ট্যুর ডি টাঙ্গাইল

গত কয়েকদিন যাবৎ আমি বেশ মনোদৈহিক যাতনার মধ্যে আছি। ব্যাপারটা প্রিন্সিপাল স্যার অবগত। ডেস্কজব করলে যা হয় আর কি, ব্যাকপেইন। হওয়াটা খুব ইজি বাট খতরনাক এন্ড লং লাস্টিং ।আমার ঠিক এখনো হয়নি কিন্তু সেরকমই ঈঙ্গিত দিচ্ছে। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান হও নীতিতে তৎপর। এখনি এইটার মূলোৎপাটন করাটা বাঞ্ছনিয়। এখানে বলে রাখা ভাল আমার শরীর ছিল বিশ্রি রকমের ভাল। ক্যাডেট কলেজে ফাঁকি মারার জন্য খুব কমই সিক রিপোর্ট করতে পেরেছি। বিশেষ করে পরীক্ষার আগে দেখতাম ক্যাডেটদের মধ্যে বাই এনি চাঞ্চ হসপিটালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যেত। আমি অবশ্য সেরকম সুযোগ খুব কাজে লাগাতে পারিনি। তারপরও ক্যাডেট ত- হাল ছাড়ব কেন।একদিন সকার খেলতে গিয়ে পায়ে সামান্য ব্যথা পেলাম (তখন মনে হয় ক্লাস এইটে) আর সিক রিপোর্ট করে হসপিটালে গেলাম। তখন মেডিকেল অফিসার ছিলেন মেজর মুকুল জ্যোতি চাকমা। আমাকে দেখে খুব একটা আশ্বস্ত হলেন না। বললেন “ মকামি কর”? আমি খুব ব্যথার ভাব ধরলাম। দয়া করেই মনে হয় ২ দিন এক্সকিউজ দিয়ে দিলেন। ঢাকায় ভেজাল হাওয়া বাতাস খেয়ে এখনো সিজনাল অসুখ ছাড়া আর কোন অসুখ সাধারণত হয়না । আরও অবাক করা ব্যাপার ক্যাডেট কলেজে পড়েও আজ পর্যন্ত আমার শরীরে কোন সিঙ্গেল স্টিচ নেই।
আমি জানতাম লাবলু ভাইয়েরও এই প্রব্লেম আছে তাই ভাবলাম নিশ্চয়ই উনার ডাক্তার আছে। ফোন দিলাম এবং প্রকৃত প্রিন্সিপালের মতই গাইডলাইন দিলেন। উনার ফ্রেন্ড এখলাসুর রহমান, পিএইচডি অর্থো(জাপান)। আছেন ইয়ামাগাতা ঢাকা ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালে (জাপানের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার), লালমাটিয়া আড়ং এর পাশে। আমাকে ফোন নাম্বার দিলেন এবং উনার ফ্রেন্ডকেও ফোন করে বলে দিলেন।ডাক্তার দেখে বললেন নাথিং সিরিয়াস, ঠিক হয়ে যাবে। মাইওল্যাক্স খেতে বললেন আর এডভাইজ দিলেন- ভেজা গরম সেক, সুইমিং, নির্দেশ অনুযায়ী চেয়ার ব্যবহার করা। ভাবছিলাম ডেস্কজব করে কি লাইফ শেষ করে দিচ্ছি নাকি ! আবার আমার কাজ ত এরকমই।
সুইমিং এর সাথে আমার সখ্যতা দুরন্ত শৈশব থেকেই। গ্রামের ছেলে তাই ডুবতে ডুবতেই সাঁতার শেখা। আমার শৈশব কেটেছে বাসাইল (থানা শহর,টাঙ্গাইল থেকে ১৬ কিলো পূর্বে)। প্রতিদিন মনের আনন্দে পুকুরে বা বর্ষাকালে বাড়ীর পাশে পানি আসত। সব পোলাপাইন পানিতে ঝাপাঝাপি করতে করতে চোখ লাল করে তবেই বাড়ী ফেরা। আরও স্পস্ট করে যদি আমার সুইমিং এর উস্তাদ এর কথা বলি তিনি হলেন আব্বার দাদা হাকিম খান। যদিও আমার দাদা দাদী কাউকে আমি দেখিনি কিন্তু উনি সুস্থ শরীরে শতবর্ষ বেঁচে গিয়েছেন। শুধু মৃত্যুর আগে কয়েকদিন অসুস্থ ছিলেন এবং লাঠি ইউজ করেছেন।আমার মা এখনো সব সময় আমাকে আশির্বাদ করেন আমি যেন হাকিম খানের মত দীর্ঘজীবি হই। একমাত্র আমাদের কলেজেই সুইমিং পুল ছিল। কলেজে আমাদের পুলের নাম ‘সন্তরন পল্বল’।সেখানে কিঞ্চিত ঝর তুলেছিলাম। আর ‘আইসিসিএসএম’ এ আর্মি থেকে কোচ এনে আমাদের আরও পোক্ত করা হয়েছিল। আমার কলেজ লাইফের যে সামান্য কয়টা মেডেল তার বেশির ভাগই সুইমিং এ। সুইমিং কম্পিটিশন দেখতে আমার বেশি ভাল লাগে। বেইজিং অলিম্পিকে মাইকেল ফেলপ্‌স, স্টেফানি রাইস =(( , ইমন সুলিভান, ডারা তোরেসদের খবর রাখতাম নিয়মিত। আরও অতীতে ইয়ান থর্প, আলেকজান্ডার পোপভ। ‘সন্তরন পল্বল’ এখনো আমাকে নীরবে ডাকে। সুইমিং ত বেস্ট এক্সারসাইজ। আর ব্যকপেইন আমাকে আবারো সুইমিং এর সাথে আত্নার সম্পর্ক গভীর করে দিল।

