সারফেস অ্যানাটমি

মৌসুমীর লগে দেখা হইলো চার বছর পর। লোকাল বাসে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতো ঝুইলা ঝুইলা যাইতে ছিলাম। শাহাবাগ টু কাকরাইল। আট নাম্বার বাস। এই বাস গুলাতে সিট পাওয়া যায় না। অনেক সময় ধইরা ঝুইলা আছি দেইখা মৌসুমী ডাক দিলো।

ওই তুমি মাহফুজ না?? প্রথমে আমি মাহফুজ পরিচয় দিতে রাজি হই নাই। এই রকম ঝুইলা ঝুইলা যাওয়া একটা প্রেস্টিজের ইস্যু। এছাড়া মৌসুমীর লগে একবার আমি আকাম করছিলাম। এরপর ওর স্বামীর নাম্বার কালেক্ট কইরা কইছিলাম, আপনার বউয়ের বুকে তিল আছে। লাল তিল। কি মিয়া ঠিক কইছি না?

ওর স্বামী আমার কথা শুইনা ভয় পাইয়া কইলো, আপনে কেমনে জানলেন ভাই?? কেডা আপনে??

আমি কইলাম, আমি কেডা হেইয়া তোমার বউরে জিগাইয়ো। প্রেস ক্লাবের সামনে হোটেল ডিলাক্সে ৮০০ টাকা দিয়া নন এসি রুমে বহুরাত এক লগে আছিলাম, স্বামী স্ত্রী পরিচয় দিয়া।

আমার কথা শুইনা লোকটা বললো, ভাই আপনে ফোন দিচ্ছেন কিল্লায়?? চান কি আপনে??
আমি কইলাম, আমার কাছে একটা ভিডিও আছে। তিরিশ মেগাবাইটের। রেজুলেশন ভালো না। তয় আপনের বউয়ের মুখ স্পষ্ট বোঝা যায়। আসল কথায় আসি। আপনে তো সরকারের আমলাগিরি কইরা প্রচুর টাকা পয়সা কামাইছুন। হেই টাকা থেইক্কা আমারে বেশি না, ১০ লাখ টাকা দিবেন। আর আপনি ভিডিওডা লইয়া যাবেন।

আমি ওই ভিডিও দেইখা কি করুম ভাই? যা করার তো কইরাই ফেলছেন। আপনি বরং ওইডা এক্স ভিডিও ডট কমে আপলোডাইয়েন। দেইখা লমুনে। দশ লাখ টাকা দিয়া রেজুলেশন খারাপ হওয়া ভিডিও দেখুম না। এই টাকায় তো সানিরে পাওন যাইবো।

আমি লোকটার নির্লিপ্ততা আর রসবোধ দেইখা অবাক হইছিলাম। আমার নাম মাহফুজ। যে বছর মেডিকেলে প্রশ্ন আউট হইছিলো আমি ওই বছর কোথাও চান্স না পায়া নষ্ট হইয়া গেছিলাম। তারপর বাইচা থাকনের লাইগা অদ্ভুত সব পন্থা বাইর করছিলাম। আমার একটা গার্লফ্রেন্ড আছিলো। ওর নাম হইলো মৌসুমী। মৌসুমী একটা সরকারী মেডিকেলে চান্স পাইয়া আমারে টাটা গুড বাই দিছিলো। আমি মাইনা নিতে পারি নাই। অবশ্য টাটা গুড বাই দেওয়ার আগের রাতে মৌসুমী কইছিলো, শোন তোমার লগে রিলেশন কন্টিনিউ করা এখন একটা প্রেস্টিজের ইস্যু। কাল থেইকা তুমি আমার এক্স হইয়া যাবা। এর আগে আমি তোমার সারফেস এনাটমি করুম।
আমি অবাক হইয়া কইছিলাম, এইডা আবার কি, জান?
ও কইলো, তুমি টান টান হইয়া খালি গায়ে শুইয়া থাকবা। আমি তোমার শরীরের হাড় গুলার নাম আর বডির জিয়োগ্রাফি মুখস্ত করুম হাত দিয়া ধইরা ধইরা। এইটারে কয় সারফেস অ্যানাটমি।

সারারাত ও আমার সারফেস অ্যানাটমি করলো। শেষ রাতে কইলাম, অনেক তো করলা। এইবার আমি করি।

কি করবা?? সারফেস অ্যানাটমি??? শোন, আর কিছু কইরো না। কাল থেইকা তুমি আমার এক্স হইয়া যাবা। খামাখা পেইন বাড়ায়া লাভ আছে??

আমি কইলাম, আমি অন্য কিছুই করুম না। টেনশন নিয়ো না।

মৌসুমী ঘুমায়া গেলে আমি ওর পুরা শরীর ভিডিও করছিলাম। নোকিয়া এন 95 মোবাইল দিয়া। সকালে উইঠা দুইজন ফ্রেশ হইয়া যে যার রাস্তা ধরলাম। এরপর থেইক্কা ওরে আর জালাই নাই। খালি মাঝে মাঝে বুকটা ফাকা ফাকা লাগতো। মনে হইতো কেউ শালার সারফেস অ্যানাটমি কইরা দিলে ভালোই হইতো। শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে। অনেক রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাটতাম। হুমায়ুন নামের এক কবির লগে দেখা হইতো। এই কবির লগে প্রেম আছিল লাবন্য নামের এক হিজড়ার। তিন বছর প্রেম করার পর যখন জানলো এইটা হিজড়া, তখন হুমায়ুন কইলো, আল্লায় সবই দিছে। খালি একটা ভ্যাজাইনা দিলেই হইতো। এমন মাল পাওয়া খুব টাফ।

আমি কবি হুমায়ুনের দিকে চাইয়া কইতাম, ওইডা নাই দেইখাই তোমার মতো কবিরে ভালোবাসছে। নাইলে তো এখন এসির মধ্যে বইসা কোন টাকলুর সারফেস অ্যানাটমি করতো।

হুমায়ুন আমার কথা বুঝতে না পাইরা কইলো, কি অ্যানাটমি?? এইডা আবার কি??

