ছেলেবেলার প্রান্তর

ছেলেবেলার প্রান্তর

আমার মাঝে মধ্যেই মনে হয় স্মৃতি সত্য ধারন করতে পারলেও পূর্ণ সত্যকে ধারন করতে পারেনা। কারন একটাই। স্মৃতিকে সব সময়েই বিস্মৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে হয়। অসম এই যুদ্ধে আমি দেখেছি বিস্মৃতিই বেশিরভাগ সময়ে বিজয়ী হয়!বিজয়ী এই বিস্মৃতি পরাজিত সকল স্মৃতিদেরকে রুপকথার সাত সমুদ্দুর আর তেরো নদীর ওপারে পদ্মপুকুরের নীচের লোহার সিন্দুকে অথবা গহীন কোন অন্ধ কুঠুরিতে রেখে আসে! এই স্থানে আধুনিক বিজ্ঞানও পৌঁছতে অক্ষম! ফলে আমরা যতই হাতড়াই না কেন, অতীতের খণ্ডাংশ অথবা সংযোগহীন কোন চিহ্ন কিংবা পলায়নপর অস্পর্শনীয় কোন মানব নিয়তি ছাড়া আর কোন কিছুকেই বর্তমানে তুলে আনা সম্ভব হয়না!

ছেলে বেলার কথা মনে করতে চাইতেই শুধু একটা প্রান্তরের কথা মনে এলো ! আমাদের বাড়ীর উত্তর পাশে এক মাইল দূরে অবস্থিত ঝাড়কাটা গ্রাম পর্যন্ত দিগন্ত বিস্তৃত ধু-ধু সবুজ প্রান্তর। পৃথিবী বা কাঁসার থালার  মতন গোল সেই প্রান্তরের ওপাড়ে নীলাকাশ এসে মিশেছে কালচে সবুজ গ্রামটার পেছনে। বৃত্তাকারে ঘুরে যাওয়া গ্রামটাকে মনে হয় প্রান্তররূপী এক অপরুপ বাগানের চারিধারের হেজলাইন! দিগন্ত থেকে আরও অনেক দূরে আবছায়াভাবে দৃশ্যমান নীলাভ গারো পাহাড়টাকে মনে হয় আকাশের বুকে হেজলাইনের প্রতিচ্ছায়া। সাপের মতন সরু একটা খাল দিগন্তকে অতিক্রম করে সবুজ সেই প্রান্তরের ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়ে আমাদের বাড়ীর চারপাশ ঘেরা পগারের উত্তর প্রান্তে এসে মিলেছে।এ টুকু ভাবতেই এক ঝাঁক মাছ কিলবিল করতে করতে খালের ভেতরে সাঁতরাতে সাঁতরাতে আমাদের পগারে এসে প্রবল আনন্দে খেলাধুলা শুরু করে দিল!

প্রান্তরের এক কোণে কামারের ভিটা। অতীত কোন সভ্যতার নিদর্শন হিশেবে আজও টিকে আছে! প্রান্তরের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে অনেকগুলো রেইন ট্রি কড়ই গাছ আর আম গাছ নিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে এক জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা। এই জঙ্গলের উত্তরাধিকার আমার! আমার জন্মেরও অনেক যুগ পূর্বে এই খানটায় আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল। এখন পরিত্যক্ত। স্কুল থেকে আসার পর নির্জন দুপুরে প্রতিনিয়ত আমি সেখানে যাই। কয়েকটা শঙ্খচিল এই জঙ্গল রাজ্যের আদি বাসিন্দা। সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষদের এই বাড়িতে বসবাসের সময় হতেই! আমি যতক্ষণ এই নিবিড় জঙ্গলের ভেতরে থাকি, ততক্ষন এরা মাথার ওপর দিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে চক্কর দিতে থাকে। হয়তবা আমাকে পাহারা দেবার জন্যে! কোন কোন সময়ে এরা উড়তে উড়তে দিগন্তের ওপাড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। শ্যাওড়া, আকন্দ, নিশিন্দি, বেতফলের গাছ এবং গুল্মলতা দিয়ে তৈরি এই ঘন জঙ্গলের ভেতরে আছে অনেকগুলো জীবন্ত প্রাণী আছে।টিকটিকি, গুইসাপ, হয়তোবা সাপও আছে এই গহীন জঙ্গলে। আমি যখন একা একা খেলি, তখন এরা আমার সামনে দিয়ে মাটির উপর দিয়ে বুকে ভর দিয়ে হেঁটে যায়। আমাকে কখনই ভয় পায়না।আমিও না। জঙ্গলের শ্যাওড়া গাছের ভেতরে বাসা করে আছে কয়েকটা কয়েকটা টুনটুনি। সারাক্ষন তারা আমার চারপাশে মৃদঙ্গের মতন শব্দ করতে থাকে! আর আছে অনেকগুলো হলুদ নরম পায়ের খয়েরী শালিক। এরাই সারাক্ষন কিচিরমিচির শব্দে আমার মনের আনন্দকে প্রকাশ করতে থাকে! আমি রোজই মনে মনে শঙ্খচিলদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরিয়ে যাই প্রান্তর, নদী আর আকাশ!

