একজন কলেজ আউটের গল্প

অনেক দিন হাসিনা।একটা সময় ছিল যখন হাসির অর্থ ছিল অনেক।ইদানিং জোকস শুনলেও বিরক্ত লাগে।ক্যাডেট থাকা অবস্থায় বেশ হাসি খুশী ছিলাম।কারনে অকারনে হাসতাম।একবার স্যার নিউটনের গতি সূত্র পড়াচ্ছেন।আমি পেছন থেকে হাসতেছি।স্যার বললেন ‘হাসছো ক্যানো?
আমি জবাব দিলাম ‘স্যার ভাবতেছি নিউটন যদি নারিকেল গাছের নিচে বসে থাকতেন আর মাথায় যদি নারিকেল পড়ত তাহলে কি হত?স্যারের উত্তর দেয়ার আগেই আমার জনৈক ক্লাসমেট উত্তর দিল ‘দোস্ত তাহলে লস অফ ইমোশন তৈরি হত. . .’
ক্লাসে হাসির রোল পরে গেলে স্যারের করুন চোখের বিমর্ষ চাহূনীতে তিনি আমাকে যা বোঝালেন তার অর্থ মোটামুটি এরকম।আমাকে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।ক্লাস নাইনে থাকতে একটি ফিজিকস ক্লাসেও ক্লাসে থাকতে পারিনি।

অন্য একদিনের কথা।আমাদের টেষ্ট পরীক্ষায় ভুল বশত একটা প্রশ্ন ছাপা হয়েছে।’গফুর গল্প অবলম্বনে মহেশ চরিত্র টি আলোচনা কর।
মোটামুটি একটা হাসির ঝড় বয়ে গেল পরীক্ষার হলে।পরীক্ষার গার্ড ছিলেন জহির স্যার।তিনি আবার ইংরেজীতে কথা বলায় বেশ পারদর্শী।স্যার তার অভিনব ইংরেজীতে বললেন ‘Your teacher iz exam hall,but your mouth is laughing,,very shocking..(?)
স্যারের কথা শুনে আমাদের হাসির বেগ আরো বেড়ে গেলে স্যার আমাদের হাসির কারন জিজ্ঞেস করলেন।আমি যেহেতু একটু বেশি হাসি তাই আমি দাঁড়িয়ে বললাম ‘স্যার প্রশ্নে ভুল আছে।
স্যার অঙ্কের টিচার।তিনি বললেন ‘যা আছে তাই ল্যাখো. . . .
আমি মোটামুটি একটা ভরসা পেলাম।লেখা শুরু করলাম. . . . . . . .মহেশের চোখ দুটি ছিল মায়াবী।চরিত্র ছিল সতী সীতার সমতুল্য।গফুর গল্পে মহেশ একটি আদর্শ গরু চরিত্র. . .(!)
খাতা দেয়ার পর অবশ্য রেহাই পাইনি।বাসায় ছোট একটা লাভ লেটার গিয়েছিল।যার একটি লাইন ছিল ‘আপনার পুত্র বা পোষ্যের বাহ্যিক জ্ঞান অত্যন্ত নিম্ন মানের. . . . .’

এর দুই বছর পরের কথা।আমরা তখন ক্লাস টুয়েলভে।প্রায়ই জুনিয়র ব্লকে যাই প্রেপ গার্ড হিসেবে।ভীষন কড়া টাইপ গার্ড দেই।একদিন হঠাত্‍ করে একটা ডাক শুনতে পেলাম “অই গাব্দা খাতাটা পাঠাতো”
গাব্দা ডাকটা শুনে কিছুক্ষন হ্যান্গ হয়ে ছিলাম।বললাম ‘অই তোমাদের মধ্যে গাবদা কে?
অসম্ভব মোটা একটা ছেলে দাঁড়ালো।দেখে আমার ই হাসি পেল।বুঝতে দেরী হলনা ক্যাডেটদের আক্রমনাত্মক টিজ থেকে ছেলেটিও রেহাই পায়নি।

এরপর থেকে প্রেপ গার্ড গেলে প্রায়ই গাবদা কে দেখতাম।মাঝেমাঝে ডেকে কথা বলতাম।একদিন ক্যান্টিনে দেখা হল।বললাম ‘অই গাবদা এদিকে আয়।
সেদিন গাবদা মনে হয় বেশ লজ্জা পেয়েছিল।আর আমরাও সবাই অট্টহাসিতে মাতোয়ারা হয়েছিলাম।পরে ভাবলাম ওকে হাউসে গিয়ে সরি বলব।কিন্তু সরি আর বলা হয়ে ওঠেনি।

