অর্চি

অর্চির সাথে আমার প্রথম পরিচয় কফিশপে। এক বিকেলের হলুদ রোদ এসে জানালার কাঁচে অপূর্ব প্রতিফলন তৈরি করছে। কফি মকা র অর্ডার দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে আমি আকাশ দেখছি। হঠাত্‍ পাশ থেকে সুরেলা কন্ঠে ডাক,ভাইয়া ওয়াশ রুমটা কোন দিকে? মোটামুটি থতমত ই খেয়ে গেলাম। বুঝলাম মেয়েটি আমাকে ওয়েটার ভেবে ভুল করেছে। অবশ্য ভুল করার ই কথা। সাদা ফর্মাল ড্রেস সাথে টাই আর হাতে কফি শপের ম্যানু। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকা। ওয়েটার ভাবা অস্বাভাবিক তো কিছুই না। আমি পাশ ফিরে বললাম,জ্বী আমি ঠিক জানিনা…আমি এখানে…কথা শেষ করার আগেই অর্চি বলল,ওহ। এক্সট্রেমলি স্যরি..।কেউ এক্সট্রেম পর্যায়ের স্যরি বললে করার আর কিছুই থাকেনা। এক্সট্রেম পর্যায়ের স্যরি মানে চরম পর্যায়ের দুঃখিত। অর্থাত্‍ মেয়েটি আমার কাছে পরাজিত। পরাজিত সৈনিককে যুদ্ধের মাঠে হেনস্তা করা যায়। এর বাইরে না। আমি বললাম ঠিক আছে ঐ দিকে যান। অর্চি মুচকি হেসে ভুল বোঝাটাকে সামলে নিল।
অর্ডার দিয়ে বসে আছি অনেকক্ষন হল। তানভীরটা আসি আসি করেও আসছেনা। সময় জ্ঞান বলতে কিছুই নেই ছেলেটার। তানভীর না এলেও কফি চলে এসেছে সময় মত। কফিতে দু এক চুমুক দিচ্ছি এমন সময় দেখলাম অর্চি ঠিক আমার পাশের টেবিলেই বসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি দিল। মুখ ফুটে হয়তো থ্যাংকস শব্দটাও বেরিয়েছে। ফরমালিনের যুগে মানুষ গুলো ফরমাল হবে এটাই স্বাভাবিক। আমিও বাধ্য ছেলের মত ওয়েল কাম বলার পরেই মনে হল ছোট একটা ভুল হয়ে গেছে। অর্চি যেহেতু পরাজিত সৈনিক তাই তাকে একটু বাজিয়ে দেখলেই ভালো হত। বাজিয়ে দেখা মানে কোথায় থাকে নাম ধাম এই আর কি। সুযোগের সত্‍ব্যবহার বলে খাঁটি বাংলায় একটা কথা আছে। লালনের গান ও আছে,সময় গেলে সাধন হবেনা।..সত্যিই সময় চলে গেলে আর কিছুই করার থাকবেনা। অর্চির সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করছিল খুব। একটু চুমুক একটু আড় চোখে ওকে দেখা। লুকোচুরির গল্প যাকে বলে। মেয়েটিও হয়তো কারো জন্যে অপেক্ষা করছে।
আধুনিক মেয়ে। বয়ফ্রেন্ডের সাথে কফিশপে ডেটিং। অস্বাভাবিক তো কিছু না। খুব ই স্বাভাবিক। বরং আমার মত আঁতেল টাইপ কোন ছেলের জন্য আধুনিক কোন মেয়ে অপেক্ষা করবে এটাই অস্বাভাবিক। ধরা মাছ একবার ছুটে গেলে তাকে আর ধরা যায়না। সে হিসেবে অর্চি এখন আমার কাছে হাত থেকে ফসকে যাওয়া মাছ। নিজ ইচ্ছেই কথা বলার সুযোগটা হারালাম। এখন সেধে গিয়ে কথা বলা পার্সোনালিটির একটা ব্যাপার। মেয়েদের পার্সোনালিটি আর একটু বাড়িয়ে দেয়ার জন্য পার্সোনা নামের বিউটি পার্লার আছে। আফসোস ছেলেদের কিছু নেই। সাতপাঁচ ভেবে তানভীরকে ফোন দিতেই ও জানাল পান্থপথে জ্যামে আটকা পড়েছে। পৌঁছাতে বেশ সময় লাগবে। বুঝলাম আজ এই ভাষাহীন নিঃষ্প্রান কফিশপে আমার আরো অনেক ক্ষন বসে থাকতে হবে। ভাষাহীন এই অর্থে অতি ফর্মাল জায়গায় মানুষের কথা বার্তাও খুব লিমিটেড হয়। প্রেমিক প্রেমিকার ফিসফাস গল্প আর মুখোমুখি তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন বিশেষ দৃশ্য চোখে পড়ছেনা। মাঝেমাঝে টুকটাক যাও অর্চিকে দেখছি তাও চোখে চোখ পড়তেই ও মুখ ঘুরিয়ে ফেলছে কিংবা এমন ভাব করছে যেন ওর আশেপাশে কেউ নেই। অর্চির ও হয়তো আমার মতই দশা। কারো জন্যে অপেক্ষা। একদিক থেকেই ভালো হল দুজন একই পথের যাত্রী। অনেক কিছু ভাবছি এর মধ্যে দেখলাম হুট করে তানভীর ঢুকলো। আমি ডাকলাম,এই এই তানভীর…শুনলোনা অথবা শুনেও না শোনার ভান করে এগিয়ে গেল সোজা অর্চির টেবিলে। পরবর্তী ঘটনা গুলো ঘটল খুব দ্রুত,আমার কাঁধ চাপড়ে বলল,কি রে এতক্ষন পাশাপাশি বসে আছিস তাও অর্চির সাথে কথা বলিস নি? এই নে তোর অর্চি। তানভীরের কথা শুনে সত্যিই আমি আকাশ থেকে পড়লাম। অর্চি মানে সকালের প্রথম আলো। যার জন্যে সূদূর কানাডা থেকে আসা। তানভীরের আর দোষ কি নিজেই তো অর্চিকে দেখতে চাইনি। বলেছিলাম একদম সামনাসামনি দেখবো। আমি যে একটা সিরিয়াস পর্যায়ের আঁতেল আবার টের পেলাম। না হলে কি নিজের বউ নির্বাচনের মত গুরু দায়িত্বটাও বন্ধুকে দেই।

