একটি বিক্ষুব্ধ সত্ত্বা

অনেকক্ষণ ধরেই সূর্যটা মধ্যগগনে  অধিষ্ঠিত হয়ে তার অস্তিত্ব টা বেশ ভালোভাবেই জানান দিচ্ছে। প্রচণ্ড তাপে পিচ ঢালা পথ থেকে বাষ্প উড়ে সূক্ষ্ম মরীচিকার সৃষ্টি করছে। শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে এক যুবক। দুনিয়ার কোন কিছুতেই তার আর কিছু যায় আসে না।মুখে কিছুদিন ধরে শেভ না করা খোঁচা খোঁচা দাড়ি । পরণে প্রায় ফিকে হয়ে যাওয়া একটা নীল ফুল টি শার্ট ও কালো প্যান্ট। হাঁটতে হাঁটতে একটা মোড়ে এসে পৌছাল সে। শরীর আর মানছে না।একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। ফুটপাতের পাশে একটা সিমেন্টের চেয়ারে বসল সে। পাশেই বেশ কিছু ফুলের দোকান । ফুলের দোকান গুলোয় কেন যেন  বেশ ভীড়। ওহ, কালকে বিজয় দিবস।তাই হয়তো বা।  বসে বসে আশেপাশের লোকজনের কর্মকান্ড দেখতে লাগল সে। মাঝে মাঝেই এরকম করে সে। যখন কোন কাজ থাকে না, তখন বসে বসে এভাবে সময় কাটায় সে। কত বিচিত্র রকমের মানুষ । আর কত বিচিত্রই না তাদের কাজ কারবার। এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের মনে নিজেই হেসে ফেলল সে। যখন কোন কাজ থাকে না, হাহাহা! আসলে তার কাজ টা থাকে কখন? যখন মানুষ নানা রকম কাজে ব্যস্ত থাকে,দম ফেলার ও ফুরসত পায় না,তখন সে ভাবে ,আহা একটু যদি অবসর পেতাম। প্রতিদিনের এই রুটিনবাঁধা কাজের মাঝে না জানি কত শত শখ মাথা কুটে মরছে। একটু অবসর পেলেই সেই সব  অকাজের শখ দের কে মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু যখন আক্ষরিক অর্থে অবসর এসে বলে, কই নাও এইবার তোমার শখ মেটানোর পালা। তখন মনে হয়, আহা, এই মাত্রই না রাজ্যের  কাজ শেষ করলাম, একটু বিশ্রাম ও কি নেবার ফুরসত নেই। আসলে আমরা কার কাছে জবাবদিহি করি তাই ই আমরা জানি না। অনেক টা ওই গানটার মত। উড়ছি কেন কেউ জানে না , যাচ্ছি কতদুর…

যুবকের বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা ভাবনার সুতাটা যেন হঠাৎ করেই কেটে গেল। সামনে এসে থেমেছে একটা মেরুন রঙের গাড়ি।গাড়ি সম্পর্কে তার খুব একটা আইডিয়া নেই । তবে ছোটবেলায় তার অনেকগুলো ইচ্ছার মধ্যে একটা স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একটা গাড়ি কেনার। মার্সিডিজ বেঞ্জ! হা হা, বেঞ্জ। ছোটবেলার সেই সব অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্নর কথা মনে পড়লে কেন যেন খুব মায়া লাগে তার।হ্যা, মায়া লাগে।কত বড় স্বপ্নই না ছিল তার।অনেক দূরে স্বপ্ন আমার , অনেক দূর আমার চাওয়া। সেই নাইন –টেনে পড়ার সময় স্বপ্ন দেখত সে। একদিন খুব বড় একটা কোম্পানির ম্যানেজার হবে সে। কর্পোরেট লাইফ!ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট আর একটা গাড়ী। স্বপ্ন পুরণের জন্য বেশ খানিকটা পড়াশোনাও করেছিল সে। ছোটবেলা থেকেই বাপ-মা  হারা। আত্মীয় –স্বজনদের এর ওর কাছে আশ্রিত থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাঙ্কিং  নিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে সে। কিন্তু তার অযোগ্যতা ছিল একটাই। সে ছিল গরিব।ব্যাঙ্কের সিনিয়র অফিসারদের পরিবারের ঈদের বাজার করার জন্য মাত্র তিন লাখ টাকা সে দিতে পারেনি।  ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টেন্ট ছিল তার গ্রামের লোক। তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর সে একটা সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল।তিনি বলেছিলেন, অনেক বলে কয়ে টাকার পরিমান টা আড়াই লাখে নামিয়ে এনেছেন।“বুঝোই তো বাবা, সবার ই তো একটা চাহিদা আছে” ।
চাহিদা! বাবার বয়সী লোকটার কথা শুনে ওর মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। ছোটবেলায় সে পড়েছিল চাহিদা রেখার কথা। দাম বাড়ার সাথে সাথে চাহিদার পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু কোন সেই মহার্ঘ্য ? যাতে ওই লোকগুলার চাহিদা কমবে?  তার উত্তর কি কোন অর্থনীতিবিদের জানা আছে?

