সন ক্রুসোর মতন মুক্ত সমুদ্রের তীর থেকে ঘন অরন্যের ক্যানিবালদের দেশে এসে পড়েছি? আতঙ্ক এবং অন্যমনস্কতার কারণে আমার হাতের টানে সামনের টেবিলের ড্রয়ার খুলে গেছে। গতিজড়তার কারণে ড্রয়ারের ভেতরের দিক থেকে অনেকগুলো জরাজীর্ণ পুরনো গুলির খালি কার্টিজ গড়িয়ে এলো! এরা সেই আক্রমনের ভয়াল স্মৃতিকে ধারন করছে!

ক্যাপ্টেন শাব্বির স্মিত হাসি দিয়ে আমাকে আমার বসবাসের রুম এবং বসবাস রুমের থেকে দুইগজ দূরে নিজেদের তৈরি বাথরুম দেখিয়ে দিল। বলল, “ স্যার, দুইদিন আগে এর ভেতরে একটা অজগর সাপ দেখেছিলাম।  কিন্তু মারতে পারিনি। পালিয়ে গেছে। আপনি একটু সাবধানে থাকবেন”!

পর পর দুটো আত্মা অথবা হৃদয় হরণকারী তথ্য শুনে আমি যারপরনাই বিচলিত। আমি শাব্বিরের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালাম। তার মুখ পূর্বের মতন হাস্যজ্জল। এই হাসির ভেতর থেকে সত্য বের করে আনার কোন উপায়ই নেই! পরবর্তীতে আমি খেয়াল করে দেখেছি শাব্বির প্রকৃতপক্ষে হাসে না।  তার মুখটাই হাসি হাসি। এই ধরণের মানুষ জীবনে মার খেয়ে ভূত হয়ে গেলেও, অন্যেরা তার কষ্ট বুঝবে না বা তার সহমর্মি হবে না!

‘আর ইউ এফ’ এর কারণেই আমাদেরকে সিয়েরালিওনে আসতে হয়েছে। হীরা আর লৌহের দেশ সিয়েরালিওন।  ১৯৬১ সনে দেশটি স্বাধীন হবার পর থেকেই মুল্যবান হীরার খনিই নিরীহ দেশবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। মুল্যবান খনিজ সম্পদ আহরনের লক্ষ্যে ঔপনিবেশিক প্রভুরা দেশটিতে দুর্বল শাসন ব্যবস্থা চালু রাখতে সচেষ্ট হয়। ফলে জন্ম নেয় কুশাসন। আর্থ-সামাজিক অবনতি। অর্থনৈতিক দৈন্যতা সেনাবাহিনীকে করে তোলে বিশৃংখল। এই সুযোগে সেনাবাহিনী থেকে বহিস্কৃত কর্পোরাল ফুদে শাংক দেশের বেকার যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলে বিপ্লবী বাহিনী, রেভুলেশনারী ইউনাইটেড ফ্রন্ট সংক্ষেপে আরইউএফ। ফ্যুদে শাংক সেনাবাহিনি হতে বহিষ্কৃত এক প্রাক্তন সৈনিক হওয়া ছাড়াও ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্যামেরাম্যান যে প্রশিক্ষন গ্রহন করেছিলো স্নায়ু যুদ্ধকালীন সময়ে লিবিয়ায় গাদ্দাফির গেরিলা ক্যাম্পে। তিনি ১৯৮৮-৮৯ সালে লিবিয়ায় আরইউএফ সংগঠিত করেন নিজ দেশে বিপ্লব ঘটানোর জন্যে।

‘আর ইউ এফ’ ১৯৯২ সন থেকে ২০০২ সন পর্যন্ত সিয়েরালিওনে প্রলয়ঙ্করী এক গৃহযুদ্ধের অবতারণা করে। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, কোন বিপ্লবীবাহিনীই দেশের অভ্যন্তরে এককভাবে গড়ে উঠতে পারে না। কারণ তাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সহায়তা।। সিয়েরালিওনের হীরক এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হবার জন্য প্রতিবেশী দেশ লাইবেরিয়ার চার্লস টেইলর তার National Patriotic Front of Liberia (NPFL) আরইউএফকে সবধরনের সহায়তা দিতে প্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরই মদতে ১৯৯১ সনে আর-ইউ-এফ আক্রমন করে বসে সীমান্তবর্তি অঞ্চলে। উদ্দেশ্য হীরক খনি দখলসহ সরকার উৎখাত।

