..আড়ালে..

মেয়েটা সেই কবে থেকেই নতুন একটা ফ্রকের জন্য জালাচ্ছে। আজ দেব কাল দেব করতে করতে ঈদ এসে গেল। গত ঈদেও মেয়েটাকে কিছু দেয়া হয়নি। মেয়েটা সারাদিন মন খারাপ করে বসে ছিল। পাশের বাশার মুক্তি এসে মেয়েটার সাথে কথা বলতে চাইলেও বলেনি। মুক্তির বাবা বড়লোক। ঈদে পাঁচ থেকে ছয়টি ড্রেস পায়। ঈদের দিন পাঁচ থেকে ছয়বার ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্যাশন শো দেখায়। মেয়েটির আত্মসম্মান বোধ প্রচুর। এতটুকু মেয়ে অথচ এই বয়সেই বোঝার ক্ষমতা দারুন। তাই হয়তো মুক্তির সাথে কথা বলেনি। বুঝতে পারে মুক্তি নতুন ড্রেস দেখাতে এসেছে। অন্য কারন নেই। কিশোরীর ক্ষোভ ভয়াবহ জিনিস। ভাঙতে চায়না। কি জানি এ ঈদেও হয়তো মুখ গোমড়া করে রাখবে। রুমের দরজা বন্ধ করে জানালা দিয়ে আকাশ দেখবে অথবা নিঃশব্দে কাঁদবে। মেয়েটির নিঃশব্দ কান্না বুঝতে কষ্ট হয়না। আর কী ই বা করার আছে। রায়হান টা হঠাত্‍ না মারা গেলেই হত। তিন বছর বয়সী মেয়েটাকে রেখে মানুষটার চলে যাওয়ার কোন মানে হয়?

রায়হান চলে যাওয়ার পরেই সংসারটা পিছিয়ে পড়েছে। কোন মতে টেনেটুনে সংসারটাকে এ পর্যন্ত ধরে রাখতে নিজের ও কষ্ট কম হয়না। একসময় আমিও তো কত বিলাসী ছিলাম। কত বেছে চলতাম। এখন এইসব ইগো ধুলোয় মিশে গেছে। অর্থ কষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট। অন্য সব কষ্টের ওষুধ আছে এই কষ্টের নেই। শেষ কবে নতুন শাড়ী পরেছি মনে পড়েনা। রায়হানের কিনে দেয়া শাড়ী গুলোই ওলট পালট করে পড়ছি। আর এখন তো বিধবা খেতাব পেয়ে বসে আছি। বাংলাদেশের সমাজে বিধবারা এক প্রকার বাই প্রোডাক্ট। অন্যের গলগ্রহ আর সমাজের মানুষের ভ্রুকুটি সহ্য করে বেঁচে থাকা। যৌবন থাকতে বিধবা হওয়া তো আরো কষ্টের। সবার চোখ যায় দেহটার দিকে। এইতো রায়হান মারা যাবার পর কত চেষ্টা করলাম ওর অফিসে একটা চাকরীর জন্য। যদিও সার্টিফিকেটের জোড় কম। অফিসিয়াল কাজ টেলিফোন রিসিভ এসব কাজ করতে তো আর সার্টিফিকেট এর জোড় লাগেনা। হবে হবে করেও যখন চাকরীটা হলোনা তখন এক প্রকার আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা। চাকরীটা অবশ্য হত। রায়হান এর বসকে খুশী করতে পারলেই হত। একটা জিনিস বুঝিনা এত কুরূচি মানুষের হতে পারে? পুরুষ জাতিটাই কি এমন। কিছুই ভাবতে পারিনা। বসের ইচ্ছা মত কাজ করলে অবশ্য এই দুর্ভোগটা থাকতোনা। মেয়েটাকে নতুন জামা দেয়া যেত। ভালো একটা ফ্লাটে ওঠা যেত। কিশোরী বয়সে মেয়েদের ছোট ছোট কিছু ইচ্ছে থাকে তাও পূরন করা যেত। অথচ এর কোন কিছুই এখন করতে পারিনা। কি দারুন অক্ষমতা। মেয়েটার কথা ভাবতেই খারাপ লাগে। বুকের ভেতর চিকন একটা ব্যথা চিনচিন করে জেগে ওঠে। এবার ঈদটাও নতুন জামা ছাড়া কাটাতে হবে। বাচ্চা মেয়ে। এতকিছু বোঝে না। বোঝার কথাও না. . .

