আমার অ্যাথলেট জীবন


আমি কখনই নিবেদিতপ্রাণ অ্যাথলেট ছিলাম না, ছিলাম না কোন দুর্দান্ত দৌড়বিদ, লম্ফবিদ, নিক্ষেপকারীও। তাই লেখাটার নাম “আমার অ্যাথলেট জীবন” না হয়ে “আমার দর্শক জীবন” হলেই বোধহয় নামকরণের সার্থকতা প্রকাশ পেত।

অতীতের কোন এক ক্লান্ত বিকেলে প্রিফেক্ট/জে.পি.-র চাপে পড়ে একদল ক্লাস সেভেনের দিক-বিদিগ্‌জ্ঞানশুণ্য দৌড়ে (যেটাকে ইংরেজীতে HITS বলে) প্রথম সারিতে না থাকতে পারার দরুন আমি কোনদিন স্প্রিন্টার হতে পারলাম না! তাই ফুটবল পায়ে বোল্টের গতিতে দৌড়াতে পারলেও কোনদিন ওই ১০০মিটারের ট্র্যাকে দৌড়ানো হলোনা। পরবর্তীতে শুধু হপ্‌ স্টেপ জাম্পেই যেটুকু অংশগ্রহণ, আর লং জাম্পে বালিস্পর্শ, এর বেশি আর যাওয়া হয়নি। ভার্সিটি (IUT)-তে যখন অ্যাথলেটিকস্‌ হলো, প্রথমবার ভিনদেশি দানবগুলোর ভয়ে পা দিইনি, পরেরবার আমিই কিনা লং জাম্পে ২য়, হপ্‌ স্টেপে ৩য়! অ্যাথলেট জীবনে ভার্সিটি লাইফের ৫টি মেডেলই আমার অ্যাথলেটিক্সে পারদর্শীতার প্রমাণ। (এখানে বলে রাখা ভালো, ১১শ-তে থাকতে প্র্যাকটিস বাদ দিয়ে ইংরেজি ওয়াল ম্যাগাজিনের কাজে হাউসেই থাকতাম। লং জাম্পের ফাইনালের দিন গ্রাউন্ডে ১২শ-র সাকিব ভাই বলল, যা, আমার লং জাম্পটা দিয়ে আয়। তার নাকি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে প্রবলেম হবে। তাকে যতই বোঝায়, আমি ওইবার অ্যাথলেটিক্সের প্র্যাকটিসে একটা লাফ তো দূরের কথা, একটা বালি পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখিনি। তিনি মানবেন না, উল্টো আমাকে উজ্জীবিত করে মাঠে নামিয়ে দিলেন, বললেন ৬ঠ হলেও হবে। যথারীতি ৬ঠ-ই হলাম। সেই আমি ভার্সিটির মাঠে ২য়! )

ক্লাস সেভেনেই আমাদের ইনটেক থেকে বাঘা বাঘা কিছু অ্যাথলেট আসলো, মেহেদী, অনীক, তাহসিন… পরে আরো কিছু বাঘ বেরলো, শামস, ইমরান, আব্দুল্লাহ, আরিফ, সানজিদ, মুহিত, রাফি (!)… তো এদের শারীরিক কসরত আর আমার অপারগতা দেখে নিজের মানসিক উদ্যমকে ধামাচাপা দিয়ে অক্ষমতা মেনে নিলাম। তাই পরবর্তী প্রতি অ্যাথলেটিক্সেই হাউস টেন্ট, হাই জাম্পের ফোম-এসব জায়গাই হয়ে উঠলো আমার আশ্রয়।

খারাপ লাগতো যখন অ্যাথলেটিক্স পূর্ববর্তী গেমসগুলা এক্সকিউজ করে প্র্যাকটিস দিত, দিনগুলোই কাঁদামাটি হয়ে যেত। মনের সাথে যুদ্ধ করে অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ডে যাওয়া পড়ত। জুনিয়র আমলে অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ড চক্কর দিতে দিতে হাওয়া হয়ে যাওয়া, আর সিনিয়র আমলে নন-অ্যাথলেটদের আড্ডাই ছিল সবচেয়ে উপভোগ্য। আড্ডার মাঝে মাঝেই হাই/লো হার্ডলস নিয়ে লাফঝাঁপ, আর মাঝে মাঝে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্লকে পালিয়ে যাওয়া ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

নন-অ্যাথলেট গ্রুপের কয়েকজন ছিলো প্রতিভাধর ক্রীড়াবিদ, কিন্তু ইভেন্টে অংশগ্রহণ তাদের ধাতে ছিল না। আর কারো কারো গ্রাউন্ডে অনুপস্থিতিই অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ডের সাত জনমের সৌভাগ্য। এই নন-অ্যাথলেটরা সারাদিন গল্পের বই পড়ে, আড্ডা দিয়েই পার করত।