সিয়েরালিওনের সরকার বিপ্লবীদেরকে বিশৃংখল সেনাবাহিনী দিয়ে দমন করা সম্ভব নয় বিবেচনা করে গড়ে তোলে মিলিশিয়া বাহিনী। নাম সিভিল ডিফেন্স ফোর্স সংক্ষেপে সিডিএফ। উদ্ভুত পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে সমাধা না করে সিয়েরালিওনের তৎকালীন প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী হিংগা নরমান সেনাবাহিনী ও সিডিএফ দিয়ে আরইউএফকে প্রতিহত করার কৌশল বেছে নেন। ফলে শুরু হয়ে যায় নির্মম এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারনে সিয়েরালিওনে এক দশক সময়কালে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ নিহত হয়। প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্যুত (Displaced) হয়। অসংখ্য পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

আরইউএফ কোমলপ্রাণ শিশুদের জোরপুর্বক ধরে নিয়ে তাদের বাহিনীতে শামিল করে। এই বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালনা করে ‘অপারেশন পে ইয়োরসেলফ’ এবং ‘অপারেশন নো লিভিং থিং’। শিশুদেরকে নেশায় আসক্ত করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়। চালানো হয় তাদেরকে দিয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নারী ও শিশু নির্যাতন। এমনকি মানুষজনদের বিকলাঙ্গ করে দেয়ার মতন চরম পর্যায়ের মানবাধিকার লংঘন।মাদক নির্ভর এই অভূতপূর্ব শিশু বা কিশোর বিপ্লবী বাহিনীরই প্রামানিক দর্শন আমরা দেখতে পাই আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘ব্লাড ডায়মন্ড’-এ। পার্থক্য শুধু এই ছবিতে বরাবরের মতন ভিয়েতনাম যুদ্ধের র‍্যামবোর মতন প্রটাগনিস্ট Danny Archer (Leonardo DiCaprio) কে সূচিত করা হয়েছে আমেরিকানদের শৌর্য–বীর্য প্রদর্শনের জন্যে! যুদ্ধের প্রথম বার মাসের ভেতরেই আর ইউ এফ সিয়েরালিওনের নিষ্ক্রিয় সরকারকে আরও নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে সমর্থ হয়। নিজেদের আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয় দেশের পূর্ব ও দক্ষিনের হীরার খনিগুলোকে।

কয়েকটা বিদ্রোহ-প্রতিবিদ্রোহের পর ১৯৯৬ সালে Ahmad Tejan Kabbah নামের জনৈক ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনের মাধ্যমে সিয়েরালিওনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কাবাহ তার ক্ষমতার নয়মাসের মাথায় আরইউএফ এর সাথে একটা শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হন। কিন্তু তিনি নিজেই Major Johnny Paul Koroma নামের সামরিক বাহিনীর মেজরের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গিনিতে পালিয়ে যান। এই প্রবাসে থাকাকালেই তিনি নাইজেরিয়ানদের সর্বময় কর্তৃত্বাধীন Economic Community of West African States Monitoring Group (ECOMOG) সংস্থার সাহায্য কামনা করেন। ECOMOG তাকে সাহায্য করতে সম্মত হয় এবং সিয়েরালিওনের বিভিন্নস্থানে এর অধিনস্ত সেনাবাহিনি আরইউএফ এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন করে। অতঃপর প্রাথমিকভাবে ECOMOG বাহিনির কাছে বিশৃঙ্খল আরইউএফ বাহিনী পরাজিত হলে ফ্যুদে শাঙ্ক বন্দি হয়।

