ধারাবাহিক উপন্যাস – ৭

এক দুই তিন চার এবং পাঁচ
ছয়

পর্বঃ সাত

সাত

একদিন হঠাৎ করেই দেশটা স্বাধীন হয়ে গেল। আমরাও শাহপুর ছেড়ে কুমিল্লায় চলে আসি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে বাসা হয়ে গিয়েছিল মৃত্যু-কুপ, সেই একই বাসাতে এসে আবার উঠি। গোছলখানা সেই আগের মতোই আছে। এখন দিনের বেলাতেও সেখানে যেতে ভয় পাই। এখানে আটকে থাকার সেই দমবন্ধ করা ঘটনাটি বার বার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আমার কথা ভেবে আম্মা বাসা বদলাতে চেয়েছিলেন। কাদের মোল্লার স্ত্রীর জন্য তা আর হল না। আমরা সে বাসাতে উঠার একমাস পর কাদের মোল্লার স্ত্রী একদিন আমাদের বাসায় আসেন। মহিলা আপাদমস্তক কালো বোরখায় আবৃত। কালো কাফনের মতো। শুধু চোখ দুটো খোলা। আম্মা উনাকে নিয়ে ভেতরের ঘরে বিছানার উপর বসতে দেন। দরজাটা ভেতর থেকে আলতো করে বন্ধ করে মহিলার পাশে এসে বসেন। আমি তখন ঘরের মধ্যে। আম্মা আমাকে যেতে বলেননি। হয়তো বড় হয়ে গেছি তাই।
আম্মা পাশে বসার পর হঠাৎ করেই মহিলা আম্মাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। ’আপাগো আফনার দুই পায়ে ধরি, বাসা ছাইড়া যাইয়েন নাগো। মতির বাপের কোন খবর নাইগো। হেতেনে এখন কোথায় তা আল্লা মাবুদ ছাড়া কেউ বলতে পারে না গো।’ বোরখার ভেতর থেকে হু হু কান্নার আওয়াজ আসতে লাগলো।
’উনি বেঁচে আছেন কিনা সেটা জানেন?’ যে লোক আমাদেরকে পাকিস্থানি মিলিটারির হাতে প্রায় তুলে দিতে নিয়েছিল, সেই লোকের জন্য আম্মার এই উৎকণ্ঠা ভাল শোনাল না।
’সেইটা জানলে তো একটু নিশ্চিত হইতে পারতাম। আফা আপনারা চইল্যা গেলে এই বাসা ওরা দখল কইর‌্যা নিবোগা।’
’কাদের কথা বলছেন?’ আম্মা মনে হয় একটু বাজিয়ে দেখতে চাচ্ছে।
’আফা মাস গেলে ভাড়া না পাইলে পোলাপানগো লইয়া উপোষ করণ লাগবো। আফনি বাসা ছাইরেন নাগো। আপনি মতির বাপকে কত শ্রদ্ধা করতেন। উনি সেইট্যা আমারে কইছে।’ মহিলাও ঘাগু। কথা অন্য প্রসঙ্গে ঘুরিয়ে দিলেন।
মহিলা চলে গেলে দাদামনু মজা করে বলে, ‘দেখলি বোরখার কত উপকারিতা? এই বেটিকে এখন কেউ রাস্তা দিয়ে চলতে দেখলে পচা ডিম ছুঁড়ে মারত।’
আর ভালমানুষ আম্মা সহানুভূতিশীল হয়ে তার একসময়ের যমকে মাপ করে দিলেন। শুধু এই ’মোল্লা হাবেলি’ রক্ষার জন্য সপরিবারে আমরা এই বাড়িতে থেকে গেলাম। মাস শেষে নগদ ভাড়া আম্মা কাদের মোল্লার স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে আসতেন।
প্রায় দুবছরের মতো আমরা ওই বাসায় ছিলাম। প্রায় পুরোটা সময়ই কাদের মোল্লা গা-ঢাকা দিয়ে পালিয়ে ছিলেন। দেশে তখন শান্তি কমিটির সদস্যদের ইঁদুর দশা। আনাচে-কানাচে কিম্বা গর্তে গর্তে লুকিয়ে থাকা। সব রাজাকারের সর্দার গোলাম আজম তো পাকিস্তানে পালিয়ে গেলেন।

