ধারাবাহিক উপন্যাস – ১

অথবা একটি ঢিশুম ঢিশুম উপন্যাস (যারা প্রেম পছন্দ করে না তাদের জন্য)

পর্ব – একদম গোড়া থেকে

এক

সেই কবে ছোট্টবেলায় পড়েছিলাম সিন্ধাবাদের রোমাঞ্ছকর ভ্রমনের কাহিনী। এর মধ্যে চলে গেছে চল্লিশ বছর। আজকাল সিন্ধাবাদের কথা প্রায়ই মনে হয়। মনে হয় তার কাঁধে ভর করে থাকা সেই বুড়োর কথা। হয়তো কমবেশি সবাই অদৃশ্য এক বুড়ো কাঁধে নিয়ে এক একটা জীবন পার করে দেয়। এরকম মনে হওয়ার কারণ ইদানিং আমার কাঁধের বুড়োটা খুব যন্ত্রণা শুরু করেছে। গলায় বিদ্ধ সূক্ষ্ম কাঁটার মতো। ঢোক গিলবার সময় প্রতিনিয়ত তার অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। অথচ না পারছি তাকে নামাতে, না পারছি কাউকে জানাতে। আপাত দৃষ্টিতে আমার ছবির মতো সুন্দর জীবনটাতে কেউ কোন নতুন আঁকিঝুকি দেখছে না। শুধু প্রতি ঢোকে খালি মনে হচ্ছে আমার কিছু করার কথা ছিল। ছিল কিছু অতীত দেনা। তার পাওনা মেটানো না পর্যন্ত বুড়ো আমার কাঁধ থেকে নামবে না। অদ্ভূত প্রতিশোধ!একেই কি বলে বিবেকবোধ?

গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে ঢোক গিলতে যেয়ে ধরফরিয়ে জেগে উঠি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তিনটা। সারারাত আর ঘুম আসবে না। এতোদিনে সুদেআসলে দেনার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
এরকমই এক ঘুমভাংগা মাঝরাতে বাড়ির গ্যারেজ পরিষ্কার করতে শুরু করি। অনেকগুলো বাক্স জমে আছে। সব পুরোনো দিনের। একটা বাক্স খুলে চমকে যাই। খাকী রংযের একটা বড় খাম। তার গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে বাংলায় বড় করে লেখা ‘১৯৮১’। আমিই লিখেছিলাম। ঊনিশ অট্টাশী সালে যেবার প্রথম আমেরিকা আসি। দাদামনু খামটা দিয়েছিল। এরমধ্যে আমার সব লেখাপড়ার সনদপত্রগুলো ভরেছিলাম। দরকার ছিল না বলে এতদিন তাদের আর খোঁজ পড়েনি। ভেবেছিলাম হারিয়েই গেছে। এতদিনে তো আর কম জায়গা বদল করলাম না।
খামটা খুব ভারী ভারী লাগছে। অকেজো কাগজপত্রও অবেলায় ভারী হয়ে যায়? ঠিক মানুষের মতো? ফেলে দেওয়ার আগে খামটা একবার খুললাম। আর আমাকে বিস্ময়াভূত করে ভারী খামটা তার রহস্য উন্মোচন করলো। ভেতরে একটা ডায়েরী আর ফাউন্টেন পেন। এক মুহূর্তে আমার চোখের সামনে সারা পৃথিবী দুলে উঠলো। এক টাইম মেশিন আমাকে একটানে ঊনিশ’শ একাশিতে নিয়ে গেল। চোখের সামনে স্পষ্ঠ দেখতে পারছি ঊনিশ বছরের এক তরুনী জীবনে প্রথম ঢাকার শিশুপার্কে বেড়াতে এসেছে। নাগরদোলায় চড়ছে। পাশে বসে আছে ভালবাসার মানুষ। উপর থেকে দেখা পার্কের ভেতরের সবুজ ঘাসের কার্পেট, কৃষনচূড়া-বাবলা-মেহগনি-হিজল গাছের পাতাদের ঝিরঝির নড়ে উঠা, মাঝখানে রাইডগুলোর সামনে বাচ্চাদের হাত ধরে বাবা-মাদের জটলা, আর পার্কের বাইরে শাহবাগের রাস্তা ধরে অল্পস্বল্প রিক্সা-স্কুটার-গাড়িদের মিলমিশ টুকটুক মসৃন গতি। সবকিছু একটার পর একটা দৃশ্যপট পটপট বদলে যেতে লাগলো। যেন তারা স্মৃতি নয়, জীবনের মতো জীবন্ত!আমি ডায়েরীটা হাতে নেই। রেক্সিন দিয়ে মোড়া শক্ত মলাটের উপর লেখা ‘১৯৮১, হারুন ডায়েরি’। সে মলাট উল্টাই। ভেতরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘ভালবাসার দেয়াকে – হিরণ/৩০-১-১৯৮১’।
একটানে জানুয়ারী মাসের ত্রিশ তারিখের পৃষ্ঠা উল্টাই। সেখানে লেখা – ‘এই পৃথিবীতে আমার মতো সুখী আর কে আছে?’আমারই হাতের লেখা। ছোট্ট একটা বাক্য। কিন্তু খুব সত্যি। আমি এখনও বিশ্বাস করি কথাটা লেখার সময় আমি ভেতরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখ ধারণ করেছিলাম। আজ এতো বছর পর সেই ছোট্ট বাক্যটি পড়ে ঠিক একই রকম সুখাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পেলাম গলার ভেতর থেকে সূক্ষ্ম কাঁটাটা মিলিয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে বুড়োটা আসলে আমার ভাল চায়। সে চায় আমি আবার সেই রকম সুখী হয়ে উঠি। সুখী হওয়ার প্রথম পাঠ ঋণমুক্ত হওয়া। কাঁধ থেকে ভার নামিয়ে ফেলা। যখন ঋণ শেষ হবে তখনই শুরু হবে সঞ্চয়।

নতুন করে খুঁজে পাওয়া এই ডায়েরী আর ফাউন্টেন পেন নিয়ে লিখতে বসলাম। শুরু হলো আমার ঋণমুক্ত হবার অভিযান।

(চলবে)

১,৮৬৯ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “ধারাবাহিক উপন্যাস – ১”

  1. আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)

    " যখন ঋণ শেষ হবে তখনই শুরু হবে সঞ্চয়।"
    অদ্ভুত সুন্দর লাগলো বাক্যটি । বিশেষ করে এই লিখার context এ। পরবর্তী সংযোজন গুলির অপেক্ষা করছি।


    Smile n live, help let others do!

    জবাব দিন
  2. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    হৃদয়স্পর্শী প্রেমের কাহিনী পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম শান্তা........

    ভূমিকা পড়ে মনে হলো... এটা ডিজিটাল যুগের নয়, আমাদের কালের প্রেমের উপন্যাস হবে। রাইসা, রাসিনরা আবার বলবে না তো, "মা তোমাদের সময়টা এতো ন্যাকা ন্যাকা ছিল কেন?" ;)) ;)) ;))


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  3. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    যা ছিল তা তো অস্বীকার করার উপায় নাই। আগে ছিল এনালগ ন্যাকামী, এখন হইছে ডিজিটাল ন্যাকামী। যতই কম্পিউটার ব্যবহার করুক আপনি কি মনে করছেন ্মানুষ তাদের ন্যাকামী ঝেড়ে ফেলছে?


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।