টম ক্রুজ

 

অতি সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিচিত নামটি আমাদের কানে  কিংবা নজরে এসেছে আলোচিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব অনন্ত জলিল এর সুবাদে। আরো একটু পেছনে গেলে পাওয়া যাবে ‘মিশন ইম্পসিবল ৪’ এর দুর্দান্ত অ্যাকশন। সোজা কথায় বললে আমাদের আশেপাশেরই বহু রমণী- তরুণী- বালিকার অতি আপনজন এই টম ক্রুজ।

কিন্তু আমি হলিউডের কারো কথা আজ বলছিনা। অনন্ত জলিল কে নিয়েও কিছু বলছিনা। বাঙালি মেয়ের হলিউডি ভালোবাসা নিয়েও কিছু বলছিনা। আমি বলছি আমাদের এক টম ক্রুজ এর কথা।

২০১০ সালে এইচএসসি পরীক্ষার আগে হুনাইন ডর্ম ৪ এ আগমন হয় টম ক্রুজের। একটি কাঠবিড়ালির ছানা। আমাদের সবার আদরের টম ক্রুজ। আমার টম।

কলেজ জীবনের শেষ ছুটি কাটিয়ে ফেরার পরেই খায়বার হাউসে পাওয়া যায় তিনটি কাঠবিড়ালির বাচ্চা। বয়স আনুমানিক এক সপ্তাহ। একটারও চোখ ফোঁটেনি তখনও। একটা নিলো সানজিদ, একটা নিলাম আমি আর বাকিটা নিলেন এক সুইপার তার পিচ্চি মেয়ের জন্য। পশুপাখির ভরণপোষণের ব্যাপারে সানজিদ একজন বিশেষজ্ঞ, তাই ওর পরামর্শ অনুযায়ীই টমের স্থান হল আমার বাটা জুতার বাক্সে চড়ুই পাখির বাসার মতন একগাদা কিছু একটার মাঝে। হুনাইন ডর্ম ৪, ডর্ম লিডার থেকে লাস্ট প্লেস, কাবার্ড এর ডাউন স্টেয়ারস, বাটা অক্সফোর্ড জুতার বাক্স।

খুব দ্রুতই আমাদের ডর্মের পাবলিক সংখ্যা দশ থেকে এগারো তে উন্নীত হয়। টম কে নিয়ে আমরা বড় বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কিন্তু সব স্বপ্নে পানি ঢালে সাকিব। সে আমাদের সবাইকে বুঝায় যে এটা একটা বন্য জীব। এটা পোষ মানবেনা। টের পাওয়ামাত্রই টম পালাবে গাছের ডালে। আমরা অবজেকশন দিই, ”আমরাই তো গাছ’!!”

যাই হোক কিছুতেই কিছু হয়না আর আমরা সিদ্ধান্ত নিই কাকের হাত থেকে বাঁচতে টম আমাদের কাছেই থাকবে। প্রতিদিনের জীবনের দরকারি কাজগুলো শিখে ফেললেই আমরা ওকে ছেড়ে দেবো।

কমবেশি সারাদিনই টম ঘুমাত। আমি একটু পর পর বাক্স খুলে দেখতাম ঘুমাচ্ছে কিনা। ঘুমালে  আদর পেতো, না ঘুমালে হাতের তালুতে তুলে নিতাম। ওর মিল্ক ব্রেকের বেল পড়তো। সবাই বলতো ” দোস্ত আমাকে দে আমি খাওাই”। মাঝে মাঝে দিতাম, কিন্তু নিজে না খাওয়ালে শান্তি লাগতনা!! সহসাই নিজের মায়ের কথা মনে পড়তো……

ক্যাডেটদের জ্ঞানের শেষ নেই। কাঠবিড়ালি জীবনের খুঁটিনাটি পর্যন্ত আমরা জানতাম। শুরু হয়ে গেলো টমের ট্রেনিং। চোখ না ফোঁটা এক কাঠবিড়ালির বাচ্চার ট্রেনিং। প্রথম কাজ ছিল ওকে ঝুলতে শেখানো। আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে সে মশারিতে ঝুলে থাকতো দারুণ! এই পর্যায় পার হলে ওকে ঝুলিয়ে দেয়া হল নেট এর জানালায়। কয়েকদিনের নিবিড় অনুশীলনে টম এখানেও তার স্কিলের প্রমাণ দেয়।

