অকারণে এলোমেলো…

গত কয়েকদিনে বেশ ক’জন প্রাক্তন সতীর্থ, জ্যেষ্ঠ্য-কনিষ্ঠ বন্ধু ও বন্ধুপত্নীদের গুরতর অসুস্থ হওয়া এবং পরপারে চলে যাবার মর্মান্তিক দুঃসংবাদে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। অনিবার্য মৃত্যু সম্পর্কে পবিত্র ক্বুর’আনে বহুবার আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছেঃ “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যু আস্বাদন করতে হবে” । (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৮৫); “তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও”। (সূরা নিসা, আয়াত নং ৭৮); “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷ আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷” (সূরা আম্বিয়াঃ ৩৫)। এ ছাড়াও বড় বড় মুনি, ঋষি, কবি, দার্শনিকেরা নানাভাবে আমাদেরকে মৃত্যুর অনিবার্যতার কথা বলে গেছেন। যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেনঃ “জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?”

পরিবারের যে কোন একজন সদস্য হাসপাতালে শয্যাশায়ী হলে সে পরিবারে বিষাদ ও বিড়ম্বনা দুটোই ক্রমান্বয়ে শেকড় গাড়তে শুরু করে। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তার সাহেব যখন গম্ভীর মুখে কোন দুরারোগ্য ব্যাধির ঘোষণা দিয়ে বসেন, তখন সে পরিবারের উপর আকাশ ভেংগে পড়ে। আমার চেনা শোনা কয়েকটি পরিবার এখন এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সদা হাসিখুশী এই মানুষগুলোর মুখে আকস্মিক নেমে আসা বিষাদের ছায়া দেখে খুবই ব্যথিত বোধ করি, কিন্তু তাদেরকে কোন সান্তনা দেয়ার ভাষা আমি কখনো রিহার্সেল করেও রপ্ত করতে পারিনি। আমার একমাত্র সম্বল তাদের জন্য জন্ম মৃত্যুর একচ্ছত্র অধীশ্বরের নিকট নীরবে দরখাস্ত পেশ করা, আমি তাই সর্বান্তঃকরণে উজার করে দেই। ইদানীং নিজেকে তেমনই কোন বিষাদগ্রস্ত পরিবারের একজন হিসেবে ভাবার প্রবণতা ঘুরে ফিরে আমার মাথায় আসছে। আমি নিজে কখনো যদি এমন একটা বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়াই, তবে পরিস্থিতি কেমন হবে সে কথা ভাবতে গেলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা হিমশীতল স্রোত ওঠানামা করে। নিজের ব্যথা বেদনার জন্য নয়, প্রিয়জনদের আমি কতটা দুশ্চিন্তা আর মনোস্তাপের মধ্যে ফেলবো, সেকথা ভেবে।

ডাক্তাররা যতই কঠিন হৃদয়ের লোক হন না কেন, আমি অনুভব করি কোন রোগীকে দুরারোগ্য রোগের দুঃসংবাদ দিতে তাদেরও অনেক খারাপ লাগে। আমার এক ডাক্তার বন্ধু আমাকে বলেছেন, তার এ কাজটা করতে খুব খারাপ লাগে, এটা যেন মৃত্যু পরোয়ানা স্বাক্ষর করার সামিল। আমার কারণে কোন ডাক্তারকে এমন একটা ঘোষণা দিতে হবে আমারই প্রিয়জনদের কাছে, এটা ভেবেই আমি কল্পনায় সেই অজানা ডাক্তারের কাছে বিব্রত বোধ করি, আর প্রিয়জনদের কল্পিত মলিন মুখগুলোর কাছে অপরাধী হিসেবে তীব্র মর্মপীড়া অনুভব করি। আমার কী হবে সেটা পরের কথা, কিন্তু তাদের কতটা দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হবে, সেটা ভেবেই অস্থির হয়ে যাই। আমাকে ভালবাসার জন্য যেন তাদের কাউকে চড়া মূল্য দিতে না হয়, সেটাই আমার আন্তরিক কামনা। ওরা আমাকে কখনো ব্যথিত করে নাই, আমিও যেন চলে যাবার আগে ওদের কাউকে কোন মানসিক দুশ্চিন্তা, অবসাদ কিংবা বেদনা দিয়ে না যাই। যে অনিবার্যতা অবশ্যম্ভাবী, তাকে হাসিমুখে বরণ করে নেয়ার সাহস আমাকে তিনিই যোগাবেন, যাঁর উপর আমার অন্তহীন আস্থা। তবে সেটা যেন হয় শুধু আমার আর তাঁর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে, তাঁর দয়ার মাঝে থেকেই যেন আমার অন্তিম যাত্রা শুরু ও শেষ করতে পারি, প্রতিটি রূহের চিরবন্ধু সেই দয়ালু ও মেহেরবান প্রতিপালকের কাছে এটাই আমার নিত্য প্রার্থনা। প্রার্থনা কবুলের মালিকও একমাত্র তিনিই।

