ফুলি বেগম যেদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসলো, সেদিন সে মনে মনে অনিশ্চয়তার দোলাচল আর কিছুটা চাপা উত্তেজনায় চঞ্চল ছিলো। বিয়ের আগে সে বাবুল মিঞাকে পরিবারের অন্যান্য সবার সামনে বসে চাক্ষুষ দেখার আর তার সাথে মাত্র দুই একটা কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলো। দুই একটা কথা আর দুই একবার দৃষ্টি ও হাসি বিনিময় ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য আর কিছুই ঘটেনি। কন্যা সম্প্রদানের সময় প্রথানুযায়ী বুকফাটা কান্নাকাটির পর সেই যে সে সোজা বাবুল মিঞার ঘরে চলে এলো, তার পর থেকে একবারের জন্যও তার কখনো মনে হয়নি যে সে ভুল ঘরে এসেছে।
ফুলি বেগমের দু’চোখ জুড়ে ছিল কতশত স্বপ্ন! বিধাতা তার অপার করুণায় তার প্রায় সব স্বপ্নই একে একে পূরণ করে দিয়েছেন, এজন্য ফুলি বেগম প্রায়ই একান্তে বিধাতার কাছে চোখের জল ফেলে কৃতজ্ঞতা জানায়। ধীরে ধীরে ফুলি বেগমের সংসারে এক এক করে কয়েকটা সন্তান এলো। ফুলি বেগম একান্ত নিষ্ঠায় হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলায় ব্রতী হলো। টানাপোড়েনের সংসারটাকে সে পুষ্পকাননের ন্যায় সাজিয়ে রাখতো। সময়ের কাজ সময়মত করতে সে সদা ওষ্ঠাগতপ্রাণ ছিল। বাবুল মিঞাও তার ছোটখাট সখ আহ্লাদগুলোকে যথাসাধ্য মেটাতে কার্পণ্য করতো না।
ফুলি বেগম বিধাতার কাছে আরও কৃতজ্ঞ যে সে জীবনে খুব বেশী অসুখে বিসুখে ভোগেনি, তার স্বামী সন্তানেরাও না। মাঝে সাঝে জ্বর টর হলে সে যথাসাধ্য চেষ্টা করতো আক্রান্তকে কমফোর্ট দিতে। নিজের হলে সে তেমন কিছু চাইতো না। চাওয়ার আগেই সে কিছুটা আহ উহ করেই ভালো হয়ে যেত, আবার দ্রুত সচল হয়ে উঠতো। এমনকি সন্তান প্রসবের সপ্তাহান্তেই সে প্রতিদিনের রুটিন কাজগুলো নিজেই করা শুরু করতো। তার একটা বড় অসুবিধা ছিল যে রান্নাঘরে একাধারে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে তার পায়ের পেশীগুলো শক্ত হয়ে যেত। সন্তানরা যখন ছোট ছিল, তখন পা টেপাটিপি করার জন্য তাদের ডাক পড়তো। বড় হয়ে যাবার পর আর তাদেরকে ডাকতো না।
একদিন রাতে ফুলি বেগমের পা দুটো ব্যথায় টনটন করছিলো। অগত্যা সে ঘুমকাতুরে বাবুল মিঞাকেই ঘুম থেকে ডেকে জানালো পা ব্যথার কথা। ঘুম ঘুম চোখে বাবুল মিঞা তার পায়ের কাছে বসে বললো “দাও”। এই বলে সে একটা পা তার কোলে নিয়ে টেপা শুরু করলো। আর নিমেষেই ফুলি বেগম নাক ডাকা শুরু করলো। বাবুল মিঞা আস্তে করে পাশে শুয়ে ফুলি বেগমের একটা হাত নিজের মুঠোবন্দী করে চোখ বন্ধ করলো। আর ভাবতে লাগলো, এই হাত সংসারের এত কাজ করে, তবুও কত নরম! এই হাতের কল্যানেই তার আর তার সন্তানদের মুখে ব্যত্যয়হীনভাবে ভাবে উঠে এসেছে অন্ন, বছরের পর বছর। এসব ভাবতে ভাবতে সে সিদ্ধান্ত নিল, পরের দিনই সে ফুলি বেগমকে একটা বড় সারপ্রাইজ দিবে। সে নিজ হাতে তাকে তার প্লেট থেকে তুলে কয়েক নলা অন্ন খাইয়ে দিবে।
এভাবেই দেখতে দেখতে বলতে গেলে প্রায় এক নিঃশ্বাসেই তারা তাদের জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এলো। আর সবার মতই তাদের মাঝেও টুকটাক ঝগড়াঝাটি হতো, মান অভিমান হতো, আবার অভিমানের ধনুর্ভঙ্গ পণও সামান্য একটু আদরেই ভেঙ্গে পড়তো। যে প্রথম নিজের ভুলটুকু বুঝতে পারতো, সেই অসন্তোষের কালো আঁধারটুকু অপসারণের উদ্যোগ নিত। আজ পরিণত বয়সে এসে ফুলি বেগম আর বাবুল মিঞা অতীতের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে একান্তে বিশ্লেষণ করে দেখে, তারা অতীতে বেশী সুখী ছিলো, না এখন! যাচাই করে দেখে, তারা সবার প্রতি এবং পরস্পরের প্রতি তাদের দায়িত্বটুকু ঠিকঠাক মত পালন করেছে তো?