এর মাঝেই পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। ওর দেখাশুনার কোনও কমতি ছিলনা কিন্তু ঝামেলা বাঁধতো যেদিন পরীক্ষা থাকতো সেদিন। সাড়ে নয়টার মধ্যে রুম থেকে বের হয়ে আরও তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়ে এরপর লাঞ্চ সেরে রুমে ফিরতে দু’টা বাজত। এই লম্বা সময় টম একা। আমি যাবার আগেই ওকে খাইয়ে যেতাম। পরীক্ষার আগেই নয়টার দিকে ছিল মিল্ক ব্রেক । নিজে খাওয়ার জন্য কোনোদিন যাইনি। ছোট্ট একটা বোতলে খানিকটা দুধ নিয়েই চলে আসতাম। আমি, কিংবা রাফি, মুবিন, সাকিব, আশিক……কিন্তু মিস হয়নি কোনোদিন।

লাঞ্চ থেকে ফিরেই আগে ওকে খাওয়াতাম। আমাদের কারো কাছেই ড্রপার ছিলনা। উপায় না পেয়ে কলমের শীষ। ও আঙ্গুল চাটতোনা।

এভাবে মাস কাটলো। টম একটু বড় হল, চোখ ফুটলো, ছোট্ট টম আরও সুন্দর হল। আমাদের হাতে হাতেই থাকতো টম। রাফির কাধে চড়তো। আমার বেডে রেস দিত। সাকিবের কাছ থেকে কমান্ডো ট্রেনিং নিত।

একদিন ডাইনিং  এ গিয়ে শুনি  মিল্ক ব্রেকে দুধ দেয়া আপাতত বন্ধ। ডেইরী ফার্মে প্রোডাকশন কমে গেছে। চিন্তায় পড়লাম। টম খাবে কি এখন ??

গুঁড়ো দুধ পেলাম কিন্তু গরম পানি তো নাই !! শুধুমাত্র দুপুরবেলায় ১/২ টার দিকে ড্রাইং রুমের ট্যাঁপের পানি গরম পাওয়া যায়। রোদের তাপে গরম হওয়া পাইপের পানি। ওই পানিতেই দুধ গুলে খাওয়াতে লাগলাম আমরা। কিন্তু সে গুঁড়ো দুধ খায়না। হরলিক্স খাওয়ালাম। সেটাও খেলোনা। খেলো কী?? দুধ চা!!!

নিরুপায় হয়ে চা-ই চালালাম। ফলাফল পেতে দেরি হয়নি। ও ক্রমেই দুর্বল হতে লাগলো। খেলতনা, ছুটতনা, শুধু চোখ বন্ধ করে কিচ কিচ আওয়াজ করতো। আমার মন খারাপ । ওর জন্য কিছুই করতে পারছিনা। ওর মার কোনও খোঁজ নেই, আর ও নিজেও বাইরে একা থাকার মতো বড় হয়নি। কি করব?? কি করব???

সানজিদের কাছে ওকে দিয়ে আসার কথা বলল সবাই। কারণ ওর বাচ্চাটা ভালোই ছিল। অবশেষে আবেগের মুখে প্রচণ্ড লাগাম টেনে ওকে রেখে এলাম খায়বার হাউসে। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, সুস্থ হলেই ওকে ফিরিয়ে আনবো। এতো তাড়াতাড়ি তো আমাদের বিচ্ছেদ হবার কথা না!!

বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। নিজের বোনের কাছে ফিরে যাবার এগারো দিনের মাথায় টম মারা যায়। আমি ওকে শেষবারের মতো দেখতে যাইনি। আমি পারছিলামনা। নিজেকে পাষাণ মনে হচ্ছিল আমার!!

প্রায় তিন বছর হয়ে গেলো। এখন পর্যন্ত ক্ষমা করতে পারিনি নিজেকে। আসলে আমি কিংবা আমরা ওর জন্য আর কিছুই করতে পারছিলামনা।

আমি তোকে অনেক ভালোবাসতাম, টম! যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস। তুই মরে যাবার পর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কোনোদিন পশুপাখি পুষবোনা। তুই সারাজীবন আমার একমাত্র হয়ে থাকবি।

তুই ভাগ্যবান, টম ! মানুষের এতো ভালোবাসা কয়টা কাঠবিড়ালির কপালে আছে??? অনেক মানুষই তো এতো ভালোবাসা পায়না।।

৫৫ টি মন্তব্য : “টম ক্রুজ”

  1. রেজা শাওন (০১-০৭)

