২৫ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। উচ্চতর গণিত পরীক্ষা দিয়ে এসে জানতে পারি ঢাকায় সেনাবাহিনীর সাথে গন্ডগোল চলছে বিডিয়ারের। খুব বেশি কিছু জানার সুযোগ ছিল না। কারণ, আমরা বাস করি এমন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে যেখানে বাইরের পৃথিবীর খবরগুলো সেন্সর করে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। সব খবর আমাদের জন্য প্রাসংগিক না। এ কারণেই হয়তো এমন করা। কলেজের শৃং্খলা রক্ষায় নিয়োজিত জলপাই রং পোশাকের মানুষগুলোর বিচলিত মুখ দেখে বুঝতে পারি কোন সাধারণ ঘটনা নয়। নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কোন বিষয়। দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে দেখি পিনপতন নীরবতা। এডজুটেন্ট স্যার বার বার রাউন্ড দিচ্ছেন। ঢাকায় ঘটে যাওয়া বিষয়ের কোন কিছুই যেন আমাদের কানে না আসে।

কলেজের সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচ, যাদের কাছে সবার আগে খবরাখবর আসে তারাও কেমন নিশ্চুপ। দুপুরের খাবার খেয়ে আমাদের আবাসস্থল হাউসে চলে যাই। সাধারণত অন্যদিন গুলোয় লাঞ্চ শেষের পর রেস্ট টাইম শেষ হলে হাউস কমন রুম খুলে দেয়া হয়। সেদিন এডজুটেন্ট অফিস থেকে কড়া নির্দেশ এলো টিভি রুম খোলা যাবে না। ঢাকায় আদৌ কি ঘটছে আমরা তখনো তা জানি না। বিকেলে গেমসের সময় কিছুটা ধারণা পেলাম। অনেকেই কলেজে লুকিয়ে মোবাইল ব্যবহার করতো। ওদের কাছে বেশ কিছু তথ্য পেলাম। শুনলাম, বিডিআরের জোয়ানরা বেশ কিছু আর্মি অফিসার মেরে ফেলেছে পিলখানায়।

আমাদের কলেজগুলো তৈরি করা হয়েছিল মূলত ডিফেন্স অফিসার তৈরির জন্য। দেশ থেকে বাছাই করে কিছু কিশোর কিশোরিকে এক ধরণের সামরিক আবহে বড় করে তুলবে। যারা পরবর্তীতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীতে যোগ দেবে। যার ফলে সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের সবারই কম বেশি দুর্বলতা। এছাড়া অফিসার এবং সৈনিকের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান তা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি কলেজের প্রশাসনিক কাজে দায়িত্বরত এডজুটেন্ট, যিনি সেনাবাহিনীর একজন মেজর এবং নন কমিশন্ড অফিসার, যাদের আমরা স্টাফ ডাকতাম, এদের মাঝে। তাই এ কথা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি কোন সৈনিক কোন অফিসারের কমান্ড অমান্য করতে পারে। মেরে ফেলাতো আরো দূরের কথা।

রাতের প্রেপ টাইম শেষ হবার পর আমরা ভিড় জমাই কমন রুমে। ডি এ ডি তৌহিদ নামে একজনকে দেখি দাবি দাওয়া নিয়ে বেশ কথা বলে বেড়াচ্ছে। ততক্ষণে একের পর এক লাশ পাওয়ার খবর। সবার নামের আগেই ভারি ভারি র‍্যাংক। কলেজে আমরা সর্বোচ্চ লেফটেন্যান্ট কর্নেল র‍্যাংক পেয়েছি সুবহানি স্যারকে। এর অধিক র‍্যাংকের কেউ আমাদের কাছে দূরতম নক্ষত্রের কোন মানুষ। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল দেখছি, হঠাত বন্ধু Ranan Reza চিতকার দিয়ে উঠলো ওর মামাকে দেখতে পেয়ে। বিদ্রোহের সময় ওর মামা পালিয়ে এসে এখন টিভি চ্যানেলে তার বর্ণনা দিচ্ছে। ও চলে গেল হাউস অফিসে বাসায় কথা বলবে বলে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জানালো ওর মামা সৌভাগ্যক্রমে বেচে গেছে। কিন্তু অবস্থা ভয়ানক।

হঠাত করে অনুধাবন করি, এই জলপাই রং মানুষগুলোর জন্য চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে। আমরা হাউমাউ করে কাঁদছি। অথচ, এইতো সেদিনও সকালবেলা তিন চক্করে তিন কি:মি: দৌড়ানোর পর যখন এডজুটেন্ট আরো এক চক্কর বাড়িয়ে দিয়েছিল তাকে পেছনে আমরা পাষন্ড বলে গালি দিয়েছি। সেদিন সন্ধ্যায় মাগরেবের নামাজের পর আমাদের ইমাম সাহেব বললেন বিশেষ দোয়া আছে। তিনি মাইকে ঘোষণা দিলেন বিডিআর বিদ্রোহে শহিদ হয়েছে আমাদের কলেজের চতুর্থ ব্যাচের ছাত্র মেজর মাহবুব।

