তারার পাশে তাঁরা

শাকুর মজিদ নামের সাথে পরিচয় নবম শ্রেণীতে। আমি তখন বরিশাল ক্যাডেট কলেজ এ পড়ি। হঠাত্‍ করে খবর পেলাম কেউ একজন ক্যাডেট কলেজের সপ্তম শ্রেণীর জীবনযাত্রা নিয়ে একটি বই লিখেছে। বই এর নাম,ক্লাস সেভেন ১৯৭৮। বইয়ের নাম শুনেই বুঝলাম যে বইটা লিখেছেন তিনি হয়তো ১৯৭৮ সালে ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণীতে ছিলেন। বই এর প্রতি আগ্রহ তৈরি হল। কারণ,আধাসামরিক এ কলেজের নিয়ম কানুন দেশের আর দশটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা। এবং এখানে একজন ক্যাডেটকে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হতে হয়। কৈশোরের বাবা মা এর স্নেহ থেকে বিচ্ছিন্ন এ জীবন তাই বেশ কষ্টের। এক বসায় বইটা শেষ করলাম। লেখকের প্রতি অন্য রকম শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হল। এরপর কলেজ লাইব্রেরিতে শাকুর মজিদের অন্য বই খুঁজি। পাইনা। একসময় কলেজ থেকে বের হই। ফেসবুকের কল্যাণে শাকুর মজিদকে খুঁজে পাই ২০১১ দিকে। ফেসবুকে তাঁর বিভিন্ন কার্যকলাম দেখে ধারণা করি হুমায়ূন আহমেদ এর সাথে তাঁর সম্পর্ক বেশ জোড়ালো। হুমায়ূন আহমেদ তখন অসুস্থ। চিকিত্‍সার খাতিরে দেশের বাইরে। এরমাঝে প্রথম আলোতে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে শাকুর মজিদ এর নিয়মিত স্মৃতিচারণ বের হতে লাগলো। আগ্রহ নিয়ে পড়ি,ভালো লাগে। শুধু যে ভালো তা নয়,ভয়াবহ ভালো। কোন কোন লেখা পড়ে কাঁদি। শাকুর মজিদের সাথে তখন আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক মাত্র গড়ে উঠছে। সম্পর্কে তিনি আমার ক্যাডেট কলেজের শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়র ভাই। এরমাঝে একদিন তিনি জানালেন প্রথমা প্রকাশনি থেকে তাঁর একটি বই বের হচ্ছে। বই এর নাম,হুমায়ূন আহমেদ:যে ছিল এক মুগ্ধকর। প্রথম আলোতে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যে বিশেষ স্মৃতিচারণ ছাপা হতো তারই একটি সংগ্রহ বলা যায়। বই মেলার অপেক্ষা করি। বইমেলার এক সন্ধ্যায় শাকুর ভাই এর ফোন পাই। উত্‍সাহ আর উল্লাস মাথায় নিয়ে বইটি কিনে আনি। আগ্রহ নিয়ে পড়ি। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অনেক লেখকের অনেক বই পড়েছি। তবে এ যেন এক ভিন্ন লেখনি। বুকের গভীর থেকে গহীন স্মৃতি বই এর পাতায় পাতায় পৃষ্ঠা বন্দী। বই এর শুরুতেই যে শাকুর মজিদকে পাই তিনিও ঐ আমারই মত ক্যাডেট কলেজ নামক এক আধাসামরিক শৃঙ্গলে বন্দী কিশোর। তবে এবার বরিশান নয়,ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজ। একজন লেখকের লেখা পড়ে যখন একজন পাঠক মুগ্ধ হয় তখন তাঁর প্রতি ভালোবাসার সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর তাই হুমায়ূন আহমেদ এর প্রথম উপন্যাস পড়ে আধাসামরিক কলেজের বেসামরিক সেই ছেলেটি যেন হুমায়ূন আহমেদ এর প্রতিপাগল প্রায় হয়ে ওঠে। বই এ পাই,কিভাবে সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়মতান্ত্রিক সেই পরিবেশে তিনি কৌশলে হুমায়ূন আহমেদ এর বই পড়েন। কখনো সময় বাঁচিয়ে,কখনো বইয়ের ওপর টেক্সট বই এর মলাট দিয়ে। এ যেন অন্য এক শাকুর মজিদ। এরপর দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়। লেখক ও আধাসামরিক চৌহদ্দি থেকে বের হয়ে আসেন। ১৯৮৬ সালে হুমায়ূন আহমেদের একটি দীর্ঘ সাক্ষাত্‍কার নিতে গিয়ে লেখক তাঁর প্রিয় লেখককে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এরপর শুধুই মুগ্ধতার গল্প। কখনো কাছ থেকে,কখনো দূর থেকে দেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। বই এ গতানুগতিক কোন স্মৃতি উঠে আসেনি বরং কিভাবে হুমায়ূন আহমেদ মানুষকে মুগ্ধ করতেন তারই বর্ণনা আছে। লেখক কোথাও সত্য কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি। তাঁর জীবন সংগ্রাম,বুয়েটের স্থাপত্য বিদ্যার পাশাপাশি সাংবাদিকতা,হুমায়ূন আহমেদ এর কাছে আসার আকুতি সবকিছুই বাস্তবতার এক দারুণ প্রতিচ্ছবি। এমনকি লেখকের স্ত্রী যে হুমায়ূন আহমেদকে পছন্দ করতেন না তাও নির্দ্ধিদায় বলে গেছেন সহজ সরল এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। শুরুর দিকে হুমায়ূন আহমেদ এর সাথে শাকুর মজিদের সখ্যতা অতটা জোড়ালো ছিলনা কিংবা গড়ে ওঠার সুযোগ ও ছিলনা। একজন অতিবিখ্যাত লেখক একজন অখ্যাত সাংবাদিকের সাথে সখ্যতা করবেনা এটাই স্বাভাবিক। তারকার পাশে থাকতে হলে তাকে তারকা হতে হয়,শাকুর মজিদ ব্যাপারটা ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। আর তাই বই বেশ কিছু অংশে শাকুর মজিদের এর ভয়াবহ এক জীবন সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে যেখানে আছে প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের কাছে আসার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কিছুতেই যে সুযোগ আর আসছিলনা। তাই হুমায়ূন আহমেদ তখনো শাকুর মজিদের কাছে দূরতম নক্ষত্রের দ্বীপ। যাকে দেখা যায়,যার কাছে পৌঁছানো যায়না। তবে শাকুর মজিদ হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। অন্তত যে ছেলে ধরা পড়লে ভয়াবহ শাস্তি জেনেও ক্যাডেট কলেজের ভয়াল পরিবেশে সমস্ত সামরিক চক্ষুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টেক্সট বইয়ের মলাটের নিচে প্রিয় লেখকের বই পড়তে পারে সে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লেখকের কাছে পৌঁছাবে এটাই স্বাভাবিক। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে একটি প্রামান্য চিত্র তৈরি করার সুবাদে প্রিয় লেখকের সাথে আবার দেখা হয় শাকুর মজিদের। মাঝখানে কেটে যায় অনেক গুলো বছর। এই অনেক গুলো বছরে অনেক গুলো বিশেষণ এসে যুক্ত হয়েছে শাকুর মজিদের সাথেও।