একাত্তরে দেশটা তেতে ছিল। যখন আগুন লাগলো তখন আর কারো সাধ্য ছিল না দায় দায় আগুনটাকে দমিয়ে রাখে। অবশেষে আগুন থামলো দেবালয় পুড়িয়ে। আমার চোখের সামনে দেখা শান্ত শহর বিভীষিকাময় নিস্তব্ধ-পুরী হয়ে উঠলো। সে শহরে যখন ফিরে আসলাম তখন সে বিধ্বস্ত। পরিচিত অনেক মানুষের জীবন আর আগের মতো নেই। এবড়ো-থেবড়ো হয়ে গেছে। অনেকটা চারপাশের বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট আর দালানকোঠার মতো।
আমার সাথে পড়তো কাজল। তার বড়ভাই মোসাদ্দেক আর চাচা বজলু মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তারা আর কেউ ফিরে আসেনি। কাজলের বাবাকে পাকসেনারা ক্যান্টনমেন্ট ধরে নিয়ে গিয়ে অনেক অত্যাচার করেছিল। ধীরেন দাদু আর ওনার ছেলে দিলিপ কাকুর নাম আজ শহিদের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে।
অনেক কিছুই বদলে গেছে। আমাদের গোয়ালা বদলেছে, ধোপা বদলেছে। ওরা কেউ মারা গেছে, কেউ বা ভারতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সময়মত শিপ্রারা পালাতে পেরেছিল আবার ষোলই ডিসেম্বরের পরে ফিরে এসেছে। তবে এর মধ্যে ওদের পরিবারে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। শিপ্রার মেজদিদিকেও নাকি পাকিস্তানী মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার আর কোন খবর নেই। অনেকে অনেক কথা বলে। অধিকাংশই বুঝতাম না। তবে তখন এতটুকু বুঝেছিলাম যে পাকিস্তানী মিলিটারিরা নাকি ওর দিদিকে ক্যাম্পে নিয়ে ন্যাংটো করে শুয়েছিল। ওর দিদিকে আর কেউ বিয়ে করবে না। ওদের বাসায় থাকলে শিপ্রাদের বোনদের আর কারো বিয়ে হবে না। কেউ কেউ বলে সে গলায় দড়ি দিয়েছে। আবার কেউ বলে একটা বিদেশী মিশনারী সংস্থার সাথে বিদেশ চলে গেছে। ঘটনাটা আমার সব হিসেব-নিকেশকে গড়মিল করে দেয়। একটা ছেলেকে মারতে হলে প্রাণে মারতে হয়। আর একটা মেয়েকে কাপড়চোপড় খুলে ছুঁয়ে দিলেই সে তার চারপাশের মানুষজনের কাছে মরে যায়? মেয়েদের বেলায় এতো কেন বৈষম্য? আমি খুব ঘাবড়ে যাই। ভেতরে ভেতরে এই প্রশ্নটা আমাকে বার বার কুড়ে খায়। সেসময় একটা নতুন শব্দের সাথে পরিচয় হয়। কিন্তু এর মানে কি বুঝিনি। একবার খুব সাহস করে দাদামনুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ধর্ষণ মানে কি রে?’
আমার প্রশ্নটা শুনে প্রথমে দাদামনুর মুখটা একটু অপরাধীর মতো হয়ে গেল। পরক্ষণেই চোখ-মুখ কঠিন করে খেকিয়ে উঠলো, ‘তুই আমার বিছানার বালিশের নীচ থেকে মাসুদ রানা বইটা নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছিস। তাই না?’
দাদামনুর এমন আচরণে ভেতরে ভেতরে আরও গুটিয়ে যাই। এরপর ভুলেও আর কারও কাছে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। পাছে যদি সবাই আমার ইতিহাস জেনে যায়। আরিফ ভাইয়ের কথা গোপন করে রাখি। সবাই জেনে গেলে তো আমাকেও শিপ্রার মেজদিদির মতো নিরুদ্দেশে যেতে হবে।

