ঢাকা টু নরসিংদী (ভ্রমন কাহিনী!)

ঢাকা টু নরসিংদী (ভ্রমন কাহিনী!)

আমার বড় মেয়ের ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা শুরু হওয়া থেকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি প্রসেস কমপ্লিট হওয়া পর্যন্ত মোট পৌনে এক বছর সময় লাগলো! মার্চ টু ডিসেম্বর ২০১৪! এই সময়ের মধ্যে পুরো পরিবার নিয়ে আমার কোথাও বেড়াতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজেই এই বছরের শুরুতে যখন আমার মিসেসের খালা নরসিংদীতে তাদের বাসায় বেড়াতে যাবার আমন্ত্রন দিলেন, আমরা লুফে নিলাম।

খুব সকালে যাত্রা করলাম। নতুন বছরে হঠাৎ করে শীতের কুয়াশা সব উধাও হয়ে গেছে। নতুন বছরের সোনালী সকাল। দুই পথে নরসিংদীতে যাওয়া যায়। একটা ঢাকা – ঘোড়াশাল – নরসিংদী , অন্যটা ঢাকা- সিলেট রোড হয়ে নরসিংদী। আমি এর আগে একবার ঢাকা – সিলেট রোড হয়ে একবার নরসিংদীতে গিয়েছি। এটাই নতুন পথ। এই পথেই সবাই এখন ওখানে যাতায়াত করে থাকে। অন্য পথটা অনেকটা পরিত্যাক্ত। অথচ এই পথই এক সময়ে যাতায়াতের একমাত্র পথ ছিল। আমার অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে আমার ড্রাইভার পরিত্যাক্ত পথটাতে ঢুকে পড়েছে! আমরা টের পেলাম কিছুক্ষন পর যখন আমার ছোট মেয়ে উঁচু নিচু পথে গাড়ির আন্দোলনে মুগ্ধ হয়ে আনন্দিতভাবে তার মাকে বলে উঠলো, “ মা , দ্যাখো, আমাদের গাড়িটা কি সুন্দর ভাইব্রেট করছে!” আমার মিসেস বলল, “ আরে, এটা তো পুরনো পথ! ছোটবেলায় আমি এই পথেই অনেকবার এসেছি। চারপাশের জায়গা গুলোও আমি চিনতে পারছি!” ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল এই পথ ছাড়া আর কোন পথ সে চেনে না। আমার কাছে সব পথই সমান। বরং এই পথটাকেই আমার বেশি আপন মনে হচ্ছে কারন এই পথে আমি কখনো আসিনি। রবার্ট ফ্রস্টের, ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতাটা মনে পরে গেলঃ

“ দুটি পথ দুদিকে গেছে চলে হলুদ ফুলে ছাওয়া বনে
দুঃখ বাসা বাঁধে মনে জানি যাবেনা যাওয়া একসাথে দুটি পথে
আর যেহেতু পথিক আমি একা, থাকলাম দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ নিশ্ছুপ –
দুচোখ মেলে দৃষ্টি যতদূরে যেতে পারে—
যেথায় পথ গেছে বেঁকে ঝোপঝাড়ের মাঝে ;
তার পর বেছে নিলাম অপর পথটি, মনোরম অন্যটির মতো
বরং অন্যটির চেয়ে এটা আরও ভাল , কারন
এ পথ ঘাসে সমৃদ্ধ যা ছাঁটা জরুরী
যদিও লোকেরা ঐ পথ ধরেই যায় চলে
পার্থক্য খুব সামান্য, দুটি পথ যমজ যেন”

আমাদের আনন্দিত যাত্রা শুরু হল! রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। নতুন ধানের চারা লাগানো হয়েছে সেখানে। নয়নাভিরাম দৃশ্যপট! সকালের মৃদু আলোতে পুরো প্রান্তর মুখরিত। এই আনন্দকে ম্লান করতে একটু পর পর ক্ষেতের আলগুলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে রিয়েল এসটেট কোম্পানিগুলোর বাহারি বিলবোর্ড গুলো। প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে পুরো প্রান্তরের ওপর এরা এমন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, মনে হয় কৃষকদের তারা দয়া করে চাষ করতে দিয়েছে। আমার স্ত্রী বিলবোর্ড গুলো দেখে আতঙ্কিত। কিছুক্ষন পর পর আমাকে জিজ্ঞেস করছে, “ এই সব জমিই যদি ঘর বাড়ি হয়ে যায়, তাহলে ফসল চাষ হবে কোথায়?” আমি নিশ্ছুপ। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই, অথবা জানা থাকলেও আমি উত্তর দেবার কে?

দিগন্তের আকাশে পেঁজা তুলোর মতন মেঘ। রাস্তার পাশের ডোবাগুলোতে হাঁসেরা সারি বেঁধে ভাসছে। কয়েকটা গরু চরছে পাশের মাঠে। এদের মধ্যে একটা গর্ভিণী গাভীও আছে! গর্ভিণীর পেটের ভেতরে থেকেই বাচ্চাটা চারপাশের সব শিখে নিচ্ছে! মার পেট থেকে যখন বের হবে তখন চারপাশের সবকিছু তার মুখস্ত! মানুষের বাচ্চাদের মতন তাকে নিবিড় পরিচর্যায় বড় হবার দরকার নেই! এ রকম একটার পর একটা অপসৃয়মান দৃশ্যপটের সমান্তরালে আমার শৈশব ও কৈশোর দ্রুত আবির্ভূত হয়ে পুনরায় বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে থাকে! গাড়ির ভেতরে আমরা সবাই নিশ্চুপ। আমার বড় মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে! চারপাশের দৃশ্য পট তাকে খুব একটা আকর্ষণ করতে পারেনি! ছোট মেয়ে ট্যাবে গেইম খেলছে!

মাত্র দুই ঘণ্টা পর আমরা নরসিংদী পৌঁছে গেলাম। শহরের প্রবেশ পথেই মুক্তিযুদ্ধের একটা স্মৃতিস্তম্ভ। ভিত্তি প্রস্তরের গায়ে বড় বড় অক্ষরে নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের নাম লেখা। শত্রু অথবা প্রিয়জনদের হাতে নিহত হবার পর শহরের বুকে যত্র তত্র তার তৃতীয় মৃত্যু দিবসে এখনও তার হত্যাকারীদের বিচারের দাবি বৈদ্যুতিক পাইলনের গায়ে শোভা পাচ্ছে! আমার মনে হল বিখ্যাত মানুষেরা তাদের মৃত্যুর পরেও যীশু খ্রিস্টের মতন পুনরত্থিত হন অন্তত বছরে একবার! কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে তার স্মৃতি ক্রমশ ম্লান হতে হতে একসময়ে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু হত্যাকারীরা ক্রমশ প্রবল হতে প্রবলতর ভাবে শক্তিশালী হতে থাকে! তাদের কখনও বিচার হয়না!

– মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

 

১,৮৪৯ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।