সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায় (৫ম পর্ব)

সমুদ্রপারে তাদের পাড়ায় পাড়ায় (৫ম পর্ব)

লুনসারের লৌহ পাহাড়ে!

আমার ব্যক্তিগত মত হল পৃথিবীতে স্বাধীনতা বা স্বাধিকারের জন্যে যুদ্ধই হল ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ; অন্য যে কোন ধরনের যুদ্ধই মানুষের জন্যে অকল্যাণকর। ন্যায় সঙ্গত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মানুষদের আচরন, চলাফেরা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রন করার কোন প্রয়োজন নেই, কারন এই সময়গুলোতে মানুষেরা তাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মৌলিক চিন্তাভাবনা এবং আচরণকেই সকল সময়ে প্রতিবিম্বিত করে থাকে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল আমাদের ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। কি এক অলৌকিক তাড়নায় সারাদেশের শুধুমাত্র কিছুসংখ্যক ব্যতীত সকলেই হিরন্ময় কোন এক সুত্রে গ্রথিত হয়ে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল! আমি ঐ সময়টাতে ক্লাস ওয়ানে পড়া এক শিশু হয়েও বুঝতে পারতাম মানুষের এই যুথবদ্ধতা।

সিয়েরালিওনের যুদ্ধটা ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ। এখানে দেশের মানুষেরা পরস্পরের শত্রু এবং পরস্পরকে হানাহানি করতে লিপ্ত। এই যুদ্ধে কোন নৈতিকতার লেশ মাত্র নেই। যুদ্ধংদেহী সকল দলের সদস্যরাই এখানে মানবিকতাকে লঙ্ঘন করতে ব্যস্ত। এই ধরনের একটা পরিস্থিতি শান্তিস্থাপনের উদ্দেশ্য আগত দল সমুহের সদস্যদের ভেতরেও বিচ্যুতি সৃষ্টি করতে পারে! একারনেই সম্ভবত আমাদের সকল আচরনের ওপরে ঊর্ধ্বতন বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণের আতিশয্য বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে!এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি অনুভব করলাম আমার প্রয়োজন হয়ে পরেছে উজ্জ্বল আলোর ভেতরে অবস্থিত আটলান্টিকের মুক্ত সৈকত থেকে দুরে ঘন অরণ্যানীতে ঢাকা কোন প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়া, যেখানে নিঃসীম সমুদ্রের বদলে পাহাড়ের ‘একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী, চরাচরে তীব্র নির্জনতা’ বিরাজ করবে!