আম্মা একদিন আমার সাথে শিপ্রাদের বাসায় গেলেন। কথায় কথায় শিপ্রার মা জানালেন, ‘আমার একটা ছেলে থাকলে এদেশে আর ফিরে আসতাম না।’
‘দিদি কেন একথা বলছেন? ওদেশে কি আরও ভাল থাকতে পারতেন?’
‘নিজের দেশ যে ছেড়ে যায় তাকে কি অন্যদেশ খুশি মনে গ্রহণ করে? আমরা তো কলকাতা গেলে রেফিউজি বলে লোকে গাল দেয়। এবার নিজের জীবন দিয়ে বুঝলাম রেফিউজিদের কি কষ্ট! বনগাঁর শরণার্থী শিবিরে কত মানুষকে যে নিজের চোখে মরতে দেখলাম!’
আম্মার চোখ ক্রমশ আর্দ্র হয়ে উঠল। উনি এরকমই। কাদের মোল্লার বৌএর কষ্টেও সমব্যথী হন এখন আর শিপ্রার মায়ের কষ্টে হয়তো বুক ফেটে যাচ্ছে।
‘আপনার আত্মীয়-স্বজন আগে যারা গেছে তারা কেমন আছে?’ আম্মা প্রশ্ন করলেন।
‘ভাল নাই দিদি। কেউ ভাল নাই। কিন্তু এখানে বড় অসহায় লাগে। দিদি ভগবানের কিরে যদি কাটেন তবে একটা গোপ্ন কথা বলব।’
‘আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। আপনার কথা কাউকে বলব না।’
‘সেদিন খালেক মজুমদার এ বাড়িতে এসেছিল। একথা সেকথার পর আমাদের এই বাড়ির দলিল দেখতে চাইল। আমার অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না।’
‘কি বলেন দিদি!’ আম্মার চোখ প্রায় কপালে গিয়ে ঠেকল। ‘খালেক মজুমদার না একজন মুক্তিযোদ্ধা?’
‘না দিদি সরাসরি কখনও যুদ্ধ করেনি। তবে মুজিব বাহিনীতে ছিল। এখন সেটা বেঁচেই আমাদের চোখ রাঙ্গিয়ে গেল।’
‘আপনার তো দেখি উভয় সংকুট।’
‘সাধে কি দিদি কেউ তার দেশ ছেড়ে যেতে চায়? সেই সাতচল্লিশের পর থেকে কম হিন্দু তো আর এদেশ থেকে ওদেশে গেল না।’
‘দিদি ওদেশ থেকেও তো অনেক মুসলমান বাধ্য হয়ে এদেশে এসেছে। তাদেরও নিশ্চয় একই কষ্ট বইতে হচ্ছে।’
‘তা হয়তো এসেছে।’ মনে হল মাসিমা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। আসলে যার কষ্ট তাকেই একা যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। কে গেল আর কে এলো এই পরিসংখ্যাণে তার কি লাভ?
‘আমার নিজের মনে আছে যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তখন একবার খুব দেশ বদলের স্রোত বইলো। আমার ছোটভাইয়ের বৌএর নিকট আত্মীয়রা কলকাতায় থাকতো। ওরা কখনও বাংলাদেশে আসার কথা ভাবেনি। কিন্তু সেবার আর একেবারের জন্য বাংলাদেশে না এসে পারেনি।’
‘পশ্চিমবংগে রেফুইজিরা রেলস্টেশন থেকে শুরু করে এখানে সেখানে খালি জায়গা যা পাচ্ছে সেখানে কোনরকমভাবে মাথা গুজে থেকেছে। অনেকে তো আবার দল বেঁধে কলকাতার বড় বড় খালি বাগানবাড়িগুলোও দখল করে নিয়ে কলোনি বানিয়ে ফেলেছিল।’
‘কোন বাঁধা পায়নি?’
‘পায়নি না আবার? কিন্তু পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠে।’
‘রেফুউজিদের জন্য ওদেশের সরকার কোন ব্যবস্থা করছে না?’
‘ঠাকুর বলতে পারবে পূর্বজন্মে কি অপরাধ করেছিলাম! ছাই ফেলতে ভাংগা কুলো। ওদেশে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার পাঞ্জাবি রিফিউজিদের জন্য দিল্লি কি পাঞ্জাবে ব্যবস্থা করল আর বাংগালিদের পাঠাল আন্দামান আর দণ্ডকারণ্যে। বামরা চাইলো না বলে তাও তো বন্ধ হয়ে গেল। রেফুউজিদের জন্য আবার ব্যবস্থা!’
আম্মা বললেন, ‘তারপরও চলে যেতে চান দিদি?’
‘আপনিই তো বললেন উভয় সংকুট। কিন্তু আমি যেতে পারছি না কারণ সেখানে জোরজার করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবারে একজন শক্তিশালী ছেলে দরকার। তা আমার নেই। তাই সব কিছু ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়েছি।’
মাসিমার সাথে আম্মার কথায় একবারের জন্যেও শিপ্রার মেজদিদির কথা আসল না। পুরোটা সময় উনারা দেশ বদল নিয়ে কথা বললেন। সেসময় অতো কিছু না বুঝলেও শুধু এই ব্যাপারটা বুঝেছিলাম যে মাসিমা হয়তো কোন সুখের আশায় দেশ বদল করতে চায়না। শুধু নিজের দলের সাথে আছি এই স্বস্তিটুকু পেতে চেয়েছিলেন। সংখ্যালঘু হবার কষ্ট অনেক।

