ক্যাডেট লাইফ ও একটি মায়ের চিঠি

আম্মুর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল চিঠি। দুই টাকার হলুদ একটি খাম ভেতরে দুই জনমের আবেগ। আম্মুর লেখা প্রতিটি চিঠি অসংখ্য বার পড়তাম।
মাঝেমাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে এলে কোন মতে বালিশে চাপা দিতাম অবাধ্য অশ্রুরাশিকে। প্রতি সপ্তাহে একটি চিঠি আসতো। মায়ের কাগজ বন্দী আবেগ আর উপদেশ গুলো ক্যাডেট কলেজের সেই প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার প্রেরনা যুগিয়েছে। আধুনিক সভ্যতার মুঠোফোনের বেতার তরঙ্গ তখনো ক্যাডেট কলেজে জায়গা করে নিতে পারেনি আর্মি হেড কোয়াটারের স্বেচ্ছাচারিতায়। এক দিক থেকে ভালোই হল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিঠি গুলো জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে থাকবে মায়ের ভালোবাসার। অনেক বেশি ভালোবাসি মা কে।

আমার মা অনেক আবেগী একজন মানুষ। প্রতিবার আম্মাকে ছেড়ে কলেজে যেতে খুব কষ্ট হতো। মনে পড়ে কলেজে যাওয়ার আগের রাতে মা খুব কাঁদতেন। গভীর রাতে নিজর্নতায় একা একা। মা কখনো চাইতেন না আমি তার চোখের পানি দেখি। তিনি জানতেন আমার পৃথিবীটা তাহলে এলোমেলো হয়ে যাবে। শুধু যাওয়ার আগে চোখের ওপর একটা চুমু দিয়ে বলতো,ভালো থাকিস বাবা। ক্যাডেট কলেজের নিয়ম কানুন মেনে চলিস। মায়ের চোখে বিদায়ের অশ্রু তখন চকচক করছে যেন আমি ছুঁয়ে দিলেই সেখানে তুমুল বর্ষন শুরু হবে। আমি মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে যখন গাড়ীতে উঠতাম তখন দেখতাম অতি আবেগী একজন মানুষ মুখে আঁচল চেপে আছে। ইচ্ছে হত সেনাবাহিনীর সব নিয়ম কানুন ভেদ করে ক্যাডেট কলেজের মধ্যে মাকে নিয়ে আলাদা এক পৃথিবী গড়ে তুলি। যে পৃথিবী শুধু আমার আর মায়ের। স্টেশন ছাড়িয়ে গাড়ী চলত তার আপন গতিতে শুধু আমি তাকিয়ে দেখতাম বিন্দুর মত ছোট আমার মা সিন্ধু সম মমতা নিয়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একাকী

অষ্টম শ্রেনীতে থাকা কালীন একবার কলেজ থেকে আমার নামে ওয়ানিং লেটার পাঠানো হলো। সপ্তম শ্রেনীর এক ক্যাডেট কে মারার কারনে কলেজ থেকে বিশেষ চিঠি। কলেজের নিয়ম ছিল প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার অভিভাবক সাক্ষাতকার দিবস হবে। ক্যাডেট কলেজের ভাষায় যার নাম প্যারেন্টস ডে। সেই প্যারেন্টস ডে তে আব্বু আম্মুকে প্রিন্সিপাল ডাকলেন। আমার অভিযোগ শোনালেন। আর্মি হেড কোয়ারটারের নিয়ম অনুযায়ী আমাকে জরিমানা করা হল।আম্মু প্রিন্সিপাল স্যারকে অনেক অনুরোধ করলেন। আম্মুর অনুরোধে এ যাত্রায় আমাকে কলেজ থেকে বহিস্কৃত করা হলোনা। শুধু প্রিন্সিপাল এর রুম থেকে বের হয়ে তিনি অত্যন্ত কঠিন চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি অপরাধীর মত মাথা নিচু করে ফেললাম। আম্মু আমাকে মাফ চাওয়ার ও সুযোগ দিলেন না। অত্যন্ত আবেগী এই মহিলা এক মুহূর্তে পাথর হয়ে গেলেন। আমার সাথে কোন কথা না বলে কলেজের গেট থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি শুধু তাকিয়ে দেখলাম অজস্র মমতার গাঢ় আচ্ছাদনে ঢাকা আবেগী আমার মা কি গভীর সহজ অভ্যাসে হেঁটে চলছেন। একবার পিছু ফিরে তাঁর এই অপদার্থ ছেলেটিকে দেখলেন ও না। সেদিন নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়েছিল। ইচ্ছে করছিল পৃথিবীকে চিত্‍কার করে বলি, মা গো আমি আর কখনো ভুল করবোনা। শুধু তোমার আঁচলে একবার থাকতে দিও।