একেক ঋতুতে একেক রূপ ধরে এই প্রান্তর। বর্ষার আগে আগে দিগন্ত বিস্তৃত পাটগাছে ছেয়ে যায় পুরো প্রান্তর। ধুসর সবুজের ঢেউয়ে সারা দিনমান কাঁপতে থাকে প্রান্তর। একটা পায়ে চলা মেঠো পথ বয়ে গেছে পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে ঝাড় কাটা গ্রাম পর্যন্ত। ঐ গ্রামের ছেলে মেয়েরা এবং লোকেরা এই পথ দিয়ে স্কুল আর বাজারে আসা যাওয়া করে।এই পথ দিয়েই আমি প্রতিদিন সন্ধেবেলায় এই প্রান্তর অতিক্রম করে যাই ঝাড়কাটা গ্রামের মন্ডল বাড়িতে। বান্ধা এক পরিবার হতে এলুমিনিয়ামের জগে করে দুধ আনতে। ফেরার পথে পুরো পথটাই প্রায় জনশূন্য থাকে। দুধ নিয়ে ফেরার পথে গোধূলির আগমনে পাটক্ষেতের ভেতরে অন্ধকার নিবিড় হয়ে আসে। চারদিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতে থাকে। ভয়ে আমার গা ছমছম করতে থাকে সরবক্ষন । আকস্মিক কোন শব্দ হলেই আমি এলুমিনিয়ামের জগটাকে বুকের সামনে ধরে ডান বাম কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড়াতে থাকি। এক সময়ে পাটক্ষেতের ঘনত্ব কমে আসে এবং আমি অস্পষ্টভাবে আমাদের বাড়ীটকে দৃশ্যমান দেখতে পাই। কতবার যে এভাবে দৌড়াতে গিয়ে জগ থেকে দুধ ছিটকে বের হয়ে যেয়ে আমি ভিজে গিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই!

বর্ষায় প্রান্তরটা একটা মনোরম দৃশ্য ধারন করে। পুরো প্রান্তর ভরে যায় বানের পানিতে। আমাদের বাড়ীটাকেও মনে হয় জলের ওপরে ভেসে থাকা একটা দ্বীপ। বানের ঘোলা পানিতে মাথা জাগিয়ে থাকে শুধু আমন ধানের মাথাগুলো। দূর থেকে মনে হয় সবুজ রঙের ঢেউ। কোনদিন এই প্রান্তর জুড়ে শুরু হয়ে যায় নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা। ৬০ থেকে ১৫০ ফুট লম্বা বাইচের নৌকাগুলো যখন একসাথে বৈঠা মেরে প্রান্তরের ওপার থেকে এপারে আসে তখন নৌকার বয়াতিদের গানের তালে নাচতে নাচতে আন্দোলিত হতে থাকে চারপাশের গ্রামগুলো আর গ্রামের মানুষগুলোর মন। তারপর একদিন বর্ষার পানি সরে যেতে থাকে। প্রান্তরের খাল দিয়ে তখন নেমে আসে হাজারো মাছের মেলা। আমন ধানের খড়ে হলুদ হয়ে থাকে সমস্ত প্রান্তর।