শিপ্রারা করেনি তবে আরও অনেকেই ইচ্ছা করে পরবাস বেছে নিয়েছে। সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম তাপসীদি আর কলকাতা থেকে ফিরবে না শুনে। উনি শিপ্রাদের বাসার কাছেই থাকতো। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময় উনাদের বাসায় খুব বড় করে পূজামণ্ডপ হতো। প্রতিমা গড়ার জন্য দূর থেকে মস্ত বড় কারিগর এসে সাতদিন ধরে কাদামাটি থেকে প্রতিমা গড়ত। দুর্গা, সরস্বতী আর লক্ষ্মীকে যত সুন্দর করেই গড়ে তোলা হোক না কেন তাপসীদির কাছে তারা নমস্য হয়ে পড়তো। আমার সেই শৈশবের চোখে দেখা তাপসীদি এতোটাই সুন্দরী ছিলেন। উনি একসময় মডার্ন স্কুলে লেখাপড়া করতেন। ভাইয়ার সাথে। একবার স্কুলের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ওরা দুজন মিলে রবীন্দ্রনাথের ’ আমাদের এই গায়ের নামটি খঞ্জনা’ কবিতাটি আবৃতি করেছিলেন। সেই তাপসীদি আর ফিরে আসলো না। এখন থেকে নাকি কলকাতায় উনার কাকুর বাসায় থেকে পড়াশোনা করবে। কি অদ্ভুত ব্যাপার! যুদ্ধ করে আমরা একটা নতুন দেশ পেলাম। আর সেই দেশটা অনেকের কাছে হয়ে গেল পরদেশ।
আগের ধোপা নকুলের জায়গায় তার ছেলে পরিমল এখন কাজ করছে। গোবিন্দ গোয়ালার জায়গায় নতুন গোয়ালা এসেছে। আগে মাঝে মাঝে ওর বৌ আমাদের বাসায় দুধ দিতে আসতো। সে মহিলা আমাকে খুব আদর করতো।গেটের ভেতরে ঢুকে ডেকে উঠত, ’কই মা দেবী চৌধুরানী? দুধ নিয়ে যাও গো।’ একদিন শিপ্রার সাথে গোবিন্দ গোয়ালার বাসায় গিয়েছিলাম। গোবিন্দর বৌয়ের সাথে দেখা করবো বলে।
আমি বাড়ির ভিতর পা দেবার সাথে সাথে গোবিন্দর ছেলের বৌ আঁতকে উঠেছিলো, ’এ কি করলেন দিদিমণি? ঘর যে অপবিত্র করে দিলেন।’ শুনে আমার খুব অভিমান হয়েছিলো। যেন একজন মুসলমান হয়ে হিন্দুর বাড়িতে এসে তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোন অধিকার আমার নেই। আমি যেন ওদের কাছে নেহায়েতই এক অপবিত্র বস্তু। তবে সবচেয়ে দুঃখ পেয়েছিলাম গোবিন্দ গোয়ালার বিধবার বেশ দেখে। একদম ধবধবে সাদা শাড়ি। আগে মাথায় একরাশ চুল ছিল। তার জায়গায় কদম ছাটের মতো আধা ইঞ্চি উচ্চতার ছোট ছোট খাড়া খাড়া চুল। আগের মতো আর হাসিখুশি স্বভাবের নেই। আমার সাথে কোন কথা বলল না। সে বাড়ি থেকে চলে আসার সময় পিছন ফিরে দেখতে পেলাম ছেলের বৌ গোবর গোলা গুলছে ঘর গোবর লেপা দিয়ে পবিত্র করবে বলে।
মানুষের থেকে গোবর হয়ে যায় পবিত্র। জানিনা এসব আচার-আচরণের কথা কোথায় লেখা আছে। ধর্মের উৎপত্তি তো ভাল উদ্দেশ্য নিয়েই। শুধু সময় সময় কিছু মানুষ প্রভাবশালী ধার্মিক হতে চেয়ে সে উদ্দেশ্যের গতিপথ বদলে দিয়েছে। আর অজ্ঞ লোকেরা না বুঝে সেটাতেই ধর্ম হিসেবে মেনে নেয়। যে যত সংস্কার মানে সে তত ধার্মিক। সংস্কার না বলে কুসংস্কার বলা ভাল। এইসব কুসংস্কারের আধিক্যে হারিয়ে যেতে বসেছে ধর্মের মূল সুর।

