কাপুরুষের ডায়েরী

৭ মার্চ,১৯৭১
আজ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এত মানুষ হয়েছে, ওফফ সে এক অসাধারণ দৃশ্য। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আর মনে হয় আমাদের সাথে পেরে উঠবে না। আমাদের দাবী মেনে নিতেই হবে। এত গণজাগরণ ঠেকিয়ে রাখবে কিভাবে। হল থেকে বন্ধুরা সবাই মিলেই গিয়েছিলাম। আজ অন্যরকম আবহাওয়া ছিল। মিছিল তো প্রায়ই করি কিন্তু আজ কেমন যেন উৎসব উৎসব ভাব ছিল। শামীম ভাই অবশ্য বলেছিলেন আজ নাকি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন। ফেরার পথে বন্ধুদের মধ্যে সেটা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। শামীম ভাই অবশ্য হতাশ উনি বলছেন এর চেয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলেই পারতেন। এই পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে থাকা যাবে না আমাদের। নিজেদের একটা দেশ লাগবে। জাহিদ অবশ্য বলছিল উনি তো বলেছেনই স্বাধীনতার সংগ্রাম । কিন্তু শামীম ভাই তাতে সন্তুষ্ট নন। উনিই বল পশ্চিম থেকে নাকি মিলিটারি আসছে। কি হবে এবার বুঝতে পারছিনা।
হলে আর ফিরে যাইনি। অনেকদিন বাসায় যাইনা। বাসায় এসে দেখি আম্মু খুব চিন্তিত। ঠিকই বুঝেছিল আমি আজ রেসকোর্সে যাব কি না কি হয় তা নিয়ে চিন্তিত। এত চিন্তা করলে কি আর এখন হয় এখন তো উত্তাল সময়। কাল যদি যুদ্ধ শুরু হয়েই যায় তাহলে কি আর আমি ঘরে বসে থাকব।

২৫ মার্চ, ১৯৭১
আজ যে কি হচ্ছে হলের দিকে কিছুই বুঝতে পারছিনা। প্রচুর গোলাগোলি হচ্ছে রেডিওতে শুনলাম। পাকিস্তানি কুত্তার বাচ্চারা নাকি মিলিটারি নামিয়ে দিয়েছে ওরা যাকে পারছে তাকেই মারছে। এইসব কুত্তাদের যদি একটাকেও নিজের হাতে মারতে পারতাম। গত কিছুদিন ধরেই এই নিয়ে বন্ধুরা আলোচনা করছিলাম। সবাই বুঝে গিয়েছি যুদ্ধ নিশ্চিত। কিন্তু কিভাবে যুদ্ধ হবে কিভাবে আমরা যুদ্ধে যাব তাই বুঝতে পারছিলাম না। গত ১ সপ্তাহ ধরে আম্মু কিছুতেই আমাকে হলে যেতে দিল না। সবার আগে নাকি ছাত্রদের উপর হামলা হবে। আসলেই মনে হয় তাই। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মনে হয় দিল একেবারে গুড়িয়ে। শফিক, সাদেক ওরা যে এখন কি অবস্থায় আছে। আমার খুব অস্থির লাগছে। দুবার গিয়ে ছাদের উপরে দেখে আসলাম । এত দূর থেকে কিছু বোঝা যাবার ও কথা না ।

১৪ মে, ১৯৭১
নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিনা। আমি এখনো বাসায় বসে আছি। যা খবর পেয়েছি আমাদের মোটামোটি সবাই যুদ্ধে চলে গিয়েছে। কুমিল্লার ওদিকে বর্ডার ক্রস করে সবাই ইন্ডিয়া চলে গিয়েছে ট্রেনিং নিতে। আমিই শুধু বসে আছি বাসায়। আম্মুকে বোঝাতে পারছিনা কিছুই। আম্মু কিছু বলে না শুধুই কাঁদে। তার সাথে যোগ দেয় ছোট বোনটা । আব্বু মারা যাবার পর আমাদের ৩ জনের সংসার । কিন্তু এই অবস্থায় থাকাও যে যায় না। আমাদের ক্লাসের মিন্টু যে শুধু পড়ালেখাই করত কতদিন তাকে মিছিলে না যাওয়ার জন্য রাগিয়েছি সেও চলে গেল পড়ে রইলাম শুধু আমি? ছিহ আমি কি করব কিছু বুঝতে পারছিনা। আম্মুকে কিভাবে বুঝাব।

