পর্বতশৃঙ্গে

পর্বতশৃঙ্গে

“পাহাড়-চুড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল
আমি এই পৃথিবীকে পদতলে রেখেছি
এই আক্ষরিক সত্যের কাছে যুক্তি মূর্ছা যায়”। – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যজিত রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটি আমি দেখি ১৯৯২ কি ৯৩ সনে। ১৯৬২ সনে কলকাতায় মুক্তি পাওয়া এই ছবিটা আমার জানামতে ব্যবসা সফলতার মুখ দেখেনি। আন্তর্জাতিক কোন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারও পায়নি। তবুও আমার মনে হয় সত্যজিত রায়ের অমর সৃষ্টিসমূহের অন্যতম এটা। তাঁর কর্তৃক নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’!

মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকৃতিই যে একটা চলচ্চিত্রের মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠতে পারে তার অনন্য উদাহরন এই ছবি। ছবির নামকরণ থেকেও বিষয়টা স্পষ্ট। কলকাতার এক রায় বাহাদুর পরিবার দার্জিলিং বেড়াতে এসেছেন। পরিবারের সদস্যগুলো শ্রেণী সমাজের সকল ভণ্ডামি, কৃত্রিমতা, অন্তসারহীনতা ও কুপমন্ডুকতাকে ধারণ করার কারণে কখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনা। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ নীচের দিকে।এই সমস্যাসঙ্কুল অবনত জীবনের প্রতিফলন কাঞ্চজঙ্ঘার দৃশ্যাবলীতেও! অত্যুজ্জ্বল রৌদ্র থেকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। অতঃপর ক্রমবর্ধমান কুয়াশা। অস্পষ্টতায় ঢাকা চারদিক। ১৭ দিনের ভ্রমনে একবারের জন্যেও কাঞ্চজঙ্ঘার দর্শন পাওয়া যায়নি। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার মুখ লুকিয়ে রেখেছে কুয়াশা আর তুষারের অবগুণ্ঠনে।

রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ রায়।ঔপনিবেশিক অভিজাততন্ত্রে বিশ্বাসী। সমাজের প্রচলিত ধারণায় প্রতিষ্ঠিত মানুষ। চরিত্রগত দিক থেকে দাম্ভিক, উন্নাসিক, পরম অসহিষ্ণু। নিজের গন্ডিতে আবদ্ধ আত্মম্ভরি এক বন্দী মানুষ। নিজেকে নিয়েই মগ্ন। বৈষয়িক বিষয় ছাড়া কোন কিছুতেই আগ্রহী নন। মেয়ে মনীষার বিয়ে দিতে চান নিজ পছন্দে।একই শ্রেণীর ধনবান পাত্রের হাতে।

লাবণ্য তার স্ত্রী। চাপা স্বভাবের। অনুভূতিপ্রবণ। মুখ বুজে স্বামীর দাপট সহ্য করে। তার সকল স্বাধীনতা সম্পূর্ণ সমর্পিত স্বামীর কাছে। ভেতরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো হারিয়ে গেছে কবেই।কিন্তু ভ্রমণে এসে হিমালয়ের চূড়ার নিকটে বসে স্ত্রী ‘লাবণ্য’ আবিস্কার করে ভিন্ন এক সত্যকে। সে তার জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিশাবকে মিলাতে চায় এই নবীন সত্যের আলোতে। সিদ্ধান্ত নেয় সে আর মুখ বুজে সহ্য করে যাবে না। প্রয়োজনে দাম্ভিক-রক্ষণশীল স্বামীর বিরুদ্ধে লড়বে। রক্ষণশীল চিন্তার বেড়াজালে পিষ্ট নিজের জীবনের পুনরাবৃত্তি হতে দিবে না। নিজের মেয়ের ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য সে লড়বে।

রায় বাহাদুর পরিবারের সাথে বেড়াতে এসেছে প্রনবেশ। একজন বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার। বড় চাকুরি করে। রায় বাহাদুর ইন্দ্রনাথ এর সাথেই মেয়ে মনীষার বিয়ে ঠিক করেছেন। প্রনবেশ শিক্ষিত,ভদ্র এবং সামাজিকভাবে কেতাদুরস্ত হলেও রায় বাহাদুর ইন্দ্রনাথের মতন আত্মম্ভরি প্রেমহীন মানুষ। দার্জিলিং এর পরিবেশ তার মনে ওপরে কোন প্রভাবই বিস্তার করতে পারে নি।

অন্যদিকে মনীষা সূক্ষ্ম রুচি সম্পন্ন গভীর প্রকৃতির মেয়ে। আনমনা এবং এক ধরণের সারল্যের অধিকারিণী। এই সারল্য মানুষকে জীবনের প্রতি কৌতূহলী করে তোলে। প্রকৃতির এই নিবিড়তায় এসে সূক্ষ্ম রুচির মনীষার কাছে প্রনবেশকে অসহ্য লাগে। কারণ প্রনবেশ শুধুমাত্র নিজের কথাই বলে! তার চাকুরীর কথা। তার ক্ষমতার কথা। তার গৌরবের কথা। বিলেতের কথা।

এই সময়ে মনীষার সাক্ষাত হয় কলকাতা থেকে চাকরি সন্ধানে আসা অশোকের সাথে। বেকার অথচ আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন এক যুবক। ইতিমধ্যেই অশোক মনীষার বাবার অফার করা চাকুরি নিতে অস্বীকার করেছে। মনীষাকে বলা তার কথায়, “৩০০ টাকার চাকরি! হঠাৎ কি যে হয়ে গেলো! এই জায়গা বলেই বোধহয়। কলকাতা হলে নির্ঘাত নিয়ে নিতুম। ভিক্ষে হোক আর যাই হোক!” কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘার রোদ, মেঘ আর কুয়াশার মধ্যে এসে অশোকের মনে হল হয়েছে যে, সে সাধারণ কেউ নয়। সে নায়ক, প্রচণ্ড সাহসী কেউ। প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে প্রয়োজনে লড়বে তবু কারো দয়া গ্রহণ করবে না।

এভাবেই একে একে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ইন্দ্রনাথ রায়ের পরিবারের সবাই। তার বিরুদ্ধে। কাঞ্চনজঙ্ঘা তাদের ওপরে তার বিশালত্ব আর রহস্যময়তা নিয়ে বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। অবশেষে ভ্রমনের শেষপ্রান্তে যখন প্রায় সকলের মনের কুয়াশা দূরীভূত হয়ে যায়, তখনি শুধুমাত্র রৌদ্র ছায়ার সাথে লুকোচুরি খেলার পর কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে রঙ ধরে। প্রথমে রঙ লাগে পর্বতের শীর্ষে।হাল্কা গোলাপি রঙ। সেই রঙ ক্রমে বদলাতে থাকে। গোলাপি থেকে লালচে কমলা। কমলা থেকে হলুদ। আর এক সময়ে সোনালি আলোয় নেয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা তার বরফে মোড়া সাদা পোষাকে রাজ্যশাসনে বসে!

ছবিঃ অন্তর্জাল

(ক্রমশ…)

৩,৭৫৪ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “পর্বতশৃঙ্গে”

  1. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    পড়ে ছবিটা আবার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।
    দেখে নেবো ইউটিউব থেকে।
    আমি শিওর, অন্যদেরও এই একই ইচ্ছা হবে...
    প্রাঞ্জল বর্ননা, বরাবরের মতই...


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।