আমি হুমায়ুনের সারফেস অ্যানাটমি কইরা দিলাম। এরপর প্রায়ই রাতে কবি ফোন দিয়া কইতো, মাহফুজ ভাই। শইল্ডা ভালা নাই। সারফেস অ্যানাটমি করতে মঞ্চায়। আমি হুমায়ুনরে ঝাড়ি দিয়া কইতাম, যা শালা। আমারে রেইনবো পাইছোস?? লাত্থি দিয়া সারফেস অ্যানাটমি তোমার অ্যানাস দিয়া বাইর করুম।

এরপর আমার মৌসুমীরে মনে পড়তো। ফোন দিয়া দেখতাম ওয়েটিং। আমার মেজাজ বিগড়াইয়া যাইতো। আমি মেসেজ পাঠাইতাম,
তোমার বুবস গুলা মিস করতেছি।

এই মেসেজ পাইয়া মৌসুমী খেইপা যাইতো। আর আমার নাম্বার ব্ল্যাকলিস্টে রাইখা দিতো। আমি মজা পাইতাম।

এইভাবে দুই বছর কাটার পর জানলাম, ওর বিয়া হইয়া গেছে। আমিও ভুইলাই গেছিলাম সবকিছু। হঠাত একদিন মেমোরি কার্ড খুইজা পাইলাম একটা। ফরম্যাট দেওয়ার আগে সেই ভিডিওডা পাইলাম। খুইলা পুরনো মৌসুমীরে ভালো কইরা দেখলাম। খোজ নিয়া জানলাম, স্বামীর কথা। নাম্বার কালেক্ট কইরা কিছুটা ঝামেলা করার ইচ্ছা হইলো। হাতে টাকা পয়সা নাই। কিন্তু ওর আবুল স্বামী কোন পাত্তাই দিলো না।

এতক্ষণ ভাবলাম। পুরানা কথা। মৌসুমীরে কইলাম, হ। মাহফুজ। চিনছো?
মৌসুমী কইলো, চিনুম না। তোমার সারফেস অ্যানাটমি কইরাই তো অ্যানাটমি পাশ করছিলাম ফার্স্ট ইয়ারে। তারপর কি খবর, সিগারেট খাও নাকি?
আমি কইলাম, আমার ঠোট দেইখা মনে হয়?
না। ঠোট তো গোলাপিই আছে। কিন্তু এতে কি। খাইতেই পারো?
আমি পালটা প্রশ্ন করি, তুমি চুমু খাও?
এইটা কেমন কথা?? বিয়া করছি খামুনা???
আমি কইলাম, দেইখা তো মনে হয় না। ঠোট কিছমিছের মতো চুপসায়া আছে।

মৌসুমী লজ্জা পাওয়ার আগে বাস কাকরাইল পৌছাইয়া গেল। নামার আগে মোবাইলডা খুইলা সেই মেমোরি কার্ডটা বাইর কইরা মৌসুমীর হাতে দিলাম।
ও কইলো, কি এইডা?
আমি কইলাম, আমিতো অহন সিনেমা নাটক বানাই। একটা মিউজিক ভিডিও আছে স্বামীর লগে বইসা দেইখো।

(ছোটগল্প: সারফেস অ্যানাটমি
২১ সেপ্টেম্বর,২০১৫)

৩,০৯৮ বার দেখা হয়েছে

১৫ টি মন্তব্য : “সারফেস অ্যানাটমি”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    কেয়াবাত, ভাইয়া :clap: :clap:

    তোমার লেখা পড়তে পড়তে মনেহলো এই দেশটিকে আমি দেশে দেখে আসিনি। এইসব সংলাপ এবং চরিত্রগুলো আমার অচেনা। বদলে যাওয়া দেশের তরুণ সমাজের যে ছবি এঁকেছো এক কথায় অসাধারণ!

    গতকালই ঈদসংখ্যা ব্লগের কথা বলছিলাম আমার মন্তব্যে। আজ ঘুমঘুম চোখে সিসিবিতে এসেই মনেহলো আমার ঈদসংখ্যা বিচিত্রাটি মাত্রই হাতে পেলাম 😀

    উপচে পড়া মুগ্ধতার সাথে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলাম!

    জবাব দিন
    • রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

      আপা, এটাই নির্মম বাস্তবতা আর এ সময়ের তরুণদের মুখের ভাষা। আমি সেভাবেই লিখেছি, ব্যত্যয় ঘটেনি। আর ঘটনাগুলো জীবন থেকেই নেয়া, হয়তো নিজের নয়, তবে চারপাশের।

      আগে কিন্তু আপা বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে লিখতাম। ঈদ, নববর্ষ। দীর্ঘদিন পর সিসিবিতে ফিরে এসে মনে হচ্ছে ফ্রেশ অক্সিজেন পাচ্ছি। 🙂


      নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
      খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
      বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
      কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

      জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন লিখেছো রাব্বী। আমরা যারা কবিতা টবিতা কম বুঝি তাদের জন্য পদ্যের পাশাপাশি এরকম কিছু গদ্যও দিও 🙂


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।