গিট্টু

জুম্মার নামাজে হুজুরের খুত্‍বা শেষ হবার পর সবাই নামাজ পড়তে উঠে দাঁড়াবার সময় পত পত করে একটা শব্দ হল। দু থেকে তিনজন গড়িয়ে পড়ল। তাত্‍ক্ষানিক বেগ সামলাতে প্রিন্সিপাল স্যার কমান্ড দিলেন,হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং? স্যারের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হলোনা। ততক্ষনে সবাই বুঝে গেছে পাঁচ থেকে ছয়জনের পাঞ্জাবীতে সিরিয়াললি গিট্টু মারা হয়েছে। গিট্টুটা এমন ভাবে মারা হয়েছে যে একজনের পাঞ্জাবীর সাথে আর একজনের পাঞ্জাবী সংযোগ হয়ে গেছে। এই কাজ করেছে অষ্টম শ্রেনীর কিছু ক্যাডেট। আর ভিকটিম নবম শ্রেনী। কোন একটি ব্যপার নিয়ে হয়তো মন কষাকষি চলতেছে। জুম্মার নামাজে হুজুরের দীর্ঘ খুত্‍বা পড়ার সময় সবার মধ্যেই ঘুমঘুম ভাব চলে আসে। এই দুঃসাহসিক কাজটি করা হয়েছে এই সময়ে। নবম শ্রেনীর ধরাশায়ী ক্যাডেটরা তখন গিট্টু ছাড়াতে ব্যস্ত। হুজুর মাইকে ঘোষনা দিলেন নামাজ আরম্ভ করতে কিছু দেরী হবে। নামাজ শুরুর আগে সবাই ব্রাউনীয় গতির মত এলোমেলো বসে থাকায় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কে এই দুঃসাহসিক কাজটি করেছে। মসজিদে তখন চাপা হাসির রোল পড়ে গেছে। মসজিদ অধিনায়ক তৌফিক কমান্ড দিয়ে সবাইকে শান্ত করলো। প্রিন্সিপাল স্যার ঘোষনা দিলেন নামাজের পর অষ্টম এবং নবম শ্রেনীর ক্যাডেট রা মসজিদে বসে থাকবে। যথারীতি নামাজ শুরু হল। অষ্টম শ্রেনীর বুক তখন কাঁপছে। গিট্টু রহস্য ফাঁস হলে বিপদেই পড়তে হবে। এই ঘটনার মূল পরিকল্পনা কারি হোসেন। গতকাল বিকেলে বাস্কেট খেলার সময় নবম শ্রেনীর ক্যাডেটরা অষ্টম শ্রেনীকে তাড়িয়ে দেয়। ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকে। ইমিডিয়েট সিনিয়র হওয়ার কারনে এর প্রতিশোধ নেয়াটা অসম্ভব। তাই কৌশলে এঁদের শিক্ষা দিতে হবে। ক্লাসে ঘটনা জানাতেই স্বেচ্ছাসেবী কিছু ক্যাডেট উঠে এল। এরা এই ডেয়ারিং কাজটি করতে চায়। কাজটি করতে পারলে একদিক থেকে সুবিধা। রাতারাতি হীরো বনে যাওয়া যাবে। হোসেন আরাফাত ও এহসানকে কাজ বুঝিয়ে দিল। ভাইয়াদের চোখে আরাফাত ও এহসান দুধে ধোয়া তুলসী পাতা টাইপ। তাই ধরা পড়লেও এদের কিছু না বলার চান্স বেশি। প্রথমে রাজী না হলেও ক্লাসমেটদের চাপে ব্যক্তিস্বার্থ উত্‍সর্গ করতে হলো। আর অতি উত্‍সাহী ডেয়ারিং ক্যাডেটদের কাজ হলো কখন নবম শ্রেনীর ক্যাডেটদের মধ্য ঘুম ঘুম ভাব চলে আসবে এই ব্যপারটা লক্ষ রাখা। মসজিদে আজ সেভাবেই প্লান করে বসা। যদিও মূল পরিকল্পনাটা হোসেন এর করা কিন্তু ও মসজিদে আসেনি। পেটে ব্যথার অজুহাত দেখিয়ে হাসপাতালে থেকে গেছে। কারনটা খুব স্বাভাবিক। নবম শ্রেনীর চোখে হোসেন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছু। হোসেন মসজিদে থাকলে এই কাজ হোসেন না করলেও ওকে দোষারোপ করা হত। এই দায়ভার থেকে মুক্তি নিতেই হোসেন মসজিদে আসেনি। প্লান যথারীতি সাক্সেসফুল হলো। সবঠিক। তবে প্রিন্সিপাল স্যারের চোখে পড়ায় ব্যাপারটা এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রিন্সিপাল স্যার আর্মির লোক। যদি বিকেলে সবাইকে পানিশমেন্ট দিতে নামায় কিছু করার থাকবেনা। সিনিয়রের পাঞ্জাবীতে গিট্টু। ভয়াবহ অপরাধ। আজকের নামাজটাও দ্রুত শেষ হলো। সাধারনত হুজুর জুম্মায় লম্বা সূরা পড়েন। আজ সূরা আছর আর ইখলাস দিয়েই নামাজ শেষ করে ফেললেন। নামাজের পর সবাইকে গোল করে বসালেন। এহসান আর আরাফাতে বুক দড়ফড় করে কাঁপছে। মসজিদে বসে মিথ্যে বলা যায়না। স্যার যদি জিজ্ঞেস করে কে গিট্টু মেরেছে অকপটে স্বীকার করতে হবে। হোসেনের পরিকল্পনায় যে একটু ভুল ছিল এখন ধরা পড়ল। জায়গাটা মসজিদ। মিথ্যে বলার উপায় নেই। প্রিন্সিপাল স্যার আয়েশী ভঙ্গিতে মেহরাব এ গিয়ে বসলেন। সবার সামনে অষ্টম শ্রেনীকে বসিয়ে নবম শ্রেনীকে তার পেছনে বসালেন। শুরু করলেন তাঁর বক্তব্য। সবাই ভেবেছিল স্যার গিট্টু মারা প্রসংগে কিছু বলবেন। তিনি শুরু করলেন দীর্ঘ বক্তব্য। মসজিদের আদব কায়দা সম্পর্কে বিশাল জ্ঞান। কোন হাদীসে কি আছে,কোরআনের আয়াতে কি আছে এই সব।