২০০২ সালের সম্ভবত জুন/জুলাই মাস (ডায়েরী লেখার অভ্যেস কখনই না থাকায় স্মৃতিচারণের সময়ে ১০০% সঠিক সময়কাল আমার পক্ষে কখনই মনে করা সম্ভব হয়না! এছাড়া এই বিষয় নিয়ে আমি কখনো লিখব এটা সাম্প্রতিক অতীত ছাড়া কখনই মনে হয়নি!)। মধ্য সিয়েরালিওনের লুনসার নামক স্থানে বাংলাদেশ আর্টিলারি ব্যাটালিয়নের সহযোগী সিগন্যাল কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিশেবে কয়েক পক্ষকালের জন্যে গড্রিচের সমুদ্রপারের ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর থেকে আমি এসেছি। মেজর আসাদ (বড়) এর হয়ে প্রক্সি দিতে! স্যার দুই মাসের ছুটিতে বাংলাদেশের খুলনা জেলার সাতক্ষীরা এলাকায় নিজ বাড়ীতে গেছেন! লুনসারের কোম্পানি অফিসে ঢুকতেই ক্যাপ্টেন শাব্বির মৃদু হেসে আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানাল। অফিসে ঢোকার কিছুক্ষন পরই আমার পূর্ব পরিচিত এক সৈনিক আমাকে সালাম দিয়েই অফিস বিল্ডিং এর দেয়ালে চালুনের মতন ঝাঁঝরা করা অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র দেখিয়ে আমাকে বলে গেল, “স্যার, এই দেয়ালগুলোর গায়ে যে ছিদ্রগুলো দেখছেন এগুলো গুলির ছিদ্র! আমদেরও অনেক আগে এখানে নাইজেরিয়ান সেনাবাহিনীর একটা প্লাটুন ছিল। আর ইউ এফ (রেভুল্যুশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্ট) এর বিপ্লবীরা একরাতে আক্রমন করে প্লাটুন কমান্ডার এক ক্যাপ্টেন সহ পুরো প্লাটুনের সবাইকে মেরে ফেলে! এই এলাকার লোকজনের কাছ থেকে আমি শুনেছি আর ইউ এফ কমান্ডার শুধুমাত্র গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই ক্যাপ্টেনের বুক বেয়নেট দিয়ে চিড়ে তার কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল!” আমি অবাক। শেষ পর্যন্ত আমি রবিন্সন ক্রুসোর মতন মুক্ত সমুদ্রের পাড় থেকে ঘন অরন্যের ক্যানিবালদের দেশে এসে পরেছি? কিছুটা আতঙ্কিত এবং অন্যমনস্কভাবে আমি টান দিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলতেই অনেকগুলো জরাজীর্ণ পুরনো গুলির খালি কার্টিজ আমার হাতের নীচে গড়িয়ে এলো! এরা সেই আক্রমনের ভয়াল স্মৃতিকে ধারন করছে! শাব্বির আমাকে প্রথমে আমার বসবাসের রুম এবং তারপরে বসবাস রুমের থেকে দুইগজ দূরের নিজেদের তৈরি বাথরুম দেখিয়ে বলল, “ স্যার, দুইদিন আগে এর ভেতরে আমরা একটা অজগর সাপ দেখেছিলাম, কিন্তু মারতে পারিনি। পালিয়ে গেছে। আপনি একটু সাবধানে থাকবেন”! পর পর দুটো আত্মা অথবা হৃদয় হরণকারী তথ্য শুনে আমি যারপরনাই বিচলিত। আমি শাব্বিরের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালাম। সে পূর্বের মতন মৃদু হাসছে। এই হাসির ভেতর থেকে সত্য বের করে নিয়ে আসার কোন উপায়ই নেই। পরে আমি খেয়াল করে দেখেছি শাব্বির আসলে হাসেনা, তার মুখটাই হাসি হাসি!

