কল্পপুরের গাড়ি আর একটা ইনটেক বার্থডে…

ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে, দুপুর একটা বাজে। হঠাৎ-ই কল্পপুরের এক গাড়ি এসে হাজির। আরে, আজ না ১৫ই এপ্রিল, টাইম তো ২টা ছিল, তাইনা?

তড়িঘড়ি করে কল্পপুরের গাড়িতে চেপে বসলাম। গন্তব্য সেই ৬বছরের সম্পর্কে আঁটকে পড়া সবগুলো মুখের সাথে দেখা করা। আসলেই, আমার সেই ৬বছরের বন্ধুগুলো যেন ঐঠিক সেরকমই রয়ে গেছে আমার কাছে। এখন যতই ডিএসএলআর-এ ছবি তুলে ফাটিয়ে দিক, আমার কাছে আশিক সেই তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থাকা গোবেচারা আশিক-ই আছে। জাহান যতই পড়ালেখার যাতাকলে পিষ্ট হোক না কেন, আমার কাছে জাহান সেই দাতের নিচে ব্যাঙ্গের ঠ্যাং পিষ্ট করা জাহানই আছে। বা আমাদের নেভী অফিসার খালিদের কথাই বলি না! যত বড় অফিসারই হোক, আমার কাছে ও পাশের বেডের খালিদই আছে।

তো, কল্পপুরের গাড়িতে চেপে একে একে সবার সাথে দেখা করা হলো। মাসুদ, মেহেদী, শরীফ থেকে শুরু করে রিয়াদ, আল-মামুন, সাকিব পর্যন্ত সব্বাই। অনেকদিনপর সবাইকে দেখে কী যে অনুভূতি হলো তা বলে বোঝানো যাবে না। অনেকের সাথেই সেই কলেজ পাশ করে আর দেখা হয়নি, অনেকের সাথে আবার নিয়মিতই হয়। তারপরও, এই কল্পপুরে যেন সবাই আমার মনের মত একেকজন। সবাই আমাকে মিস করে, সবাই আমাকে দেখে কত্ত খুশি। কেউ কেউ তো জড়িয়ে কেঁদেই ফেলল। সুদূর অষ্ট্রেলিয়াবাসী শরীফ, আইভরী কোষ্টবাসী তাহসিন সবার সাথেই দেখা হলো। এইদিনটার জন্য নাকি তারাও অপেক্ষা করছিল। যাদের সাথে কোন দিন আর দেখা হওয়া সম্ভব কিনা তাই নিয়ে সন্দিহান ছিলাম, তাদের সাথেও দেখা হলো।

এক এক করে সবার সাথেই দেখা হলো। ফিরবার পথে ফিরোজ, আফিক, রুবেল-এর সাথেও দেখা হলো। সবার সাথে দেখা যখন শেষ ঠিক তখনি একদম গল্পের ক্লাইমেক্সের মত কল্পপুরের গাড়িটা কষে একটা ব্রেক কষলো, ওমনি বাস্তবতায় পদার্পণ।

আমার বেশ অনেকদিনের ইচ্ছে (বলতে গেলে ২-৩বছরের) একদিন সময় করে ইনটেকের সবাইকে ফোনে নক করা, শুধু জিজ্ঞেস করা, “দোস্ত, ভালো আছিস তো?”। এতদিন করবো করবো করেও করা হয়নি, তাই ভাবলাম আজ তো ইনটেক বার্থডে, আজই মোক্ষম সময়। আর কালক্ষেপণ না করে, ফ্ল্যাশ আর গোথামের নতুন এপিসোড না দেখে, দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে লেগে গেলাম ফোন দিতে। এক এক করে মোবাইলের বোতাম টিপে টিপে (স্মার্ট ফোন নেই বিধায়) ফোন দিতে দিতে যখন কলসংখ্যা ২০-এর কিছু অধিক, ততক্ষণে দেখি বিকাল পাঁচটা বাজছে। অফিস আওয়ার শেষ, অগত্যা ওখানে বিরতি দিয়ে বাসায় ফিরতেই গত একসপ্তাহ ধরে চলে আসা জ্বর আবার বেড়ে গেল। ফোন কি উঠাবো, চোখের পাতাই উঠাতে পারছিলাম না। অতঃপর আম্মু আর ছোট্ট বোনটার পরিচর্যায় কিছুটা সুস্থ্য হয়ে দেখি রাত্রি সাড়ে এগারোটা বাজে। ফোন দেওয়ার শক্তি না পেয়ে সবাইকে এসএমএস-এই জানিয়ে দিলাম, “হ্যাপি বার্থডে”।