পরিশেষে, আবার আমার সেই পীড়িত ও প্রয়াত বন্ধু, বন্ধুপত্নী ও প্রাক্তন সতীর্থ-সহকর্মীদের কথায় ফিরে আসছি। আমরা পীড়িত হলে যিনি আমাদেরকে আরোগ্যদান করেন, সেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর নিকট একান্ত প্রার্থনা, তিনি যেন পীড়িতদের সম্পূর্ণ আরোগ্য দান করে তাদেরকে স্বগৃহে প্রিয়জনদের কাছে ফিরিয়ে দেন। আর যারা প্রয়াত হয়েছেন, তাদেরকে যেন তিনি তাঁর অপার ক্ষমায় বিপদমুক্ত করে দেন, শান্তিপূর্ণ ক্ববর দান করেন এবং শেষ বিচারের দিনে জান্নাতের সম্মানিত অধিবাসীদের সাথে একই কাতারভুক্ত করে নেন! তাদের পরিবার পরিজনদের সহায় হয়ে তিনি যেন তাদেরকেও দুনিয়ার বালা মুসিবত থেকে সুরক্ষা করেন!

ঢাকা
২৫ অগাস্ট ২০১৫
স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

৪,০৮৬ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “অকারণে এলোমেলো…”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    শুধু অসুস্থতা না, যে কোন খারাপ সময়েই কাউকে বলার মত কিছু খুজে পেতে আমারো অনেক কষ্ট হয়। মনে হয় আমার কোন কথাই যথেষ্ট নয়।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. কাজী আব্দুল্লাহ-আল-মামুন (১৯৮৫-১৯৯১)

    হঠাৎ করেই কেন যেন চারিদিকের চিরচেনা পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠেছে। আজকাল দু:খের বিষয়গুলো বুকের ভিতর ভীষন চাপ তৈরী করে। ভাবনাগুলো এলোমেলোভাবে সব সময় তাড়িত করে, কিন্তু সহজ করে প্রকাশ করতে পারিনা। আপনার গোছানো লিখনীর মধ্য দিয়ে আমাদের অব্যক্ত কথাগুলোই যেন আজ ব্যক্ত হলো...

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    মৃত্যু কে ভয় পাই না। তবে কতো কিছু করা বাকি জীবনে। আরেক অর্থে এখনো কিছুই করা হলো না। দেয়ালে একটা দাগ রাখা হলো না। মা ক্যান্সারে মারা গেছেন। নানা ও। আমি ও ক্যান্সারের প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি। আবার গাড়ি চালাই। এক্সিডেন্টে মারা যেতে পারি। আর ভাগ্য বেশি খারাপ হলে হন্তারকের হাতে উঠে আসবে ছুরি।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
    • খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

      মৃত্যুকে ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই। সেটা যখন অবশ্যম্ভাবী, তখন খুশী মনে বরণ করে নেয়াই শ্রেয়ঃ। কিন্তু সমস্যা আমার অন্যখানে। নিজের মৃত্যুকে নিয়ে পরিজনরা এবং প্রিয়জনেরা বিচলিত হোক, পরিশ্রান্ত হোক, নিঃশেষিত হোক, এটাকে মেনে নিতেই যত বিপত্তি।
      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, রাজীব।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।