মেজর মাহবুব ভাইকে আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু কেন জানি না এক অদেখা মানুষের জন্য মনের ভেতর তুমুল ব্যথা শুরু হয়। কল্পনা করি, আজ থেকে দুই দশক আগে মাহবুব ভাইয়ের কৈশোর কেটেছে এই চত্বরে, যেমন আমাদের কাটছে। অথচ, সে মানুষটাকে প্রাণ দিতে হলো এভাবে। একে একে মাইকে আরো ঘোষণা এলো, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের কর্ণেল গুলজার, এমন আরো অসং্খ্য নাম। একই উদ্দেশ্য নিয়ে চালু হওয়া দেশের বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজ গুলো এক অভিন্ন সূত্রে গাথা। তাই যেকোন কলেজের কারো মৃত্যুর খবর শুনলে আমরাও সমব্যথী হই। সেদিন মাগরেবের নামাজের পর আমরা অনেকেই অঝোরে কেঁদেছিলাম। খুব কাছ থেকে দেখা সেনাবাহিনীর জীবনে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো অনুধাবন করতে পারতাম বলেই হয়তো। যখন লাশের ওপর নতজানু স্ত্রীর কান্নামাখা ছবি দেখি, তখন মনে পড়ে এই স্ত্রীকে রেখেইতো মাসের পর মাস আফ্রিকার কোন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কাটাতে হয়েছে তাকে। কতো অপেক্ষায় থেকে থেকে মনের মাঝে বেদনা নিরবধি বয়ে গেছে। একজন সেনাবাহিনীর স্ত্রীকে অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু স্বামীকে বিসর্জন দেয়া বোধ হয় সবচেয়ে কষ্টের। ভারি ভারি র‍্যাংক পরা প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা মানুষগুলোর নিস্তেজ লাশ মেনে নিতে পারিনি। মেনে নিতে পারিনি ড্রেনের ময়লা পানিতে মাখামাখি সামরিক ইউনিফর্ম, চির উন্নত মম শিরের সে মানুষগুলোর এ ভয়ানক পরিণতি।

ব্যক্তিজীবনে অনেক শহিদ পরিবারকে কাছ থেকে দেখেছি। পারিবারিক ভাবে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক কর্নেলের পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিল। দেখেছি তার স্ত্রী, কন্যা আজো সে ট্রমা বয়ে বেড়ায়। মাঝরাতে ঘুম ভাংলে মেয়ে এখনো ডেকে ওঠে, বাবা বাবা বলে।
গতবছর পরিচয় হয় Kazi Nazifa Tabassum এর সাথে। আরেক বিডিআর বিদ্রোহে শহিদ সেনা কর্মকতার মেয়ে। আলাপচারিতায় বলেছিল, ভাইয়া, আমার বাবা খুব ভালো কবিতা আবৃত্তি করতেন। ভরাট গলা ছিল তার।

নাজিফা অনেক কথাই ওর বাবার সম্পর্কে জানায়। আমাদের কলেজকে যে বছর বরিশাল রেসিডেন্টসিয়াল থেকে বরিশাল ক্যাডেট কলেজ করা হলো, তার দুবছর আগে ওরা বাবা এখান থেকে পাশ করেন। কিন্তু নিজেকে বিসিসির এক্সক্যাডেট পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন, জানায় নাজিফা। তাঁর খুব ইচ্ছেও ছিলো স্ত্রী এবং মেয়েসহ বি সি সির রিইউনিয়নে আসার। তিনি ছিলেন ১১ লং কোর্সের। আর্টিলারিতে। ১৯৯৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ২০০৯ এ তাঁর পোস্টিং হয় বিডিআরে লাইবেরিয়ায় শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আসার পর। নাজিফা একটানা অনেক কথা বলা যায়। ক্যাডেটে যাওয়া তিনি দেখে যেতে পারেন নি। যে বছর বিডিআর বিদ্রোহ ঘটে তার কয়েক মাস পরেই নাজিফা নিজেও ক্যাডেটে চান্স পায়। ওর এ নিয়ে দারুণ আক্ষেপ। আমার সত্যি খুব খারাপ লাগা কাজ করে, চোখ ভিজে আসে। ও জানায়, শেষ মেসেজ ওর বাবার মোবাইল থেকে এসেছিলো ১১ টা ২৫ এ। লিখেছিলেন, ”ilmi nd laika dnt wrry, baba is safe, Allah is with me. I love u more thn anythng”।

এরপর ১২ টার দিকে একটা সাউন্ড ক্লিপ আসে। যা ছিলো মাত্র ১০ সেকেন্ডের। দুপদাপ বুটের শব্দ আর আর্তচিতকার ছাড়া আর কিছুই ছিলো না সেখানে। ঠিক সেই মুহূর্তে মুঠোফোনের দুইপ্রান্তে থাকা দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট চোখের সামনে ভেসে আসে। যেন সিনেমার কোন চরম উত্তেজনাকর মুহূর্ত। কিন্তু কখনো জীবন সিনেমার চেয়েও বেশি টান টান উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠাময়, উপন্যাসের চেয়েও ট্র্যাজিক। এই দুঃসহ স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষের সাথে পরিচয় হতে পেরে ভালো লাগছে। জেনে এও ভালো লাগছে সফল ভাবে নাজিফা এগিয়ে যাচ্ছে।
ফেলে আসা জীবনের দুঃসহ অতীতকে পেছনে ফেলে নাজিফার মত অন্যসব বিডিআর বিদ্রোহের শহিদ পরিবারের সবাই এগিয়ে যাক অনেক দূর আর অনন্ত নক্ষত্রবীথির দেশে ঘুমিয়ে থাকা “চির উন্নত মম শির” বুকে ধারণ করা শহিদেরা দেখুক এ সাফল্য। দেখুক, তাঁদের সন্তানেরাও কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করছে না। এই প্রত্যাশা রইলো।

২,৮৭৫ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “২৫ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।