আর যাই করি এখন অন্তঃত ছুটি নেয়া দরকার। বসকে কি অবস্থা বুঝিয়ে বললাম আর ছুটি চাইলাম। প্রথমেই বসের অস্বীকার যে আমার চেয়ারের কারনে হয়নি। কর্পোরেট কোম্পানির বসদের কমন নেচার মনে হয় সবকিছু ডিনাই করা। আমি যথারীতি আমার অবস্থানে অনড় এবং যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম। শেষে মানলেন এবং বললেন কি রকম চেয়ার লাগবে বলেন আমারও চেয়ার চেঞ্জ করতে হবে(এম ডি, বস সহ আমাদের ম্যাক্সিমাম এমপ্লয়ির ব্যাকপেইন এবং আমাদের ভাবের চেয়ার কিন্তু আনহেলদি) আর ছুটির ব্যাপারে ডিনাই করলেন না । আরেক কলিগ আবার বললেন আপনার ফিটনেস এত কম কেন আপনি ত ক্যাডেট? আমি তীব্র প্রতিবাদ জানালাম, অবশ্যই গায়ে লাগার মত কথা । যিনি বললেন তিনি আবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন গত বছর। ম্যালেরিয়া থেকে শুরু করে লিভার ইনফেকশন এমন কিছু বাকি ছিলনা। মোটামুটি গোটা সাতেক সিরিয়াস কেস একেবারে। বললাম এখনো আমার ফিটনেস এখানে সবার চেয়ে বেশি। আমার ফিটনেস যা নষ্ট হইছে এখানে এসেই। আমি গত সাত মাসে সিক লিভ নিয়েছি মাত্র ২ দিন তাও গত শীতে সিজন চেঞ্জ এর ফ্লুতে কঠিন কাশি হইছিল। আমার ব্যক্তিগত অভিমত- ক্যাডেটদের সিভিলরা মানুষ মনে করেনা। তাই ভাবে আমরা অসুস্থ হতে পারিনা। আর কিছু হলেই বেশি করে চোখে পড়ে। আর তারা সারা বছর সিক থাকলেও সেটি নরমাল। ক্যাডেটরা ত ভাঙ্গা পা নিয়েও অবলীলায় হাসতে জানে। ক্যাডেট জাতির বিবেকের কাছে আমার জিজ্ঞাসা- “আসলেই কি ক্যাডেটদের ফিটনেস সিভিলদের চেয়ে কম? ”
১৯-২২ জুলাই পর্যন্ত ছুটি নিলাম । ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার অফিস করে টাঙ্গাইল চলে গেলাম আমার আরেক ফ্রেন্ড নজরুলের (তুলা) সাথে । নজরুল এন সিসি ব্যাংকে জব করে। আর টাঙ্গাইলে আমাদের জন্য অপেক্ষমান ছিল আরেক ফ্রেন্ড ক্যাপ্টেন হারুন(এম সি সি)।হারুন কুয়েতে ৩ বছরের মিশনে গিয়েছে এই বছরের শুরুর দিকে। ১ বছরের আগে ছুটি পাওয়ার কথা না কিন্ত ওখানে এক সৈনিক মারা গেছন তার লাশ নিয়ে আসা। লোকটি আজীবন ছুটি নিয়ে আমার বন্ধুকেও ১০ দিনের ছুটি ম্যানেজ করে দিলেন।