তবুও সে হাল ছাড়েনি । ছোটখাটো একটা চাকরি জুটিয়েও ফেলে সে। এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। কর্তব্যে যে সে একটুও ফাঁকি দেয় নি এটা পুরোপুরি সত্য নয় । কিন্তু তাই বলে চুরি ??? ওই দিন তার নিজেকে যে কতটা ছোট আর অসহায় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যে ধরণী দ্বিধা হও ,আমি তাতে মুখ লুকাই।তাও যদি সম্মান টা অক্ষুণ্ণ থাকে । ও চেয়েছিল একটুখানি সৎ পথে থেকে আয় করতে। কিন্তু ওরা তা হতে দিল না। ঠিক যেন ঐ প্রবাদটার উল্টা ।আমি অধম , তাই বলিয়া তুমি উত্তম হইবা কেন? হাহা, রিয়েল লাইফ আসলেও সিনেমার চেয়েও অবিশ্বাস্য।  ।দূর্নীতিবাজ গুলোর দলে যোগ না দেয়ায় আজ তার এ অবস্থান। হঠাৎ চেঁচামেচির শব্দে বাস্তব জগতে ফিরে  এল ও । সামনে দুটি ছয়-সাত বছরের বাচ্চা দাঁড়ানো। হালকা হালকা  শীত পড়তে শুরু করেছে।তারপর ও খালি গা ।পরণে হাফ প্যান্ট। বোবার মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে এক লোকের ঝাড়ি শুনছে তারা। পোশাকে –আশাকে লোক্তাকে গাড়ির ড্রাইভারের মত মনে হচ্ছে। মনোযোগ দিয়ে লোকটার কথা শোনার চেস্টা করল সে।শুনে যা বোঝা গেল বাচ্চা দুটির অপরাধ দোকান থেকে ফুলের ডালাগুলা আনার সময় একটা ডালার একপাশ পুরা ভেঙে ফেলেছে। “ তোরা জানিস তোরা কি করেছিস?কালকে বড় সাহেব স্মৃতিসৌধে ফুল দেব,কত লোকজন থাকব। এখন এই যে তোরা ফুল গুলান পুরা নস্ট কইরা দিলি এখন এক রাতের মধ্যে এইগুলা আবার কে বানায়ে দিবো? একটা কাজ ও ঠিকমত করতে পারস না। সবসময় খালি খাই খাই, কাজের বেলায়…” ।।হঠাৎ গাড়ির পেছনদিকের কাঁচটা নামিয়ে একজন বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন , “আহ ড্রাইভার, কি করছ কি এইসব? ছুচো মেরে হাত গন্ধ করে কোন লাভ আছে ? গাড়িতে এস, আমার তাড়া আছে” । “জি স্যার, জি স্যার, এইতো আসতাছি। এই যাহ, তোরা এইখান থেকে ভাগ” ।“আমাগো টাহা?” ওদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেটা বলে উঠল হঠাৎ। “টাকা??” ড্রাইভার হঠাৎ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল । “ফুল নস্ট করার সময় মনে ছিল না?এখন আবার টাকা চাস? জলদি এইখান থেকে ভাগ। নাইলে কিন্তু মাইর এখান ও মাটিতে পড়ব না” । এই বলে ঠাস করে গাড়ির দরজা বন্ধ   করে দিল সে। কয়েক মুহুর্ত পরই চোখের সীমানার বাইরে চলে গেল গাড়িটা। কুৎসিত একটা গালি দিয়ে উঠল বড় ছেলেটা ।“বড়লোকগুলান সব এক কিসিমের। একটা পয়সাও দিল না”। “খাড়া একবার বড় হইতে দে, সব কিছু বোম মাইরা উড়ায় দিমু,আগুন জ্বালায় দিমু” বলে উঠল  আরেকটা ছেলে। তার চোখের তাঁরায় জ্বলে উঠল  ঘৃণার আগুন। এতক্ষণ ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো চুপচাপ লক্ষ্য করছিল সেই যুবক।ছুঁচো ! হ্যাঁ, আসলেই ওরা ছুঁচোর পর্যায়েই পড়ে। মার খেলে একটু চিঁ চিঁ করে বৈকি।কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী ।শেষ পর্যন্ত ওই গর্তে ফিরে যাওয়াই ওদের নিয়তি। প্রবাদ টার কথা মনে পড়ে যায় তার , ‘জোর যার, মুল্লুক তার’ ।কথাটা কাটায় কাটায় ঠিক,নিয়তি বড়ই নির্মম। সে শুধু তাকেই দেয়, যে আদায় করে নেবার উপায় জানে। কথাটা মনে হতেই হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল তার শরীরে। নিয়তি বার বার শুধু তার মত কিছু দুর্বল সত্ত্বাকে  বোকা বানিয়ে যাবে তা সে কিছুতেই হতে দেবে না। সন্ধ্যা  হয়ে এসেছে। হালকা –পাতলা কুয়াশাও পড়ায় আবহাওয়া টা খানিকটা ঘোলাটেই হয়ে এসেছে বলা যায়। বসার জায়গা ছেড়ে উঠে দাড়াল সে। হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যেয়ে এক গলির মুখে দাড়াল সে। গলির ভেতরে অন্ধকারটা বেশ  ভালোভাবেই জেঁকে বসেছে। রাস্তার লাইটপোস্ট টাও নস্ট। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না তাকে। এক মহিলাকে দেখতে পেল।দেখে মনে হচ্ছে কোন ভদ্র ঘরের মহিলা।হয়তবা চাকুরিজীবি, দিন শেষে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। সাথে আর কেউ নেই।  চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিলো সে। কেউ নেই দেখে আরো একবার নিশ্চিন্ত হল। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা মোটামুটি বড় সাইজের ইট তুলে নিলো হাতে। সোজা হাঁটতে শুরু করল ঐ  মহিলাকে উদ্দেশ্য করে । তার মাথার বাম পাশটায় হঠাৎ যন্ত্রণা করতে শুরু করল ।শুরু হল নিয়তির বিরুদ্ধে এক বিক্ষুব্ধ সত্ত্বার যুদ্ধ।

৯৪৩ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “একটি বিক্ষুব্ধ সত্ত্বা”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।