বিপ্লব, যুদ্ধ এবং শৈশব (প্রথম পর্ব)

বিপ্লব, যুদ্ধ এবং শৈশব (প্রথম পর্ব)

শান্তির সময়ে শিশুদের বয়স দ্রুত বাড়েনা! কিন্তু আন্দোলন, বিপ্লব, যুদ্ধ, এমনকি দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষের সময়ে তারা দ্রুত বেড়ে ওঠে। আমি এই কাল, সেই কাল, এই দেশ, সেই দেশ এবং যুদ্ধ বা শান্তির সময়ের পরিক্রমা থেকে এধরনের একটা সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছি! কারন এই সময়গুলোতে বড়রা এমন সব বিষয়ে নিজেদেরকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত রাখেন যে, শিশুরা কখনই তাদের স্বভাবগত শিশুসুলভ কোন বৃত্তি সমূহকে লালন বা পরিচালনা করতে পারেনা। ফলে তারা বড়দের উপযাচক হিশেবেই ব্যস্ত থেকে নিজেদেরবৃদ্ধিকে গতিময় করে তোলে!

আমার জন্ম ১৯৬৫ সালে মতান্তরে ১৯৬৪ সালে। তবে বাস্তব হল ১৯৭১ সনে আমি ‘ছোট ওয়ান’ থেকে ‘বড় ওয়ানে’ উঠেছি এবং তখনো আমার ভেতরে পরিপূর্ণভাবে অক্ষরজ্ঞান সৃষ্টি হয়নি। আমি তখন ‘সবুজ সাথী’ নামক স্বপ্নের ছড়াবই থেকে সুর করে অঙ্ক শিখছি – ‘পিঁপড়া পিঁপড়া কয়টা ডিম? – ১ টা, ২ টা, ৩ টা ডিম’ এবং বাংলা ‘ত’, অঙ্কের ‘১’ ও ‘৯’ এর ভেতরে অদ্ভুত রকমের মিল দেখে ভীষণরকম কিংকর্তব্য বিমুঢ় হচ্ছি! এই সময়ের কিছু আগে থেকেই অর্থাৎ ১৯৬৯ সালেই আমার শৈশব আমাকে ছেড়ে যাই যাই করছিলো এবং আমি দ্রুত একজন পুর্নাঙ্গ মানুষে পরিনত হচ্ছিলাম!

স্মৃতি থেকে আমি যতটা পুনরুদ্ধার করতে পারি সে অনুযায়ী আমার প্রতি বাড়ীর বড়দের সর্বপ্রথম অমনোযোগিতা প্রদর্শিত হয় ১৯৬৯ সালে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী শাসন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে বাঙালী জাতিকে মুক্ত করতে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। এরপর ১৯৬৯ সালের শুরুর দিকে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং অন্যান্য ছাত্র গোষ্ঠী বা গ্রুপ মিলে ১১দফা প্রনয়ন করে বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এই আন্দোলনকে নস্যাত করার হীন উদ্দেশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে। মামলার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা দুর্বার ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তোলে এবং ভীত সন্ত্রস্ত সরকার কর্তৃক জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ মিছিল সহ রাজপথে নেমে আসে।সেনাবাহিনী নামানো হয় শহরে।এই সময়ের এক মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত হন নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমান।উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। আমার এক চাচা স্কুলের ওপরের শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে এই ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার কারনে কয়েকমাস বাড়ী থেকে পালিয়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছিলেন। কোথায় আমরা তা জানিনা। তবে উনার এই যাত্রা (যা সবাই তার অগ্যস্ত যাত্রা বলে ভেবে নিয়েছিল!) আমাকে এবং বাড়ীর অন্যান্য সকল শিশুকিশোরদেরকে রাতারাতি বয়স্ক মানুষ বানিয়ে দিয়েছিল। কারন ঐ সময়ে আমরা সকল শিশুতোষ শব্দ ভুলে যেয়ে ছয় দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন, ১৪৪ ধারা, হরতাল, এরেস্ট এই শব্দগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত পরিচিত হচ্ছি!