বাড়ীতে গিয়ে বাবা মার এক্সট্রা খাতিরের আওতায় পড়লাম। এমনিতেই আমার বাকি ২ বোনের চেয়ে স্পেশালি মায়ের কাছে আমি বেশি আদরের পাত্র যে কারনে আমি অনেক আগে থেকেই বেশ বিব্রত। এবার আবার অসুস্থতার কারনে বাড়ী আসা। এর আরেকটা কারন ক্যাডেট কলেজের সুবাদে আমি আশৈশব গৃহত্যাগী । বাড়ী আসি অতিথি পাখির মত। সকালে মা সেক দিয়ে দেন রাতে বাবা। আর মায়ের খাওয়ানোর অত্যাচার ত আছেই।অনেকদিন যাবৎ এই অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। হাজার বলেও কোন ফায়দা হয়নি।আমি বাড়ীতে আসলেই এমন আপ্যায়ন/অত্যাচার চলতে থাকে যেন আমি সত্যিই মেহমান।এবার বাঁচার জন্য বিনা নোটিশে হাজির হয়েছি বলে মায়ের অভিযোগের শেষ নেই।
পরদিন ১৭ জুলাই সকালে হারুনদের বাসায় গেলাম।সেখানে আড্ডা দিয়ে একটু বাইরে বেরিয়ে আবার দুপুরে ওদের বাসায় ফিরে জুমার নামাজ পড়লাম এবং লাঞ্চ করলাম।আমি হারুন আর নজরুল বাসায় বসে ‘মনপুরা’ ছবি এনজয় করলাম(যদিও আমি সিনেপ্লেক্সে দেখেছিলাম)।বিকেলে একটু রোদের তীব্রতা কমলে বেরিয়ে পড়লাম।৩ জন টানা ২ ঘন্টা রিক্সায় ঘুরে বেড়ালাম টাঙ্গাইল শহর, বাইপাস। মাঝে ঝালমুড়ি এবং আমড়া খাওয়ার বিরতি ছিল(রাস্তার খাবার ত ঢাকায় খাইনা অনেকদিন)। রিক্সাওয়ালা চাচাও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারপর সন্ধায় ডিঙ্গিতে ধুমায়িত আড্ডা (কফি+স্মোকিং)। চমৎকার এবং ইভেন্টফুল দিন গেল।
তারপরদিন শনিবার একটু লেজি টাইম কাটালাম।একটু রিলেটিভদের বাসায় দেখা করা(সামাজিকতা আর কি) এবং রেস্ট। আর বিকালে আবশ্যই লেকে সুইমিং।কারণ গতকাল মিস হয়েছে আজ নো কম্প্রমাইজ। রবিবার সকালে হারুনের সাথে শহরে কিছু সময় কাটানো এবং দুপুরে সুইমিং করতে গেলাম। পাশেই বার কাউন্সিল। আমার মামা এবং আমার ফ্রেন্ড সাদিকের (আরসিসি) বাবা এডভোকেট। উনাদের সাথে দেখা করলাম এবং চা পান করলাম। তারপর সুইমিং করে বাসায় ফেরা। হারুন আসল, খাওয়া দাওয়া সেরে বিকেলে আবার বের হলাম এবং ফ্রেন্ডদের সাথে জম্পেশ আড্ডা দিলাম।
২০ জুলাই সোমবার সকাল।নাস্তা না করেই সুইমিং এ গেলাম। আজ লেকের পানিটা বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। বিশাল এবং ভড়াট লেক,প্রতিদিনই পানি বাড়ছে। আগামী মাসে ‘শৌখিন মৎস শিকারি সমিতির’ ব্যানারে বড়শি দিয়ে মাছ মারা কম্পিটিশন হবে তাই কৃত্রিমভাবে পানি দেয়া হচ্ছে। ফ্রেশ বাতাস।আজ পানি থেকে উঠতেই ইচ্ছা করবেনা। বসে আছি মেহগনি গাছের শিকড়ে।কাল ঢাকা চলে যাব তাই কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছি।লাবলু ভাইকে একটা ফোন দেই…