অতঃপর ফ্যুদে শাঙ্ক’র তার স্থলাভিষিক্ত হয় Sam Bokari নামের আর ইউ এফ এর আরেক নেতা। ইতিমধ্যেই  ‘ধর্ষণ, হত্যা আর অঙ্গহানি’ রণকৌশল দ্বারা বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। প্রবাসী কাবাহ সরকার কর্তৃক ফ্যুদে শাঙ্ককে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু ঠিক পরের বছরেই ১৯৯৯ সনে আরইউএফ পুনরায় সিয়েরালিওনের বিভিন্ন স্থানে নিয়োজিত ECOMOG এর ক্যাম্পসমূহের উপর আক্রমন করে এবং ৫০০০ সাধারন মানুষকে হত্যা করে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তারা ফ্রিটাউন এবং অন্যান্য শহর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আমার ধারনা আর ইউ এফ কর্তৃক আমাদের বর্তমান ক্যাম্পে আক্রমনের ঘটনাটি ১৯৯৯ সনের দিকে ঘটেছিলো।  উল্লেখ্য, এ বছরেই Togo –তে কাবাহ সরকার এবং আর ইউ এফ এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ডাকা হয়। যেখানে ফ্যুদে শাঙ্ককে তার মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিয়ে তাকে সিয়েরালিওনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ প্রদান করা হয়। এবং তার কাছে সিয়েরালিওনের হীরার খনির কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়া হয়। বিনিময়ে ফ্যুদে শাঙ্ক  জাতিসংঘ বাহিনীকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে সিয়েরালিওনে আসতে দিতে সম্মত হন!

লুন্সারে আমার কয়েক পক্ষকালের অবস্থান ছিল মুগ্ধতা আর বৈচিত্রে ভরপুর। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমাদের ক্যাম্পের চারপাশে সারি সারি ‘আয়রন হিল’ সকালের সোনালী আলোতে চিকচিক করছে। পাহাড়ের নিচে উঁচুনিচু সমতল ভূমিতে হাজার হাজার পাম গাছের মাথা মুড়ানো এবং পুড়ানো। দেখে মনে হবে রাতের বেলায় কোন দৈত্য এসে এদের ঘাড় মটকে দিয়ে গেছে! আমি শাব্বিরকে জিজ্ঞেস করলাম, “পামগাছ গুলোর এই অবস্থা হয়েছে কেন?” শাব্বির বলল, “ স্যার, আজ রাতেই বুঝবেন!” বলেই হেসে তার রুমে চলে গেল। রাত নয়টার দিকে প্রবল ক্রান্তীয় ঝড় শুরু হল। মনে হচ্ছে কিয়ামত শুরু হয়েছে কোন ধরনের পূর্ব সংকেত প্রদান করা ছাড়াই! মুহুর্মুহু বিদ্যুতের চমকে ঝলসে উঠছে রাতের পৃথিবী। বিদ্যুতের ফুলকি বের হচ্ছে আমাদের সামনে রাখা টেলিফোন থেকে। আমরা দুজনে মিলে রুমের মাঝখানে জড়সড় হয়ে যিশু খ্রিষ্টের মতন প্রার্থনায় রত। আমাদের দুজনের মুখ থেকে আপনাআপনিই পবিত্র কোরআনের আয়াত ঝরে পড়ছে! অথচ ঘুম থেকে উঠে দেখি রৌদ্র করোজ্জল সোনালি সকাল! ভিউ কার্ডের ছবির মতন চিকচিক করছে পুরো দেশ!