টানা তিন সপ্তাহ তিনি কোন চিঠি পাঠালেন না। পরবর্তী চিঠিতে তিনি লিখলেন,

প্রিয় রাব্বী,
অজস্র ভালোবাসা নিস। সেদিন তোর কাছ থেকে এভাবে চলে আসার পর অনেক কেঁদেছি। আমি জানি আমার চেয়েও তোর কষ্টটা বেশি। ক্যানো এমন করিস? অনেক কষ্টে তোকে ক্যাডেট কলেজে পড়াই। মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে পড়াতে পরিবারের যে কত ধাক্কা সামলাতে হয় তা তুই জানিসনা। আমরা সবাই তোর জন্যে অনেক কষ্ট করি। আর্থিক কষ্টের চেয়েও মানসিক কষ্টটা প্রধান। যে আমি তোকে ছাড়া কখনো ঘুমায়নি সেই আমি তোকে ছাড়া থাকছি। তুই কি বুজবিনা আমার কষ্টটা। আর কখনো কোন জুনিয়রকে মারবিনা। আমার কছম থাকলো। ভালো থাকিস বাবা। তোর জন্যে অনেক আদর।
ইতি তোর মা
০২.০৬.০৬

মায়ের এই চিঠির জবাব আমি দিতে পারিনি। পরবর্তী কয়েক মাস নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হতো। পরবর্তী বছর আমাদের কলেজের ম্যাগাজিনে মাকে নিয়ে আমার লেখা একটা কবিতা ছাপা হলো। কবিতাটির কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি।

“জন্ম নিয়ে প্রথম আলোয় দেখি তোমার মুখ
মাগো তোমার মাঝেই খুঁজে পাই আমার যত সুখ
মাগো তুমি সকল সুখের মূল কেন্দ্রবিন্দু
তুমি সাহারা সম এই হৃদয়ে বয়ে চলা সিন্ধু
দুখের মাঝে সুখের স্বপন মরন অঞ্জলীতে
তাই তোমায় স্মরন করি দিবস ও রাত্রিতে”

কবিতাটি মা সবাইকে দেখিয়ে গর্ব করে বলেছিলেন এটা আমার ছেলের লেখা। সেদিন মা তাঁর তরল হাসির আড়ালে আমার প্রতি তাঁর জমে থাকা সব অভিমান মুছে ফেলে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলেছিলেন,অনেক বড় হ। আমি মায়ের সামনে অপরাধীর কন্ঠে বললাম, মা, মাফ করেছোতো?
মা তার চির চেনা হাসি দিয়ে বলেছিলেন,ধুর পাগল। সন্তানের কোন অপরাধ কি মা মনে রাখে?. . . . . .

মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে হয় মা রা এত ভালো কেন? কিছু কিছু প্রশ্ন আছে যার উত্তর নেই।
null

১,৩০৬ বার দেখা হয়েছে

২০ টি মন্তব্য : “ক্যাডেট লাইফ ও একটি মায়ের চিঠি”

  1. জিহাদ (৯৯-০৫)

    চিঠি পাওয়াটাই অন্য রকম একটা ব্যাপার। সেটা যদি মায়ের হয় তাহলেতো কথাই নেই।
    ফলইনে যখন প্রিফেক্ট কেউ চিঠি নিয়ে আসতো তখন দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতাম এই বুঝি আমার ক্যাডেট নম্বরটা ডাকলো। একে একে হাতের চিঠি দেয়া শেষ হয়ে গেলেও যখন কোন চিঠি পেতাম না, মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যেত। চিঠি ব্যাপারটা কলেজ থেকে বেরোনোর পর আর সেভাবে তেমন একটা অনুভব করার সুযোগ হয়নি। ভাবলে খারাপই লাগে।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।