খবর, ইতিবৃত্ত আর ভ্রষ্টদের উপাখ্যান -০১

আকিজ ঠিক যে মুহূর্তে ঘোষ এর দোকান থেকে সন্দেশ দিয়ে উদর পূর্তি করে বের হল, ঠিক তখনি খবরটা তার কানে এল । এত বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা কিভাবে ঘটে যেতে পারল তা নিয়ে বকুল চত্ত্বরের সজ্জাদ, রাজীব, আল আমিন , কচাতলার মোড়ের ফাহিম হায়দার,মিল্টন এবং গৌতমের চায়ের দোকানে বসে সকাল থেকে মাঝরাত অব্দি আড্ডা মেরে চলা রসুল,সিরাজ আর পান্নুর মতই তারও চিন্তার কোন অন্ত রইল না। দুপুর অব্দি এই ঘটনা মাগুর মাছের পুকুরের ইজারাদার এবং প্রভাবশালী পাড়ার বড় ভাই ভেস্পা মানিক এর কানেও পৌঁছে গেল, এবং ঘটনার প্রকার শুনে সে আপন মনেই বলে উঠল ” নাহ , ছেলেপিলে কয়ডার মানুষ করতি পাল্লাম না” । তার এই আক্ষেপ সরল ছন্দিত স্পন্দনের মতই তার কিছু সাগরেদ আর শুভাকাঙ্খীর কানে পৌঁছানো মাত্রই তারা এর কারন , প্রতিকার এবং ভবিষ্যত প্রতিরোধ নিয়ে বিকেলেই সেই নাসিরের দোকান, যেই দোকানেই ঘটনার সূত্রপাত, সেখানেই এক আলোচনা সভা ডেকে বসে রইল।আলোচনা সভার গুরুত্ব অনুধাবন করে দুপুরে কালীগঞ্জে লুকিয়ে ডাল খেতে যাওয়া কামরান টপাটপ এক বোতল সাবাড় করেই মোটর সাইকেল সহযোগে ফেরার পথে চুতলিয়ার মোড়ে দুর্ঘটনায় পতিত হল এবং হাত ভেঙ্গে দুপুরেই সদর হাসপাতালে ভর্তি হল। সবাই তখন সেই ঘটনাকে কিছুক্ষনের জন্য ভুলে দৌড়ে হাসপাতালে গেল এবং কামরান তাদের বলল

” আমি তো বাড়িরতে কুমড়োর বড়ি দিতি গিলাম খালার বাড়ি, আসার সময় ওই মোড়টার মদ্যি দেকি এট্টা গরু রাস্তা পার হচ্চে। আমি সামনে যাতিই গরুডা একদম বাগের মত করে দেকে উইঠল , এইডে যে কি ভূত না জীন কিডা কবে ? আমার আর কোন হুশ নেই তারপরেতে।”

সকলে হায় হায় করল, এবং তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করল, আর এর আশে পাশের কোন এক সময় গৌতমের দোকানে বসে ঘটনা শুনে রসুল বলে উঠল
” শালা ডাল খোর “।

শহরের একদম মাঝেই নাসিরের দোকান। ঢ্যাল ঢ্যালা চা আর বেশি দুধ চিনির বড় চা বানাতে তার জুড়ি নেই। তার এই চায়ের অধিকাংশ কাস্টমার ই কালীগঞ্জ থেকে যারা হাত পা না ভেঙ্গে ফিরে আসে তারা । এই চা তাদের শরীরে এক অন্য রকম আমেজ সৃষ্টি করে বলে তারা দাবী করে।

ওদিকে সন্ধ্যে পড়তে না পড়তে কলেজ মোড় পেরুতেই আজিজ ফিসফিসিয়ে বলে উঠল “ডাল খাবি কাকা ?”……
ওর আচমকা কথা শুনে, ডানে বামে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে মিলন জিজ্ঞেস করল ” আছে তোর কাছে?”
হুম আছে…
চল স্টেডিয়ামে চল…
চল …
দর কষাকষি করে এক রিকশা ঠিক করে সোজা স্টেডিয়াম। হাউজি মাঠের পাশের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আবার হটাত বিরু কাকার সাথে দেখা।
“কোনে জাচ্ছিস?”
— এইতো জাচ্চি।
“সেতো দেখতিই পাচ্চি জাচ্চিস, তা এদিক কনে জাচ্চিস?
— এইতো এট্টু জাচ্চি আরকি।
” বিয়াদপ”
আসসালামুয়ালাইকুম চাচা।
বলেই হনহন করে ছোট গেটটা দিয়ে ঢুকে সোজা গ্যালারির উপর। অন্ধকার স্টেডিয়াম, মাঝে কিছু জোনাকি উড়ছে আপন মনে। গ্যালারীর পাশের সিকিউরিটি বাল্বগুলো বড় আজন্মা মনে হল মিলনের। ভেঙ্গে ফেলবে নাকি , দুই একটা বাল্ব? এর আগে এক রাতে গ্যালারিতে শুয়ে যখন তারা গুনছিল তখন হটাত করে মনে হল চোখের উপর জ্বলে থাকা বাতিটা বড় বিরক্ত করছে অনুভূতি সৃষ্টিতে। অনুভূতির দাম যেহেতু কোটি টাকা সেহেতু বেচারা বাতিটাকে অকালে জীবন দিতে হল। একটু পরই সারির একটু দূরের বাতিটাও সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে তার মনে হল, তারপর তার পরের বাতি, তারপরের বাতি… প্রায় চার পাচটা বাতির জীবন নষ্ট করার পর সে একটু আরাম পেয়েছিল। নাহ, আজ থাক।আজ আর বেশিক্ষন থাকবে না এখানে।
— কই বের কর।
“দাড়া বাল, বের করতি দে তা”… আজিজের মুখে মধুর হাসি।
— ধুর ক্যালাইস নে, বের কর।
অবশেষে আজিজ তার ঢোলা পাজামার পকেট থেকে এক প্যাকেট প্রান ডাল ভাজা বের করে দাত দিয়ে ছিড়ে মিলনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল” নে বা… ডাল খা”
বলেই দাত মুখ খিচিয়ে একটা হাসি দিল।
মিলন আর তখন কি বা বলবে , ডাল খেতে এসে ডাল দেখে সেও একখানা স্মিত হাসি টেনে বলল ” তুই শালা আসলেই ডাইল খোর”…………………

(চলবে)

৬২৫ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “খবর, ইতিবৃত্ত আর ভ্রষ্টদের উপাখ্যান -০১”

  1. টিটো মোস্তাফিজ

    =)) =)) খুব ভাল লিখছ । হাল জমানার মাদকাসক্তদের নিয়ে একখান লিমেরিক লেখছি। তোমাকে উৎসর্গ করলাম-

    কুম্ভিলক

    মায়াকান্নায় নক্র মশাই সাজেন বড় স্তাবক
    মহান কাজে ভিখ মাগেন গিরিগিটি তঞ্চক
    কল্কে বোতল
    শুকনো গরল
    গড্ডালিকার কুম্ভিলক।


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন
  2. দিবস (২০০২-২০০৮)

    পেশাদার গাঁজাখোর রা নিজেদের মধ্যে গাঁজাকে অন্য কোন নামে ডাকে। ডাইলের বেলাতেও তেমনি, এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন ছদ্মনাম থাকে। তাই যখন

    ডাল খাবি কাকা

    দেখলাম। ডাউট টা রেডি করেই ফেললাম B-) । কিন্তু শেষের টুইস্টটা আমাকে আর কোন ডাউট দেয়ার সুযোগ দিল না। লেখা চলুক। 😀


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।