(চলবে)

২,৫৫৮ বার দেখা হয়েছে

২২ টি মন্তব্য : “ধারাবাহিক উপন্যাস – ৭”

  1. রাব্বী (৯২-৯৮)
    বাঙ্গালিদের আন্দামানে কিম্বা দণ্ডকারণ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু কলকাতার বাম সরকার সেটাতে বাঁধা দিল। আবার তারাও তেমন ব্যবস্থা করতে পারছে না। তাই জোরজার করে অনেকে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে

    সিপিআইএম সরকারের মূখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করার পর পশ্চিম বঙ্গ সম্ভবত একাত্তরে কেন্দ্র থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ছিল। পারলে তথ্য একটু যাঁচাই করে নিয়েন।

    উপন্যাস ভাল হচ্ছে।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      যে অংশটা তুমি কোট করেছ সেটা আ্মি ৪৭ আর ৬৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম বাংলায় যাওয়া হিন্দুদের স্রোতের কথা বলতে চেয়েছিলাম। সেক্ষেত্রে ঠিক আছে তো? একাত্তরে তো শরণার্থীরা বনগাঁ আর যশোর রোডের দুপাশ জুরে ছিল। সেই ভাবে সারা কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েনি। তথ্যগুলো সুনীলের 'অর্ধেক জীবন' এবং 'পূর্ব-পশ্চিম' থেকে বোধহয় মাথায় জমা আছে ভাসমান ভাবে। এখন বুঝতে পারছি এখানে শিপ্রার মায়ের কথাটা একাত্তরের শরণার্থীদের ক্ষেত্রে বোঝাচ্ছে। আচ্ছা আমি এই অংশটা আবার পরিষ্কার করে লিখছি।
      অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। কেউ তথ্য বিভ্রান্তি হলে ধরিয়ে দেবে এই আশাই তো ব্লগে পোস্ট করছি।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
      • রাব্বী (৯২-৯৮)

        আচ্ছা। আমি পড়ে ৪৭ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত সময়টা বুঝতে পারিনি। ৪৭ থেকে ৬৫ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। বামদলগুলো তখনো পপুলারিটি পায়নি ততোটা। ৬৫'এর পর নক্সালবাড়ি আন্দোলনের পর তারা পপুলারিটি পায়।

        ৬৪'তে সেসময়ের পূর্ব-পাকিস্থানে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর যে পূর্ববাংলার এক লক্ষের বেশি হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিম বাংলায় যায় বা তার আগে যখন চলে যায় সেটা উল্লেখ করলে সেসময় বামপন্থী সরকার ছিল না ক্ষমতায়। তবে উদ্বাস্তু হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গে থাকা নিয়ে বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব থাকতে পারে - সেটা আমার জানা নেই।


        আমার বন্ধুয়া বিহনে

        জবাব দিন
        • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

          তৎকালীন পূর্ববংগ থেকে অনেক বারে বারে পশ্চিমবংগে শরণার্থীরা যায়। এই মুহূর্তে হাতের কাছে থাকা সুনীলের 'অর্ধেক জীবন' থেকে কিছু লাইন দিচ্ছি। বইটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এইসব শরণার্থীদের কথা এসেছে।