এতটুকু লিখে সামিয়া ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডায়রি জিনিসটা না থাকলে মানুষের কষ্টের সীমা থাকতো না। কত কষ্টের কথা জমা রাখে ডায়রির নিঃষ্প্রান কয়েকটি পাতা। অথচ এর মধ্যেই প্রানের আকুতি গুলো,অবিচ্ছিন্ন আবেগ গুলো প্রবল ভাবে জেগে ওঠে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল একটা বাজে। পুনমের স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়েছে। সামিয়া ডায়রিটা বন্ধ করে ফেলল। আলমাড়িতে রাখতে গিয়েই টুপ করে একটা জিনিস একেবারে পায়ের ওপর পড়লো। সামিয়া নিচ থেকে ময়লা ঝেড়ে তুলে নিতেই দেখল একটা শাড়ী। শাড়ীটা সামিয়ার ই। যে মাসে রায়হান মারা গেল তার আগের মাসে কেনা। নিউমার্কেট থেকে শাড়ীটা রায়হান কিনে ছিল। বিবাহ বার্ষিকীতে পড়ার জন্য। রায়হানটা মারা যাওয়াতে আর পড়া হয়নি। রঙচটা শাড়ী। বাঙালী বিধবা মেয়েদের রঙচটা শাড়ী পড়ার নিয়ম নেই। সামিয়ার দীর্ঘশ্বাস আর একটু ভারী হল। শাড়ীটা এখনো নতুন। ভাজ ও খোলা হয়নি। হঠাত্‍ করেই অদ্ভুত এক চিন্তা খেলা করলো সামিয়ার মনে। এই শাড়ী দিয়ে নিঃসন্দেহে দুটো জামা হয়ে যাবে। পুনমটা একসাথে দুটো জামা পেয়ে নিশ্চই খুশী হবে। মেয়েটাকে আর গোমড়া মুখে থাকতে হবেনা। নিজের কাছেও ভালো লাগবে। সামিয়া কিছুক্ষন ভাবলো। রায়হানের দেয়া শেষ স্মৃতিটাও কেটে ফেলতে ইচ্ছে হয়না। মনের সাথে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব করে অবশেষে শাড়ীটা প্যাকেটে ঢুকালো সামিয়া। বর্তমানটাই মুখ্য। স্মৃতি হচ্ছে অতীত। অতীত কে বর্তমানে টেনে আনা মানে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো। মেয়েটার হাসিমুখের কাছে যেসব বেদনা সহজেই ম্লান হয়ে যায়। সামিয়া নিজেকে ঠিক করে নিল। পুনম স্কুল থেকে ফেরার আগেই দর্জির কাছে কাপড় দিয়ে আসতে হবে। হাতে সময় নেই।

গ্লোরী টেইলার্স থেকে বের হয়ে মা মেয়ে কিছুক্ষন মুখ চাওয়াচুয়ি করলো। পুনম আজ বেশ খুশী। ড্রেসের মাপ দিয়ে এসেছে। নতুন জামা হবে। অনেক আনন্দের ব্যাপার। পুনম তাকিয়ে দেখল ওর মার চোখ ছলছল করছে। মায়ের কষ্টটা কোথায় পুনম জানেনা। শুধু জানে টেইলার্স থেকে ফেরার সময় ওর মা কিছু টুকরো কাপড় সাথে করে নিয়ে এসেছে। এই টুকরো কাপড় দিয়ে কি হবে পুনম ভেবে পায়না। ওর মাতো আর ছোট নেই যে পুতুল খেলবে। অতি কৌতুহলী মন মাকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,মা এই কাপড়ের টুকরো গুলো দিয়ে তুমি কি করবে?
-জমিয়ে রাখবো।
কেন মা?
সামিয়া নিজেকে শক্ত করে বলল,সব প্রশ্নের উত্তর হয় না মা। পুনম আর কিছু বলতে পারেনা। ও জানে ওর মায়ের অনেক কষ্ট। কিছুটা চাপা,কিছুটা মাপা। সামিয়া আকাশের দিকে তাকায়। মধ্য দুপুরের মেঘলা আকাশে একটা চিল ভেসে বেড়াচ্ছে। জীবনানন্দের কবিতার কথা মনে পড়ে সামিয়ার,

হায় চিল,সোনালি ডানার চিল,এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে
. . . .
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে. . . .

একটু পরে বৃষ্টি নামে। ঘন শ্রাবনের অবাধ বর্ষনে ভিজে যায় সামিয়ার চোখ,চোখের পাতা, এবং অনেক দিনের অযত্নে ফেলে রাখা একটি সনাতনী মন।. . . .

৬৯৮ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “..আড়ালে..”

  1. সামিয়া (৯৯-০৫)

    গল্পটা পড়তে দেরী হইল, নাইলে আগেই মাইরটা খাইতি। পড়তে পড়তে তোরে কি শাস্তি দিব ভাবতেসিলাম, নিচে এসে শহীদ ভাইয়ের কমেন্ট পড়ে হেসে ফেললাম।
    এত মানুষ থাকতে আমারে এত কষ্টের মধ্যে ফেলার কি ইচ্ছা হইল?

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।