ভিসা পার্সপোর্ট সব ঝামেলা চুকিয়ে অর্চিকে পারমানেন্টলি কানাডা নিয়ে আসতে একটু দেরীই হল। প্রথম পরিচয়ে অর্চিকে যেমন পরাজিত সৈনিক বানিয়েছিলাম ঠিক তেমনি ও আমাকে অনেক বার পরাজিত জেনারেল বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। শুধু পার্থক্য এই যে আমি ওর কাছে খুব সিরিয়াস কিছু ব্যাপারে ধরা খাই। যা ভয়াবহ লজ্জার। গল্পে বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের গল্প। সব কি বলা যায়? সেন্সর শীপের একটা ব্যাপার স্যাপার আছে।

টরেন্টোর শেষ বিকেলে বাংলাদেশের হলুদ আলো না থাকলেও বরফ আচ্ছাদিত তুষার থাকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি কফির মগ হাতে তুষারপাত দেখি। অভ্যাসটা একটু বদলেছে। আগে কফি মকা কিংবা কফি কাপাচিনো ছাড়া খেতাম না আর এখন অর্চির হাতের বানানো সহজ সরল এক কাপ কফি ছাড়া কিছুই ভালোলাগেনা। মাঝেমাঝে কফি হাতে নিয়ে ভাবতে থাকি আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথা। কফি ও কফির মগ দুটোই ঠান্ডা হয়ে যায়। অর্চি আগের মতই বলে ওঠে,এই যে ওয়াশ রুমটা কোন দিকে. . .

উত্‍সর্গ: নিয়ামুল হাসান ভাই এবং ফারজানা ভাবী (এক বিকেলে কফি শপে তাঁদের দেখে মনে হয়েছিল তাঁরা দুজন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দম্পত্তি)

১,৪৯২ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “অর্চি”

  1. রকিব (০১-০৭)

    ভালো লেগেছে। বিশেষ করে গল্প বলার স্টাইলটা বেশ পছন্দ হয়েছে।
    খালি একটা জায়গায় মাইনাস; শীতের শেষ বিকেলে টরন্টোতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুষারপাত দেখতে দেখতে কফি খাওয়া খুব একটা আরামদায়ক নয়। পারতপক্ষে কাউরেই খাইতে দেখি নাই 😛 😛


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

      শীতের শেষ বিকেলে টরন্টোতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুষারপাত দেখতে দেখতে কফি খাওয়া খুব একটা আরামদায়ক নয়। পারতপক্ষে কাউরেই খাইতে দেখি নাই

      টরন্টোতে যাই নাই ভাই 🙁 🙁


      নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
      খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
      বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
      কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

      জবাব দিন
  2. আহমদ (৮৮-৯৪)

    গল্পের ধারাটা ভাল লেগেছে। সবচেয়ে ভাল লেগেছে এই লাইনটাঃ "এক বিকেলে কফি শপে তাঁদের দেখে মনে হয়েছিল তাঁরা দুজন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দম্পত্তি।"


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।