‘আর ইউ এফ’ এর কারনেই আমাদেরকে সিয়েরালিওনে আসতে হয়েছে! ১৯৬১ সনে দেশটি স্বাধীন হবার পর থেকেই মুল্যবান হীরার খনিই নিরীহ দেশবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। মুল্যবান খনিজ সম্পদ আহরনের লক্ষ্যে ঔপনিবেশিক প্রভুরা দেশটিতে দুর্বল শাসন ব্যবস্থা চালু রাখতে সচেষ্ট হয়। ফলে জন্ম নেয় কুশাসন। আর্থ-সামাজিক অবনতি। অর্থনৈতিক দৈন্যতা সেনাবাহিনীকে করে তোলে বিশৃংখল। এই সুযোগে সেনাবাহিনী থেকে বহিস্কৃত কর্পোরাল ফুদে শাংক দেশের বেকার যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলে বিপ্লবী বাহিনী, রেভুলেশনারী ইউনাইটেড ফ্রন্ট সংক্ষেপে আরইউএফ। ফ্যুদে শাংক সেনাবাহিনি হতে বহিষ্কৃত এক প্রাক্তন সৈনিক হওয়া ছাড়াও ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্যামেরাম্যান যে প্রশিক্ষন গ্রহন করেছিলো স্নায়ু যুদ্ধকালীন সময়ে লিবিয়ায় গাদ্দাফির গেরিলা ক্যাম্পে। তিনি ১৯৮৮-৮৯ সালে লিবিয়ায় আরইউএফ সংগঠিত করেন নিজ দেশে বিপ্লব ঘটানোর জন্যে। ‘আর ইউ এফ’ ১৯৯২ সন থেকে ২০০২ সন পর্যন্ত সিয়েরালিওনে প্রলয়ঙ্করী এক গৃহযুদ্ধের অবতারনা করে। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, কোন বিপ্লবীবাহিনীই দেশের অভ্যন্তরে এককভাবে গড়ে উঠতে পারেনা কারণ তাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সহায়তা।। সিয়েরালিওনের হীরক এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদে আকৃষ্ট হয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হবার জন্য প্রতিবেশী দেশ লাইবেরিয়ার চার্লস টেইলর তার National Patriotic Front of Liberia (NPFL) আরইউএফকে সবধরনের সহায়তা দিতে প্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁরই মদতে ১৯৯১ সনে আর-ইউ-এফ আক্রমন করে বসে সীমান্তবর্তি অঞ্চলে, উদ্দেশ্য হীরক খনি দখলসহ সরকার উৎখাত। বিপ্লবীদেরকে বিশৃংখল সেনাবাহিনী দিয়ে দমন করা সম্ভব নয় বিবেচনা করে সরকার গড়ে তোলে মিলিশিয়া বাহিনী, সিভিল ডিফেন্স ফোর্স সংক্ষেপে সিডিএফ এবং উদ্ভুত পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে সমাধা না করে সিয়েরালিওনের তৎকালীন প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী হিংগা নরমান, সেনাবাহিনী ও সিডিএফ দিয়ে আরইউএফকে প্রতিহত করার কৌশল বেছে নেন। ফলে শুরু হয়ে যায় নির্মম এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারনে সিয়েরালিওনে এক দশক সময়কালে লক্ষাধিক সাধারন মানুষ নিহত হয়, দুই মিলিয়ন মানুষ নিজেদের এলাকা থেকে বিচ্যুত (Displaced) হয় এবং অসংখ্য পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আরইউএফ কোমলপ্রাণ শিশুদের জোরপুর্বক ধরে নিয়ে তাদের বাহিনীতে শামিল করে। এই বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত ‘অপারেশন পে ইয়োরসেলফ’ এবং ‘অপারেশন নো লিভিং থিং’ দ্বারা ফ্যুদে শাঙ্ক নেশায় আসক্ত করে অবুঝ শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের দিয়ে চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মানুষজনদের বিকলাঙ্গ করে দেয়ার মতন চরম পর্যায়ের মানবাধিকার লংঘন।মাদক নির্ভর এই অভূতপূর্ব শিশু বা কিশোর বিপ্লবী বাহিনীরই প্রামানিক দর্শন আমরা দেখতে পাই আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘ব্লাড ডায়মন্ড’-এ। পার্থক্য শুধু এই ছবিতে বরাবরের মতন ভিয়েতনাম যুদ্ধের র‍্যামবোর মতন প্রটাগনিস্ট Danny Archer (Leonardo DiCaprio) কে সূচিত করা হয়েছে আমেরিকানদের শৌর্য–বীর্য প্রদর্শনের জন্যে! যুদ্ধের প্রথম বার মাসের ভেতরেই আর ইউ এফ সিয়েরালিওনের নিষ্ক্রিয় সরকারকে আরও নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে এবং দেশের পূর্ব ও দক্ষিনের হীরার খনিগুলোকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়।