    চমৎকার লাগলো ভাই। আশা করি ব্লগে এমন চমৎকার সব লেখা আরও লিখবে।

    একটা কাজ করবে কি ভাইয়া? লেখার মাঝে প্যাড়াগুলোর গ্যাপ একটু কমিয়ে দাও। পড়তে সুবিধা হবে সবার।

    ভাল থেকো।

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    তোমার ভাগ্য ভালো যে জলীল ভাই রে নিয়া কোন ফান করো নাই; খবর ছিলো তাইলে তোমার।
    আমি তার বিশাল পাঙ্খা।

    গল্প খুব ভাল হইছে।
    খালি দ্যাশ থিকা নিয়ম উইঠা গেছে।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. তাওহীদ

    আমি প্রথম এক্সট্রা ড্রিল খাই একটা চামচিকার জন্যে ... সকাল এ পিটি এর আগে রুম এ চামচিকা আসে , ওইটাকে রুমে রেখে দিব এজন্যে অনেক কিছুই করেছিলাম এবং পেরেছিলাম শেষ পর্যন্ত... 😛 সকালে নেমে দেখি তখন ড্রিল শুরু হয়ে যাচ্ছে প্রায় ... 😛 চামচিকা প্রেমিক ছিলাম ... 😛

    জবাব দিন
  4. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    জগদীশ বাবু তো আগেই প্রমাণ করেছেন..বৃক্ষেরও প্রাণ আছে :-B
    এনিওয়ে, খুব ভালো রিফাত।
    অনেকদিন পর সিসিবিতে একটা ভালো লেখা পড়লাম!!
    লিখো, আরও..


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
  5. আসিফ মাহমুদ

    ....তোদেরকে পাঙ্গা দিয়ে তাহলে মানুষ করতে পেরেছি... 😛 just awesome.... :hatsoff: কিন্তু এখানে প্রথম লেখার পর ১০ টা ফ্রন্টরোল দিতে হয় এই নিয়মের কথা বলা হয়েছে .... B-) (সম্পাদিত)


    ...একদিন সবকিছু মুছে যায় হিমেল হাওয়ায়, স্মৃতিমাত্র লিখে নাম...সেইখানে আমিও ছিলাম...

    জবাব দিন
  6. সন্ধি (১৯৯৯-২০০৫)

    লেখা ভাল লাগল। আরও সুন্দর সুন্দর লেখা পাব তোমার কাছ থেকে আশা করি। জীবনে কাঠবিড়ালী পোষার খুব শখ ছিল। কিন্তু তা আর বাস্তবের মুখ দেখে নি। তোমার জীবনে সে সুযোগ এসেছিল জেনে ভাল লাগল।

    জবাব দিন
  7. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    আ হা রে...
    ঘটনাটা কষ্টের।

    আমরা একবার টার্ম এণ্ড পরীক্ষার পর খাবো বলে একাডেমিক ব্লক থেকে একটা কবুতর ধরে আনলাম। একজনের কাবার্ডে তাকে দানাপানি দিয়ে ক'দিন পালবার পর কোন একটা পরীক্ষাশেষে দেখি পাখি উড়ে গেছে!
    বহুদিন পরে আমাদেরই এক দোস্ত স্বীকার করসিলো, তার কোন পরীক্ষা খারাপ হবার পর পাপবোধে আক্রান্ত হয়ে পূণ্যলাভের আশায় ওটাকে সে মুক্ত করে দ্যায়।আমরা যা খেপসিলাম! 😀

    জবাব দিন
  8. তাজিন (২০০৫-২০১১)

    আমাদের ছোট পাখিকে এনার্জি প্লাস বিস্কুট খাওয়াতাম। 🙁
    // আমরা অবজেকশন দিই, ”আমরাই তো গাছ’!!”//
    😀 😀 😀 B-) B-) B-)


    যখন চলে যাব দূরে...বহুদূরে...নৈশব্দের দূর নগরীতে

    জবাব দিন
  9. মাহমুদ (১৯৯৮-২০০৪)

    আমাদের ব্যাচের একটা পোষা কুকুর ছিল;নাম ছিল নেপোলিয়ন।আমরা আদর করে ডাকতাম 'নেপো'!
    ক্লাস ১২ এর শেষের দিকে প্রায় ৬ মাস নেপোকে আমরা পেয়েছিলাম।আমরা চলে আসার পর নাকি পরে এক সময় নেপোও কোথায় জানি চলে যায়!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।