এরপর থেকে মোটামুটি সবাই একে গাবদা নামে ডাকত।জানিনা ভেতরে ভেতরে ও কষ্ট পেত কিনা তবে আমার নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হত।একদিন গেমস টাইমে দেখলাম স্টাফ গাবদাকে ড্রিল শেখাচ্ছে।বেচারার শরীর থেকে টপাটপ ঘাম বের হচ্ছে।আমি কাছে গিয়ে বললাম স্টাফ ছেঁড়ে দিন।ওর ক্লাসমেটরা সব হাউসে চলে গেছে।কি মনে করে স্টাফ ছেঁড়ে দিলেন।গাবদা একটু হাসল।আনন্দ আর বেদনার মাঝামাঝি সে হাসির অর্থ ছিল অনেক।

অনেক দিন পরের কথা।সকালের পিটি তে দৌড়াচ্ছি।এক চককর দৌড় তখনো শেষ হয়নি।এমন সময় দেখতে পেলাম গাবদা মাটিতে লুটিয়ে আছে।হয়তো বিশাল শরীরটাকে দৌড়ানোর সময় ধরে রাখতে পারেনি।দেখলাম গাবদার মুখ থেকে গোঙানীর মত শব্দ আসছে।কলেজ মাইক্রোবাসে করে গাবদাকে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল এ পাঠানো হল।

ওয়াহেদ ফিরে আসল বিকেল চারটায়।ওকে রাখা হল কলেজ মস্কের সামনে।সবাইকে শেষ বারের মত ওকে দেখতে যেতে বলা হল।আর একটু পরেই কলেজ থেকে চলে যাবে ওয়াহেদ।আমাদের গাবদা।চিরদিনের জননে।ওয়াহেদকে শেষ বারের মত দেখতে আমি যেতে পারেনি।ওর চলে যাওয়াটা মানতেও পারছিলাম না।কিছুক্ষন পর কলেজের বিশেষ গাড়িতে ওয়াহেদকে পাঠিয়ে দেয়া হল।কলেজ আউট ওয়াহেদ।আর কলেজ আউট হবেই না কেন?মানুষ মরে গেলে অর্থঁহীন হয়ে যায়।কেউই তাকে রাখেনা
* * * * * * * * * * * *
ওয়াহেদের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার দিনটি ছিল ১০.১০.১০
এই দিনটির পর শেষ কবে প্রাণ খুলে হেসেছি মনে পরছেনা।গাবদা তোকে অনেক ভালোবাসতাম।কথনো তোকে বলতে পারিনি।আমাকে মাফ করে দিস।ওয়াহেদ মৃত্যুর পর প্রায়ই কাঁদতাম।গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে জানালা দিয়ে বাস্কেট বল গ্রাউন্ড দেখতাম।
মাঝেমাঝে অপূর্ব জোছনা উঠতো।বরিশাল ক্যাডেট কলেজের সমস্ত প্রাঙ্খন ভেসে যেত।দেখতাম অস্বচ্ছ জোছনার আবছায়া মায়াবী আলোয় একটি ছায়ামূর্তি।চেনা আরা অচেনার সংমিশ্রনে আবছায়া অবয়বকে গাবদা মনে হত।
আমার এ লেখাটা হয়তো তুই পড়বিনা গাবদা তবে মৃত্যুর পরে যদি কোন জগত থাকে সেই জগতে তোকে আমি এই লেখাটা দেখাতে চাই।ভালো থাকিস্ গাব্দা…….অনেক অনেক ভাল…………

২,১৮৬ বার দেখা হয়েছে

২২ টি মন্তব্য : “একজন কলেজ আউটের গল্প”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    খুব মজা নিয়ে পড়ছিলাম লেখাটা কিন্তু শেষে এসে বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম...

    ওয়াহেদ শান্তিতে থাকুক।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    গতকাল রাতে পড়া শুরু করেছিলাম, ভালোই লাগছিল। আজ শেষাংশটুকু পড়ে আবার উপরে গিয়ে দেখলাম সেই লেখাটাই কিনা......

    ওয়াহেদ শান্তিতে থাকুক...এই কামনা করি...

    জবাব দিন
  3. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    ওয়াহেদের জন্য ভালোবাসা। জানি ওর কাছে সেটা পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। তবুও এটাই তো দিতে পারি।

    লেখা ভালো হয়েছে রাব্বী জুনিয়র।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  4. গল্প ভেবে পড়ে তোমার লেখক শৈলিতে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। তবে অন্যদের মন্তব্যে যখন বুঝতে পারলাম যে এটা মন্জুরের মত আরেকটা করুণ পরিনতি, কষ্টে বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। কারণ মন্জু ছিল আমার টেবিলমেট, তখন অনেক কেদেছি, তাকেও আমি একটা টিজ নামে ডাকতাম। মন্জু, ওয়াহেদ, খুরশিদ সহ নাম না জানা সকল কলেজ আউট ক্যাডেটকে আল্লাহ্ বেহেস্ত নসীব করুণ। রাব্বী ভালো থেকো, ধন্যবাদ তোমাকে সহজে সব ভুলে যাওয়ার ভিড়ে বিলীন না হওয়ার জন্য.....

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।