এদিকে সবার অবস্থা বেশ খারাপ। এম্নিতেই প্রচন্ড ক্ষিদে পেয়েছে তারপর জুম্মার দীর্ঘ নামাজ সাথে প্রিন্সিপাল স্যারের বক্তব্য। এদিকে এহসান আর আরাফাত মনেমনে দোয়া ইউনুস পড়ছে। কোন ভাবে প্রিন্সিপাল স্যার গিট্টু প্রসংঙ্গ এড়িয়ে গেলেই হয়। এহসান আর আরাফাতের দোয়া আল্লাহ শুনলেন না। প্রিন্সিপাল স্যার বলা শুরু করলেন,এই যে গিট্টুটা তোমরা মারলে এ থেকে কি লাভ হলো। পাঞ্জাবী ছিঁড়ে গেল। তোমরা দেশের এত ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ো তোমরা যদি কাজ করো বস্তির ছেলেরা কি করবে। কথা বলতে বলতে তিনি রেগে গেলেন। প্রিন্সিপাল স্যার রেগে গেলে ইংরেজিতে কথা বলেন। তিনি বললেন, হু ইজ দ্যট ব্লাডি ক্যাডেট হু ডিড দিজ . . .এই পর্যন্ত এসে তিনি থেমে গেলেন। কিছুতেই আর গিট্টুর ইংরেজী খুঁজে পান না। এদিকে সবার মুখ বেশ হাসি খুশী। কিছুক্ষন হা হুঁতাশ করার পর তিনি হতাশ চোখে ক্যাডেটদের দিকে তাকিয়ে বললেন,হোয়াট ইজ দ্য ইংলিশ অফ গিট্টু? ক্যাডেটদের মধ্য থেকে কোন উত্তর এলোনা। এমন সময় প্রিন্সিপাল স্যার এর পিয়ন এসে বলল,স্যার বাসা থেকে ম্যাডামের জরুরী ফোন। প্রিন্সিপাল স্যার কথা অসমাপ্ত রেখেই উঠে এলেন। হেঁটে যাওয়ার সময় লক্ষ করলেন তাঁর পাঞ্জাবীতেই বিশাল একটা গিট্টু। তিনি যথা সম্ভব চেষ্টা করলেন ব্যপারটা ক্যাডেটদের যেন চোখে না পড়ে। কিন্তু লাভ হলোনা। অনেকের ই চোখে ধরা পড়লো। হঠাত্‍ স্যারের মনে হল গত কাল স্যারের ছোট মেয়ে মাইশা পাঞ্জাবী নিয়ে কি যেন একটা করছিল। তিনি আজ নামাজ পড়তে আসার সময় তাড়াহুড়ায় এত কিছু খেয়াল করেন নি। কাজটা তাহলে মাইশাই. . .তিনি অতি দ্রুত বের হয়ে এলেন।

স্যার চলে যাওয়ার পর সবাই বেশ মজা পেল। এহসান আর আরাফাত মুখ চাওয়াচুয়ি করলো। মনেমনে ভাবলো,প্রিন্সিপাল স্যারের পাঞ্জাবীতে গিট্টু দেয়ার মত দুঃসাহসী ক্যাডেট আছে। কি জানি থাকতেও পারে,ক্যাডেটদের দ্বারা সব ই সম্ভব।

(কাকতালীয় ভাবে কারো সাথে কাহিনী মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়)

রাব্বী আহমেদ

১,১৪৭ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “গিট্টু”

  1. রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

    🙂 🙂


    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
    খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
    বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
    কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।