মুলত আসাদ স্যারের অনুপস্থিতিতে তার চলমান কিছু কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখানে আমার প্রধান  কাজ। প্রতিদিন সকালে গাড়ীতে করে জাতিসংঘ হতে আমাদের খাবার হিশেবে সরবরাহকৃত বিস্কুট, চকলেট, কফি ইত্যাদি নিয়ে আমরা গহীন ঘন জঙ্গলের ভেতরে চলে যাই। এমন নিবিড় বন আমি কোথাও দেখিনি। অনেক দূর পর পর এক একটা গ্রাম। ছন দিয়ে তৈরি উল্টো ফানেলের মতন ঘরের চাল। এগুলোই সিয়েরালিওনের আদি বাসস্থান। প্রতিটা গ্রামেই গ্রামের প্রধান আছে। আর কয়েকটা গ্রাম মিলে আছেন একজন ‘প্যারামাউণ্ট চিফ’ যার রোল মুলত জাপানের সম্রাট হিরোহিত’র মতন। ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ অবতার! সবারই খুব সুন্দর সুন্দর তরুণী ভার্যা আছে! এমনকি যে কারো নতুন স্ত্রীকে বিবাহের বাসর রাত প্যারামাউন্ট চীফের সাথে কাটাতে হয়। এ নিয়ে কারো কোন অভিযোগ আছে বলে মনে হলনা! সবাই মনে করে প্যারামাউন্ট চীফরা কখনই মৃত্যুবরণ করেনা। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান তার আত্মাকে নির্ধারিত কোন সময়ে প্রতিস্থাপন করে থাকে মাত্র। সেটাও সম্পন্ন হয় জাঁকজমকপূর্ণ অনুস্থানের মাধ্যমে!

আমাদের এলাকার এলাকার প্যারামাউন্ট চীফ একজন আশি ঊর্ধ্ব বয়সের মানুষ। তিনি মাঝেমধ্যেই আমাদের ক্যাম্পে আসেন। নিয়মিতভাবে আমরা তাকে আমাদের উদ্বৃত্ত খাবার থেকে খাবার সরবরাহ করে থাকি। একদিন আমার জীপের চালক একটা গ্রামীণ বাজারের পাশে এসে সিয়েরালিওনের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পরা একটা ম্লানমুখের সুন্দরী কিশোরীকে দেখিয়ে বলল, “ স্যার, এই মেয়েটা প্যারামাউন্ট চীফের অনেক স্ত্রীর একজন!” – গ্রামীণ সমাজ এখানে স্থবির! যুগ যুগ ধরে সক্রিয় এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে আছে এই নারীরা! মুহূর্তেই আমার জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের ‘টুনি’ চরিত্রের কথা মনে পড়ে গেল!

ব্যতিক্রমও যে আমি দেখিনি তা বলা যাবে না। একদিন সকালে আমার কোম্পানির সিনিয়র জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার) এসে বলল, “এগারোজন মেয়ে এসেছে আপনার সাথে দেখা করার জন্যে।  গোলঘরে বসতে দিয়েছি । লাঞ্চের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।” আমি বিচলিত। শাব্বির আজ সকালেই শুকনো  খাবার বিতরণের জন্যে গাড়ির টহলে বের হয়েছে। গ্রামে গ্রামে প্রদক্ষিন করবে সে, গ্রামের আবালবৃদ্ধবণিতারা সবাই ‘বাংলা, বাংলা’ বলে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এসে তার জীপের চারপাশে ভিড় করবে। শাব্বির তার স্বভাবসুলভ মৃদু হাসি দিয়ে খাবার বিতরন করবে। শান্তি পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেবে!

আমি সিনিওর জেসিওকে বললাম, “আপনি আমার সাথে থাকবেন”! গোলঘরের কাছে যেতেই দেখি অদ্ভুত কলকাকলিতে গোলঘর ভরে আছে। অনিন্দ্য সুন্দর সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়া এক কালো মেয়ে আমার দিকে হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুদ্ধ ব্রিটিশ উচ্চারণে আমাকে সম্বোধন করলো,  “ গুড মর্নিং স্যার। আর নট ইউ ভেরি হ্যাপি, সিইইং দিস মোস্ট বিউটিফুল লেডিস অফ সিয়েরালিওন এট ইওর ক্যাম্প?”

এরা স্থানীয় মিশনারি স্কুলের ছাত্রী। অন্য একটা স্কুলের মেয়েদের দলের সাথে ফুটবল খেলবে। অনুষ্ঠান করার জন্যে আমার কাছে চাঁদা চাইতে এসেছে!প্রাচীনকালে নাকি গ্রীক দেবতারা আফ্রিকার এই অঞ্চলের রাজা-রানীদের সাথে ডিনার পার্টি করতে পছন্দ করতেন!

৩,০৬৮ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।