          পৃষ্ঠাঃ১১৫ -"উনিশ শো পঞ্ছাশ সালে পুনরপি দাংগা শুরু হয় পূর্ববংগে ... ত্রাণ শিবিরের সংখ্যা যৎসামান্য, লক্ষ লক্ষ পরিবার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় উন্মুক্ত আকাশের নীচে ... দেশ ভাগের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই পশ্চিমবংগে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় বাষট্টি লক্ষ। ... অনেক মুসলমান এ রাজ্য ছেড়ে চলে গেছে, তবে তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।'

          পৃষ্ঠা ১৫৮ - 'কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যনীতি তার জন্য অনেকখানি দায়ী তো বটেই। পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুদের স্রোত বেড়েই চলছে, জনসংখ্যার এই অস্বা্ভাবিক স্ফীতি সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে রাজ্য সরকার, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি সন্নিধানে পাঞ্জাবে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য যতটা তৎপর, সে তুলনায় দূরবর্তী বাংগালি উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে অনেকখানি। পঞ্জাবি উদ্বাস্তুরা বসতি পেয়েছে এদিককার পঞ্জাবে পঞ্জাবে ও দিল্লিতে। যে-জন্য দিল্লি পঞ্জাব-প্রধান শহর হয়ে উঠে, আর বাংগালি উদ্বাস্তুদের পাঠানো হতে লাগল দণ্ডকারণ্যের প্রতিকূল পরিবেশে। সেখানে তারা কখনও স্বাবলম্বী হতে পারেনি। কিছু উদ্বাস্তু প্রেরিত হয়েছিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে, সেখানকার চাষাবাদ চাষাবাদ ও মাছ ধরা জীবিকা বাংগালিদের অনুকূল, কিন্তু কোনও দুর্বোধ্য কারণে আন্দামানে উদ্বাস্তু পাঠানোর প্রবল বিরোধিতা করল বাম্পন্থীরা, তাদের বিক্ষোভে এ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেল।'

          এরকম অনেক তথ্য বইটার এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। আমার এই পর্বের (তোমার উল্লেখিত অংশটার) ভিত্তির রেফারেন্স। অংশটা আমি আরেকটু পরিশোধন করে লিখছি।


          “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
          ― Mahatma Gandhi

          জবাব দিন
                • রেফারেন্স হিসেবে সুনীলের উপন্যাসকে টেনে আনাটা কেমন যেন বেক্ষাপ্পা লাগলো। উপন্যাসে আবার ঘটনা চরিত্র সব কাল্পনিক একথাগুলো বেশ যায়।

                  জবাব দিন
                  • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

                    সুনীলের 'অর্ধেক জীবন' কিন্তু আত্মজীবনী, উপন্যাস নয়। ঘটনা, চরিত্র সব বাস্তব।

                    উপন্যাসে আবার ঘটনা চরিত্র সব কাল্পনিক একথাগুলো বেশ যায়।

                    - বুঝলাম না। তুমি কি আমার উপন্যাসের কথা বলছো?


                    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
                    ― Mahatma Gandhi

                    জবাব দিন
                    • "অর্ধেক জীবন" যে আত্মজীবনী তা জানা ছিল না। ধন্যবাদ। তবুও আমার মনে হয়, রেফারেন্স হিসাবে আরও শক্ত ডকুমেন্ট থাকা দরকার, যদি সত্যিই রেফারেন্স হিসেবে কিছু দিতে চান।

                      বারবার "ফিকশন" কথাটা বলছেন, ফিকশনে কি ইতিহাস জরুরী কিছু? আমি জানি না, আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি।

                      না আপনার উপন্যাসের কথা বলছি না, মেইনস্ট্রীমের কথা বলছিলাম।

                    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

                      সুনীলের "পূর্ব-পশ্চিম" এ আত্মজীবনী "একাত্তরের দিনগুলি"র রেফারেন্স আছে। রাঘব-বোয়ালরা আত্মজীব্নী থেকে রেফারে্নস নিতে পারলে আমাদের চুনো-পুঁটিদের এতে কি সমস্যা?