এরপর আসে শরৎ কাল। তারপর হেমন্ত! হাজারো নলকূপে ভরে যায় সমস্ত প্রান্তর। ইরিধানের চারা মঞ্জরিত হতে হতে এক সময়ে সারা প্রান্তর হলুদে ভরে যায়। ধান কাটার মৌসুমে প্রান্তরের সারা গায়ে সোঁদা গন্ধ। মাঠে তখন আর ধান নেই। কোদাল দিয়ে ইঁদুরের গর্ত থেকে এলাকার গরীব ছেলেমেয়েরা বের করে আনছে রাশি রাশি ধান!

আমার মনে আছে আমি এই সময়েই স্বপ্নটা দেখেছিলাম। ছোটবেলায় আমার ভেতরে স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যৎ অনুধাবন করার একটা প্রবল শক্তি আমার ভেতরে ছিল! আমার দাদীর মৃত্যুর আগে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলাম আকাশের তারা নিয়ে। তার মাত্র কয়েকদিন পরেই আমার দাদী অকস্মাৎভাবে মরে গিয়েছিলেন! অন্য এক রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম আমি নিজেই মরে গিয়েছি!আমাদের বাড়ীর উত্তর পাশের তালগাছটার নিচ থেকে পুরো প্রান্তরটা দেখা যায়। আমার মৃত্যুর পর আমাকে বিদায় জানানোর জন্যে বাড়ীর সবাই আমাকে তালগাছটার নীচে নিয়ে এসেছে। সবাই নির্লিপ্তভাবে আমাকে হাত নেড়ে বিদায় দিল। প্রান্তরের মেঠো পথ দিয়ে উত্তরের গারো পাহাড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমার মন ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু প্রান্তরের মাঝখানের জংগলের কাছে আসতেই আমার মন খুশিতে ভরে উঠলো। হঠাৎ মনে হল মৃত মানুষের যেহেতু শারীরিক কোন অস্তিত্ব নেই, সেহেতু আমি চাইলে উড়তে পারি! আমি দেখলাম আমি সত্যি সত্যিই উড়তে পারছি!এবং আমার চারপাশ দিয়ে উড়ছে সেই শঙ্খচিলগুলো! উড়তে উড়তে আমি দিগন্তের কাছে যেখানে ঝাড় কাটা গ্রাম আর আকাশ মিলে গিয়েছে সেখান থেকে পেছনে ফিরে তাকালাম। আবার আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। এখান থেকে আমার গ্রামটা অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে! প্রান্তরের ওপারে নীল টিনের দেয়াল ঘেরা আগাছার রাজ্যের ভিতর একাকী দাঁড়িয়ে আছে কুয়াশাচ্ছন্ন আমার বাড়ি। সেখানে আমি মারা গেছি! এই প্রান্তর, এই আগাছার সাম্রাজ্য আর তালগাছের নীচে আমার আর কখনই ফেরা হবেনা!

ঠিক পরের বছরই আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়ে চিরদিনের মতন চলে এলাম!

“স্মৃতির সরণি বেয়ে হেঁটে বেড়াই সারাদিনমান…/হাত ডোবাই পাঁকে, খোঁজ করি পদ্মের/মেলে না…/মেলে না…/কাঁদা ঘাটাই সার হয়/ক্লান্তি আসে, তবু থামি না/ঘেঁটেই চলি ঘেঁটেই চলি../একসময় গড়িয়ে পড়ি খড়ের গাদায়/আমার ছেলেবেলার খড়ের গাদায়…/কী হবে পদ্ম তুলে../বরং এইখানে শুয়ে থাকি খানিক চুপটি করে/কেউ দেখতে পাবে না আমায়…”

 

(সম্পাদিত)

 

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

০৬ জুন ২০১৬

২,৩১৮ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “ছেলেবেলার প্রান্তর”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।