“মন বাড়িয়ে ছুঁই”

জুঁই কখনোই ভাবেনি ওর স্বামী এতটা কাব্যিক হবে। কবি ও কবিতার প্রতি জুঁইয়ের ক্ষোভ অনেক আগে থেকেই। কলেজে মোয়াজ্জেম স্যার বাংলা পড়াতেন। কবিতার ক্লাস গুলো অত্যন্ত সুন্দর ভাবে নিলেও জুঁই এর কিছুই মাথায় ঢুকতোনা। এইচ এস সিতে যখন বাংলার জন্য গোল্ডেন মিস হলো সেদিনই জুঁই প্রতীজ্ঞা করেছিল জীবনে কখনো সাহিত্যিক অথবা কবি বিয়ে করবেনা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটা ছেলে জুঁইকে পাগলের মত ভালোবাসতো। যতটা ভালো একটা মানুষকে বাসা যায় এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ছেলেটা কবিতা লিখতো। অসাধারণ মেধাবী ছিল। পাগলামিও করতো প্রচুর। জুঁই বুঝতে পারলো ছেলেটা ওকে ভালোবেসে ফেলেছে। প্রচন্ড এবং ভয়াবহ ভাবে। ছেলেটাকে ও অবহেলা করতো। তবুও কি এক অজানা কারণে ছেলেটা তা বুঝেও বুঝতোনা। কবিতা জুঁই এর অসহ্য লাগতো অথচ পাগল এ ছেলেটা যেকোন ভাবে জুঁই কাছে কবিতা পৌঁছে দিত। একটা কবিতা তখন প্রায় সবার মুখেই ঘুরে বেড়াত।

“ইচ্ছে করে একটু তোকে ছুঁই
সব হারানোর শেষের ভোরেও
থাকিস পাশে তুই।
থাকবিনারে জুঁই?”

জুঁই ছেলেটার পাশে থাকেনি। চতুর্থ বর্ষে এসে হঠাত্‍ করেই ওর বিয়ে গেল। ছেলেটা হয়তো জুঁইয়ের বিয়ের খবর পেয়েছিল। এরপর আর কখনোই জুঁই এর ঠিকানায় কোন কবিতা আসেনি। জুঁই ও বুঝি হাফ ছেঁড়ে বাঁচলো।

জুঁই সবচেয়ে অবাক হয়েছিল সেদিন যেদিন ওর স্বামী “এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা” নামে একটি বই নিয়ে আসলো। শান্ত কন্ঠে বলল, আমি কবিতা লিখতে পারিনা। তবে আবৃত্তি পারি। এরপর থেকে প্রতিরাতে তোমাকে একটি করে কবিতা পড়ে শোনাবো. . .
জুঁই নিরীহ কন্ঠে বলল, আচ্ছা।
অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের কারণেই হোক কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক সেই “আচ্ছা”য় যে একটা বিষাদময় দীর্ঘশ্বাস জড়ানো ছিল তা কেউ টের পায়নি..

আজ সকালটা অস্বাভাবিক সুন্দর হতে পারতো। সাইফুলের ডাকে ঘুম ভাঙতে পারতো। কিংবা এও হতে পারতো প্রতিদিনের মত সাইফুল কোন প্রিয় কবিতার লাইন আওড়াতে আওড়াতে টাইয়ের নট ঠিক করছে আর বলছে,আর কত ঘুমাবে তুমি? এখন ওঠো। দেখ আজকের ঢাকার আকাশ অস্বাভাবিক সুন্দর। গত একবছর অনেকটা এভাবেই জুঁইয়ের ঘুম ভাঙতো। আজ জুঁইয়ের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। অথচ আজই সাইফুলটা দূরে। বিরক্তি নিয়ে মুঠোফোন ধরতেই একটা মেসেজ এল। সাইফুলের।
“তোমার জন্য একটা গিফট আছে। আমার প্রিয় এক লেখকের বই। নিচের ড্রয়ারে পাবে। অনেক মিস করছি বউ। শুভ বিবাহ বার্ষিকী।”

সাইফুলের মেসেজ পেয়ে জুঁইয়ের মন কিছুটা ভালো হল। নিচের ড্রয়ার খুলতেই গিফট পেপারে মোড়ানো একটা বই পাওয়া গেল। জুঁই আগ্রহ নিয়ে গিফট পেপার খুলল। কবিতার বই। লেখকের নাম কিছুটা চেনা চেনা লাগলো। বইয়ের শেষ ফ্লাপে লেখকের একটা ছবি দেয়া। উস্কোখুস্কো চেহারার একটা ছেলের ছবি। লেখক পরিচিতিতে লেখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন কবি এমরানুর রেজা। জন্ম ঝালকাঠীর কাঁঠালিয়ায়। মনঃবিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। গতবছর এক দুরারোগ্য রোগে কবি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। কবির একমাত্র কাব্যগ্রন্থ “মন বাড়িয়ে ছুঁই” কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। আপনারা কবির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করবেন।
বিনীত
মনঃবিজ্ঞান বিভাগ
সপ্তম ব্যাচ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়…

জুঁই এর সবকিছু অন্যরকম লাগতে লাগলো। ভয়েভয়ে প্রথম পাতা উল্টাতেই উত্‍সর্গে লেখা,
জুঁই কে. . .

“ইচ্ছে ছিল একটু তোকে ছুঁই
কোন আকাশের বিশালতায়
হারিয়ে গেলি তুই
থাকলিনারে জুঁই. . . .

জুঁই এর চোখের পাতা ঝাপসা হলে এল। কলিং বেল এর শব্দ আসতেই জুঁই কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজা খুলতেই সাইফুল গেয়ে উঠলো, খোল খোল দ্বার। রাখিওনা আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে. . .

বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি দোদুল্যমান জুঁই বলল, তুমিহ?

হ্যাঁ,আমি। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতেই এটা করা। অফিসের কাজ গতকাল ই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

জুঁই সাইফুলকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেললো। সাইফুল অবাক হয়ে বলল, আহা বউ,এই খুশীর দিনে কাঁদতে হয়।

কান্নাভরা জুঁইয়ের ভেজা কন্ঠ সাইফুলকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আমাকে ছেঁড়ে তুমি কোথ্থাও যেতে পারবেনা। কোথথাও না।

জুঁই এর কান্নার বেগ বেড়ে গেল। সাইফুল বাঁধা দিলনা। যে কাঁদতে চায় তাকে কাঁদতে দিতে হয়. . . .

১,০৯০ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য ““মন বাড়িয়ে ছুঁই””

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।