                      এখন কে কিভাবে ফিকশন লেখে সেটা তার উপর নির্ভর করে। একটা সাধারণ উদাহরণ দিচ্ছি। ধর একটা লোক রেল স্টেশনে বসে আছে। তার বাচ্চারা খুব দুষ্টুমি করছে - এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। ্লোকটা কিছু বলছে না। এখন আশপাশের সবাই লোকটার দায়িত্বহীনতা দেখে বিরক্ত। এখন কেউ যদি বলে যে লোকটার বৌ গতকাল মারা গেছে। এইমাত্র বৌকে কবর দিয়ে ফিরলো - তখন কিন্তু সবার আবার লোকটার উপর সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে।
                      অর্থাৎ একটা ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপটটা যদি জানি তো সেটা আমাদের ঘটনাটা অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

                      আমি যখন ছবি আঁকি তখন প্রতিটা আঁচর সূক্ষভাবে দিতে পছন্দ করি।


                      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
                      ― Mahatma Gandhi

    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      ধীরে বৎস ধীরে। তোমার ম্যাড়ম্যাড়ে প্রেম কাহিনীর ফেনা মাত্র উৎড়াচ্ছে।

      এর আগে বলেছিলাম ফিকশন লেখাটা পাজল মেলা্নোর মতো। আবার এটা ছবি আঁকার মতোও। এখন আমি ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি আঁকছি। যাতে পরে জমজমাটি ফ্রন্টগ্রাউন্ড ভালভাবে ফুটে উঠে।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  2. হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    আমার কিন্তু খুবই ভালো লাগতেছে, ধর্মকে যে অধিকাংশ মানুষ শুধু নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে, আবার দেখলাম। একইভাবে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের লুটপাটের লিপ্সা। তবে শিপ্রার মা'র মুখে ওই পরিসংখ্যানটা কেমন যেন বেমানান লাগল।

    দেশে কি আসতেছেন ফেব্রুয়ারীতে?

    জবাব দিন
  3. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    মাঝে বেশ কয়েকটা পর্ব বাদ পড়ে গেছে, ব্যস্ততার কারণে। এ পর্ব পড়তে পড়তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। উদ্ধৃতি দিতে গেলে অনেক লাইন তুলে দিতে হবে, তাই সেপথে যাচ্ছিনা।

    উপন্যাস জমে উঠেছে নির্ঘাত। চরিত্রগুলো বেশ কথা কয়ে উঠছে। না পড়া পর্বগুলো পড়ে নিয়ে বিস্তারিত বলবার আশা রাখি।
    একটা কথা মনে হলো : বর্ণণায় একটা তাড়াহুড়োর ভাব টের পাচ্ছি; আরেকটু রয়েসয়ে, আরেকটু বিস্তৃত ক'রে এগুলে মন্দ কি। আয়তন বাড়ুক না উপন্যাসের।
    আর, তথ্যসমূহের রেফারেন্স রেডি করে রাখছো তো? প্রকাশের সময় এটা কিন্তু অবশ্য প্রয়োজনীয়।

    অশেষ শুভকামনা।

    জবাব দিন
    • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

      নূপুরদা আমার এই উপন্যাসের জানালা দেয়ার চোখ আর তার চিন্তাভাবনা। অনেক কিছুই আধো-আধো ভাবে এসেছে কারণ দেয়ার নিজের কাছেও সব কিছু তেমন পরিষ্কার নয়। মূলত দেয়ার বেড়ে উঠার সাথে সাথে ওর জীবনের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যাপারগুলো আসবে।

      আপনার মন্তব্য অনেক উৎসাহব্যঞ্জক।


      “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
      ― Mahatma Gandhi

      জবাব দিন
  4. সাইফ শহীদ (১৯৬১-১৯৬৫)

    শান্তা,

    সত্য কথা শুনতে জাতি হিসাবে আমাদের অনেকেরই অনিহা। সেই জন্যেই মনে হল কেউ যেন রেটিং-এ অহেতুক কম নম্বর দিয়ে আত্মতৃপ্তি পেল।

    যা লিখেছো ঐতেহাসিক ভাবে সবই সত্যি। এভাবেই লিখে যাবে আশা করি।

    আমার খুব ভাল লাগছে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।