আমার স্পষ্ট খেয়াল আছে আমার চাচা বাড়ী থেকে চলে যাচ্ছেন। তাকে ঘিরে পুরো বৃহত্তর পরিবারে শোকের মাতম লেগেছে। আমার বাবা যিনি একজন স্কুল শিক্ষক, তিনি ক্রুদ্ধ অথবা বিরক্ত হয়ে আমার চাচার দিকে তাকিয়ে আছেন! আমার বড় ফুপু যমুনা পারের সুদুর গোবিন্দির চর থেকে এসেছেন তাকে দেখতে।আমার দাদা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন! কিছুই বুঝছেন না তিনি।দাদী সুর করে কাঁদছেন। তার সন্তান কি করে সে সম্পর্কে তার কোন ধারনাই নেই! তবে তিনি তার সন্তানকে নিয়ে যারপরনাই গর্বিত! অদৃশ্য কারো দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি তাদের গুষ্টি উদ্ধার করছেন! বাড়ীতে থাকলে তাকে নাকি এরেস্ট হয়ে যেতে পারেন।অবশ্য তাকে কে কোথা থেকে এসে এরেস্ট করবে তার কিছুই স্পষ্ট নয়! আমরা বাড়ীর সকল শিশু কিশোরেরা অবাক নয়নে এই সমস্ত বয়স্ক বিষয় সমুহ দেখছি আর গিলছি। কাল থেকে আমাদের সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে এই ‘GREAT ESCAPE’!

এক মাস, দুই মাস অথবা তারও কয়েকমাস পরে চাচা ফিরে এসেছেন তার সাথে পালিয়ে যাওয়া আরও দুইজন সহপাঠী নিয়ে।! আমাদের বাড়ীতে আনন্দের জোয়ার বইছে। আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ‘লৌহ মানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন! বঙ্গবন্ধুকে আরও কিছুদিন পর তারা মুক্ত করে দিতে বাধ্য হবে!চাচার কাছে গল্প শুনেছি যে, তারা নাকি রাতের বেলায় লোকালয় ছেড়ে যমুনা পাড়ের চরের বালিতে আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে চাঁদের আলোতে শুয়ে থাকতেন, যাতে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লোকজন তাদেরকে দেখতে বা সনাক্ত করতে না পারে!বিপ্লব নিয়ে এই চরম রোমান্টিকতার গল্পটি আমি ছোটবেলায় তাদের মুখে শুনে তাৎক্ষনিকভাবে বিশ্বাস করলেও, আরও বড় হবার পর গল্পটিকে আমার কাছে সত্যের অতিরঞ্জন বলে মনে হয়েছে!

“দেয়ালির আলো মেখে নক্ষত্র গিয়েছে পুড়ে কাল সারারাত
কাল সারারাত তার পাখা ঝ’রে পড়েছে বাতাসে
চরের বালিতে তাকে চিকিচিকি মাছের মতন মনে হয়
মনে হয় হৃদয়ের আলো পেলে সে উজ্জ্বল হ’তো ।” -শক্তি চট্টোপাধ্যায়

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

২,৪৯৩ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “বিপ্লব, যুদ্ধ এবং শৈশব (প্রথম পর্ব)”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আপনাদের মত অগ্রজ, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও তার আগে পরের সময়গুলো দেখেছেন তাদের কাছ থেকে ঐ সময়ের কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকি। আশা করি এই সিরিজের মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই জানতে পারবো।

    পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    আমার অনেক স্মৃতির সাথে মিলে গেলো।
    ৭০-এ আমি বেবীতে ছিলাম।
    ৬৯ বেবীতে ভর্তির আগের বছর।
    আগরতলা, নবকুমার স্কুল, এসব তখন শুনলেও অর্থ করতে পারি নাই।
    তবে ৬৯-এ টিভিতে চন্দ্রাভিযানের ফুটেজ দেখাটা চন্দ্রবিজয় সম্পর্কে জানাটা হলো আমার ওলডেস্ট কমপ্লিট মেমরি...

    ভাল লেগেছে!!! (এবার দ্বিতীয় পর্বটা পড়ি...)


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।