আমার বাবার গল্প

আমি যখন গ্রামের বাড়ি পৌঁছলাম তখন হাইস্কুলের মাঠে জানাযার নামাজ শুরু হচ্ছে। আমার দাদীর জানাযা।  তাড়াতাড়ি অজু করে সবার পেছনের কাতারে দাঁড়ালাম।  মাইকের সামনে বড় চাচা কাঁদতে কাঁদতে কথা বলছেন। বাকি চাচারা প্রথম কাতারে পাশাপাশি দাঁড়ানো। শুধু আমার বাবা পরের কাতারের এক প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে। আমার ভেতরটা চুরমার হয়ে গেল। ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার বাবা থরথর করে কাঁপছিলেন। টকটকে লাল চোখ। তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদলেন কিছুটা। আমি বাবার কাঁধে গাল ঠেকালাম। কে কাকে সাহস দিল বোঝা গেল না।

শৈশবে বাবা ছিলেন আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমার সব কথা আমি বাবাকে বলে দিতাম। তিনিও খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতেন। তবে কথার উত্তর দিতেন খুব কম। আমার মন খারাপ হত। বাবা সেটা বুঝতেও পারতেন। তাই সবসময়ই আমাকে অবাধ প্রশ্রয় দিতেন। সেই প্রশ্রয়েই ভাইয়া যে মায়ের ছেলে আর আমি বাবার ছেলে এটা বুঝে নিতে  আমারও বেশিদিন লাগে না। যখন থ্রি তে পড়ি তখন ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে চলে যায়। বছরে মাত্র তিন মাস বাসায় থাকতো, তাও অতিথির মতো। কাজেই পরিবারের সক্রিয় সদস্য সংখ্যা নেমে আসে তিনজনে। যেকোনো সিদ্ধান্তে কিংবা বাবা-মায়ের মতের অমিলে আমি চোখ বন্ধ করে বাবার দলে অবস্থান নিই। ক্লাস সেভেনে আমিও ক্যাডেট কলেজে চলে যাবার আগ পর্যন্ত সময়টা বাপ-বেটা জোটের চরম স্বর্ণযুগ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে আমরা বারবার বিজয়ী হই।

আমার বাবার শৈশব কেটেছে দারিদ্রে। কৈশোর কেটেছে  অবহেলায়। যৌবন কেটেছে দাদার বিশাল পরিবারের ঘানি টেনে। পরের বাড়ি লজিং থেকেছেন। নিজের এক ক্লাস জুনিয়র ছেলেকে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। প্রতিবেলায় পান্তাভাত পেঁয়াজ মরিচ ডলে খেয়েছেন নিজের ভাই বোনদের সাথে ভাগাভাগি করে। আমার শোনা সবচেয়ে করুণ ঘটনাটা অবশ্য আলাদা। একবার লুকিয়ে ঘুড়ি বানাচ্ছি। পলিথিন  আর বিছানা ঝাড়ার শলার ঝাড়ু থেকে শলা ভেঙে ঘুড়ি বানানো শিখিয়েছিল ভাইয়া। ভালো পারতাম না আমি। কিভাবে যেন বাবার কাছে ধরা পড়ে গেলাম। নিশ্চিত ধমকের ভয়ে বুক ধক ধক করছে। বাবা কাছে এসে আমার ঘুড়ি নেড়েচেড়ে দেখলেন। তারপর বললেন, যা আরেকটা পলিথিন আন। হাতে কলমে আমাকে ঘুড়ি বানানোর কিছু মৌলিক নিয়ম শেখালেন। বিশেষ কয়েকটা ব্যাপার খেয়াল করতে বললেন। সেই ঘুড়ি আকাশে এতো সুন্দর উড়ল!  বাসায় ফিরে মায়ের কাছে জানলাম বাবা ছোটবেলায় নিজ হাতে ঘুড়ি বানিয়ে গ্রামের ছেলেদের কাছে বিক্রি করতেন। অল্প কিছু লাভ হত।  বাবা আমাকে ওই একবারই ঘুড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন। আমিও আর কখনো অনুরোধ করিনি মায়ের নিষেধের কারণে।

ছেলেদের খেলাধুলা নিয়ে তিনি কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। আমাকে কখনোই ব্যাট কিনে দেন নি। ফুটবল কিনে দেন নি। তবে টেনিস বল কেনার জন্য টাকা চাইলে দিতেন। একবার মার্বেল খেলতে দেখে বাসায় ডেকে এনে খুব বকলেন। আসলে সেই বিকালে কারো কাছেই বল ছিল না। উপায় না পেয়ে গোল্লাছুট খেলতে গেলাম।  ‘পাক্কি’ হওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখে দৌড়াতে গিয়ে পিচের পাকা রাস্তায় ভূপাতিত হলাম। ডান হাতের কনুই ছিলে গেল। রক্তারক্তি অবস্থা। খানিকটা চামড়া রাস্তায় লেগে ছিল। বাসায় ফিরলাম সেটা হাতে নিয়ে। বাবাকে দেখাবো বলে! খেলার প্রতি তাঁর কিছুটা নমনীয়তা আসে আরও কয়েকবছর পরে, ভাইয়া যখন ক্যাডেট কলেজ থেকে ক্রিকেট-ফুটবল দুটোতেই বেস্ট প্লেয়ারের ক্রেস্ট বাসায় নিয়ে আসে তখন। কিছুদিন আগেও আমার ব্যাচ ফুটবল টীমের জার্সি নম্বর ৯ দেখে বললেন, আমার ছেলেরা ভালোই খেলে মনে হচ্ছে!

