প্রিয় বাদামওয়ালী

প্রিয় বাদামওয়ালী,
তোমার স্কুলের ড্রেসটা লাল-সাদা ছিল, মনে আছে…… আর তাই-ই বোধহয় তোমাকে লাল অথবা লাল সাদাতেই আমার কাছে বেশী ভালো লাগতো। যদিও কিনা রং দুটোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ বিপরীত। আগে একসময় পরিণয় এর রং ছিল শুধুই লাল, আর বৈধব্যের রং সাদা। এখন অবশ্য এ সকল আদিখ্যেতা কমে গেছে অনেক। লাল এর ভেতর যে আবার বহু রকমফের আছে সেটা তুমিই শিখিয়েছিলে। তোমার সাথে যে লালটা সবচে ভালো যেত তার নাম মনে আছে বলেছিলে ” রানী গোলাপ ” – টকটকে লাল ও নয় আবার ফ্যাকাসে হতে হতে “লাল” এর মাধুর্য হারিয়ে ফেলেনি এমন একটা লাল। মাথায় জিগজ্যাগ সিঁথি করে হুড়পাড়িয়ে তুমি স্কুলে চলে যেতে। ডে-শিফটের কল্যাণে তোমার এই হুড়পাড়িয়ে চলে যাওয়াটা বারান্দায় বসে হোম ওয়ার্ক সারতে সারতে নজর এড়াত না। অনেক আগের কথা বলছি তাইনা ? সেতো তেরো চোদ্দ বছর আগের বেশী কি কম নয়। তোমার সাথে আমার পরিচয় দেড় যুগ এরও বেশী ছাড়িয়ে গেছে। নবছর আগে তুমি একদিন আমাকে বলেছিলে বাদাম নাকি ভালবাসার ফল, ফ্রুট অফ লাভ…… যদিও গত ন বছরে সর্ব সাকুল্যে ৬০-৬৫ দিনের দেখায় আমি কোনদিন তোমার সাথে কোঁথাও বসে বাদাম খেতে পারিনি… সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি। ২০০৮ সালের ঠিক এই মার্চ মাসেই চট্টগ্রাম থেকে তোমাকে লিখে পাঠিয়ে ছিলাম—–

অনেকদিন বাদাম খাওয়া হয়না,
ক্যাফেটেরিয়ায় প্রান বাদাম আছে,
কিন্তু পটপট করে বাদাম ভাঙ্গার মজা
তাতে কি পাওয়া যায়, বলো?
আবার আমরা বাদাম খাব
পটপট করে ভেঙ্গে,
আমি ভাঙ্গবো তুমি খাবে
তুমি ভাঙবে আমি খাবো।

আমাদের আর কোনদিনও পটপট করে বাদাম ভেঙ্গে খাওয়া হল না । তোমার স্কুল জীবনে বাদামের প্রতি একটা অন্যরকম আগ্রহ ছিল বলা চলে। মনে আছে তুমি বলেছিলে বড় হলে তুমি একটা দোকান দেবে, যার নাম হবে ” পী নাট কর্নার” … পৃথিবীর সব রকম বাদাম বাদামজাত খাবার নাকি পাওয়া যাবে সেখানে। তোমার পাগলামি গুলো শুনতাম আর মনে মনে হাসতাম।আজ থেকে বছর চারেক আগে তোমাকে “পী নাট কর্নার” এর কথা মনে করিয়ে দেখি তুমি নিজেই নিজের ইচ্ছের কথা বেমালুম ভুলে বসে আছো।২০০৪ এ তোমার এই বাদাম অনুরাগের বিষয় অন্য কলেজের এক ঘনিষ্ঠ বড় ভাইকে বললে তিনি বলেছিলেন ” বাহ আধুনিক বাদামওয়ালী”।সেই বড় ভাই একবার কলেজে চিঠি লিখলেন– ” কিরে তোর বাদাম ওয়ালীর খবর কি?”। সেই বাদাম ওয়ালী শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ , ভাবানুবাদ ছাড়াও আরও কত প্রকার অনুবাদ আমাকে হাউস অফিসে দাঁড়িয়ে হাসিনা ম্যাডামের কাছে করতে হয়েছিল সেটা তোমাকে বলা হয়ে ওঠেনি সময় এর অভাবে। দেখতে দেখতে তোমার সাথে সাতটি বছর পার হয়ে গেলো… আবার তোমাকে ছাড়াই দেখো দুটো বছরও পার করে ফেললাম। তোমাকে কেন ভালবাসতাম বা কেন আজ দু বছর পরে আবার তোমাকে লেখা এই চিঠি যদি কেউ তার কারন জিজ্ঞেস করে বসে স্ট্রেইট একটাই উত্তর যা আগেও দিয়েছি — জানি না কেন। আর কেন এই দু বছর ?, কিভাবে…… ইত্যাদির উত্তর ও একটাই — সব কিছু থাকার পরও প্রকৃতির চাওয়া না চাওয়াকে সমীহ করতে হয়। এতটুকু তোমাকে বলতে পারি যে তোমার উপর কোন রাগ বা অভিমান নেই আমার। বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারলেই খুশী হই কারন না পাওয়ার মানে যে সব সময় পরাজয় বা গ্লানি নয়, না পেয়েও যে মানুষ জীবনের কিছু চরম সত্যকে অনুধাবন করে, সেটা তুমিই আমাকে শিখিয়েছ। জীবন স্রোত কোনও মোহনায় আবার মিলবে কিনা জানিনা তবে যেদিকেই প্রবাহিত হই চেষ্টা করব দুকুলকে আমার ইচ্ছা আর ভালবাসায় উর্বর করে তুলতে। শেষ করার আগে একটা কথা , জীবনে কখনও সামর্থ্য হলে একটা দোকান দেব– ‘পী নাট কর্নার” … যদি ঘুরতে ঘুরতে কোনদিন এসে পড় তবে বুঝে নিও তোমার হেয়ালি ইচ্ছে গুলোর অনেক মূল্য ছিল এবং অদ্যাবধি আছে আমার কাছে যা কিনা কোনদিন ঢোল পিটিয়ে তোমাকে বোঝাতে যাই নি। ভাল থাকো , খুব ভালো।

ইতি
খুলনা ,কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ঘুরে এখন ঢাকা

৬২১ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “প্রিয় বাদামওয়ালী”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।