১৯৮৬ সালে সাক্ষাত্‍কার আনতে যাওয়া সেই তরুণ অখ্যাত সাংবাদিক তখন একজন স্থপতি,বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মের চিত্রনাট্যের রচয়িতা,পরিচালক,আলোকচিত্রী,লেখক,বিশেষণের শেষ নেই। ততদিনে তাঁর লন্ডনি কইন্যা নাটকটি মোটামুটি হইচই ফেলে দিয়েছে। শাকুর মজিদের বইতে উঠে আসে এমনি কিছু মুগ্ধতার গল্প,

“আমার হাতে একটা ভি এইচ এস ক্যাসেট ধরিয়ে দিয়ে বলেন,নাও,এটা তোমার নিয়ে যাও।
আমি তাকিয়ে দেখি ক্যাসেটের গায়ে আমারই হাতে লেখা একটা নাটকের নাম,লন্ডনী কইন্যা। এবার আমার সত্যি সত্যি মুগ্ধ হবার পালা।

সময় গড়ায়। তারার পাশে হাঁটার জন্য যে শাকুর মজিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালে,অদম্য ইচ্ছা শক্তির বলে সেই মানুষটা ২০০৪ সালে ‘ঝিলিক চ্যানেল আই ঈদ অনুষ্ঠান পুরস্কার” এর জন্য মনোনিত হন তাঁর বৈরাতি টেলিফিল্মের জন্য এবং তা হুমায়ূন আহমেদ এর সাথেই। এরপর শুধুই একসাথে পথচলার গল্প। সময়ের প্রবাহমান ধারায় শাকুর মজিদ হয়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ এর খুব কাছের কেউ। ২০০৮ সাল থেকে খুব কাছ থেকে মিশে দেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ কে।

শাকুর মজিদের পর্যবেক্ষণ শক্তি ভালো। তাই বইটি পড়তে পড়তে অন্য এক হুমায়ূন আহমেদকে জানা যায় যে তাঁর গতানুগতিক চরিত্র থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। যে তাঁর মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়,বিমুগ্ধ অনুভূতি যাঁকে গ্রাস করে,যাঁর মধ্যে রসবোধের কমতি নেই। লেখক শাকুর মজিদ ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ এর তেমনি কিছু বৈশিষ্ট্য তুল এনেছেন যা স্মৃতিময়। তাই আমরা কখনো আড্ডাবাজ হুমায়ূন আহমেদকে পাই,কখনো বিক্ষিপ্ত হুমায়ূন আহমেদকে কখনো পৃথিবীর সমস্ত দুঃখে ভারাক্রান্ত এক দুঃখী হুমায়ূন আহমেদকে। হুমায়ূন আহমেদ এর জীবনের শেষ দিন গুলোর বিচ্ছিন্ন কিছু স্মৃতি অনায়াসেই পাঠকের চোখ ভিজিয়ে দেবে। শাকুর মজিদ সেই আবেগের বড় অংশ হয়ে থাকবে। তারার পাশে হাটঁতে চাওয়া সেই ছেলেটিও আজ তারা। দূরতম নক্ষত্রের দ্বীপে পৌঁছাতে কি পেরেছেন শাকুর মজিদ? হ্যাঁ। পেরেছেন। কাউকে মনেপ্রাণে চাইলে আর ইচ্ছা শক্তি থাকলে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। আকাশের তারা যেমন আলো ছড়ায়,তেমনি হুমায়ূন আহমেদ ও শাকুর মজিদ দুজনেই আলো ছড়াক। অনেক অনেক বছর। তারার পাশে তাঁরা জ্বলে উঠুক আপন আলোয়।

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে শাকুর মজিদের বইটির নাম, হুমায়ূন আহমেদ:যে ছিল এক মুগ্ধকর। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটির মূল্য ২৬০ টাক। সংগ্রহে রাখতে পারেন।

৪৭৮ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “তারার পাশে তাঁরা”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।