আমার ধারনা আর ইউ এফ কর্তৃক আমাদের বর্তমান ক্যাম্পে আক্রমনের ঘটনাটি সম্ভবত ১৯৯৯ সনের দিকে ঘটেছিলো। কয়েকটা বিদ্রোহ-প্রতিবিদ্রোহের পর ১৯৯৬ সালে Ahmad Tejan Kabbah নামের জনৈক ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনের মাধ্যমে সিয়েরালিওনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কাবাহ তার ক্ষমতার নয়মাসের মাথায় আরইউএফ এর সাথে একটা শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হন, কিন্তু তিনি নিজেই Major Johnny Paul Koroma নামের সামরিক বাহিনীর মেজরের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গিনিতে পালিয়ে যান। এই প্রবাসে থাকাকালেই তিনি নাইজেরিয়ানদের সর্বময় কর্তৃত্বাধীন Economic Community of West African States Monitoring Group (ECOMOG) সংস্থার সাহায্য কামনা করেন। ECOMOG তাকে সাহায্য করতে সম্মত হয় এবং সিয়েরালিওনের বিভিন্নস্থানে এর অধিনস্ত সেনাবাহিনি আরইউএফ এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন করে। অতঃপর ECOMOG বাহিনির কাছে বিশৃঙ্খল আরইউএফ বাহিনী পরাজিত হলে ফ্যুদে শাঙ্ক বন্দি হয় এবং তার স্থলাভিষিক্ত হয় Sam Bokari নামের আর ইউ এফ এর আরেক নেতা যিনি ইতিমধ্যেই তার ‘ধর্ষণ, হত্যা আর অঙ্গহানি’ রণকৌশল দ্বারা বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। প্রবাসী কাবাহ সরকার কর্তৃক ফ্যুদে শাঙ্ককে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। কিন্তু ঠিক পরের বছরেই ১৯৯৯ সনে আরইউএফ পুনরায় সিয়েরালিওনের বিভিন্ন স্থানে নিয়োজিত ECOMOG এর ক্যাম্পসমূহের উপর আক্রমন করে এবং ৫০০০ সাধারন মানুষকে হত্যা করে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তারা ফ্রিটাউন এবং অন্যান্য শহর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আমার ধারনা এই সময়েই আমার ক্যাম্পে বর্ণিত হত্যাযজ্ঞটি ঘটেছিলো! উল্লেখ্য, এ বছরেই Togo –তে কাবাহ সরকার এবং আর ইউ এফ এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ডাকা হয় যেখানে ফ্যুদে শাঙ্ককে তার মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিয়ে তাকে সিয়েরালিওনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ এবং তার কাছে সিয়েরালিওনের হীরার খনির কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়া হয়। বিনিময়ে তিনি জাতিসংঘ বাহিনীকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে সিয়েরালিওনে আসতে দিতে সম্মত হন!

লুন্সারে আমার কয়েক পক্ষকালের অবস্থান ছিল মুগ্ধতা আর বৈচিত্রে ভরপুর। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমাদের ক্যাম্পের চারপাশে সারি সারি ‘আয়রন হিল’ সকালের সোনালী আলোতে চিকচিক করছে। পাহাড়ের নিচে উঁচুনিচু সমতল ভূমিতে হাজার হাজার পাম গাছের মাথা মুড়ানো এবং পুড়ানো। দেখে মনে হবে রাতের বেলায় কোন দৈত্য এসে এদের ঘাড় মটকে দিয়ে গেছে! আমি শাব্বিরকে জিজ্ঞেস করলাম, “পামগাছ গুলোর এই অবস্থা হয়েছে কেন?” শাব্বির বলল, “ স্যার, আজ রাতেই বুঝবেন!” বলেই হেসে তার রুমে চলে গেল। রাত নয়টার দিকে প্রবল ক্রান্তীয় ঝড় শুরু হল। মনে হচ্ছে কিয়ামত শুরু হয়েছে কোন ধরনের পূর্ব সংকেত প্রদান করা ছাড়াই! মুহুর্মুহু বিদ্যুতের চমকে ঝলসে উঠছে রাতের পৃথিবী। বিদ্যুতের ফুলকি বের হচ্ছে আমাদের সামনে রাখা টেলিফোন থেকে। আমরা দুজনে মিলে রুমের মাঝখানে জড়সড় হয়ে যিশু খ্রিষ্টের মতন প্রার্থনায় রত। আমাদের দুজনের মুখ থেকে আপনাআপনিই পবিত্র কোরআনের আয়াত ঝরে পরছে! ঘুম থেকে উঠে দেখি রৌদ্র করোজ্জল সোনালি সকাল!