আমাদের বাবা-ছেলে সম্পর্কের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে আমাদের সিকি শতাব্দী পুরনো ফনিক্স (আসল উচ্চারণ যদিও ফিনিক্স) সাইকেলটা। একদম বাচ্চাকালে আমার জায়গা হত সামনের রডের উপর। ভাইয়া বসত পিছের ক্যারিয়ারে। ভাইয়া গায়ে গতরে বেড়ে উঠলে সে সাইকেল থেকে জায়গা হারায় আর আমি ক্যারিয়ারে শেকড় গেঁড়ে বসি। আমাদের অনেক অনেক ভাব আদান প্রদান হয়েছে এই সাইকেলের সামনে পিছনে বসে। আমার প্রজন্মের আরও অনেকের মতো আমিও সাইকেল চালানো শিখি সিটে না বসেই। রডের নিচ দিয়ে পা ঢুকিয়ে কিম্ভুতকিমাকার এক স্টাইল সেটা। বাবা অফিস থেকে ফিরলে আমি কিছু না দেখেই টের পেতাম। বলতাম, আব্বু আসবে। সঙ্গে সঙ্গে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ আসতো। ছোট আপু খুব অবাক হত। অনেকবার জিগ্যেস করেছে আমাকে, ক্যামনে বুঝিস তুই? আমি শুধু ঠোঁট টিপে হাসতাম। রহস্য ফাঁস করিনি কখনো। আসলে আমাদের সাইকেল স্ট্যান্ড করার সময় যে আওয়াজটা হত সেটা আমি খুব ভালো চিনতাম। এখনও চিনবো। রহস্য আজ ফাঁস হল।

চলবে…

 

পুনশ্চঃ আরেকটা কথা। আজকের দিনেই হঠাৎ বাবাকে নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল না। লেখার কারণটা বলি। রাত বারোটা বাজলেই পরের দিনটা ১২.১২.১২ । এই রকম আরেকটি দিন আবার আসবে ০১.০১.২১০১ তারিখে। সেদিন আমি কিংবা আপনি কেউ থাকবো না এটা নিশ্চিত। তাই এই দিনটা অনেকেই অনেকভাবে সেলিব্রেট করছে। আমার পরিচিত কয়েকজন বিয়ে করছে কিংবা আংটি বদল করছে। এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেটের রাজপুত্র সাকিব আল হাসান। অনেকেই প্রিয় মানুষের সাথে ঘুরতে যাচ্ছে। অনেক সন্তানসম্ভবা মা সিজারিয়ান সন্তান নিচ্ছেন। মেয়েবন্ধু জিগ্যেস করেছিল আমার কোনো প্ল্যান আছে কিনা। বলেছি নেই। তখন জিগ্যেস করলো হঠাৎ যদি জানতে পারি পৃথিবী এখনই ধ্বংস হয়ে যাবে ( ডিসেম্বর ২০১২, ইনকা ভবিষৎবাণী!) তাহলে আমি শেষবারের মতো কি করতে চাইবো। বেচারি ভেবেছিল আমি কোনো রোমান্টিক উত্তর দেবো। কিন্তু আমি বললাম, আব্বুকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদবো। আমি জানি আমি মিথ্যা বলিনি। সবার ১২.১২.১২ দিনটি সুন্দর কাটুক।

 

 

 

২,৩৮৩ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “আমার বাবার গল্প”

  1. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    থ্যাংকস রাকিব ভাই
    দেশে বাবার ছেলের সংখ্যা কম
    সেইদিক দিয়ে আপনার আমার জন্য এটা বড় অ্যাচিভমেন্ট
    😀 😀 😀


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  2. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    মঈন ভাই, লজ্জা দিলেন :shy: :shy: :shy:
    সত্যি কথা বলি। আমি এখানে কখনো লিখবো সেটা সেটা ভাবিইনি। কিন্তু কয়েকজন সিনিয়র ভাই আর আপুর লেখা পড়ে এতো অভিভূত হয়েছি যে আমারও লিখতে ইচ্ছে হল। প্রথম লেখা দেয়ার পর সবাই এতো উৎসাহ দিলেন যে আমি এরপর থেকে কেউ না পড়লেও আমি ইনশা আল্লাহ্‌ লিখেই যাবো। দোয়া করবেন। আর ভাই আপনার কি খবর? ভালো আছেন তো? (সম্পাদিত)


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  3. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    রায়হান ভাই, অসংখ্য ধন্যবাদ 🙂
    ইউ এন মিশন সংক্রান্ত আপনার লেখাটাও আমি পড়েছি :boss:
    আর বাপের পোলা হওয়ার ভাবই আলাদা। কি কন! :awesome: :awesome:


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  4. কিছু লেখক এর লেখায় একটা চুম্বকীয় আকর্ষণ থাকে যা পাঠককে পড়া শেষ না করা পর্যন্ত ধরে রাখে। এটি তেমনি একটি লেখা যা পাঠককে আকর্ষণ করে রাখে। ধন্যবাদ ফেরদৌস জামান রিফাত

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।