ইনটেকের প্রথম ক্যাডেট মাসুদ জ্যাভলিন দিত, শরিফকে সেই ক্লাস সেভেনেই উদীয়মান স্প্রীন্টার ভাবা হয়েছিল, কিন্তু ঐযে “মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেচে থাকলে বদলায়”।তাকে আর ট্র্যাকে নামানো গেল না। রাকিব সুস্বাস্থ্যের অধিকারি হওয়ায় তাকে আর আমরা অনুরোধ করিনি। তবে রিজওয়ান কিভাবে কিভাবে যেন শর্টপুটে গেল, সাথে গেল ইউসুফ। ফেরদৌসকে (ফেরদৌস জামান রিফাত নয়) কোনদিন দৌড়াতে দেখেছি বলে মনে পড়েনা। রাশেদ অ্যাথলেট হিসেবে যত না ভালো, তার চেয়ে ঢের ভালো জে.পি./প্রিফেক্ট হয়ে জুনিয়রদের প্র্যাকটিস করাতে। আর ১২শ-তে থাকতে জীবনে প্রথমবারের মত অ্যাথলেটিক্সে গিয়ে হাই জাম্পে ১ম হয়ে চমকে দিয়েছিল খালিদ। সাজেদ জীবনে একবারই ট্র্যাকে নামলো, ৮০০মিটারে ৫ম হয়ে তার দৌড় শেষ হল। আর ফেরদৌস জামান রিফাত তো ক্লাস ১২শ-তে প্রথমবারের মত জ্যাভলিন মেরেই ৩য়, কেন যে সে আগে শুরু করলো না, আক্ষেপ, শুধুই আক্ষেপ। আর মনে পড়ে সুজনের পোল ভল্ট, সত্যই চমকপ্রদ ও দৃষ্টিনন্দন ছিল তা। এমন আরো কত জনকে পাওয়া যাবে যারা শেষ জীবনে জ্বলে উঠেছিল, যেমনটি প্রদীপ নেভার আগে দপ্‌ করে একবার জ্বলে ওঠে।

এবার বলি আমার ইনটেকের কিছু সত্যিকার অ্যাথলেটদের কথা। মেহেদী ক্লাস টেন থেকে এমনভাবে জ্বলে উঠলো যে, সেই তখন থেকেই জাত অ্যাথলেট অনিকের কলেজ গেমস প্রিফেক্টশীপ নিয়ে টানাটানি পড়ে গেল, শেষ পর্যন্ত মেহেদীই গেমস প্রিফেক্ট, অনিক কলেজ কালচারাল। স্প্রীন্টে মেহেদী, অনিক, তাহসিন ছিল তুখোড়, আর লং রানে সানজিদ, ইমরান। মাঝে মাঝে সানজিদের একনাগাড়ে দৌড়ানো দেখে মনে হত ওরা কী খায়! ভেবে দেখলাম কলেজ মেস থেকে আমাকেও কিছু কম দিত না! বুঝলাম, ওরা অমনই!

লং জাম্পে কলেজ রেকর্ড করতে গিয়ে ডিসকোয়ালিই হয়ে গেল ঢ্যাঙ্গা শরীরের আব্দুল্লাহ, তবে আরিফ, মুহিত-ও কম যায়না, বালির শেষ রেখা পেরোতে অল্পই বাকি থাকতো। ১১০ হাই হার্ডলসে শামসের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ওই আব্দুল্লাহ। তবে আমার দেখা পূর্ণাঙ্গ অ্যাথলেট ছিল ইমরান, কী পারতো না সে! ট্র্যাক-ফিল্ড সব ইভেন্টেই তার জুড়ি মেলা ভার।

অ্যাথলেটিক্স দর্শক হিসেবে আমার প্রাপ্তি তাসিন ভাইয়ের (৩৭) পোল ভোল্ট; আশিক ভাইয়ের (৩৮) স্প্রীন্ট; ইয়াসিন ভাইয়ের (৩৮) হাই জাম্প ও ৪০০; ওয়াহিদ ভাইয়ের (৩৮) জ্যাভলিন; ফেরদৌস ভাইয়ের (৩৮) হপ্‌ স্টেপ; জাসিফ ভাই, মাহমুদ ভাই ও তারেক ভাইদের (৩৯) স্প্রীন্ট; সেলিম ভাই ও ইমরান (বদর) ভাইদের (৩৯) অন্তহীন দৌড়; রাফি ভাইয়ের (৩৯) ১১০ হাই হার্ডলস; সাকিব ভাইয়ের (৪০) ৪০০; আজাদ ভাই ও সাজ্জাদ ভাইদের ডিসকাস;  আরো কত কী… অনেক নাম বাদ পড়ে গেল, আসলে এই প্রাপ্তিগুলো ফর্দে সাজানো ‘মুশকিলই নেহি, নামুমকিন’!

অতীতের কথা বাদ দিলে, আমাদের আমলে অ্যাথলেটিক্স মানেই খায়বার হাউসের জন্য এক দুর্বিষহ অধ্যায়। মনে পড়ে আমাদের লিডিং-এ শেষদিনের আগ পর্যন্ত নীল পতাকা (খায়বার) হুনাইনের উপরে ছিল যা ছিল আমাদের দেখা অন্যতম দুর্লভ দৃশ্য। শেষদিন কী থেকে কী হয়ে গেল, থাক ওসব।

অনেক কথা বলে ফেললাম, আসলে অ্যাথলেটিক্স নিয়ে প্রত্যক ক্যাডেটেরই অভিজ্ঞতার অন্ত নেই, আর তা বলতে শুরু করা মানে রামায়নপাঠ।

ক’দিন আগে মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজে এক আণ্ডারগ্রাউণ্ড টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। দেখলাম ওখানকার ইন্সট্রাক্টররা অ্যাথলেটিক্সের বিভিন্ন ইভেন্ট প্র্যাকটিস করাচ্ছেন, চোখের সামনে ভেসে উঠলো এম.এ.রহমান ক্রীড়াঙ্গন, আমাদের অ্যাথলেটিক্স গ্রাউণ্ড।

ধন্যবাদ, একজন নন-অ্যাথলেটের অ্যাথলেট জীবনের কাহিনী শোনার জন্য।

১,৩৭১ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “আমার অ্যাথলেট জীবন”

  1. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    ওই আমার জ্যাভলিনের কথা লিখলি না ক্যান? :gulli2: :gulli2: :gulli2:
    ক্লাস টুয়েলভে জীবনে প্রথমবারের মতো মাইরাই থার্ড হইসিলাম :duel: :duel: :duel:


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।