মুলত আসাদ স্যারের অনুপস্থিতিতে তার চলমান কিছু কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের প্রধান কাজ। প্রতিদিন সকালে গাড়ীতে করে জাতিসংঘ হতে আমাদের খাবার হিশেবে সরবরাহকৃত বিস্কুট, চকলেট, কফি ইত্যাদি নিয়ে আমরা গহীন ঘন জঙ্গলের ভেতরে চলে যাই। এমন নিবিড় বন আমি কোথাও দেখিনি। অনেক দূর পর পর এক একটা গ্রাম। ছন দিয়ে তৈরি উল্টো ফানেলের মতন ঘরের চাল। এগুলোই সিয়েরালিওনের আদি বাসস্থান। প্রতিটা গ্রামেই গ্রামের প্রধান আছে। আর কয়েকটা গ্রাম মিলে আছেন একজন ‘প্যারামাউণ্ট চিফ’ যার রোল মুলত জাপানের সম্রাট হিরোহিত’র মতন। ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ অবতার! সবারই খুব সুন্দর সুন্দর তরুণী ভার্যা আছে! এমনকি যে কারো নতুন স্ত্রীকে বিবাহের বাসর রাত প্যারামাউন্ট চীফের সাথে কাটাতে হয়। এ নিয়ে কারো কোন অভিযোগ আছে বলে মনে হলনা! সবাই মনে করে প্যারামাউন্ট চীফরা কখনই মৃত্যুবরণ করেনা। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান তার আত্মাকে নির্ধারিত কোন সময়ে প্রতিস্থাপন করে থাকে মাত্র। সেটাও সম্পন্ন হয় জাঁকজমকপূর্ণ অনুস্থানের মাধ্যমে!আমাদের এলাকার এলাকার প্যারামাউন্ট চীফ একজন আশি ঊর্ধ্ব বয়সের মানুষ। তিনি মাঝেমধ্যেই আমাদের ক্যাম্পে আসেন। নিয়মিতভাবে আমরা তাকে আমাদের উদ্বৃত্ত খাবার থেকে খাবার সরবরাহ করে থাকি। একদিন আমার জীপের চালক একটা গ্রামীণ বাজারের পাশে এসে সিয়েরালিওনের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পরা একটা ম্লানমুখের সুন্দরী কিশোরীকে দেখিয়ে বলল, “ স্যার, এই মেয়েটা প্যারামাউন্ট চীফের অনেক স্ত্রীর একজন!” – গ্রামীণ সমাজ এখানে স্থবির! যুগ যুগ ধরে সক্রিয় এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে আছে এই নারীরা! মুহূর্তেই আমার জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের ‘টুনি’ চরিত্রের কথা মনে পরে গেল!

অবশ্য এর ব্যতিক্রমও যে আমি দেখিনি তা বলা যাবেনা। একদিন সকালে আমার কোম্পানির সিনিয়র জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার) এসে বলল, “এগারোজন মেয়ে এসেছে আপনার সাথে দেখা করার জন্যে। গোলঘরে বসতে দিয়েছি তাদের। লাঞ্চের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এদের জন্যে!” আমি বিচলিত। শাব্বির আজ সকালেই শুকনো খাবার নিয়ে টহলে বের হয়েছে। গ্রামে গ্রামে প্রদক্ষিন করবে সে, গ্রামের আবালবৃদ্ধবণিতারা সবাই ‘বাংলা, বাংলা’ বলে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এসে তার জীপের চারপাশে ভিড় করবে। শাব্বির মৃদু হেসে তাদের ভেতরে খাবার বিতরন করবে এবং সুকৌশলে শান্তি পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেবে! আমি সিনিওর জেসিওকে বললাম, “আপনি আমার সাথে থাকবেন”! গোলঘরের কাছে যেতেই দেখি অদ্ভুত কলকাকলিতে গোলঘর ভরে আছে। এক অনিন্দ্য সুন্দর সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়া এক কালো মেয়ে আমার দিকে হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে শুদ্ধ ব্রিটিশ উচ্চারনে বলল, “ গুড মর্নিং স্যার। আর নট ইউ ভেরি হ্যাপি, সিইইং দিস মোস্ট বিউটিফুল লেডিস অফ সিয়েরালিওন এট ইওর ক্যাম্প?” এরা স্থানীয় মিশনারি স্কুলের ছাত্রী। অন্য একটা মেয়েদের দলের সাথে ফুটবল খেলার জন্যে অনুষ্ঠান করার জন্যে আমার কাছে চাঁদা চাইতে এসেছে!প্রাচীনকালে নাকি গ্রীক দেবতারা আফ্রিকার এই অঞ্চলের রাজা-রানীদের সাথে ডিনার পার্টি করতে পছন্দ করতেন!

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

২,৫৪৪ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।