৭ আগষ্ট ,১৯৭১
আমি আর পারছিনা এইভাবে ঘরে বসে থাকতে। কাল রাতে আমাদের বাড়িওয়ালা যাকে চাচা বলে ডাকি এতদিন তিনি এসেছিলেন। হয়ত আম্মুই গিয়ে ওনাকে ধরেছেন আমাকে বুঝাতে। যে ভদ্রলোককে এতদিন শ্রদ্ধা করে এসেছি কাল হাতের কাছে পেয়ে তাকে ইচ্ছে করছিল গলা টিপে ধরি। তিনি এখন শান্তিকমিটির কি যেন। আমাকে বুঝাচ্ছিলেন এইসব পাগলামি করে নিজের মা বোনকে বিপদের দিকে ঠেলে না দিতে। উনি নিজেও নাকি জানেন দেশ স্বাধীন হবে কিন্তু সবাই তো আর সেটাতে যোগ দিতে পারে না। সবার সেই যোগ্যতা নেই। উনি নিজেও নাকি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছিলেন তখন তো আর বুঝতেন না যুদ্ধ কি । নিজেকে নিজের পরিবারকে বাঁচাতেই উনি এখন শান্তিবাহিনী। একজন রাজাকার আমাকে বুঝাচ্ছে আমি যেন যুদ্ধে না যাই। এই লজ্জা আমি কই রাখি। আমার পক্ষে কিছুতেই আম্মুকে ফেলে যাওয়া যাচ্ছে না। কখনো আম্মুর কথা ফেলিনি। কিন্তু এখন কি আর এইসব ভালো ছেলে সেজে থাকার সময়। আম্মুকে না বলেই পালাতে হবে আমাকে। এইভাবে থাকলে সুইসাইড করা ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকবে না।

১৯ অক্টোবর, ১৯৭১
গত কদিন ধরে শেষ চেষ্টা করলাম আম্মুকে বুঝানোর। কিন্তু আম্মু এখন আর কাঁদে না খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে থাকে যুদ্ধের কথা শুনলেই। ছোট বোনটা বেশ সুর করে কাঁদে। আমি পরাজিত, আমি কাপুরুষ এদেরকে উপেক্ষা করে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এতদিনের মিছিল , রাজনীতি সব আসলে ফাঁকি।

১ নভেম্বর, ১৯৭১
আজ ছোট বোনটার জন্মদিন ছিল। সে এসে আমার সাথে গল্প করছিল। কথায় কথায় ওর সাথে বেশ হাসাহাসি করছিলাম। হঠাৎ মনে হল আমার আজ যুদ্ধে থাকার কথা ছিল। আমার বন্ধুরা প্রাণ দিচ্ছে আর আমি বাসায় বসে হাসছি। ধিক্কার আমাকে। ছিঃ

১০ ডিসেম্বর , ১৯৭১
পাকিস্তানিরা আর পারবে না। যে কোন সময়ে আমরা স্বাধীন হয়ে যাব। কিন্তু আমার কি সেই দেশে থাকার যোগ্যতা আছে। আমি কাপুরুষ এই দেশকে কিভাবে আমি মুখ দেখাব। আমার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এই দেশের মাটিতে পা রাখার অধিকার নেই। আমি আর পারছিনা এই লজ্জা নিয়ে বেঁচে থাকতে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল স্বাধীন দেশে প্রাণ খুলে হাসতে কিন্তু সেই হাসি আমি হাসতে পারব না বরং সবাই আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলবে এই ছেলে সুবিধেবাদী। আমি সহ্য করতে পারব না। তারচেয়ে এই ভাল মরে যাই…

১৯ টি মন্তব্য : “কাপুরুষের ডায়েরী”

  1. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    আমি মাত্র বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান উপভোগ করে আসলাম 😀 😀
    কামরুলতপু ভাই বরাবরের মতই সিরাম হইছে :boss: :boss: :boss: :boss:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  2. রকিব (০১-০৭)
    আমি আর পারছিনা এই লজ্জা নিয়ে বেঁচে থাকতে

    গৎবাধা কথা আর রাজাকারদের প্রশয় দিয়ে কাপুরুষের মতো মাথা নিচু করে আমরা আর কতদিন চলবো?? আমাদেরও কী বেছে থাকা এই উচিত এই লজ্জা নিয়ে?
    তপু ভাইকে :salute:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  3. রহমান (৯২-৯৮)

    আমার মতে গল্পের এই ছেলেটা কাপুরুষ না, বরং যথেষ্ট বিবাকবান। যুদ্ধে না যেতে পারার কষ্ট বার বার তাকে দংশাচ্ছে। তার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। কিন্তু আমাদের দেশের রাজাকারদের দিকে তাকালে আমার ঘেন্না হয়। অপরাধবোধ তো দূরের কথা, সামান্যতম লজ্জাও এদের নেই। তারা আবার বুক ফুলিয়ে, গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ঘুরে বেরায়। এসব ভাবলেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।

    আমার খুব ইচ্ছে ছিল স্বাধীন দেশে প্রাণ খুলে হাসতে কিন্তু সেই হাসি আমি হাসতে পারব না বরং সবাই আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলবে এই ছেলে সুবিধেবাদী

    আমরা সবাই জানি, আসলে এই সুবিধাবাদী কে বা কারা

    জবাব দিন
  4. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    নিজেকে বড়ই কাপুরুষ মনে হয়, ইরাকি এক সাংবাদিক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে জুতা মারতে পারে আর আমরা একটা রাজাকারকেও জুতাও দেখাতে পারিনা বরং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের পিটায় সেটা সহ্য করি। আবার শুনলাম তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রিসার্চ করে। এই লিঙ্কটা দেখেন। যুদ্ধে নাকি ১০হাজারের বেশি লোক মারা যায়নাই বরং রাজাকার মারা গেছে দেড় লাখ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে।
    বিকৃত যুদ্ধ তথ্য

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।