ক্যাডেট নাম্বার ধরে ধরে ফোন দেওয়া শুরু করেছিলাম। তাই এক অংশের সবাইকে ফোন দিয়েছি, ফেসবুকের ফোন ডিরেক্টরী ঘেঁটে, নিজস্ব ফোনবুক থেকে। ফোন দিয়েছি সঠিক, ফোন ধরেছে বেশ ক’জন, কথাও হয়েছে, তবে সবার সাথে না। বাস্তবতার সাথে কল্পপুরের এতটা কেন পার্থক্য? ক’জনের সাথে মাঝে মাঝেই কথা হয়, তাই খুব একটা আলাদা লাগেনি, কিন্তু ক’জনের সাথে অনেকদিন পর কথা বলে মনটায় একটা আলাদা তৃপ্তি পেলাম। অবশ্য কিছু ফোন ছিল বরাবরের মতই একমুখী, নো অ্যানসার। ভাবতে কষ্টই হয়, কাউকে কাউকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ভার্সিটি জীবনে পা রেখে নতুন বন্ধুমহল পেয়ে হয়ত আমাদের আর তাদের প্রয়োজন পড়ে না।

এসএমএস-এর ব্যাপারটাও কিছুটা ফোনের মতই, কেই রিপ্লাই দিল, কেউ দিল না। তারপরো, কারো রিপ্লাই পেয়ে বলতে ইচ্ছে করলো, “দোস্ত, ইউ জাস্ট মেইড মাই নাইট”।

গতকাল ১৫ই এপ্রিল, ২০১৫ ছিল জেসিসি ৪১ ইনটেক আর ক্যাডেট ব্যাচ ২০০৪-২০১০ এর ইনটেক বার্থডে। টিএসসিতে আয়োজন ছিল, অফিসের কারণে যেতে পারিনি, অসুস্থতার কারণও আছে। সরি বলছি না, থ্যাঙ্কস দিচ্ছি, সব্বাইকে। থ্যাঙ্কস দিয়ে তোদের ছোট না করলে এই ক্ষুদ্র প্রাণে রাখবো কিভাবো?!

১,৫৬৪ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “কল্পপুরের গাড়ি আর একটা ইনটেক বার্থডে…”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    "ভার্সিটি জীবনে পা রেখে নতুন বন্ধুমহল পেয়ে হয়ত আমাদের আর তাদের প্রয়োজন পড়ে না।" - নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ৩২ বছরের পেশাগত জীবনে যাদের নিবিড় সান্নিধ্যে পথ চলেছি, কষ্ট সয়েছি, একসাথে ইঁদুর দৌড় দৌড়েছি, তাদের চেয়েও ঐ ৬ বছরের অকৃ্ত্রিম বন্ধুত্ব অনেক, অনেক বেশী শক্তিশালী ও কালোত্তীর্ণ।

    জবাব দিন
  2. সাইদুল (৭৬-৮২)

    "আমার বেশ অনেকদিনের ইচ্ছে (বলতে গেলে ২-৩বছরের) একদিন সময় করে ইনটেকের সবাইকে ফোনে নক করা, শুধু জিজ্ঞেস করা, “দোস্ত, ভালো আছিস তো?”

    ভালো লাগলো, আমারও অনেকদিনের ইচ্ছে এই কান্ডটি করারা


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।