জীবন সমুদ্র পাড়ি দিতে দিতে একান্তে তারা যখন পেছন ফিরে চায়, তারা আশ্বস্ত হয়। যখন সামনে তাকায়, এতদিনের অথৈ সাগরটাকে আর অন্তহীন মনে হয়না। তারা যেন সাগরের তীরটাকে দেখতে পায়। ধীরে ধীরে জীবনতরী এগিয়ে চলে, তারা দু’জনে নাওয়ের দু’প্রান্তে বসা। মাঝে মাঝে তারা প্রান্ত বদল করে দেখে নেয়, কার আসন থেকে সামনের তীরটাকে কেমন দেখা যায়। এতদিন তারা শুধু সামনের পানেই তাকিয়ে থাকতো, আর মাঝে মাঝে ভাবতো, তীর কত দূরে? এখন তীরটা দৃশ্যমান হবার পর পেছনে তাকিয়ে ভাবে, নামতেই কি হবে? পেছনে ফিরে যাওয়া যায়না, আবার একসাথে?
দূরমুঠ, মেলান্দহ, জামালপুর
০৬ জুন ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
🙂 🙂 🙂 🙂
অপরিনত ভালবাসা ডেকে কয় তারে, তোমায় আমি ভালবাসি কারণ তোমায় আমার বড় বেশী প্রয়োজন!
পরিনত ভালবাসা বলে, তোমাকে আমার প্রয়োজন কারণ আমি তোমায় বড্ড বেশী ভালবাসি! 😀
চমৎকার! 🙂
🙂 🙂 🙂 🙂
পেছনে যদি সত্যিই ফিরে যাওয়া যেতো !
মুঠোবন্দী হাতের সখ্যতা... কি ভীষণ নির্ভার জীবনের বারতা...
ফিরিবার উপায় তো নাই!
হতাশা ভালো লাগেনা। আপনার গল্পে যে পরিচ্ছন্ন জীবন যাত্রার ছবিটা একেছেন, তাতে মন ভালো হয়ে যায়
যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান
খুবই প্রেরণাদায়ক মন্তব্য। ধন্যবাদ সাইদুল, আমার লেখা পড়ে কাউরো মন ভালো হয়ে গেলে সেটাতো আমার জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি।
'বায়োস্কোপ' শিরোনামটা এই লেখার সাথে ১০০ ভাগ মানিয়ে গেছে! 😀
ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ
আমি যেকোন লেখায় মন্তব্য করার আগে শিরোনামটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেই। আমার লেখার শিরোনামটা তোমার শতভাগ সমর্থন পেলো, এতে ভীষণ প্রীত হ'লাম। ধন্যবাদ জুনায়েদ।
কয়েকটি বাক্যে দুটো পুরো জীবন -- তাদের সংলগ্নতা আর নির্ভরতা এত সুন্দর উঠে এসেছে!
শুধু দুটো শব্দের প্রয়োগে একটু খটকা লাগছে -- কমফোর্ট আর সারপ্রাইজ। মনে মনে একটি গ্রামীণ ছবির কথা ভাবছিলাম তো!
ধন্যবাদ নূপুর, লেখাটা মনযোগ দিয়ে পড়ার জন্য।
"কমফোর্ট আর সারপ্রাইজ" - অবচেতনে এসব এসে যায়।