সরল স্বীকারোক্তিঃ লাবলু ভাই এর প্ররোচনায় আবোল তাবোল কি লিখলাম জানিনা। বেশি বড় হয়ে গেল মনে হয়। লেখার মানে গুনে গুত্তা খাইলে লেখক দায়ী নয়।

১,৫৭১ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “ট্যুর ডি টাঙ্গাইল”

  1. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    শুরুতে ভূমিকার লগে শেষের এই প্যারা?? 😡

    সরল স্বীকারোক্তিঃ লাবলু ভাই এর প্ররোচনায় আবোল তাবোল কি লিখলাম জানিনা। বেশি বড় হয়ে গেল মনে হয়। লেখার মানে গুনে গুত্তা খাইলে আমি কিছু জানিনা।

    লেখাটা খারাপ না, ভূমিকা বাদে। :-B


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    দুর্দান্ত লেখছো তো।
    আবার লাবলু ভাইরে দোষ দিবার চাও ক্যান?
    তাইলে তো লেখা যে ভালো হইসে এই
    ক্রেডিট-ও উনারেই দিতে হয়!
    কি বলো!
    এনিওয়ে, চাপের মধ্যে আছো মেনে হয়।
    সামলে ওঠো।

    জবাব দিন
  3. দিহান আহসান

    ভালো লেগেছে ভাইয়া।
    এখন কেমন আছেন? আমারো বেক পেইন আছে, তবে তা চেয়ার এর কারনে না। আমি তাই বুঝতে পারছি, আপনার কষ্ট। 🙁
    ভালো হয়ে উঠুন তাড়াতাড়ি।
    আর ফ্ল্যাশব্যাক ০৫ নিয়ে আসুন, এই কামনায়। 🙂

    জবাব দিন
  4. আব্দুল্লাহ আল ইমরান

    আব্দুল্লাহ ভাই, আপনেও টাঙ্গাইলের পোলা

    মিয়া তুমি আগেও এক লেখায় একই বুলি আওড়াইছ।ভুইলা গেছ আমি টাঙ্গাইলা?
    @লাবলু ভাই, আমি ২০ তারিখ যখন আপনাকে ফোন করেছি সেখান থেকে শুরু করে আবার সেখানেই শেষ করার আপচেষ্টা করেছি।দরকার হলে এডিট করে দিয়েন ইচ্ছামত।
    @নুপুর ভাই, এই লেখার কোয়ালিটি নিয়ে কনফিউজ্‌ড।র‌্যানডমলি লিখে গেছি।লাবলু ভাই না বললে লেখার কথা মাথায় আসতনা। ~x(
    হ্যা, একটু চাপেই আছি, আমার আবার পা মচকাইছে। দুইটা পেইন নিয়ে আছি।গোদের উপর বিষফোঁড়া আর কি 😀 ব্যাপারনা এভ্রিথিং উইল বি ওকে।
    @ ভাবী, ব্যাকপেইন অনেক ইম্প্রুভ। আশা করি ভাল হয়ে যাব।দোয়া করবেন।ফ্ল্যাশব্যাক এর কথা ভাববো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।